চোখে স্বপ্ন। ভালো কলেজে পড়াশোনা করার। সেই স্বপ্ন নিয়েই পছন্দের কলেজে ঘুরছে ছাত্রছাত্রীরা। তারপর পড়ছে ভরতি চক্রের "দাদা"-দের খপ্পরে। যে বিষয়ের চাহিদা যত বেশি, ভর্তির দরও তত বেশি। এমনই অভিজ্ঞতা হয়েছে বেশ কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রীর। ইনাডু বাংলার ক্যামেরার সামনে সেই অভিজ্ঞতার কথা শোনাল তারা। তাদের বক্তব্যে উঠে এল উত্তরপাড়া পেয়ারী মোহন কলেজ, শিয়ালদার সুরেন্দ্রনাথ কলেজের কথা।
উত্তরপাড়ার তিথি পাল (নাম পরিবর্তিত)। পড়তে চায় B.Com জেনেরাল কোর্সে। স্থানীয় কলেজে পড়ার ইচ্ছে ছিল তার। সেই লক্ষ্যে উত্তরপাড়ার পেয়ারী মোহন কলেজে যায়। ভরতির জন্য ফর্মও তোলে। নাম ওঠেনি। তার পরও নাকি ভরতি হওয়া যাবে! কোনও এক "দাদা" ভরতির ব্যবস্থা করে দেবে বলেছে। তবে, তার বদলে চায় ৫ হাজার টাকা।
তিথির বক্তব্য, "যে টাকা চেয়েছিল তার নাম বলতে পারব না। কারণ, অত তো কাউকে চিনি না। তবে, টাকা চাওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, যদি ভরতি হতে চাও তবে তোমাকে টাকা দিতে হবে।" তারপর আর ওই কলেজমুখো হয়নি তিথি। এখন সে কলকাতার একটি কলেজে ভরতি হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।
বেলেঘাটার সায়নও (নাম পরিবর্তিত) ভরতি হতে চায় B.Com জেনেরাল কোর্সে। তাই সুরেন্দ্রনাথ কলেজে গিয়েছিল। ৫৩০ নম্বরে নাম উঠেছিল। এরপর কাউন্সেলিঙের বিষয়ে কলেজে জানতে যায়। তার পরের অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর নয়। সায়ন বলে, " সুরেন্দ্রনাথ কলেজে গিয়ে দেখি প্রচুর ভিড়। এক দাদার কাছে বিষয়টি জানতে চাই। উনি জানতে চান, কোন স্ট্রিম। আমি উত্তর দিই। তখন ওই দাদা বলেন, কাউন্সেলিঙে সমস্যা হবে। যদি ভরতি হতে চাও ৩৫ হাজার টাকা লাগবে। তখন আমি বলেছিলাম, আমার সামর্থ্য নেই। উত্তর পেয়েছি, সামর্থ্য না থাকলে এ কলেজে ভরতি হওয়া যাবে না।"
কলেজে ভরতি নিয়ে চিন্তিত পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরার অনুপম দত্ত( নাম পরিবর্তিত)। সুরেন্দ্রনাথ কলেজের খুব নাম শুনেছিল। তাই সেখানে ভরতির জন্য ফর্ম তোলে। ৪১৭ নম্বরে নাম ওঠে তার। অনুপম বলে, " কলেজের এক দাদা বলল ভরতি হতে গেলে ডকুমেন্ট নিয়ে আয়। আর লাগবে ২৭ হাজার টাকা। ওই দাদার মোবাইল নম্বরও দেয়। নাম ছিল সৌমাল্য।"
এই বিষয়ে কোনও অভিযোগ দায়ের করেছ? অনুপম উত্তর দেয়, "দেখুন দাদা, আমি গ্রামের ছেলে। আপাতত ভরতি হতে চাইছি। সেটা নিয়েই চিন্তিত। অভিযোগ দায়ের করার মতো মানসিক পরিস্থিতি আমার নেই। তবে একটা জিনিস বুঝতে পারছি, গ্রাম থেকে আমরা যে কলেজগুলোকে খুব ভালো বলে জানতাম, সেগুলো এই ডোনেশনের উপরই চলে।"
মধ্য কলকাতার সুরেন্দ্রনাথ কলেজ নিয়ে অভিযোগ বিস্তর। অভিযোগ, গত বছরের মতো এবারও বিষয় অনুযায়ী টাকার তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এবছরের সেই তালিকা অবশ্য পাওয়া যায়নি। তবে ইনাডু বাংলার হাতে এসেছে গত বছরের তালিকা। সেবার সুরেন্দ্রনাথ কলেজে এক ছাত্রনেতার দাবিমতো টাকা দিতে না পারায় আটকে রাখা হয়েছিল এক ছাত্রীর উচ্চমাধ্যমিকের মার্কশিট। বার বার চেয়েও সে মার্কশিট ফেরত পায়নি বলে অভিযোগ ওঠে৷ অভিযোগ, সেই উৎকণ্ঠা থেকেই আত্মহননের পথ বেছে নেয় সোনারপুরের সনিয়া মণ্ডল৷ বিষয়টি নিয়ে জলঘোলাও হয়েছিল বিস্তর। কিন্তু, তাতেও যে কোনও কিছুই পালটায়নি তা এই তিন ছাত্র-ছাত্রীর অভিজ্ঞতা থেকেই স্পষ্ট।
স্থানীয় সূত্রে খবর, সুরেন্দ্রনাথ কলেজ শাসন করেন দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। কলেজে ভরতি চক্রে তাঁর নাকি লম্বা হাত। এখন অবশ্য তিনি কোথায় তা জানা যাচ্ছে না। শোনা যাচ্ছে, পুলিশি ধরপাকড় শুরুর পর গা ঢাকা দিয়েছেন তিনি। কেউ আবার বলছেন, কার্শিয়ঙে নাকি নতুন হোটেল খুলেছেন। পুলিশি ধরপাকড়ের পর সেখানে গেছেন তিনি।
ফোনে চেষ্টা করা হলেও পাওয়া যায়নি দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
সুরেন্দ্রনাথ কলেজের অধ্যক্ষ ইন্দ্রনীল কর বলেন, "বাইরের কাউকে কলেজে ঢুকতে দিচ্ছি না। অনিয়ম শুনলে ব্যবস্থা নেব।"
সূত্র: ইনাডু

No comments:
Post a Comment