শিষ্য ও ভাব-শিষ্য পরাম্পরা : শ্রী রামকৃষ্ণ থেকে স্বামীজি এবং স্বামীজি থেকে নেতাজি - Breaking Bangla

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Thursday, 4 January 2018

শিষ্য ও ভাব-শিষ্য পরাম্পরা : শ্রী রামকৃষ্ণ থেকে স্বামীজি এবং স্বামীজি থেকে নেতাজি

কর্তব্যবোধ দিবস পালন

ড. কল্যাণ চক্রবর্তী।

যা করা উচিত, তাই কর্তব্য। ✔কৃ+তব্য=কর্তব্য (কৃৎ-প্রত্যয়, ধাতুর সঙ্গে প্রত্যয় যুক্ত হওয়া)। বাংলায় প্রত্যয় মানে হল 'বিশ্বাস'। কোনো একটি শব্দকে বা ধাতুকে একটা context-এ ব্যবহারের জন্য 'প্রত্যয়' বিশ্বাসভাজন করে তোলে। এখানে 'তব্য' প্রত্যয়ে ঔচিত্য বিষয়ে বিশ্বাসভাজন করে তোলে। যেমন, জ্ঞাতব্য (এই জ্ঞানটা রাখা উচিত), গন্তব্য (এই জায়গটায় যাওয়া উচিত), পঠিতব্য (এই পাঠটা নেওয়া উচিত); সে রকম 'কর্তব্য' হল যে কাজ আমার করা উচিত। একটা জীবনচর্যায় যখন কোনো একটি মিশন বা উদ্দেশ্যকে একটা জায়গা পর্যন্ত যাওয়া উচিত বলে মনে করি, সেটাই আমার কর্তব্যবোধ।
একটা শিশুকে জন্ম দিয়েছি মানে আমার একটা মিশন শুরু হল। আমার কর্তব্য স্থির হচ্ছে, সে যতদিন না পর্যন্ত নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে এবং নিজের বোধ দ্বারা চালিত হতে শিখছে, ততদিন পর্যন্ত তার পাশে দাঁড়াবো -- এটাই আমার কর্তব্য।

আমরা যখন কোনো মহাপুরুষের কথা বলবো, তখন এটা দেখবো যে, দেশ ও জাতি গঠনে তিনি কত সুষ্ঠুভাবে জীবনচর্যায় কর্তব্যটাকে পালন করেছেন। যে ব্যক্তির কর্তব্যনিষ্ঠা যত বেশি গভীর, তিনি তত বড় মহাপুরুষ। এই কর্তব্যবোধটা সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে একেবারে কেন্দ্রীভূত হয় একটি পরিজন বা পরিবারকে কেন্দ্র করে। মহৎ মানুষ যারা হন, যারা সমাজ ও সংসারে মহাপুরুষ হিসাবে স্বীকৃত হন, তাদের কর্তব্যবোধের মধ্যে একটা বিশালত্ব থাকে। সমগ্র মানব জাতির উন্নতির জন্যই সেই কর্তব্যবোধ চালিত হয়।

স্বামীজি নারীর উন্নতির কথা ভেবেছেন; বারবার তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন; এমনকি নারীর আদর্শের কথাও শুনিয়েছেন, "হে ভারত, ভুলিয়ো না তোমার নারী জাতির আদর্শ।" সমকালে দাঁড়িয়ে ইওরোপীয় মহাপুরুষের এটা বলার প্রয়োজন ছিল না, বলেনও নি। কিন্তু ভারতের প্রেক্ষাপট তখন আলাদা, নবজাগরণের পর্ব এবং তার অন্যতম প্রয়োজন নারীমুক্তি। ভারতের ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, তাই স্বামীজি এই কর্তব্যবোধ দ্বারা চালিত হয়েছিলেন। ভগিনী নিবেদিতাকে বালিকা বিদ্যালয় গঠনের উপদেশ দিয়েছেন। একেই বলে সামাজিকভাবে চালিত হওয়া।

স্বামীজির গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ অসম্ভব ভালো কর্তব্য স্থির করে দিতে পারতেন। তিনি ছিলেন জন্মগত সিদ্ধ পুরুষ। তাঁর কোনো উক্তি/বাণী/বক্তব্য কোনোসময় হাওয়ায় ভাসছে না; অসম্ভব বাস্তববাদী মানুষ ছিলেন। তিনি কাশীপুরের শেষশয্যায় স্বহস্তে লিখে গেছিলেন, "নরেন শিক্ষে দেবে -- যখন ঘুরে বাহিরে হাঁক দিবে"। নরেন কিভাবে শিক্ষা দিয়েছেন? নিজে আচরণ করে সেই শিক্ষা দিয়েছেন; যাকে স্বামীজি নিজেই বলেছেন 'প্র্যাক্টিকাল বেদান্ত'। 'শিব জ্ঞানে জীব সেবা'। সে সময় ভারতের যুব-সমাজের কৃচ্ছসাধনেরও প্রয়োজন ছিল। পরিব্রাজক বিবেকানন্দ সমগ্র ভারতের অন্তরাত্মাকে চিনতে, জানতে চেয়েছিলেন, গোটা ভারতের দর্শনকে বুঝতে চেয়েছিলেন। এই যে পরিব্রাজনের নামে সেই  কৃচ্ছ্রসাধন, তা যুব সম্প্রদায়ের প্রতিও এক উজ্জ্বল শিক্ষার নিদর্শন; নিজের জীবন, আচরণ দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার শিক্ষা। কোন লক্ষ্যে যাত্রা করবেন তার জন্যই তৈরি হল মিশন;  রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন। তেমনই 'দিল্লী চলো' ডাক দিয়ে নেতাজী গড়ে তুললেন 'আজাদ হিন্দ ফৌজ'।

জানুয়ারি মাসে স্বামীজি ও নেতাজি -- এই দুই মণীষার শুভ আবির্ভাব। তাই জানুয়ারির ১২ থেকে ২৩ এর মাঝে (উনাদের জন্মদিনের শুভক্ষণের মাঝে) আমরা দেশবাসী 'কর্তব্যবোধ দিবস' পালন করতে পারি, শপথ নিতে পারি দেশমাতৃকাকে সযতনে রক্ষার, দেশকে গড়ে তোলার অঙ্গীকার। কর্তব্য বোধ হল ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক এবং নাগরিক হিসাবে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের সুলুকসন্ধান এবং তার যথাযথ রূপায়ণ।

আসুন আমরা স্বামীজি ও নেতাজিকে এই কালসূচীর মধ্যে স্মরণ ও মনন করে দেশকে এগিয়ে নেবার কাজে কাঁধে কাঁধ মেলাই। নতুন ভারত গড়ে তুলি। ভারত যেন 'জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন' লাভ করতে পারে।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad