বুকের কাছে বাঁধানো ছেলের ছবি। অন্যহাতে ধরে স্বামীর প্রায় একই অবয়ব ছবি।কাকদ্বীপের রাস্তায় রাস্তায় সেই ছবি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এক বছর ষাটোর্ধ বৃদ্ধা। নাম যোগমায়া দাস।হারানো স্বামী ও ছেলে কে খুঁজে পেতে ছুটছেন রাস্তায় রাস্তায়। কখনো বাড়ি তো কখনো আবার স্টিমার ঘাটে। আলুথালু চুল আর মলিন চেহারার এই বৃদ্ধা কে দেখে মুখে কাপড় গুঁজে সরে পড়ছেন অন্য মহিলারা। কেউ আবার কিছু বলার চেষ্টা করে থেমে যাচ্ছে। কারন ওই ছবি দেখে কেউই পারবেন না তাদের বাপ-বেটা কে খুঁজে দিতে।বাড়ীর বৃদ্ধার এই কাতর আত্বিতে শোকে পাথর পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা।
সবেমাত্র শুরু হয়েছে ইলিশ ধরার মরশুম। যে ইলিশের টানে কাকদ্বীপ থেকে সমুদ্রে ছুটে যান হাজার হাজার ট্রলার ও মৎস্যজীবী । অন্যদের মত সেই রকম ভাবে ট্রলার নিয়ে গত ১৩ ই জুন সমুদ্রের দিকে যাচ্ছিলেন এফ বি কন্যামাতা নামের ট্রলার টি।কিন্তু কেঁদো দ্বীপ অতিক্রম করার আগেই ট্রলার টি ডুবে যায় গভীর সমুদ্রে। নিখোঁজ হন ১৯ জন মৎস্যজীবী। যাদের মধ্যে পরে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় ১৬ জন কে। কিন্তু এখনো খোঁজ পাওয়া নি ৩ জন কে। যার মধ্যে আছেন যোগমায়া দেবীর স্বামী মদন দাস ও। একমাস অতিক্রম হওয়ায় পরও স্বামী মদন দাস ফিরে না আসায় যোগমায়া দেবীর তিন ছেলে সদ্য শেষ করেছে নিখোঁজ বাবার পারলৌকিক কাজ। তারপরই জীবিকার টানে তিন ছেলে ফের পাড়ি দিয়েছে সমুদ্রে। সংসার চালাতে তো ভরসা সেই ট্রলার আর সমুদ্রের মাছ।আর তাই বাবার পারলৌকিক কাজ সেরেই ট্রলার নিয়ে মাঝ সমুদ্রে রওনা দিয়েছিল যোগমায়া দেবীর তিন ছেলে।কিন্তু অন্য দুই ছেলে ফিরে আসলেও ছোট ছেলে এখনো ফেরেনি।গত সোমবার বঙ্গোপসাগরে যে তিনটি ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটে সেই তার মধ্যে এফ বি জয় কৃষাণে ছিলেন ছেলে পানু দাস। এবিষয়ে যোগমায়া দেবীর ছোট মেয়ে মামনি দাস বলেন,"বাবার কাজ হয়েছে এখনো এক মাস হয় নি।তারমধ্যে আবার পরিবারে নেমে এলো আর একটি দূর্ঘটনা। দাদা এখনোও নিখোঁজ। ওই ট্রলারে যারা ছিল তাদের বেশির ভাগ মৎস্যজীবীর খোঁজ নেই।যে কয়েক জন বেঁচে ফিরেছে তারা জানিয়েছেন যে ট্রলারের মাঝি ছিলেন পানু দাস। ট্রলার ডুবে যাওয়ার সময় ইঞ্জিন রুমেই আটকে যান।ফলে বেঁচে ফেরার আশা নেই বললেই চলে।এখন এই অভাবের সংসার কি করে চলবে বুঝতে পারছি না।"
এই ট্রলার দূর্ঘটনায় ইতিমধ্যে উদ্ধার হয়েছে বারো জন মৎস্যজীবির দেহ।উদ্ধার হয়েছে অভিশপ্ত ট্রলার তিনটির একটি। কিন্তু মেলেনি দেহ।বাবার মত আদৌ মিলতে নাও পারে ছোট ছেলের দেহ। কান্নায় শোকে পাথর যোগমায়া দেবীর নুন আনতে পান্তা ফুরানো পরিবার।পরিবারের দু দুজন উপার্জন কারিকে সমুদ্রে টেনে নিয়েছে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে।আর তাই ট্রলার থেকে ফিরে যোগমায়া দেবীর অন্যছেলে মৎস্যজীবী সুবল দাস জানালেন, "আর নদী পথ বাইবো না। আর যাবো না ইলিশ ধরতে।মাছ ধরা ছেড়ে অন্যপেশাতে ফিরতে হবে। না হলে এবার পুরো পরিবার সমুদ্রে ভেসে যাবে। সরকারি সাহায্য ছাড়া আমাদের পরিবার কে বাঁচাতে পারবো না।"
এক সময় যে যোগমায়া দেবী সমুদ্রের জীবিকাকে সঙ্গী করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিল, আজ সেই সমুদ্রই কেড়ে নিয়েছে ছেলে, স্বামী সংসার কে। শোকে পাথর করেছে তাকে।একচালা দরমার ঘরে বসে ছবি দুটিই সম্বল।

No comments:
Post a Comment