পরকিয়া কি তা আমরা সবাই জানি। তবুও আলোচনার সুবিধার্থে মোটা দাগে আরেকবার বলে রাখি। বিবাহিত পুরুষ ও নারীদের বা নিদেনপক্ষে একজন বিবাহিত এবং অপরজন অবিবাহিত নারী বা পুরুষের মধ্যেকার বিবাহ বহির্ভুত এমন সম্পর্ক যেখানে যৌনতা রয়েছে।
বিবাহ একটা সামাজিক চুক্তি যা মূলত ধর্ম কতৃক সত্যায়িত। তবে রাষ্ট্র কতৃক সত্যায়িত বিবাহ চুক্তিও পৃথিবীর দেশে দেশে দেখতে পাওয়া যায়। সম্ভবত সঙ্গি নির্বাচনের ক্ষেত্রে এক ধরণের শৃংখলা প্রতিষ্ঠার জন্য বিবাহের প্রয়োজনীয়তা প্রথমবারের মত দেখা দিয়েছিলো সমাজে। পরকিয়া নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বিবাহ প্রথা নিয়ে আলোচনা না করে কোন উপায় নেই। বিবাহের উৎপত্তি নিয়ে বেশ কিছু প্রচলিত মত আছে। ধর্ম মতে এটা ঈশ্বরের ইচ্ছা এবং মানুষের ইতিহাসের সমান এই প্রথার বয়স। এই মত এখনো বিপুল জনপ্রিয়। আর বিবর্তনবাদীরা মনে করেন মানুষ শুধু দুই পায়ে দাঁড়ানো না বরং আরো বহু বহু পরে, এই মাত্র পাঁচ-ছয় হাজার বছর ধরে বিবাহ প্রথার উৎপত্তি। মূলত শিকার যুগেও বিবাহ ছিলো না। কারণ তখন মানুষ দিন এনে দিন খেত। উদ্বৃত্ত সম্পদ বলে কিছু ছিলো না। কৃষিযুগে যখন মানুষ এক স্থানে স্থানু হয়ে বাস করতে শুরু করলো এবং খাবার সঞ্চয় করে রাখতে শিখলো তখন থেকে শুরু হলো ব্যাক্তি সম্পত্তির ধারণা। এর আগে সম্পদ সম্পর্কে যৌথ মালিকানার ধারণা ছিলো। কারণ শিকার একা করা যেত না, দল বেঁধে করতে হতো। কিন্তু কৃষি যুগে এসে মানুষ যুদ্ধ জয় থেকে দাসের মালিক হতে শুরু করলো। তখন আর যৌথ মালিকানার প্রয়োজন ছিলো না। বরং দাসদের জমিতে খাটিয়ে মালিক তার জমি চষে নিতে পারতেন। ব্যাক্তি সম্পত্তির ধারণা প্রতিষ্ঠা পাবার সাথে সাথে এলো উত্তরাধিকারের ধারণা। সম্পত্তির মালিকেরা বহু যুদ্ধ, ঝুঁকি, বুদ্ধি, কূটবুদ্ধি,পরিশ্রম ও জোচ্চুরি মাধ্যমে সঞ্চিৎ সম্পদ কিভাবে নিজের ঔরষজাত সন্তানদের জন্য নিশ্চিৎ করতে পারে সেই চিন্তা থেকে এলো নারীদের উপরে মালিকানা প্রতিষ্ঠা করার ধারণা। পুরুষ চাইলো এমন নারী যে সে ছাড়া অপর কোন পুরুষের সাথে মিলিত হতে না পারে। পুরোহিতরা তখন সতি নারীর গুনগানে মুখরিত হয়েছিলো, একই কাজ কবি, সাহিত্যিকরাও করেছে। নারীরাও হানাহানি ও বিশংখলা থেকে মুক্তি পেতে বিবাহ প্রথাকে সাদরেই গ্রহন করে নিয়েছিলো।
কিন্তু মানুষ পলিগামী জীব। বিবাহ প্রথা চেষ্টা করেছে তাকে একগামী করতে। পুরুষ, ধর্ম ও সমাজ চেয়েছে এটলিস্ট নারী যেন একগামী হয়। কারণ তাতে করে নিঁখুৎ উত্তরাধিকারী পাওয়ার ব্যাপারটা নিশ্চিৎ হয়। এই জন্য নারীকে সর্বহারা করে রাখার নিরন্তর প্রচেষ্টা ছিলো পুরুষদের সব চিন্তা জুড়ে। কারণ অর্থনৈতিকভাবে মুক্তি নারী বহুগামী পুরুষের একগামী নারী হয়ে জীবন কাটাবে না। যে জন্য সফি হুজুরদের এখনো আমরা চিৎকার করতে দেখি এই বলে যে, ' আপনারা মেয়েদের ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়াবেন'। সফিরা হচ্ছেন সামন্তবাদের বা সামন্তীয় মূল্যবোধের অবশেষ। পুঁজিবাদে এসে ঈশ্বর হয়ে দাঁড়ালো সস্তা শ্রম। কিন্তু নারীদের গৃহে অবরুদ্ধ করে রাখলে সেটি পাওয়া সম্ভব না। ফলে চালু হলো নারীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তাদেরকে আর ঘরে রাখা সম্ভব হলো না। সম্ভব হবেও না। নারীদের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসার ফলে অর্থাৎ স্বাবলম্বি হয়ে উঠার ফলে পুরুষের স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ সিমীত হয়ে আসছে। তার বহু যুগের ডমিনেটিং পার্টনার থেকে সমমর্যাদার পার্টনার হয়ে উঠতে হচ্ছে। কিন্তু সামন্তীয় মূল্যবোধের মধ্যে বেড়ে উঠা আমাদের চিন্তা কাঠামো পুঁজিবাদের মূল্যবোধগুলোর সাথে অনবরত দ্বন্দ্ব ঘটাচ্ছে। আমি বলছিনা কোনটা ভাল, তবে বলতে পারি যে, সামন্তবাদের প্রধান শহীদের নাম 'মা'। আমরা যখন বলি, আগে এত বিবাহ বিচ্ছেদ ছিলো না এবং আমরা বড় হয়েছি অসাধারণ 'মা' দের অপার স্নেহে। আসলে ঐ অসহায় নারী শুধু আপোষ করতে শিখেনিয়েছিলো। তার নিজের চাওয়া পাওয়া বলে কিছু ছিলো না। তার গর্ব ছিলো পতির গর্বে, পিতার গর্বে, ভাইয়ের গর্বে অথবা পুত্রের গর্বে। আমরা কেউ তাদের কান্না মোছাতে যাইনি বরং কান্নাকে একটা মহান গুন হিসাবে বর্ণনা করার হিপোক্রেসি করেছি। এই কাজ আমরা দৈনন্দিন থেকে আমাদের শিল্পে সাহিত্যে পর্যন্ত অতি যত্ন সহকারে ছড়িয়েছি। কিন্তু আজকে যখন নারী স্বমহিমায় উঠে আসছে তখন সেটা আমার চোখে মানিয়ে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে।
এবারে সরাসরি পরকিয়া নিয়ে আলাপে আসি। পরকিয়া সামন্তযুগেও ছিলো তবে তার শাস্তি ছিলো খুবই কড়া। সমাজ ছিলো বড়ই কঠোর। তখন ব্যাক্তি স্বাধীনতার কথা বলা ছিলো এক ধরণের পাপ। কিন্তু পুঁজিবাদ ব্যাক্তি স্বাধীনতাকে তার প্রধান মূল্যবোধের যায়গায় তুলে ধরে এগিয়েছে। পুঁজিবাদ আবার ব্যাক্তি বলতে শুধু পুরুষকে বোঝায়নি। বুঝিয়েছে পুরুষ-নারী উভয়কেই। পুঁজিবাদ যে সব দেশে অধিক মাত্রায় বিকশিত সেখানে প্রথা হিসাবে বিবাহের বিলোপ ঘটছে ফলে পরকিয়ার আলাপ সেখানে অনেকটা অপ্রাসঙ্গিক। বরং মুক্ত সমাজের উওর প্রজন্মের বেড়ে উঠার চ্যালেঞ্জগুলি বড় হয়ে আলোচিত হচ্ছে।
পরকিয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে কি ঘটছে? আমাদের দেশের বর্তমানের বিশেষ বৈশিষ্ট হচ্ছে, আমাদের আট কোটি আন্ডা, বাচ্চা, ও বৃদ্ধ সমেত সক্ষম পুরুষের মধ্যে সক্ষম এক কোটি থাকে দেশের বাইরে। তাদের ও তাদের স্ত্রীদের যৌন জীবনের হাল কি আমরা ভেবেছি কখনো? এইতো গেল একটা দিক, যেটার সাথে আবার হিজাবের ব্যবহার বৃদ্ধির সম্পর্ক আছে। যাক সেই আলোচনা আরেকদিন করবো না হলে আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক দিকে চলে যাবার সমূহ সম্ভাবনা। তবে পরকিয়ার বাজারে নতুন মসলা হয়ে এসেছে ফেইসবুক। যোগাযোগ উন্মুক্ত হওয়াতে সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর আগে নারীদের যে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কাজ করতো সেটি কমে যাওয়াতে তারা সুযোগটা আগের চেয়ে বেশি হারে লুফে নিচ্ছে।
পরকিয়াতে মাদকের ভূমিকা আছে, কিভাবে বলছি। এই যে দেশে টনে টনে ফেনসিডিল আসলো, এর ফলে যে সব তরুন ফেনসিডিলে আশক্ত হয়েছিলো তাদের মধ্যে অনেকেই যৌন সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। এটা ফেনসিডিলের পার্শপ্রতিক্রিয়া। এইসব অক্ষম পুরুষের বউদের উপায় কি? এখন যে টনে টনে ইয়াবা আসছে , এটা সেবনে প্রথম প্রথম যৌন সক্ষমতা কয়েকগুন বেড়ে গিয়ে প্রদ্বীপ নেভার মত দপ করে যৌবন নিভে যায়। এই সব তথ্য ভুক্তভোগিদের কাছে থেকে সংগৃহীত। তাহলে অদূর ভবিষ্যতে যা ঘটতে যাচ্ছে তা হলো, নারীরা আসলে পরকিয়াতো ভালো বিয়ে করার মত সুস্থ ও সক্ষম পুরুষ জোটাতে হিমসিম খাবে।
পরকিয়াকেও আপার, মিডল এবং লোয়ার ক্লাসে ভাগ করে আলোচনা করা দরকার, যে কোন ক্লাসে কি জন্য পরকিয়া বিস্তার করে। আপার ক্লাসটা ভোগ সর্বোস্ব কারণ তাদের আর কিছু করার নেই। সেখানে পরকিয়া ঘটে যার কারণ মনস্তাত্ত্বিক। আসলে যৌন চাহিদা পূরণের জন্য তাদের পরকিয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু তারাও সামন্তিয় চিন্তা চেতনার প্রভাবে ও সম্পদ নিক্ষুঁৎ উওত্তরাধিকারীর কাছে পৌঁছাতে বিয়ে করে। সামাজির মর্যাদার খাতিরেও বিয়ে করতে হয়। অথচ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা না থাকায় জীবনকে ভোগ করে যাওয়া ছাড়া তাদের উপায় নেই। বিবাহ এক্ষেত্রে একটা বড় বাঁধা। ফলে তারা লুকোচুরি খেলার আনন্দে পরকিয়া খেলে যায়।
লোয়ার ক্লাসে পরকিয়ার সুযোগ সম্ভবত সীমিত। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সেখানে বিবাহ প্রতিনিয়ত ভেঙে যায়, আবার গড়ে। কিন্তু জীবন যুদ্ধ তাদেরকে এতই ব্যাতিব্যাস্ত রাখে যে, পরকিয়া করার মত অবকাশ তাদের খুব একটা হয় না।
মিডিল ক্লাসের অবস্থা সবচেয়ে জটিল। কারণ মিডিল ক্লাসের মধ্যে আবার আপার ও লোয়ার মিডিল ক্লাস আছে। তাদের আরচণ অনেকটা যথাক্রমে আপার ও লোয়ার ক্লাসের মত। তারা কখনো ফ্যান্টাসির কারণে কখনো একাকিত্ত্ব ঘোচাতে আবার কখনো পার্টনারের অবহেলার শিকার হয়ে পরকিয়ায় জড়ায়। যদিও অনেক স্বাবলম্বি নারী ইচ্ছা করলে পরকিয়া না করে বরং বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দায় মুক্ত হতে পারে কিন্তু এক্ষেত্রে বড় বাঁধা ঐ সন্তান। সন্তান যদি কন্যা হয় তাহলেতো কথাই নেই। তার ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটান না অনেকে কিন্তু পরকিয়া তার চেয়ে অনেক ক্ষতির কারণ হয়। এটা চীরদিন গোপন থাকে না। যদি কেউ পার্টনারের পরকিয়া মেনে নেয় সেটা একটা অস্বাভাবিক ঘটনা। সেটা তখনই ঘটে যখন কোন একজন নানান বিচারে অক্ষম হয় এবং নিজের অক্ষমতা মেনে নেয়।
আমার নিজস্ব মতামত হচ্ছে, পরকিয়া কোন কাম্য অবস্থা না কারণ এখনে লুকোচুরি ও ফাঁকিবাজি আছে। ওয়াদার বরখেলাপ আছে। তবে পরকিয়া আছে, ছিলো ও থাকবে। আমি মুক্ত মানুষের বহুগামীতায় কোন নৈতিক সমস্যা দেখি না। কিন্তু চুক্তিবদ্ধ মানুষের চুক্তির বরখেলাপে সমস্যা দেখি। যারা পরকিয়াতে জড়ায় তারা নিজেরাই একে এক সাংঘাতিক অপরাধ মনে করে। যে জন্য যখন তারা ধরা পড়ে যায় তখন বাঁচার জন্য এমন কি নিজের সন্তানকেও হত্যার ঘটনা আমরা প্রায়ই পত্রিকাতে শিরোনাম হতে দেখছি। এর কারণ আমি মনে করি সামন্তীয় মূল্যবোধের সাথে আধুনিক জীবনাচারের সংঘর্ষ। অর্থাৎ পালটে যাওয়া জীবনাচারের সাথে মস্তিস্কে বয়ে চলা প্রাচীন মূল্যবোধের সংঘাত থেকে জন্ম নেয় এই সীমাহীন অপরাধবোধ ও ভয়। এই যে সকল প্রবাসী বাড়ীতে বউ রেখে পাঁচ বছর দশ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে পড়ে আছে তারাই হিজাবের ব্যাপারে বউদের চাপ দিচ্ছে বা বউরা স্বামীদের আস্বস্ত করতে নিজেরাই এই প্রচন্ড গরমেও আমাদের অবহাওয়ার জন্য অস্থাস্থকর বোরখা পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বোখরার প্রচলন আগের চেয়ে বেড়ে যাওয়া এবং যুবতী ও তরুনীদের মধ্যে বেড়ে যাবার এটা একটা কারণ। আবার নিজের পরিচয় গোপন করে ঘুরে বেড়াবার জন্যও এই পোসাক আদর্শ। কিন্তু পুঁজিবাদের বিকাশের যুগে আমাদের এই উলটো পথে হাঁটার কারণ আমরা আসলে আছি দাস যুগে। আমাদের মানুষের মধ্যে প্রায় এক কোটি দাস হিসাবে প্রবাসে আছে। দেশে যখন কাজের সুযোগ হবে এবং এই মানুষেরা ফিরে আসবে তখন সামাজিক সুস্থতার উন্নতি হবে। তার আগে উন্নতির কোন সম্ভাবনা নেই। তবে সেটা রাতারাতি হবে না। কিন্তু মাদকটা নিয়ন্ত্রন করা দরকার। চাইলে সম্ভব। যেভাবে পরীক্ষায় নকল বন্ধ করা একদফা সম্ভব হয়েছিলো।

No comments:
Post a Comment