রথযাত্রার ইতিহাস
=====================
পুরাণ থেকে মূলত রথ যাত্রার কথা জানা যায়। স্কন্দ পুরাণে আমরা পাই যে ইন্দ্রদ্যুম্ন নামে এক রাজা ছিলেন উত্কল রাজ্যে, (বর্তমান উড়িষ্যা) তিনি ছিলেন পরম ভক্ত। তিনি একদিন স্বপ্নাদিষ্ট হন একটি মন্দির নির্মাণের জন্যে। পরে দেবর্ষী নারদ এসে জানান স্বয়ং ব্রহ্মারও তাই ইচ্ছা, তিনি নিজে সেটা উদ্বোধন করবেন। নারদ রাজাকে বললেন আপনি বহ্মাকে নিমন্ত্রন করুন। সেই উপদেশ মাথায় রেখে রাজা ব্রহ্মলোকে গেলেন এবং বহ্মাকে নিমন্ত্রণ করলেন। কিন্তু ব্রহ্মলোকের সময় এর সাথে তো পৃথিবীর মিল নেইৱ, আর পৃথিবীতে তত দিনে তাই কয়েক শতবছর পার হয়ে গেছে। ফিরে এসে রাজা দেখলেন তাকে কেউ চেনে না। যা হোক তিনি আবার সব কিছু নতুন করে করলেন। দৈবভাবে রাজা জানতে পারলেন সমুদ্র সৈকতে একটি নিম কাঠ ভেসে আসবে, সেটা দিয়েই তৈরি হবে দেব বিগ্রহ।
একজন কারিগর এলেন বিগ্রহ তৈরি করতে, কিন্তু নির্মাতা শর্ত দিলেন তিনি নিভৃতে কাজ করবেন। আর বিগ্রহ তৈরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে বিরক্ত করা যাবে না এবং মন্দিরে যাওয়াও যাবে না। এদিকে মূর্তি তৈরি শুরুর কিছু দিন পর রাজা কৌতূহল সংবরণ করতে না পেরে মন্দিরে প্রবেশ করে দেখেন কেউ নেই সেখানে। আর আমরা যে রূপে এখন জগন্নাথ দেবকে দেখি, সেই মূর্তিটি শুধু রয়েছে। পরে ঐ ভাবেই স্থাপিত হয় মূর্তি। ইন্দ্রদ্যুম্ন রাজা জগন্নাথ দেবের মূর্তিতেই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তীকালে শ্রীকৃষ্ণ এবং জগন্নাথ দেব একই সত্ত্বা চিন্তা করে একই আদলে তার পাশে ভাই বলরাম এবং আদরের বোন সুভদ্রার মূর্তি স্থাপন করা হয়। পুরীতে তিন রথের যাত্রা হয়, প্রথমে বলরাম তার পর সুভদ্রা এবং শেষে জগন্নাথ। ১১৯৯ খ্রিস্টাব্দে রাজা অনঙ্গভীমদেব তিনরথের রথ যাত্রা প্রচলন করেন।
জগন্নাথ দেবের মূর্তির রূপ নিয়ে আমাদের মনে প্রশ্ন আছে। কেন এই রূপ তাঁর। এখন তারই কিছু বিশ্লেষণ দেখা যাক। কঠোপনিষদে বলা হয়েছে-
"আত্মানং রথিনং বিদ্ধি শরীরং রথমেব তু।
বুদ্ধিং তু সারথিং বিদ্ধি মন: প্রগ্রহমেব চ।। (১/৩/৩) অর্থাৎ এই দেহই রথ আর আত্মা দেহরূপ রথের রথী। আর ঈশ্বর থাকেন অন্তরে। রথ যাত্রার রূপক অর্থ কিন্তু এমনই। যাহোক তিনি আমাদের অন্তরে থাকেন। তাঁর কোন রূপ নেই। তিনি সর্বত্র বিরাজিত অর্থাৎ-
ঈশাব্যাসমিদং। বেদ বলছে--- আবাঙমানসগোচর, মানে মানুষের বাক্য এবং মনের অতীত। আমরা মানুষ তাই তাকে মানব ভাবে সাজাই। এবিষয়ে কৃষ্ণ যজুর্বেদিয় শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের তৃতীয় অধ্যায়ে বলা হয়েছে-
অপাণিপাদো জাবানো গ্রহীতাপশ্যত্যচ ক্ষুঃ স শৃণোত্যকর্নঃ।
স বেত্তি বেদ্যং ন চ তস্যাস্তি বেত্তাতমাহুরগগ্র্যং পুরুষং মহান্তম্।।
অনুবাদ: তার লৌকিক হস্ত নাই, অথচ তিনি সকল দ্রব্য গ্রহণ করেন। তাঁর পদ নাই অথচ সর্বত্রই চলেন। তাঁর চোখ নাই অথচ সবই দেখন। কান নাই কিন্তু সবই শোনেন। তাঁকে জানা কঠিন, তিনি জগতের আদিপুরুষ। এই বামনদেব ই বিশ্বাত্মা, তাঁর রূপ নেই, আকার নেই । উপনিষদের এই বর্ণনার প্রতীকী রূই হল পুরীর জগন্নাথদেব। পুরাণ মানেই ধর্ম কথাকেই গল্পচ্ছলে বা রূপকের মাধ্যমে প্রচার। তাঁর পুরো বিগ্রহ তৈরি সম্ভব হয়নি- কারণ তাঁর রূপ তৈরিতে আমরা অক্ষম। শুধু প্রতীককে দেখান হয়েছে মাত্র। তাছাড়া ও আর একটি পৌরাণিক কাহিনী আছে সেটা হল ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ১২ বছর বয়সে বৃন্দাবন ত্যাগ করেন, তারপর তিনি আর বৃন্দাবনে আসেননি। কিন্তু একবার রথে করে পার্শ্ববর্তী গ্রামে এসেছিলেন বৃন্দাবনবাসিদের সাথে দেখা করতে। বৃন্দাবনবাসিরা কৃষ্ণকে প্রাণাধিক ভালবাসত তাই তাঁর বিরহে তাঁর প্রিয়জনদের অবস্থা দেখে কিছুক্ষণের জন্যে কৃষ্ণ বলরাম সুভদ্রা তিন জন
নির্বাক হয়ে যান এই ভালবাসা দেখে। তখন তাঁদের অমূর্ত রুপ ফুটে ওঠে। এই রূপই বর্তমান জগন্নাথ দেবের রূপ।
জগন্নাথ পুরীকে পুরুষত্তোম ক্ষেত্র বলা হয়। কারন,এখানকার রথ যাত্রায় দিন কোন ভেদাভেদ থাকে না। ধনী,দরিদ্র, উচু, নিচু, স্পৃশ্য, অস্পৃশ্য সবাই এক কাতারে ভগবানকে নিয়ে রাজ পথে নামে। আর
আমাদের মনে করিয়ে দেয় ভগবান সবার এবং সবাইকে একত্রিত হতে। কারণ ভগবান সকলেরৱ, ভগবানে সবার সমান অধিকার । গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু সবাইকে নিয়ে কীর্তন করতে রথযাত্রায় অংশ নিতেন। তাছাড়া প্রভাষখন্ড থেকে জানা যায় যে পুরীতে অভক্তু থেকে বিগ্রহ দর্শন করা যাবে না। আগে প্রসাদ খেতে হবে পরে দেব বিগ্রহ দর্শন। এখনও এ নিয়মচলে আসছে। পুরীকে শঙ্খক্ষেত্রও বলা হয় কারণ মানচিত্রে একে শঙ্খের মত দেখতে লাগে।
(সংগৃহীত )

No comments:
Post a Comment