পবিত্রমোহন বিশ্বাস: "আমার প্রার্থনা শোনো পঁচিশে বৈশাখ,
আর একবার তুমি জন্ম দাও রবীন্দ্রনাথের।
হতাশায় স্তব্ধ বাক্য; ভাষা চাই আমরা নির্বাক,
পাঠাব মৈত্রীর বাণী সারা পৃথিবীকে জানি ফের।"
সুকান্ত ভট্টাচার্যের এই কবিতা আজও বড্ড প্রাসঙ্গিক। বহু বছর আগে লেখা এই কবিতা পড়লে মনে হয় সদ্য লেখা হয়েছে। বিশেষ এক পরিস্থিতিতে কবি এই কবিতা লিখেছিলেন।
এখন আর হয়ত পৃথিবীতে নতুন করে বিশ্বযুদ্ধের সম্ভবনা নেই। কিন্তু,সারা পৃথিবীতেই যুদ্ধ লেগে আছে।আজ পৃথিবীর প্রত্যেকটি প্রান্তেই যেন স্বঘোষিত যুদ্ধ চলছে।এর শেষ কোথায় কেউ জানে না।রোজ মানুষ মরছে। সীমান্তের গোলাগুলিতে সেনাবাহিনীর জওয়ানদের প্রাণ যাচ্ছে।রোজ শত সহস্র মানুষ হিংসার বলি হচ্ছে। হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী।
খুন ধর্ষণ রাহাজানি আমাদের নিত্য সঙ্গী। শান্তি অস্তমিত হয়েছে।
এই রকম সময়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মত শান্তি প্রিয় মানুষের বড় দরকার ছিল। বরাবরই রবি ঠাকুর ছিলেন শান্তির স্বপক্ষে। এই উপলব্ধি থেকেই সুকান্ত পঁচিশে বৈশাখের কাছে আকুল প্রার্থনা করেছেন যাতে আরও একজন রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয়।যিনি সারা পৃথিবীতে শান্তির বার্তা পাঠাতে পারেন।
কবিগুরু ছিলেন মহীরুহ। মহীরুহের যেমন অসংখ্য ঝুরি নামে,ঠিক তেমনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সৃষ্টির ঝুরি নামিয়েছিলেন। তাঁর সেই ঝুরির মধ্যে কবিতা,উপন্যাস,গল্প, ছোট গল্প,নাটক,গান,পরিচালনা,পত্র সাহিত্য, প্রবন্ধ সহ সৃষ্টির আরও বহু শাখা রয়েছে।তাই রবীন্দ্রনাথ নামক মহীরুহ কোন ঝড়েই ভেঙ্গে পড়েনি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানুষের মধ্যে ভালবাসা ও শান্তি ও মৈত্রীর বাণী প্রচার করেছেন তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে।আজ যখন ঘরে ঘরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছে তখন মনে পড়ে কবিগুরুর সেই অমর প্রচেষ্টা যার জন্য তিনি রাখী বন্ধন উৎসব চালু করেছিলেন।
আজ থেকে ১৪৮ বছর আগে যে মানুষটি জন্মেছিলেন শান্তির বাণী নিয়ে, সেই রবীন্দ্রনাথের কোন বিকল্প নেই। তিনি শুধু ব্যক্তি ছিলেন না, ছিলেন একটি আদর্শ শিক্ষনীয় প্রতিষ্ঠান। আমার মতে 'রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর'-এই শব্দ দ্বয়ের বাংলা প্রতিশব্দ হতে পারে অক্সিজেন।যার কোন বিকল্প হয় না। আমরা রবীন্দ্রনাথে বাঁচি এবং মরি। প্রতি বছর পঁচিশে বৈশাখ কবিগুরুর জন্মদিন উপলক্ষে নানা রকমের অনুষ্ঠান করা হয়। কিন্তু কতজন আমরা কবিগুরুর আদর্শ বহন করে চলছি? এই প্রশ্ন আমি নিজেকে করেছি,আমিই বা কতটুকু বহন করছি।সত্যি বলতে কী উত্তর মেলেনি।
তবু পঁচিশে বৈশাখ এলে দেহ-মনে রবীন্দ্রনাথ উঁকি দিয়ে যায়। দোলা দেয়। ক্ষণিকের জন্য হলেও রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় ভাবিত হই।
সারা পৃথিবীটাই আজ যে জঞ্জালের স্তূপে পরিনত হয়েছে।চিল শকুনের মতই নজর পড়েছে ভাগাড়ে! এই হতশ্রী দশা থেকে মুক্তি কবে?উত্তর খুঁজতে রবীন্দ্রনাথের দারস্থ হতেই হবে।তাই আমারও প্রার্থনা পঁচিশে বৈশাখ জন্ম দাও আরও এক রবীন্দ্রনাথের।

No comments:
Post a Comment