ডাকটিকিটে পদ্ম - Breaking Bangla

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Thursday, 4 January 2018

ডাকটিকিটে পদ্ম



 কল্যাণ চক্রবর্তী ও মানবেন্দ্র রায়:    পদ্ম ভারতের জাতীয় ফুল, জলজ ফুলের রাণী। ভারতীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে পদ্ম একটি অতুলনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ নাম। বাংলায় বর্ষা ঋতুর শেষে এবং শরতের মাসে  প্রকৃতিতে পদ্মফুল এক অনবদ্য শোভায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। লোকায়ত ধারণায় পদ্ম-দল হয়ে উঠেছে ধনের দেবী লক্ষ্মীর আলয়, এমনকি লৌকিক দেবী মনসাও হয়ে উঠেছেন 'পদ্মাবতী'। সারা বিশ্বের বহু দেবদেবী পদ্মাসনা।
পদ্মের উদ্ভিদবিদ্যাগত নাম নিলাম্ব নুসিফেরা। এটি নিলাম্বোনেসী পরিবারের অন্তর্গত, যার সঙ্গে শাপলা বা শালুক গোত্রের উদ্ভিদের (নিম্ফিয়েসী) অনেকটা সাদৃশ্য আছে, বিশেষ করে নীল পদ্মের  সঙ্গে। পদ্ম জলে ভাসমান অথচ ভূ-আশ্রয়ী দীর্ঘজীবী সপুষ্পক উদ্ভিদ। ডোবা, পুকুর, খাল, বিল, হাওর, বাঁওড়ে পদ্ম জন্মাতে দেখা যায়। জলের উপরিতলে এর ফুলও পাতার নান্দনিক সৌকর্য, কিন্তু মূল প্রোথিত থাকে জলে, কাদা-মাটিতে।
পদ্ম একটি বহু পাপড়িযুক্ত, বৃহৎ পুষ্প, ফুলের বিস্তৃতি ৮-১০ সেমি, তার বর্ণ লাল, গোলাপি কিংবা সাদা; ফুলটি কাঁটাযুক্ত বোঁটার উপরে   খাঁড়াভাবে অবস্থান করে। পাতাগুলি বড় ও গোলাকার, কোনোটা জলের উপরে উঁচিয়ে থাকে, আবার কোনোটা জলের তলে অবস্থান করে। এর কন্দ ও বীজের সাহায্যে চারা তৈরি করা যায়। পদ্ম ফুল, ফল ও কন্দের নানান ভেষজ ও লৌকিক ব্যবহার রয়েছে।
পদ্মের আদি বাসভূমি ক্রান্তীয় এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া। এতদ অঞ্চলের নানান দেশের জল- মালঞ্চে তার চাষ হয়ে আসছে। ভারত ছাড়া ভিয়েতনামের জাতীয় ফুল পদ্ম। ভারতের কর্ণাটক, হরিয়ানা ও অন্ধ্রপদেশের রাজ্যগত ফুল হিসাবে পদ্মকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। হিন্দু, বৌদ্ধ, মিশরীয় এমনকি খ্রিষ্টধর্মেও পদ্ম এক পবিত্র ফুলের মর্যাদায় আসীন। তার কারণ কর্দমাক্ত, অপরিষ্কার জলের উপরে বিকশিত হয় তার নির্মল-নিষ্কলুষ মনোহর শোভা। পদ্ম তাই স্বচ্ছতার এক নাম; তনু-মন-বাক্যের নবজাগরণের প্রতীক।
লোকসংস্কৃতিতে পদ্ম একটি তাৎপর্যপূর্ণ 'মোটিফ' -- সৌকর্য, সৌন্দর্য, চমৎকারিত্ব, পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার এক সর্বজনগৃহীত প্রতীক। ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ল্যাওসের লোকসংস্কৃতিতে পদ্মের নামটি সম্পৃক্ত হয়ে আছে।
প্রস্তুত আলোচনায় আমরা ডাক-বিশ্বে পদ্মফুলের সুলুকসন্ধান করবো। ইংরাজিতে 'ফিলাটেলি' বলে একটি কথা আছে। বাংলা করলে অর্থ দাঁড়ায় ডাক-টিকিট সহ নানা ডাক-সামগ্রীর প্রতি আগ্রহ, গবেষণা ও চয়ন। 'ফিলাটেলি' কথাটি প্রথম ব্যবহার করেন জর্জেস হারপিন (১৮৬৪), কথাটি এসেছে ফরাসি 'ফিলালেটাই' শব্দ থেকে। দু'টি গ্রীক মূল শব্দ 'ফিল' এবং 'অ্যাটেলাই' থেকে তা তৈরি হয়েছে।
ফিলাটেলির বাংলা করলে দাঁড়ায়: এমন একটি সামগ্রীর প্রতি মানুষের আকর্ষণ ও আগ্রহ যার ব্যবহারের ফলে ডাকবাহী পণ্যকে নিঃশুল্ক করে তোলে। প্রথমে যখন ডাক-ব্যবস্থা চালু হল, তখন পত্রের গ্রহীতাকেই ডাক-মূল্য দিয়ে তা ছাড়িয়ে নিতে হত।
পরবর্তী কালে (১৮৪০ নাগাদ) প্রিপেড ডাকমূল্য চালু হল। অর্থাৎ চিঠির প্রেরককেই ডাক-খরচ দিতে হল। তারই অঙ্গ হিসাবে ডাকঘর থেকে ডাক-টিকিট ও অন্যান্য ডাক-সামগ্রী কেনার প্রচলন হল। এই যে ডাকটিকিট যা ডাক-খরচকে নিঃশুল্ক করে তুলল তার প্রতি আগ্রহ, তাকে জমানো, ডাকটিকিট বিনিময়, তা নিয়ে পঠন-পাঠন ও গবেষণা নিয়ে যে পরিভাষাটি তৈরি হল -- তার নাম 'ফিলাটেলাই'।
পৃথিবীর নানান দেশ নানান সময় পদ্ম সংক্রান্ত ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে। যেমন ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, চীন, সুইডেন, লাটভিয়া, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া, কম্বোডিয়া, ফিলিপিন্স ইত্যাদি। এর মধ্যে দু'একটি ডাকটিকিট সম্পর্কে আলোচনা করা যাক।
১৯৭৭ সালের ১লা জুলাই ভারত পদ্মের উপর যে ডাকটিকিটটি প্রকাশ করে তার ডিজাইন তৈরি হয় মুম্বাই-এর জে. পি. ইরাণীর আঁকা ছবি থেকে। বহুবর্ণের সমন্বয়ে ছাপানো এই ডাকটিকিটের মূল্য ছিল ২৫ পয়সা। ১৯৭৯ সালের ২রা জুলাই ৩০ পয়সা দামের একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে ভারত।
'ইন্ডিয়া ৮০' নামে আন্তর্জাতিক ডাকটিকিট প্রদর্শনীর প্রেক্ষিতে স্ট্যাম্পটি প্রকাশিত হয়। ১৯৫৪ সালের ২৪শে অক্টোবর 'ইউনাইটেড ন্যাশনাল ডে' উপলক্ষে ২ আনা মূল্যের একটি ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়, যেখানে পদ্ম ও জাতিপুঞ্জের এমলেম্ব ছাপানো হয়েছিল। ১৯৬৯ সালের ২রা অক্টোবর মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিনে তাঁর ছবির সঙ্গে (স্পিনিং হুইল সহ) সূর্য ও পদ্মের ছবি ছাপা হয়। সেখানে 'সূর্য' 'সত্য' এবং 'পদ্ম'টি 'অহিংসা'র প্রতীক।
১৯৬২ সালে নয়াদিল্লীতে অনুষ্ঠিত ১৯তম আন্তর্জাতিক চক্ষু-বিজ্ঞান কংগ্রেসের আয়োজন উপলক্ষে ১৫ নয়া পয়সা মূল্যের একটি ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়, তাতে মানব-জীবনের মহামূল্যবান চোখকে পদ্মের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে (পদ্মলোচন)। ডাকটিকিটে দেখা যায় সেখানে পদ্মফুলের মধ্যে একটি চোখ আঁকা।
ভারত ১৯৫৭ সালে ১৯ তম অন্তর্রাষ্ট্রীয় রেডক্রস সম্মেলন উপলক্ষে ১৫ পয়সা মূল্যের একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে যেখানে প্রস্ফুটিত পদ্মফুলের উপর সযতনে রেডক্রসের ছবি আঁকা।
এইরকম প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভারত সহ বিশ্বের নানান দেশের ডাকটিকিটে পদ্মের স্থান ঘটেছে।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad