মেয়েরা আত্মহত্যা কেন করে?? - Breaking Bangla

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Friday, 25 May 2018

মেয়েরা আত্মহত্যা কেন করে??




দিনে ২৮ জন মানুষ বাংলাদেশে আত্মহত্যা করে। এই ২৮ জনের বেশির ভাগই মেয়ে। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী মেয়ে। দিন দিন আত্মহত্যার সংখ্যা বাড়ছে। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করে পুরুষেরা। বাংলাদেশেই উল্টো। বাংলাদেশে আত্মহত্যা করে মেয়েরাই বেশি। ২০১০ সালে করেছিল ৯৬৬৩ জন, ২০১১ সালে ৯৬৪২, ২০১২ সালে ১০,০০৮ আর ২০১৩ সালে ১০,১২৯ জন মেয়ে। মেয়েদের আত্মহত্যার সংখ্যাটা বছর বছর বাড়ছে। পাশ্চাত্যে বয়স্ক পুরুষেরা মূলত একাকীত্বের কারণে আত্মহত্যা করে, বাংলাদেশে করে কমবয়সী মেয়েরা। বাংলাদেশে মেয়েদের আত্মহত্যার কারণ পরিবারের লোকদের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়া, স্বামীর অত্যাচার, শ্বশুর বাড়ির অত্যাচার, যৌতুকের জন্য অত্যাচার, যৌন নির্যাতন, পরীক্ষায় ফল ভালো না করা, প্রেমে ব্যর্থ হওয়া-- এসব।
কিছুদিন আগে বাংলাদেশের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আকতার জাহান আত্মহত্যা করেছেন। শুনেছি আকতার জাহানের পারিবারিক জীবনে সুখ শান্তি ছিল না। স্বামীর সঙ্গে ডিভোর্স হয়েছিল। শিশু সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতেন আকতার জাহান। স্বামী ওদিকে দ্বিতীয় বিয়ে করে নিয়েছেন। এবং আকতারের চরিত্র খারাপ ছিল এ কথাও বলে বেরিয়েছেন চারদিকে। আত্মহত্যার কারণ খুঁজতে গিয়ে অশান্তি দুশ্চিন্তা একাকীত্ব অস্বচ্ছলতা ইত্যাদির উল্লেখ করছে অনেকে।
আমার মনে পড়ছে তিরিশ বছর আগের কথা। তিরিশ বছর আগে আমি ডিভোর্স দিয়েছিলাম একটি লোককে যাকে নোটারি পাবলিকের কাগজে সই করে বিয়ে করেছিলাম। আইনের চোখে নোটারির বিয়ে হয়তো বিয়ে নয়। কিন্তু সেই সময় বিয়ে করেছি বলে মানুষকে যে জানিয়েছিলাম, সেটাই বিয়ে ঘটিয়ে দিয়েছিল। যখন দেখলাম লোকটি বহুগামি, তাকে নির্দ্বিধায় ত্যাগ করলাম। তিরিশ বছর আগে একা বাসা ভাড়া নিয়েছি, একা থেকেছি, লোকে মন্দ কথা বলেছে, লোকের মন্দ কথায় বিরক্ত হয়েছি, কিন্তু ভেঙে পড়িনি। কদিন পর পরই পত্র পত্রিকায় আমাকে নিয়ে নানা মিথ্যে কথা লেখা হতো, মেয়েদের নিয়ে যেসব কথা লিখলে লোকে তাদের ঘৃণা করে, সেসব কথা। অসভ্য সমাজে মেয়ে হয়ে জন্মালে যা হয়। ব্যস্ত ছিলাম হাসপাতালের রোগীদের চিকিৎসা আর নিজের লেখাপড়া নিয়ে। বদ আর বদমাশেরা যা কিছুই বলুক, পরোয়া করিনি। শুধু ধার্মিক আর মৌলবাদী নয়, আহমদ ছফা আর হুমায়ুন আজাদের মতো নামকরা নাস্তিকরাও হিংসে করতো। প্রথম গদ্যের বই এর জন্যই আনন্দ পুরস্কার পেয়ে গেছি, এ নিয়ে কত ক্ষুদ্র কুৎসিত মনের লেখক যে জ্বলেছে পুড়েছে! লক্ষ লক্ষ মৌলবাদী জোট বেঁধেছে, দেশ জুড়ে মিছিল মিটিং করে আমার ফাঁসি চেয়েছে, মাথার মূল্য ধার্য করেছে। পরোয়া করিনি। আমার যা করতে ইচ্ছে করে করেছি।

মেয়েরা কেন যে ভুলে যায় তারা একটা অসভ্য অশিক্ষিত নারীবিদ্বেষী সমাজে বাস করছে। ভালো মেয়েদের, বুদ্ধিমতী মেয়েদের, মেরুদণ্ড সোজা করে চলা মেয়েদের এই নষ্ট সমাজ নানাভাবে নানা কায়দায় অপমান করে, অপদস্থ করে, গালি দেয়, চরিত্র নিয়ে কুকথা বলে। যে মেয়েদের এসব করা হয় না, যে মেয়েদের ‘ভালো মেয়ে’ বলা হয়, তারা আসলে মাথা মোটা, গবেট, নির্বোধ, মানসম্মানের ছিটোফোঁটা নেই এমন মেয়ে।

যে মেয়েরা বাধা পায়, গালি খায়, তারাই সত্যিকার হীরে। তারা বিচলিত হলে চলবে কেন! আত্মহত্যা করলে চলবে কেন! নারীবিদ্বেষী সমাজটাকে তুমুল অবজ্ঞা করা শিখতে হবে। কাউকে পরোয়া না করে নিন্দুকের মুখে থুতু দিয়ে যা ইচ্ছে তাই করা শিখতে হবে। তিরিশ বছর আগে আমি যা পেরেছি, তা কেন পারবে না এখনকার মেয়েরা?

আমারও অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা ছিল, অশান্তি, দুশ্চিন্তা, একাকীত্ব ছিল, কিন্তু তাই বলে দমে যাইনি। এসব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি বলেই যে কোনও পরিস্থিতিতে পথ চলতে পারি। আমি তো সাধারণ একটি মেয়ে। যে কোনও মেয়ে চাইলেই পারবে আমি যা পেরেছি। কোনও মেয়ের আত্মহত্যার খবর আর শুনতে চাই না। পুরুষেরা তো মেয়েদের ধর্ষণ করে করে, নির্যাতন করে করে মেরেই ফেলছে। প্রতিদিন মারছে। মেয়েরা নিজেদের মারবে কেন? মেয়েরা যখন আত্মহত্যা করে, নিজের অজান্তে তারা তখন পুরুষ হয়ে যায়। পুরুষ যেমন করে মেয়েদের ঘৃণা করে, তেমন করে মেয়েরা নিজেদের ঘৃণা করে, পুরুষ যেভাবে মেয়েদের হত্যা করে, সেভাবে মেয়েরাও নিজেদের হত্যা করে।

মেয়েদের পুরুষ হলে চলবে না। মেয়েদের মেয়ে হয়ে থাকতে হবে। মেয়েরা মেয়ে হয়ে থাকলে আত্মহত্যা করা বন্ধ করবে। মেয়েরা মেয়ে হয়ে থাকলে মেয়েদের ঘৃণা করা বন্ধ করবে। মেয়েরা মেয়ে হয়ে থাকলে পুরুষেরা মেয়েদের রূপের এবং গুণের যে সংজ্ঞা তৈরি করেছে তা মানবে না, বরং সংজ্ঞাটা তারা নিজেরাই তৈরি করবে। মেয়েদের পুরুষ হওয়া মানে পুরুষের পোশাক পরে, পুরুষের মতো পেশা গ্রহণ করে পুরুষ হওয়া নয়। মানসিকতায় পুরুষ হওয়া। পিতৃতন্ত্র সব পুরুষকে যে মানসিকতায় গড়েছে, সেই মানসিকতাকে অস্বীকার করাই হলো পুরুষ হওয়াকে অস্বীকার করা। এই কাজটি যতক্ষণ পর্যন্ত না করবে মেয়েরা, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা পুরুষের পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতাকেই ভাগ করে নেবে। ভাগ করে নেয় বলেই পুরুষের সঙ্গে জোট বেঁধে মেয়েরাও মেয়েদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়। পুরুষরা তাদের এই মানসিকতারই সুষম বণ্টন চায়, অন্য কোনও কিছু--- বিয়ে, তালাক, সন্তানের অভিভাকত্ব, উত্তরাধিকার—এসব সমান ভাবে ভাগ করতে চায় না। তাদের আরও হাজারো অধিকারকে, হাজারো স্বাধীনতাকে কারও সঙ্গে ভাগ করতে তারা নারাজ। তারা যে চোখে মেয়েদের দেখে, মেয়েদের ত্রুটি বিচ্যুতি ধরে, মেয়েদের গালি দেয়, যেভাবে মেয়েদের ঘরবন্দি করে, অথবা মেয়েদের ঘরবার করে, সেভাবে মেয়েদেরও বলা হয় করতে, সেভাবে মেয়েরাও করে। যেভাবে মেয়েদের মরে যাওয়ার প্রত্যাশা করে, যেভাবে মারে, সেভাবেই মেয়েরা নিজেদের মারে, এবং নিজেরা মরে। আজও পিতৃতন্ত্র টিকে আছে পৃথিবীতে শুধু ‍পুরুষেরা একে টিকিয়ে রাখছে বলে নয়, নির্বোধ মেয়েরা একে টিকিয়ে রাখছে বলেও।

পুরুষ অত্যাচারিত হলে সর্বস্তরের নারী পুরুষ এগিয়ে আসে। নারী অত্যাচারিত হলে শুধু মানবাধিকার কর্মী আর নারীবাদীরাই এগিয়ে আসে। কারণ নারীর ওপর অত্যাচারকে এখনও, আজও, সমাজের বড় কোনও সমস্যা বলে বিবেচনা করা হয় না। যতদিন না হবে, ততদিন নারীরা আত্মহত্যা করবে, ততদিন আমরা আত্মহত্যার খবর পাবো, প্রতিবাদ করবো, এবং আমাদের প্রতিবাদে কারো’র কিছু যাবে আসবে না।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad