বাংলা খেয়াল হয় না, হতে পারে না - Breaking Bangla

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Tuesday, 20 February 2018

বাংলা খেয়াল হয় না, হতে পারে না


অনুগ্রহ করে সকলে পড়ুন –
সম্প্রতি, কলকাতার কোনও কোনও বাংলা পত্রিকা, দু’একজন “গায়ক”, ইন্টারনেটে পড়া একটি সমালোচনা পত্র দাবি করেছেন বাংলা খেয়াল হয় না, হতে পারে না। কেউ বলছেন এক শ বছরেও বাংলা খেয়ালের কোনো ছাত্র তৈরি হবেন না। মোট কথা বেশ ঘটা করে এবং যথারীতি আমায় নিয়ে ঠাট্টা করে এঁরা সকলেই বলছেন – বাংলায় খেয়াল হতে পরে না। তাঁদের বক্তব্যের পক্ষে বাংলা খেয়ালের আঙ্গিকগত কোনও সমস্যা নিয়ে তাঁরা কিছু বলছেন না। তাঁদের বক্তব্যকে দাঁড় করাতে গিয়ে তাঁর কারুর কারুর উদ্ধৃতি দিচ্ছেন মাত্র। বা বলছেন রবীন্দ্রনাথ বাংলা খেয়ালের বন্দিশ লেখেননি। ভুল।

যাই হোক, আমার হাতে সঙ্গীত সুধাকর-সঙ্গীতাচার্য্য শ্রী সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় সংগীত-শাস্ত্রী কর্তৃক প্রণীত ‘বাঙ্গলা ভাষায় উচ্চাঙ্গ খেয়াল’ বইটির একটি ফোটোকপি এসেছে, তা থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি এই লেখায়:

“যেমন ভাষার প্রাণ, সুর ও কথার সম্পৃক্তি তেমনি গানের প্রাণ। একে অস্বীকার কেবল গায়ের জোরেই করা চলে। একমাত্র সুরেই যদি মন ভরত তাহলে যন্ত্রসঙ্গীতই যথেষ্ট ছিল এবং কন্ঠে শুধু সুর ভাঁজলেই গাওয়ার কাজটি সিদ্ধ হয়ে যেত, - শত শত গান সৃষ্টির কোন আবশ্যক ছিল না।

একদিন গানের কথা নিয়ে আলোচনায় পণ্ডিত ভাতখণ্ডেজিও বলেছিলেন – ‘গানে যদি কথার মূল্য ও অবদান না থাকে তাহলে রচনার আবশ্যক কি! তাহলে খাট্‌, টেবিল, চেয়ার ইত্যাদি বলে গাইলেই তো হল...’

সুর ও ভাষা একত্রে প্রকাশিত হয়ে স্রষ্টার মহিমা, নিজের আকাঙ্খা, আবেগ ও ভাব মূর্ত হয়ে উঠে বলেই সঙ্গীতের শ্রেষ্ঠত্ব সেখানে। যে সুর শুনে আমরা আহা করি, চোখ দিয়ে ভাবের জল গড়িয়ে পড়ে সে হল সঙ্গীতের প্রাণ আর বাহা হচ্ছে সঙ্গীতের দেহ, শরীর ও গঠন। আহা-র মধ্যে দিয়ে যে বাহা আসে সেই সঙ্গীতই শ্রেষ্ঠ। এই শ্রেষ্ঠত্বের পরম প্রকাশ আসে নিজের ভাষার আবেদনই। তখন মনে হয় প্রেয় শ্রেয়র সন্ধানে অগ্রসর করে নিয়ে যাচ্ছে পরম লক্ষ্য পথে।
...
ওস্তাদি গানের কথার এটুকু বলতে পারা যায়, যদি আমরা এতদিন ঐ সমস্ত গান নিজের মাতৃভাষার মাধ্যমেও গেয়ে আসতে পারতাম তাহলে সঙ্গীতজ্ঞদের আরও ব্যাপকভাবে মর্যাদা বাড়ত।

প্রত্যেকের নিজের বিবেক ও বিচারবুদ্ধির উপর নির্ভর রেখে বিবেচনা করার অনুরোধ জানিয়ে বলব, শিল্পীরা এবং সংগীতপরিচালনার কর্তৃপক্ষরা যদি বাংলা খেয়াল ইত্যাদি প্রচলনের দিকে একটু অবহিত এবং শিক্ষার্থীদেরও সেইভাবে অনুপ্রাণিত করে শিক্ষা দেওয়ার জন্য যত্ন নেন তাহলে আমার মনে হয় সত্যই সব দিক দিয়ে উদ্দেশ্য সাধন ও কল্যাণ হবে। আমার আগের গ্রন্থগুলোতেও এ সম্বন্ধে একান্ত ইচ্ছে প্রকাশ করে এসেছি।

বাঙলাভাষার পক্ষ নিয়ে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি আমার সঙ্গে বিতর্ক ও আলোচনা করেছেন। তাঁদের গভীর অনুভূতিপূর্ণ মন বলে – বাংলা খেয়াল ইত্যাদি গানের পচলন ও প্রচার করা সঙ্গীতজ্ঞ সমাজের একন্ত কর্তব্য। তাই আমাদের যতটুকু শক্তি-সামর্থ্য আছে তাকে সম্বল করে গভীর কর্তব্যবোধে ও ঐকান্তিক প্রেরণায় এই গ্রন্থ রচনার কাজে ব্রতী হলাম।

একটা কথা – বাঙলার শিল্পীদের মন হয়ত বলতে পারে – হিন্দীভাষার জোরাল শব্দোচ্চারণে গানে যে রূপ বলিষ্ঠতা আনে সেরূপ বাঙলা ভাষার সরস ও নরম উপাদানে কি করে সম্ভব হবে! এর উত্তরে একথা জোরের সহিত বলিতে পারি বাংলা ভাষাতে আরো উত্তমরূপে রাগের মহিমাময় মূর্তি আঁকতে পারা যায়। কথার শক্ত ও বেঁকান উচ্চারণই সঙ্গীত প্রকাশের একমাত্র সহায়ক নয়। তাছাড়া আমরা হিন্দিখেয়াল গান একটা যদি আধঘন্টা ধরে গাই, তাহলে কথাগুলো বোধহয় চার পাঁচ মিনিট উচ্চারিত হয়। উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের রাগরূপের শ্রেষ্ঠ প্রকাশ আলাপে যখন আমরা আঁকি তখন তার অক্ষরে থাকে তে-রে-নে-রি-তোম্‌-না না...। খেয়ালের উচ্চাঙ্গ যদি বিলম্বিত খেয়ালকে বলা যায় তাহলে তাতে কথার কোন স্থান আছে বলে তো মনে হয় না। কারণ দেখা যায় একটা কথা নিয়েই অনেক শিল্পী গাওয়ার কাজ সমাধা করেন।

আর একটা কথা, - গানের বলিষ্ঠতা, গাম্ভীর্য ও গায়কীর রূপ কথার উপরই নির্ভর করে না, নির্ভর করে গলার প্রকাশভঙ্গীর উপরেই।

যাই হোক আসল কথা এই – পরিপূর্ণভাবে রাগরূপ রচনায় বাংলা ভাষার প্রতিবন্ধকতা কিছুমাত্র নেই। তা যদি থাকত তাহলে বাল্যকাল হতে আটান্ন বছর ধরে হিন্দীগানগুলো গেয়ে এসে তার মায়া, মমতা ও প্রভাবের মধ্যেই থেকে যেতাম। নিজের ভাষায় দরদ দিয়ে গাইবার জন্য মন প্রাণ এত আকুল করত না। হিন্দীগানের সুর গুলোর উপর বাংলা রচনা দিয়ে যখন গাই তখন মনে হয় যেন আরো অনেক ভাল হল। মোটের উপর গাওয়ার ক্ষমতা ও কৃতিত্ব যাঁদের আছে তাঁদের বাংলা ভাষায় গাওয়া আরো ভালই হবে।

বিশ্বের দরবারে ভারতে যে ভাষা শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃত, যে ভাষা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ স্রষ্টার সব কিছু সুন্দরকে ও সব কিছু কল্যাণের মূর্তিকে এঁকে গেলেন, সমগ্র বায়ুমণ্ডলীর মত ভাবের মণ্ডলী সৃষ্টি করে গেলেন, সেই আমাদের বাংলা ভাষাকে উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের মধ্যে এনে তার প্রতিষ্ঠা ও পূজা করব না – এতই কি মোহাচ্ছন্ন আমরা!

বাংলা গানের প্রভাব ও বিশিষ্ট সুর নিয়ে রচনার সম্ভাবনা যে কত রকমে,কতরূপে, কত শ্রেষ্ঠ ভাবে হতে পারে তার একটি উদাহরণ ‘তেলেনা’ গান থেকে দিচ্ছি। নটমল্লার রাগের একটি তেলেনা, তার অক্ষর- “দারা দীম্‌ দারা দীম্‌ দারা দীম্‌ দারা তদারে দানি না দের্‌ তোম্‌...” ইত্যাদি। পূজ্যপাদ জ্যতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরমহাশয় তেলেনাটির সুর ও ছন্দের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে প্রকৃত পথ অবলম্বন করে নিজের মাতৃভাষায় রচনা করলেন অক্ষরের ছন্দ ও সুরের সমতায় ,-“কত দিন্‌ গতিহীন্‌ অতিদীন্‌ভাবে রহিব হে নাথ দেখাও তব আলো মম জীবন পথে আর কিছু চাহিনা চাহি শুধু তুমি থাক সাথে...।” জানিনা অন্য কোন ভাষায় এরূপ সুন্দর মিলন সম্পর্ক রাখতে পারে কিনা। আমার অন্তরে দারাদীম্‌ বলে গেয়ে বা হিন্দিগানের কজরা, গজরা, চুরিয়া, এবং সংখ্যাধিক্য শাশু, ননদী ইত্যাদি বেশীর ভাগ অপ্রয়োজনীয় কথা নিয়ে গেয়ে কল্যাণ হবে-না ঐ রকম বাংলা গানে হবে! সুরের সঙ্গে ওই রকম ভাব ও আবেগই ত আমার অন্তর খুঁজে বেড়াবে। সুরের ভাব এবং কথার ভাব একত্রে ফুল চন্দনের মত মিশিয়ে তার চরণে সমর্পণ করার তৃপ্তি যে বড় বেশী এবং গান গাওয়ার প্রয়োজনীয়তাও ত তাই।

কারো কারো ধারণা থাকতে পারে ভাষার ভাবের ওপর আকর্ষণ বেশী বাড়লে রাগরূপের বৈচিত্র প্রকাশ বিঘ্নিত হবে। এ আশঙ্কা সম্পূর্ণ অমূলক। কারণ- কোন রাগের ঠুম্‌রীর চেয়ে সেই রাগের ভজন গানে অনেক বেশী সুরের কাজ করতে পারা যায়। তখন মনে হয় সুরের ভাব ও বৈচিত্র এবং রচনার ভাব একত্রে মিলে এক অপূর্ব আধ্যাত্মিক ভাবময় মূর্ত্তির আবির্ভাব হয়। বিশেষ ভাবে প্রমাণিত হয়ে আছে ধ্রুপদ গানে দীর্ঘপদী রচনার আধ্যাত্মিক ভাব সম্পদের সঙ্গে রাগরূপের বিরাট ভাবসম্পদ। অন্য দিক দিয়ে আর একটা কথা,- কন্ঠের এমন কোন কস্‌রতের জিনিস প্রকাশ করলে কথার ভাবের রূপ যদি ক্ষুণ্ণ হয়ে পড়বে বলে মনে হয়, তাহলে সঙ্গীতের ও সাধনার কৃতিত্বের ক্ষতি কিছুই হবে না বরং সেগুলোকে গানে অপ্রয়োজনীয় বলেই মনে করব। সেগুলো বরং আমরা তেলেনায় এবং আলাপের দ্রুত কাজে ব্যবহার করতে পারি। যেমন স্বরগ্রাম, জটিল ছন্দ ইত্যাদি। আমি এইটুকু বুঝি যে যদি সুরের কোন কাজের জন্য কথার ভাব ব্যাহত হয়, তাহলে সুরের ভাবও নষ্ট হয়ে যায়। অবশ্য গ্নের সত্যকে যদি অস্বীকার না করে ভাষার মূল্য দিই। ...”
                                    *-*-*

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad