দুঃখজনক ব্যাপার হলেও সত্যি এটাই যে, এখনও পর্যন্ত বয়স ধরে রাখার কোন যাদুকরী পদ্ধতি কিংবা ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। আমরা সবাই চাই আমাদের ত্বকের তারুণ্য অনেকদিন ধরে রাখতে। বয়স যত বাড়ে, মুখে বলিরেখা দেখা দেয়, ফাইন লাইন-গুলো ভেসে উঠে, আর অমনি আমরা ত্বকের ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠি। কিন্তু এই যত্নটা যদি আমরা বয়সের ছাপ পড়ার আগেই শুরু করি তাহলে কিন্তু এই ফাইন লাইন, বলিরেখা ও চোখের চারপাশের ভাঁজগুলো অনেক দেরীতে আসবে।
পরিচিত এমন অনেক মহিলা আছেন, যাদের বয়স চল্লিশের উপরে কিন্তু দেখলে মনে হবে বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের বেশি হবে না। আমাদের আশেপাশে এমন অনেক মানুষ আছেন। যাদের কারো বয়স ৫০ হলেও দেখতে মনে হয় ৩০। আবার কারো বয়স ৩০, কিন্তু দেখতে মনে হয় ৪৫। এমন কাউকে দেখলে প্রথমেই প্রশ্ন আসে, কিভাবে মেইন্টেইন করেন তারা? এই বয়সেও কি করে একটি বলিরেখার ছাপ নেই মুখে? না, এতো অবাক হওয়ার কিছুই নেই। এসবের পিছনে একটাই কারণ; তাহলো বয়সের ছাপ। কারো ত্বকে বয়সের ছাপ তাড়াতাড়ি আসে তো কারো ত্বকে এই ছাপ পড়ে দেরিতে। আমরা আমাদের ত্বক নিয়ে তো কতই না সচেতন।শুধু তারুণ্য ধরে রাখতে কত রকম অ্যান্টি-এইজিং ক্রিম ব্যবহার করি, কত রকম রূপচর্চা করি। কিন্তু এই সচেতনতাটি আমাদের আসে বয়সের ছাপ পড়ে যাওয়ার পর। বলিরেখা একবার পড়ে গেলে তাকে সরানো কিন্তু অনেক কষ্টসাধ্য। তাই চর্চাটি শুরু করতে হবে আজই। নিজের জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসের উপরও আপনার বয়স ধরে রাখা অনেকাংশে নির্ভর করে আজকে আপনাদের জানাবো কোন বয়সে কি রকমভাবে ত্বকের যত্ন নিলে আপনার ত্বক ও থাকবে মসৃণ, সুন্দর ও টানটান অনেকদিন।
২০ থেকে ২৫ বছর বয়সের জন্য
এই সময়টিকে হাইড্রেশন ধাপ ও বলা যেতে পারে। ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সটিতে সবচেয়ে সুন্দর ত্বক থাকে আমাদের। ত্বককে হাইড্রেটেড রাখুন। এই সময়টিতে যদি আমরা ত্বকের সঠিক পরিচর্যা নিতে পারি তাহলে এই ত্বকই আমরা ধরে রাখতে পারব অনেকদিন। বয়স ধরে রাখতে এই সময়ের জন্য কিছু টিপস মেনে চলতে হবে।
১) প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন
গাছে কয়েকদিন পানি না দিলে কি অবস্থা হয় গাছের খেয়াল করেছেন? গাছ যেমন শুকিয়ে যায়, আমাদের ত্বকও কিন্তু ব্যতিক্রম নয়। যত বেশি পানি পান করবেন আপনার ত্বক ততবেশি হাইড্রেটেড থাকবে। ত্বক হাইড্রেটেড থাকা মানেই তারুন্যদীপ্ত থাকা। আন্টি-এইজিং হিসেবে পানির গুণ সবচেয়ে বেশি। পানি আপনার ত্বকে বয়সের ছাপ পড়া রোধ করবে।
২) ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন
ময়েশ্চারাইজার আপনার ত্বককে সরাসরি হাইড্রেটেড করে এবং ত্বকের ময়েশ্চার ধরে রাখে। মুখ ধোয়ার পর আমাদের ত্বক অনেক বেশি শুষ্ক হয়ে যায় এবং শুষ্ক ত্বকে খুব দ্রুত বলিরেখা পড়ে। ময়েশ্চারাইজার ত্বকে বলিরেখা পরা রোধ করে। তাই মুখ ধোয়ার পর ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে ভুলবেন না।
৩) জেন্টল ক্লিনজার ব্যবহার শুরু করা
২০ থেকে ২৫ বছর বয়স, এই সময়ে সদ্য কিশোরী থেকে যৌবনে পা দেয় মেয়েরা। তাই ক্লিনজিং এর জন্য খুব হালকা ক্লিনজার ব্যবহার শুরু করতে হবে।
৪) এই সময় অতিরিক্ত মেকআপ, রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করুন। তাজা ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়ার চেষ্টা করুন।
২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সের জন্য
এই সময়টিকে প্রতিরোধ ধাপ ও বলতে পারেন। কথায় আছেনা “prevention is better than cure”। তাই বলিরেখা পড়ার আগেই যদি আমরা প্রতিরোধ করতে পারি, তাহলে হয়ত বয়সের ছাপ দেরিতে আসবে।
১) রেটিনলযুক্ত প্রোডাক্ট ব্যবহার শুরু করুন
রেটিনল এবং রেটিন আসে ভিটামিন-এ কমপ্লেক্স থেকে। রেটিনলযুক্ত প্রোডাক্ট আপনার ব্রণের জন্য ও উপকারী। যেকোন ডে ও নাইট ক্রিমে রেটিনল আছে নাকি দেখে কিনুন। ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সে অনেকের মুখেই ধীরে ধীরে বলিরেখা পড়া শুরু হয়ে যায়। তাই অ্যান্টি এইজিং ক্রিম ব্যবহার শুরু করা উচিত।
২) ময়েশ্চারাইজার চালিয়ে যান যত বয়স বাড়বে তত ভারী ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন। লোশন- বেসড প্রোডাক্ট ব্যবহার না করে যেকোন ক্রিম বেইসড প্রোডাক্ট ব্যবহার শুরু করুন, যাতে থাকবে অধিক পরিমাণে স্কিন প্রোটেকটিং উপাদান।
৩) অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামাটরিস এর প্রতি নজর দিন যখন আপনি আপনার ত্বকের জন্য ময়েশ্চারাইজার এবং টোনার ঠিক করবেন, তখন উপকরণের দিকে খেয়াল রাখুন। এমন প্রোডাক্ট বেছে নিন যাতে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি এবং অন্যান্য উপকরণ ঠিক ভাবে রয়েছে যা আপনার পোর সাইজ ও ত্বক লাল হয়ে যাওয়া কমাবে এবং ত্বকের স্বাভাবিক রং ধরে রাখবে।
৪) চিনি খাওয়া কমিয়ে দিন সামান্য চিনি আপনার ত্বকে বয়সের ছাপ ফেলার জন্য যথেষ্ট। তাছাড়া চিনি শরীরে নানা রকম রোগ সৃষ্টির অন্যতম কারণ
৩৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সের জন্য
৩০ বছরের পর থেকে চেহারার সৌন্দর্য্য হারিয়ে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে। ৩৫ বছর থেকে অনেকেরই মুখে হালকা বলিরেখা, চোখের কোণে ভাজ পরা শুরু করে।যেহেতু মাত্র শুরু তখনই যদি যত্ন নেয়া হয়, এই বয়সের ছাপ দুর করা যায়।
১) সকালে ও রাতে ক্লিনজিং করুন
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠার পর ও রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ভালো ক্লিনজার দিয়ে মেকআপ ও ময়লা পরিষ্কার করুন।
২) ময়েশ্চারাইজার
ক্লিনজিং করার পর দিনের শুরুটা করুন ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করে। ত্বকের শুষ্কতা দুর করতে আমরা ত্বককে ময়েশ্চারাইজ করি। শুষ্ক ত্বকে অতি দ্রুত বলিরেখা পড়ে যায়। তাই ময়েশ্চারাইজ করা জরুরী। সাথে এই ময়েশ্চারাইজার হতে হবে এস পি এফ ১৫ বা তার বেশি এসপিএফ যুক্ত। তাহলে তা আপনাকে সূর্য্যের ক্ষতিকর রশ্মির কারণে ত্বকে অল্প বয়সে বলিরেখা ও ভাজ পড়া প্রতিরোধ করে।
৩) সিরাম ব্যবহার
৩) সিরাম ব্যবহার
যদি আপনার ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে থাকে তাহলে আপনি ময়েশ্চারাইজার এর সাথে অল্প সিরাম যোগ করে নিতে পারেন। সিরাম সাধারণত ঘন হওয়ায় এতে বেশি পরিমাণ অ্যান্টি এইজিং উপাদান থাকে এবং ত্বক তা তাড়াতাড়ি শোষণ করে নেয়।
৪) চোখের যত্ন
আপনার চোখের চারপাশের জায়গাটি ত্বকের অন্যান্য জায়গা থেকে বেশি পাতলা হয়ে থাকে। তাই এখানে দ্রুত ফাইন লাইন দেখা যায়। এই ফাইন লাইন রোধ করতে গ্লিসারিন অথবা নিয়াসিনিমাইড (ভিটামিন বি৩) যুক্ত আই-ক্রিম ব্যবহার করুন। এই আই-ক্রিম চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল ও ফোলা ভাবও দুর করবে।
৪৫ এর পর ত্বকের যত্ন
এই সময়টিকে মেইন্টেনেন্স ধাপও বলা যেতে পারে। ৪৫ এর পর সবার মুখেই বলিরেখা, চোখের কোণায় ভাজ পড়ে যায়। নিশ্চয় ভাবছেন বলিরেখা তো পড়েই গেল, আর কি যত্ন নেব। যদি এখন ও আপনি বয়স ধরে রাখতে চান তাহলে উপরের যত্নগুলোর কোনটিতেই ছাড় দেয়া যাবে না। উপরের টিপস গুলোর পাশাপাশি শরীর ফিট রাখুন।
কারণ শরীর সুস্থ থাকলেই আপনার ত্বকে প্রাণ থাকবে। তাই প্রতিদিন ব্যায়াম করার চেষ্টা করুন। নিয়ম করে হাটুন।এই সময় মহিলাদের মেনোপজ বন্ধ হয়ে যায়, শরীরে নানা রকম পরিবর্তন দেখা যায়। যার প্রভাব পড়ে ত্বকে। তাই এই সময়টাতে ডাক্তারের সাথে কথা বলে নিজের ডায়েট চার্ট তৈরী করে নিন।
No comments:
Post a Comment