সুন্দরবনে শুরু মধু সংগ্রহ, স্বামীরা মধুর জন্য জঙ্গলে, তাদের স্ত্রীরা বিধবার বেশে গ্রামে থাকে। মলিন চেহারা। পায়ে জুতোও নেই। মাথার চুলে কিছুদিন ধরে তেলের ছোঁয়া পড়ে নি তা বোঝা যাচ্ছে। পরিপাটি করে আঁচড়ানো নয় চুল। বরং উসকো খুশকো হয়ে রয়েছে। এক ঝলকে দেখলে মনে হবে মহিলার স্বামী বোধহয় সদ্য মারা গেছেন। কিন্তু না, তাঁর স্বামী জীবিতই রয়েছেন। তবে মধু সংগ্রহের কাজের জন্য গেছেন সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে। আর সেই কারনেই ঘরে তাঁর স্ত্রী বিধাবার আচার আচরন পালন করতে শুরু করেছেন। দুইবেলা স্বামীর মঙ্গলকামনায় বনদেবীর থানে ফুল ও ডালা দিয়ে পুজো চড়াচ্ছেন। নিরামিষ আহারও করছেন। দু সপ্তাহ পরে মধু সংগ্রহ করে স্বামী বাড়ি ফিরবেন। স্বামী যাতে সুস্থ শরীরে বাড়ি ফিরে আসেন, তাঁর জন্যই স্ত্রীর এই আচার পালন। বনদেবীর কাছে দিনরাত ধরে প্রর্থনা। এটাই রীতি সুন্দরবনে মধু সংগ্রহে যাওয়া মৌউলে পরিবারদের। ঝড়খালির নদী বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে হেরোভাঙ্গা জঙ্গলের দিকে চেয়ে এমন কথাই শোনালেন সুন্দরবনে মৌউলের পরিবারের বধূরা ।
সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্প সূত্রে জানান হয়েছে, এবছর ব্যাঘ্র প্রকল্প এলাকায় মধু সংগ্রহের কাজ শুরু হয়ে গেছে। প্রকল্পের সজনেখালি ও বাঘনা রেঞ্জ কার্যালয় থেকে মৌউলেদের প্রয়োজনীয় অনুমতি পত্র দেওয়া হয়েছে। তাঁরা জঙ্গলে মধু সংগ্রহের কাজ শুরু করে দিয়েছেন। বাঘনা রেঞ্জ কার্যালয় থেকে ৩৬ টি দল এবং সজনেখালি থেকে ২৪ জন মৌউলের দল এই অনুমতি পত্র পেয়ে জঙ্গলে মধু সংগ্রহের কাজ করছেন। এবছর সরকার নির্ধারিত মধুর দাম ১২৫ টাকা কেজি। আর মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক হয়েছে ১১ টন। সুন্দরবনে এই সময় বাইন, গর্জন, খলসে প্রভৃতি গাছে ফুল ফুটতে শুরু করেছে। আর তা থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি মধু সংগ্রহ করে চাকে মজুত করছে। এই মধুর খ্যাতি জগৎ জোড়া। সুন্দরবনে প্রতিটি মধু সংগ্রহকারী দলে থাকেন ৬ জন করে মৌউলে। তাঁরা জঙ্গলে নেমে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েন। মৌচাক দেখতে পেলেই বিশেষ আওয়াজ করে সবাইকে এক জায়গায় জড়ো করেন। তারপর আগুনের ধোঁয়া দিয়ে মধু সংগ্রহের কাজ চলে। এক একটা চাক থেকে প্রায় ২০–২৫ কিলো মধু সংগ্রহ করা হয়। তারা বাঘকে বোকা বানানোর জন্য বিশেষ ধরনের মুখোশও পড়ে থাকেন। বন দপ্তরের এক আধিকারিক জানান এই বছরে মৌলেরা যথেষ্ট পরিমাণে মধু পাচ্ছেন ও মধু সংগ্রহ করে বন দপ্তরে জমা দিয়ে টাকা নিচ্ছেন। প্রতি বছর এই মধু সংগ্রহের সময় বাংলাদেশি দুষ্কৃতীদের আনাগোনা বাড়ে। সেই কারণে পুলিশ প্রশাসন ও বনদপ্তরের উদ্যোগে জোরদার নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয় সুন্দরবন জঙ্গলের বিভিন্ন দিকে। এমনকি বাঘ ও জল দস্যুদের আক্রমনে মারা গেলে সেই মৌলেদের পরিবারকে উপযুক্ত আর্থিক সাহায্য দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে।




No comments:
Post a Comment