মাড়োয়ারি: মরুদেশ থেকে বাংলায় - Breaking Bangla

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Friday, 28 September 2018

মাড়োয়ারি: মরুদেশ থেকে বাংলায়




রাজস্থানের মরুভূমিতে বসবাসকারী একটি ছোট্ট গোষ্ঠী উনিশ শতকে বাংলা থেকে শুরু করে পুরো ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে; গড়ে তোলে অসংখ্য গ্রাম, নগর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হতে হতে এ গোষ্ঠী পুরো ভারতবর্ষের স্থলপথের বাণিজ্যের বেশির ভাগ নিয়ন্ত্রণ শুরু করে। ঝুঁকি নেয়ার ক্ষুধা ছিল তাদের, তারা মাড়োয়ারি। পশ্চিম বাংলায় এদের ডাকা হয় ‘মেরো’ নামে আর পূর্ব বাংলা বা বর্তমান বাংলাদেশে ‘মাউরা’। বাংলাদেশের মফস্বলে এখনো মাউরা শব্দটি একটি গালির মতো ব্যবহার করা হয়।
কোনো দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি তার উদ্যোক্তারা। তারা পুঁজি, শ্রম, জমিকে প্রযুক্তির সঙ্গে ব্যবহার করার ঝুঁকি নেন। ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের পেছনে এ উদ্যোক্তাদের ভূমিকা অপরিহার্য উপাদান হিসেবে কাজ করেছিল। ভারতবর্ষে শিল্প বিপ্লব না হওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে পণ্ডিতদের অনেকে ইউরোপের মতো উদ্যোক্তা না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তবে মাড়োয়ারি, জৈন ও বানিয়ারা এ উপমহাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশের ঘাটতি পূরণে বিরাট ভূমিকা পালন করেছেন।
ভারতবর্ষের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বাংলাসহ প্রায় সর্বত্রই মাড়োয়ারিরা বর্ণবাদী আচরণের শিকার হয়েছেন। এ নিয়ে ভারতীয় লেখক ও বুদ্ধিজীবী গুরুচরণ দাস তার নিজের কিছু অভিজ্ঞতা উল্লেখ করেছেন। তিনি তার ছোটবেলা থেকে মাড়োয়ারিদের নিয়ে শোনা নানা মিথের কথা বলেছেন। তিনি লিখেছেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি এটা জেনে বড় হয়েছেন যে, মাড়োয়ারি মানে গ্রাম বা শহরের কোণে ছোট এক শয়তান দোকানদার। এরা চড়া সুদে মানুষকে ঋণ দেয় এবং টাকা বা সুদ দিতে না পরলে মানুষকে হেনস্তা করে; বিধবাদের জমি ও গহনা কেড়ে নেয়। এ ছিল মাড়োয়ারিদের প্রতি সাধারণ মানুষের প্রচলিত ধারণা। পরবর্তী জীবনে গুরুচরণের এ দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গিয়েছিল মুম্বাইয়ে একদল মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীর সঙ্গে মিশে। তাদের বাণিজ্য ও ব্যবসা পরিচালনার দক্ষতা ও প্রতিভাকে অন্যরা একদিকে যেমন সম্মান করত, তেমনি আবার ভয়ও পেত।
মাড়োয়ারিরা তাদের প্রাথমিককালে সবচেয়ে বড় সাফল্য পেয়েছিলেন বাংলায়। বাংলার মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্যের চেয়ে কৃষিকাজ, শিল্প-সাহিত্য নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিল। বাংলার এই শূন্যস্থানে মাড়োয়ারিরা প্রবেশ করেছিলেন। এবং সফলতা লাভ করেছিলেন। মাড়োয়ারিদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ প্রবল, তাই নিজেদের উত্স ছেড়ে বহুশত মাইল দূরে গিয়েও তারা সফল হতে পেরেছেন। 
সফল বণিকরা আশপাশের মানুষের হিংসার শিকার হতেন এবং বলা যায় এখনো হন। মাড়োয়ারিদের ভাগ্যেও এ হিংসা জুটেছিল। অর্থনৈতিক উন্নয়নবিষয়ক পরামর্শদাতা ও লেখক  টমাস এ. টিমবার্গ একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন, যা থেকে মাড়োয়ারিদের সফলতার একটি সূত্র জানা যায় এবং একই সঙ্গে তাদের প্রতি বাঙালিদের ঘৃণারও নিদর্শন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত শতকের সত্তরের দশক, কলকাতায় তখন নকশাল আন্দোলনের তুমুল দাপট। ১৯৭০ সালে টিমবার্গ কিছুদিন কলকাতার একটি বোর্ডিং হাউজে ছিলেন। সেখানে তিনি একজন বাঙালি ও একজন মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীকে দেখেছিলেন। সেই মাড়োয়ারি ছিলেন একজন ইন্স্যুরেন্স এজেন্ট; তিনি কর্মোদ্যমী, হাসিখুশি, যিনি সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলতে ভালোবাসেন। তার এসব বৈশিষ্ট্য প্রতিবেশী বাঙালির মোটেই পছন্দ ছিল না। একদিন সকালে বাঙালি ভদ্রলোক রেগেমেগে মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীকে বললেন, ‘তোমার মতো মাড়োয়ারিকে একদিন নকশালরা নিশ্চিতভাবে দেখে নেবে!’ মাড়োয়ারি ভদ্রলোক তখন শান্তস্বরে জবাব দিলেন, ‘তেমনটা হওয়ার আগে আমরাই গিয়ে নকশালদের সঙ্গে যোগ দেব।’ মাড়োয়ারির এ জবাবে তাদের সম্প্রদায়ের নমনীয় বা মানিয়ে চলার বৈশিষ্ট্যটি প্রকাশ পায়। দুনিয়ার বেশির ভাগ ব্যবসায়ীর মধ্যেই এ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। মাড়োয়ারিদের সাফল্যের পেছনে তাদের এ নমনীয় মনোভাব ও পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে চলার ক্ষমতা বিরাট ভূমিকা রেখেছে।
ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এবং কঠোরভাবে রীতি, রেওয়াজ মেনে চললেও মাড়োয়ারিরা বন্ধুবত্সল। এরা তাদের গ্রাহক ও ঘনিষ্ঠদের খুশি রাখতে চান। তারা গলা চড়িয়ে কথা বলেন না। মাড়োয়ারিরা তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের প্রতি যত্নশীল, বিশেষত ভালো কর্মীকে তারা সবসময় সন্তুষ্ট রাখতে পছন্দ করেন।ঝুঁকিগ্রহীতাকে বাণিজ্যের দুনিয়া পুরস্কৃত করে। আর মাড়োয়ারিদের ঝুঁকি নেয়ার ক্ষমতাও চমকে দেয়ার মতো।
মাড়োয়ারিদের মূল আবাস রাজস্থান। তাদের মধ্যে হিন্দু সমাজের বর্ণপ্রথার চর্চা কঠোর নয়। তারা মূলত ভৌগোলিক ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত একটি সম্প্রদায়ের পরিচয় নিয়েই নিজেদের আত্মপরিচয় তৈরি করেছেন। ভারতের বিখ্যাত শিল্প পরিবার বিড়লারা মাড়োয়ারি। কে. কে. বিড়লা লিখেছেন, ‘আমাদের জন্ম ব্যবসায়ী পরিবারে। ফিন্যান্স আমাদের রক্তে, ঠিক যেমন বীরত্ব থাকে মারাঠা, শিখ, রাজপুত, গোর্খা বা জাটদের রক্তে।’
মাড়োয়ারিদের মধ্যে শিক্ষার হার উচ্চ। ব্যবসার জন্য হিসাব ও পরিকল্পনার দরকার হয়। আর তাই শিক্ষার প্রয়োজন। মাড়োয়ারিরাও তাই সবসময় শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
রাজস্থানের প্রায় সব ব্যবসায়ীই মাড়োয়ারি নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। রাজস্থান নিয়ে অনবদ্য কাজ করা উনিশ শতকের শুরুর দিকের ইংরেজ ঐতিহাসিক জেমস টড রাজস্থানে ১২৮টি ব্যবসায়ী সম্প্রদায় খুঁজে পেয়েছিলেন। এর মধ্যে বেশির ভাগ সম্প্রদায়েরই রাজস্থানের বাইরে শাখা-প্রশাখা ছিল। এর মধ্যে আগারওয়াল, মহেশ্বরী, ওসওয়াল ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী। জেমস টড লিখেছেন, ‘ভারতে দশজন ব্যাংকার বা ব্যবসাসংক্রান্ত ব্যক্তির নয়জনই মরু দেশের বাসিন্দা (মাড়োয়ার) এবং এরা মূলত জৈন ধর্মাবলম্বী।’ উনিশ শতকের একেবারে শুরুর দিকে ভারতবর্ষের ব্যবসা-বাণিজ্যে মাড়োয়ারিদের আধিপত্য শুরু হয়। আগারওয়াল সম্প্রদায়ই তখন অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে ছিল।
মাড়োয়ারি নামটি উত্তর ভারত থেকে আসা যেকোনো ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেই ব্যবহার হতো, যদিও এদের অনেকেই মাড়োয়ারের বাসিন্দা নন। মাড়োয়ারিরা ভারতে ছড়িয়ে পড়ার কয়েক শতক আগে থেকেই উত্তর ভারতের বাজার অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করত। মোগলদের হাত ধরে এরা পূর্ব প্রান্তে অগ্রসর হয় এবং গঙ্গা-যমুনার তীরে ও বাংলায় তাদের ব্যবসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। এদের মধ্যে বাংলায় জগত্ শেঠ কিংবদন্তি হয়ে আছেন।
উনিশ শতকে মাড়োয়ারিরা উত্তর ও পূর্ব ভারতে তাদের বিস্তৃত অবস্থান গড়ে তোলে। তারা এসব অঞ্চলের অন্য ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোকে প্রতিযোগিতায় হারিয়ে দেয়। বাঙালি ব্যবসায়ীরাও পিছু হটেন। একই সঙ্গে এই মাড়োয়ারিদের হাত ধরে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে হিন্দি ভাষার জাগরণ ঘটে এবং একই সঙ্গে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনও চাঙ্গা হয়। তাদের অর্থনৈতিক প্রভাব দিয়ে সমাজের আরো অনেক ক্ষেত্রে তারা তাদের আধিপত্য তৈরি করে। বর্তমানে ভারতে মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের সংখ্যা তিন লাখের বেশি নয়। গত ১৫০ বছরে হিন্দি সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ও লেখক হিসেবে মাড়োয়ারিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad