বর্তমানে সারা বিশ্বের আলোচিত বিষয় হলো মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে দেশটির সেনাবাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধদের দ্বারা রোহিঙ্গা মুসলিম গণহত্যা। ইতোমধ্যে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস ঘাটলে যেখা যায় মানুষের এই নিষ্ঠুরতার ইতিহাস অনেক পুরনো। সভ্যতার আদি থেকেই মানুষ মানুষের ওপর পশুসুলভ আচরণ করে আসছে। তেমনি কিছু গণহত্যার ইতিহাস তুলে ধরা হলো।

আর্মেনীয় গণহত্যা
আর্মেনিয়া ইউরোপের একটি দেশ। জাতিগত আর্মেনীয়রা নিজেদের ‘হায়’ বলে থাকে। আর্মেনিয়ার ৯০ শতাংশ মানুষ এই ‘হায়’ জাতির। ১৯১১ সালে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯২২ সালে এটি সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তুর্কিরা আর্মেনীয়দের ওপর নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। তিন বছর ধরে চলা এই গণহত্যায় সে দেশের ১৫ লাখ মানুষ মারা যায়। সে সময় আর্মেনিয়ার জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৩৪ লাখ।

হলোকাস্ট ও ন্যানকিং গণহত্যা
হলোকাস্ট শব্দটা বাংলা করলে দাঁড়ায় সবকিছু পোড়ানো। তবে শব্দটি এখন জার্মান সেনাদের প্রায় ৬০ লাখ মানুষ হত্যাকেই বোঝায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদি ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের ওপর চালানো এই গণহত্যাকে স্মরণকালের সবচেয়ে নৃশংস গণহত্যা হিসেবে ধরা হয়।
১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকেই ইহুদিদের ওপর জার্মান বাহিনীর খড়্গ নেমে এসেছিল। তবে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যা ঘটে, সেই নৃশংসতাকে কোনো শব্দ দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। জার্মান বাহিনী ১৯৪১ সাল নাগাদ ইউরোপের বেশ কিছু দেশ দখলে নেয়। তখন জার্মানিতে ক্রমবর্ধমান নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে পার্শ্ববর্তী পোল্যান্ড, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, ডেনমার্ক ও নরওয়েতে আশ্রয় নেয় লাখ লাখ মানুষ। অনেক ইহুদিকে বন্দী করে পাঠানো হয় পোল্যান্ড ও জার্মানির বন্দিশালাগুলোতে।
এসব বন্দিশালাতেই কখনো গুলি, কখনো গ্যাস কিংবা কখনো রাসায়নিক প্রয়োগে হত্যা করা হয় কয়েক লাখ ইহুদিকে। বন্দিশালায় অত্যধিক পরিশ্রম, খাবারের অভাব আর চিকিৎসার অভাবেও মারা যায় বহু ইহুদি।
এই নৃশংসতম গণহত্যায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে প্রতিবছর ২৭ জানুয়ারি জাতিসংঘের পক্ষ থেকে পালন করা হয় আন্তর্জাতিক হলোকাস্ট দিবস।
একই সময়ে আরেকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যা ‘দ্য ন্যানকিং ম্যাসাকার’ কিংবা ‘রেইপ অব ন্যানকিং’ নামে অনেকের জানা। ১৯৩৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর থেকে ১৯৩৮ সালের জানুয়ারির শেষ ভাগ পর্যন্ত জাপানি সেনাবাহিনী চীনের তৎকালীন রাজধানী ন্যানকিং শহরটিকে একদম গুঁড়িয়ে দেয়। প্রচুর পরিমাণে ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ড ও লুটতারাজ চলতে থাকে। এই অল্প সময়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ লাখ। বলা হয়ে থাকে, সেই যুদ্ধে এক তলোয়ারে ১০০ মানুষকে জবাই করা হতো।

কম্বোডীয় গণহত্যা
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়া। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত দেশটিতে ক্ষমতায় ছিল খেমাররুজরা। এই চার বছরে খেমাররুজ সরকার নির্মম গণহত্যা ঘটিয়েছিল, যা কম্বোডীয় গণহত্যা নামেই পরিচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন গণহত্যার মধ্যে কম্বোডিয়ার এই হত্যাকাণ্ড উল্লেখযোগ্য। বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নামে এই সময়ে প্রায় ২০ লাখ সাধারণ কম্বোডীয়কে হত্যা করে ক্ষমতাসীন বামপন্থী খেমাররুজ সরকার।
যে নৃশংস হত্যার শুরু হয়েছিল আগের সরকারের অধীনে কাজ করা কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে। কেউ অনিয়মের প্রতিবাদ করলেই হত্যা করা হতো।
একপর্যায়ে এই হত্যাযজ্ঞ ছড়িয়ে পড়ে খোদ খেমাররুজ সদস্যদের মধ্যেও। বিদেশিদের গুপ্তচর, দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার বায়বীয় অভিযোগে অনেক খেমাররুজ সদস্যকেও তাঁদের জীবন হারাতে হয়।
একসময় দেশটিতে চরম অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়। দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। দুর্ভিক্ষ আর মহামারিতে আক্রান্ত হয়েও প্রাণ হারাতে থাকে হাজার হাজার মানুষ। পরে ভিয়েতনামের সরকারি বাহিনীর হাতে খেমাররুজ সরকারের পতন হয়।

২৫ মার্চ ১৯৭১ বাঙ্গালিদের ওপর পাক বাহিনীর নৃশংস সেই গণহত্যা
২৫ মার্চ মানবসভ্যতার ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে সাধারণ বাঙালির ওপর নেমে আসে ভয়ঙ্কর এক অভিশাপ। বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আধুনিক মারণাস্ত্র নিয়ে হিংস্রের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে শুরুতেই ধ্বংস করে দেওয়া। সেই রাতে হানাদাররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, ইকবাল হল, রোকেয়া হল, শিক্ষকদের বাসা, পিলখানার ইপিআর সদর দফতর, রাজারবাগ পুলিশ লাইনে একযোগে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে হত্যা করে অগণিত নিরস্ত্র দেশপ্রেমিককে। সাধারণ মানুষ তো বটেই, এই অপারেশনের আসল লক্ষ্য ছিল দেশের নেতৃত্বস্থানীয় শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নিঃশ্বেষ করে দেওয়া।
এ ছাড়াও সেই রাতে একে একে দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদ, জাতীয় প্রেসক্লাবেও অগ্নিসংযোগ, মর্টার শেল ছুড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে পাক হানাদাররা। এ হামলায় জীবন দিতে হয় বেশ কয়জন গণমাধ্যম কর্মীকেও। হানাদার বাহিনী ট্যাংক ও মর্টারের মাধ্যমে নীলক্ষেতসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা দখলে নেয়। সেনাবাহিনীর মেশিনগানের গুলি, ট্যাংক-মর্টারের গোলা ও আগুনের লেলিহান শিখায় নগরীর রাত হয়ে ওঠে বিভীষিকাময়। পাকিস্তানি হায়েনাদের কাছ থেকে রক্ষা পায়নি রোকেয়া হলের ছাত্রীরাও। ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব ও জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, ড. মনিরুজ্জামানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ৯ জন শিক্ষককে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। ঢাবির জগন্নাথ হলে চলে নৃশংসতম হত্যার সবচেয়ে বড় ঘটনাটি। এখানে হত্যাযজ্ঞ চলে রাত থেকে সকাল পর্যন্ত।
মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন ২৫ মার্চের রাত সম্পর্কে লিখেছেন, ‘সে রাতে সাত হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়, গ্রেফতার করা হয় আরও তিন হাজার লোককে। ঢাকায় ঘটনার শুরু মাত্র হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে সৈন্যরা বাড়িয়ে চলল মৃতের সংখ্যা। জ্বালাতে শুরু করল ঘরবাড়ি, দোকানপাট লুট আর ধ্বংস তাদের নেশায় পরিণত হলো যেন। রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো কাক-শিয়ালের খাবারে পরিণত হলো।

বসনীয় গণহত্যা
১৯৯২ সালের এপ্রিলে যুগোস্লাভিয়া থেকে নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করে বসনিয়া-হার্জেগোভিনা। এই অপরাধে এই মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায় বসনীয় সার্বরা। ধারণা করা হয়, এই গণহত্যায় কমপক্ষে এক লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
তিন বছর ধরে চলা এই গণহত্যার মধ্যে নৃশংসতায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সেব্রেনিৎসা গণহত্যা। ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে জাতিসংঘ ঘোষিত নিরাপদ এলাকা সেব্রেনিৎসায় নিয়োজিত শান্তিরক্ষী বাহিনীর সামনেই আলাদা করা হয় সেখানে বসবাসরত নারী ও পুরুষদের। এরপর শুরু হয় নৃশংসতার প্রথম পর্ব। মুসলিম নারী ও কিশোরীদের একে একে বাসে তুলে পাঠানো হয় সার্ব-অধ্যুষিত এলাকাগুলোয়, যেখানে তাদের ওপর চালানো হয় যৌন নিপীড়ন, অপেক্ষাকৃত কম বয়সীরা শিকার হয় ধর্ষণের। অন্যদিকে সেব্রেনিৎসার সাত থেকে আট হাজার কিশোর ও পুরুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় সেখানেই।
একই ধরনের নৃশংসতা চালানো হয় সারায়েভো, জেপা, ফোকা, প্রিজেদর ও ভিজগ্রাদে। সার্বীয় সৈন্যদের হাতে হত্যা আর ধর্ষণের শিকার হয় লক্ষাধিক বসনীয় মুসলিম।

রুয়ান্ডায় গণহত্যা
রুয়ান্ডার জনগণের মধ্যে মূল দুই গোষ্ঠী হচ্ছে হুতু ও তুতসি, যার মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় হুতু। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডা দখলে নেয় বেলজিয়াম। তারা রুয়ান্ডার ক্ষমতায় বসায় তুতসিদের। দেশটার ব্যবসা-বাণিজ্য এই তুতসিরা নিয়ন্ত্রণ করত। ১৯৬২ সালে রুয়ান্ডা ছেড়ে চলে যায় বেলজিয়াম। এরপর তুতসিদের হাত থেকে ক্ষমতা চলে যায় সংখ্যাগুরু হুতু সম্প্রদায়ের কাছে। এবার হুতুরা তুতসিদের ওপর নির্যাতন চালাতে থাকে। এ অবস্থা দিনে দিনে বাড়তে থাকে। ১৯৯৪ সালের ১৭ এপ্রিল এই দ্বন্দ্ব গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়।
উগ্র জাতীয়তাবাদে মত্ত হয়ে প্রতিবেশী হুতুরা সপরিবার হত্যা করতে শুরু করে প্রতিবেশী তুতসিদের। এমনকি হুতু সম্প্রদায়ভুক্ত স্বামী তাঁর তুতসি স্ত্রীকে হত্যা করেন এই ভয়ে যে তাঁর স্ত্রী তুতসি হওয়ার অপরাধে তাঁরও প্রাণ যেতে পারে। লক্ষাধিক তুতসি নারীকে ধরে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহারের জন্য।
১৯৯৪ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত, মাত্র ১০০ দিন চলা হত্যাকাণ্ডে তুতসি সম্প্রদায়ের আট লক্ষাধিক নারী-পুরুষ মারা যায় হুতু সম্প্রদায়ের হাতে।
দারফুর গণহত্যা
একুশ শতকের নৃশংসতম গণহত্যা হিসেবেই ধরা হয় দারফুর গণহত্যাকে। এই গণহত্যা শুরু হয় ২০০৪ সালে, যখন সুদানের কিছু সংগঠন সুদান সরকারের বিরুদ্ধে অনারব সুদানিদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ এনে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
সুদানের একনায়ক ওমর আল বশির সরকার এ ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিক মোড় নেয়। ওমর আল বশিরের নেতৃত্বাধীন সুদান সরকারের সহায়তায় গঠিত আধা সামরিক জানজায়িদ বাহিনী অনারব এই বিদ্রোহীদের দমনের নামে অনারব জনগোষ্ঠীর ওপর শুরু করে নৃশংস এক গণহত্যা। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুসারে এখন পর্যন্ত সুদানে গণহত্যার শিকার হয়ে মারা গেছে দুই লক্ষাধিক মানুষ, ধর্ষণের শিকার হয়েছে অগুনতি নারী আর বাস্তুহারা হয়েছে বিশ লক্ষাধিক মানুষ।
রাজা লিওপোল্ডের গণহত্যা
বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে আছেন তার নেতৃত্বে পরিচালিত নৃশংস গণহত্যার জন্য। তিনি ছিলেন বেলজিয়ামের সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের প্রধান। তার গল্পের শুরুটা আফ্রিকার দেশ কঙ্গো কিনে নেওয়ার পর থেকে। কঙ্গো কিনে নিয়ে সে দেশের জনগণকে দাসে পরিণত করেন। লিওপোল্ড ইন্টারন্যাশনাল আফ্রিকান সোসাইটি নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। সেই সংগঠনের বাহ্যিক রূপ ছিল সমাজ সংস্কার। কিন্তু এর আড়ালে চলে দাস ব্যবসা। তিনি কঙ্গোর মানুষদের দিয়েই কঙ্গোর প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন শুরু করেন। তার একনায়কতন্ত্র কঙ্গোর ওপর চাপিয়ে দিয়ে চলে ভয়াবহ অত্যাচার, অঙ্গচ্ছেদ, মৃত্যুদণ্ড।
এসব কিছুই তিনি করতেন তার নিজস্ব সেনাবাহিনী দ্বারা। কঙ্গোতে তার নিজস্ব বাহিনীর নাম ছিল ফোর্স পাবলিক। রাজা লিওপোল্ডের নির্দেশে ফোর্স পাবলিকের অফিসাররা জনপ্রতি আইভরি বা হাতির দাঁত ও রাবার সংগ্রহের কোটা ধার্য করে দিত। নির্দিষ্ট পরিমাণ আইভরি বা রাবার সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হলে সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। তবে সেনাবাহিনীর অফিসারদের দয়া হলে কুমিরের চামড়ার চাবুক খেয়েই অনেকে বেঁচে যেত।
এতে তার নৃশংস হত্যাকাণ্ডে নিহত হয়েছিল আফ্রিকার কঙ্গোর প্রায় ১০ মিলিয়নেরও (এক কোটি) বেশি মানুষ। মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করার জন্য সেনাবাহিনীর গুলি যাতে অপচয় না হয়, সে জন্য সরকারের নির্দেশে প্রত্যেকটি গুলির বিপরীতে একটি করে মানুষের কাটা কব্জি জমা দিতে হতো। এ ব্যবস্থার সুফল হিসেবে মনে করা হতো হাত কাটার ভয়ে কেউ রাবার সংগ্রহে আলসেমি করবে না।
যা অত্যন্ত রোমহর্ষক হলেও তাদের কাছে অযৌক্তিক ছিল না। কিন্তু একটা কুফল দেখা দিয়েছিল, বনের ভিতর থেকে রাবার সংগ্রহের তুলনায় কাটা হাত সংগ্রহ করা অনেকটা সহজ ছিল। ফলে কঙ্গোলিজদের মধ্যে যারা সন্ত্রাসী ছিল, তারা অন্যদের ওপর আক্রমণ করে বিজিত গোত্রের লোকদের হাত কেটে জমা দিত।
রাবার সংগ্রহের পদ্ধতি ছিল রোমহর্ষক ও নিষ্ঠুরতায় ভরা। রাবার সংগ্রহকারীরা রাবার গাছের জঙ্গলে, গাছের পাতায় ও লতায় লম্বা দা দিয়ে আঘাত করত সেই আঘাতে অনেক সময় তরল রাবার ছিটকে এসে তাদের গায়ে আটকে যেত। এসব রাবার পরে দা কিংবা ছুরি দিয়ে শরীর থেকে উঠানো হতো। উঠানোর সময় বেশির ভাগ সময়ই কঙ্গোবাসীর গায়ের চামড়া পশমসহ উঠে আসত। নিগ্রোদের কালো চামড়ার ব্যথা সাদারা গায়ে মাখত না। কারণ রাষ্ট্রীয় দলিলে এভাবেই তাদের দলপতিরা স্বগোত্রীয়দের ভাগ্য নির্ধারণ করে গেছে।
আফ্রিকার মহাযুদ্ধ কিংবা রাজা লিওপোল্ডের কুখ্যাত শাসনামলে কত মানুষ মারা গেছে সেটি কখনো কোথাও উচ্চারিত হয় না। দ্বিতীয় কঙ্গোযুদ্ধ যা কিনা আফ্রিকার মহাযুদ্ধ নামেও পরিচিত। তাতে নিহত হয় অসংখ্য মানুষ। এই মহাযুদ্ধে বাম্বেঙ্গা নামে একটি আঞ্চলিক নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী দাসে পরিণত হয়েছিল ও নরমাংস ভক্ষণকারীতে রূপান্তরিত হয়েছিল।

সর্বশেষ মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তাণ্ডবে এক হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গার সংখ্যাই বেশি। মিয়ানমারে মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াং লি শুক্রবার (০৮ সেপ্টেম্বর. ২০১৭) এ কথা বলেছেন।
মিয়ানমার সরকারের দেয়া নিহতের সংখ্যার চেয়ে তা প্রায় দ্বিগুণের বেশি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং দেশটিতে অতীত সহিংসতার স্বরূপ বিশ্লেষণ করে লি বলেন, রাখাইনে হয়ত এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। উভয় পক্ষের মানুষ মারা গেলেও রোহিঙ্গা মুসলমান অনেক বেশি নিহত হয়েছে বলে জানান তিনি।
২৫ আগস্ট মিয়ানমার পুলিশের বেশ কয়েকটি তল্লাশি চৌকি এবং সেনাঘাঁটিতে হামলার অজুহাতে রাখাইনে সামরিক অভিযান শুরু করে মিয়ানমার। এতে অন্তত চারশ মানুষ নিহতের তথ্য জানিয়েছে সু চির সরকার। তবে গত দুই সপ্তাহে এক লাখ ৬৪ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার তথ্য জানিয়েছে জাতিসংঘ।
রাখাইন রাজ্যের অন্যেরা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে। জাতিসংঘ এক লাখ ৬৪ হাজার বললেও আড়াই লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। পালিয়ে আসার সময়ও নারী-শিশুসহ অনেক রোহিঙ্গা মারা গেছেন। নাফ নদীতে অনেকেরই মরদেহ ভেসে উঠছে।
তবে বৌদ্ধদের দেশ মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের সেখানকার নাগরিক হিসেবে স্বীকারই করে না। তাদের দাবি রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে সেখানে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছে।
সূত্র: বিবিসি, হিস্টি ডটকম, আল-জাজিরা অনলাইন, আর্মেনিয়ান জেনোসাইড ডটঅর্গ, জাতিসংঘ ওয়েবসাইট
আর্মেনীয় গণহত্যা
আর্মেনিয়া ইউরোপের একটি দেশ। জাতিগত আর্মেনীয়রা নিজেদের ‘হায়’ বলে থাকে। আর্মেনিয়ার ৯০ শতাংশ মানুষ এই ‘হায়’ জাতির। ১৯১১ সালে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯২২ সালে এটি সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তুর্কিরা আর্মেনীয়দের ওপর নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। তিন বছর ধরে চলা এই গণহত্যায় সে দেশের ১৫ লাখ মানুষ মারা যায়। সে সময় আর্মেনিয়ার জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৩৪ লাখ।
হলোকাস্ট ও ন্যানকিং গণহত্যা
হলোকাস্ট শব্দটা বাংলা করলে দাঁড়ায় সবকিছু পোড়ানো। তবে শব্দটি এখন জার্মান সেনাদের প্রায় ৬০ লাখ মানুষ হত্যাকেই বোঝায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদি ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের ওপর চালানো এই গণহত্যাকে স্মরণকালের সবচেয়ে নৃশংস গণহত্যা হিসেবে ধরা হয়।
১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকেই ইহুদিদের ওপর জার্মান বাহিনীর খড়্গ নেমে এসেছিল। তবে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যা ঘটে, সেই নৃশংসতাকে কোনো শব্দ দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। জার্মান বাহিনী ১৯৪১ সাল নাগাদ ইউরোপের বেশ কিছু দেশ দখলে নেয়। তখন জার্মানিতে ক্রমবর্ধমান নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে পার্শ্ববর্তী পোল্যান্ড, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, ডেনমার্ক ও নরওয়েতে আশ্রয় নেয় লাখ লাখ মানুষ। অনেক ইহুদিকে বন্দী করে পাঠানো হয় পোল্যান্ড ও জার্মানির বন্দিশালাগুলোতে।
এসব বন্দিশালাতেই কখনো গুলি, কখনো গ্যাস কিংবা কখনো রাসায়নিক প্রয়োগে হত্যা করা হয় কয়েক লাখ ইহুদিকে। বন্দিশালায় অত্যধিক পরিশ্রম, খাবারের অভাব আর চিকিৎসার অভাবেও মারা যায় বহু ইহুদি।
এই নৃশংসতম গণহত্যায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে প্রতিবছর ২৭ জানুয়ারি জাতিসংঘের পক্ষ থেকে পালন করা হয় আন্তর্জাতিক হলোকাস্ট দিবস।
একই সময়ে আরেকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যা ‘দ্য ন্যানকিং ম্যাসাকার’ কিংবা ‘রেইপ অব ন্যানকিং’ নামে অনেকের জানা। ১৯৩৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর থেকে ১৯৩৮ সালের জানুয়ারির শেষ ভাগ পর্যন্ত জাপানি সেনাবাহিনী চীনের তৎকালীন রাজধানী ন্যানকিং শহরটিকে একদম গুঁড়িয়ে দেয়। প্রচুর পরিমাণে ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ড ও লুটতারাজ চলতে থাকে। এই অল্প সময়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ লাখ। বলা হয়ে থাকে, সেই যুদ্ধে এক তলোয়ারে ১০০ মানুষকে জবাই করা হতো।
কম্বোডীয় গণহত্যা
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়া। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত দেশটিতে ক্ষমতায় ছিল খেমাররুজরা। এই চার বছরে খেমাররুজ সরকার নির্মম গণহত্যা ঘটিয়েছিল, যা কম্বোডীয় গণহত্যা নামেই পরিচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন গণহত্যার মধ্যে কম্বোডিয়ার এই হত্যাকাণ্ড উল্লেখযোগ্য। বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নামে এই সময়ে প্রায় ২০ লাখ সাধারণ কম্বোডীয়কে হত্যা করে ক্ষমতাসীন বামপন্থী খেমাররুজ সরকার।
যে নৃশংস হত্যার শুরু হয়েছিল আগের সরকারের অধীনে কাজ করা কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে। কেউ অনিয়মের প্রতিবাদ করলেই হত্যা করা হতো।
একপর্যায়ে এই হত্যাযজ্ঞ ছড়িয়ে পড়ে খোদ খেমাররুজ সদস্যদের মধ্যেও। বিদেশিদের গুপ্তচর, দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার বায়বীয় অভিযোগে অনেক খেমাররুজ সদস্যকেও তাঁদের জীবন হারাতে হয়।
একসময় দেশটিতে চরম অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়। দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। দুর্ভিক্ষ আর মহামারিতে আক্রান্ত হয়েও প্রাণ হারাতে থাকে হাজার হাজার মানুষ। পরে ভিয়েতনামের সরকারি বাহিনীর হাতে খেমাররুজ সরকারের পতন হয়।
২৫ মার্চ ১৯৭১ বাঙ্গালিদের ওপর পাক বাহিনীর নৃশংস সেই গণহত্যা
২৫ মার্চ মানবসভ্যতার ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে সাধারণ বাঙালির ওপর নেমে আসে ভয়ঙ্কর এক অভিশাপ। বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আধুনিক মারণাস্ত্র নিয়ে হিংস্রের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে শুরুতেই ধ্বংস করে দেওয়া। সেই রাতে হানাদাররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, ইকবাল হল, রোকেয়া হল, শিক্ষকদের বাসা, পিলখানার ইপিআর সদর দফতর, রাজারবাগ পুলিশ লাইনে একযোগে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে হত্যা করে অগণিত নিরস্ত্র দেশপ্রেমিককে। সাধারণ মানুষ তো বটেই, এই অপারেশনের আসল লক্ষ্য ছিল দেশের নেতৃত্বস্থানীয় শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নিঃশ্বেষ করে দেওয়া।
এ ছাড়াও সেই রাতে একে একে দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদ, জাতীয় প্রেসক্লাবেও অগ্নিসংযোগ, মর্টার শেল ছুড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে পাক হানাদাররা। এ হামলায় জীবন দিতে হয় বেশ কয়জন গণমাধ্যম কর্মীকেও। হানাদার বাহিনী ট্যাংক ও মর্টারের মাধ্যমে নীলক্ষেতসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা দখলে নেয়। সেনাবাহিনীর মেশিনগানের গুলি, ট্যাংক-মর্টারের গোলা ও আগুনের লেলিহান শিখায় নগরীর রাত হয়ে ওঠে বিভীষিকাময়। পাকিস্তানি হায়েনাদের কাছ থেকে রক্ষা পায়নি রোকেয়া হলের ছাত্রীরাও। ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব ও জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, ড. মনিরুজ্জামানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ৯ জন শিক্ষককে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। ঢাবির জগন্নাথ হলে চলে নৃশংসতম হত্যার সবচেয়ে বড় ঘটনাটি। এখানে হত্যাযজ্ঞ চলে রাত থেকে সকাল পর্যন্ত।
মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন ২৫ মার্চের রাত সম্পর্কে লিখেছেন, ‘সে রাতে সাত হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়, গ্রেফতার করা হয় আরও তিন হাজার লোককে। ঢাকায় ঘটনার শুরু মাত্র হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে সৈন্যরা বাড়িয়ে চলল মৃতের সংখ্যা। জ্বালাতে শুরু করল ঘরবাড়ি, দোকানপাট লুট আর ধ্বংস তাদের নেশায় পরিণত হলো যেন। রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো কাক-শিয়ালের খাবারে পরিণত হলো।
বসনীয় গণহত্যা
১৯৯২ সালের এপ্রিলে যুগোস্লাভিয়া থেকে নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করে বসনিয়া-হার্জেগোভিনা। এই অপরাধে এই মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায় বসনীয় সার্বরা। ধারণা করা হয়, এই গণহত্যায় কমপক্ষে এক লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
তিন বছর ধরে চলা এই গণহত্যার মধ্যে নৃশংসতায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সেব্রেনিৎসা গণহত্যা। ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে জাতিসংঘ ঘোষিত নিরাপদ এলাকা সেব্রেনিৎসায় নিয়োজিত শান্তিরক্ষী বাহিনীর সামনেই আলাদা করা হয় সেখানে বসবাসরত নারী ও পুরুষদের। এরপর শুরু হয় নৃশংসতার প্রথম পর্ব। মুসলিম নারী ও কিশোরীদের একে একে বাসে তুলে পাঠানো হয় সার্ব-অধ্যুষিত এলাকাগুলোয়, যেখানে তাদের ওপর চালানো হয় যৌন নিপীড়ন, অপেক্ষাকৃত কম বয়সীরা শিকার হয় ধর্ষণের। অন্যদিকে সেব্রেনিৎসার সাত থেকে আট হাজার কিশোর ও পুরুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় সেখানেই।
একই ধরনের নৃশংসতা চালানো হয় সারায়েভো, জেপা, ফোকা, প্রিজেদর ও ভিজগ্রাদে। সার্বীয় সৈন্যদের হাতে হত্যা আর ধর্ষণের শিকার হয় লক্ষাধিক বসনীয় মুসলিম।
রুয়ান্ডায় গণহত্যা
রুয়ান্ডার জনগণের মধ্যে মূল দুই গোষ্ঠী হচ্ছে হুতু ও তুতসি, যার মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় হুতু। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডা দখলে নেয় বেলজিয়াম। তারা রুয়ান্ডার ক্ষমতায় বসায় তুতসিদের। দেশটার ব্যবসা-বাণিজ্য এই তুতসিরা নিয়ন্ত্রণ করত। ১৯৬২ সালে রুয়ান্ডা ছেড়ে চলে যায় বেলজিয়াম। এরপর তুতসিদের হাত থেকে ক্ষমতা চলে যায় সংখ্যাগুরু হুতু সম্প্রদায়ের কাছে। এবার হুতুরা তুতসিদের ওপর নির্যাতন চালাতে থাকে। এ অবস্থা দিনে দিনে বাড়তে থাকে। ১৯৯৪ সালের ১৭ এপ্রিল এই দ্বন্দ্ব গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়।
উগ্র জাতীয়তাবাদে মত্ত হয়ে প্রতিবেশী হুতুরা সপরিবার হত্যা করতে শুরু করে প্রতিবেশী তুতসিদের। এমনকি হুতু সম্প্রদায়ভুক্ত স্বামী তাঁর তুতসি স্ত্রীকে হত্যা করেন এই ভয়ে যে তাঁর স্ত্রী তুতসি হওয়ার অপরাধে তাঁরও প্রাণ যেতে পারে। লক্ষাধিক তুতসি নারীকে ধরে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহারের জন্য।
১৯৯৪ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত, মাত্র ১০০ দিন চলা হত্যাকাণ্ডে তুতসি সম্প্রদায়ের আট লক্ষাধিক নারী-পুরুষ মারা যায় হুতু সম্প্রদায়ের হাতে।
দারফুর গণহত্যা
একুশ শতকের নৃশংসতম গণহত্যা হিসেবেই ধরা হয় দারফুর গণহত্যাকে। এই গণহত্যা শুরু হয় ২০০৪ সালে, যখন সুদানের কিছু সংগঠন সুদান সরকারের বিরুদ্ধে অনারব সুদানিদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ এনে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
সুদানের একনায়ক ওমর আল বশির সরকার এ ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিক মোড় নেয়। ওমর আল বশিরের নেতৃত্বাধীন সুদান সরকারের সহায়তায় গঠিত আধা সামরিক জানজায়িদ বাহিনী অনারব এই বিদ্রোহীদের দমনের নামে অনারব জনগোষ্ঠীর ওপর শুরু করে নৃশংস এক গণহত্যা। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুসারে এখন পর্যন্ত সুদানে গণহত্যার শিকার হয়ে মারা গেছে দুই লক্ষাধিক মানুষ, ধর্ষণের শিকার হয়েছে অগুনতি নারী আর বাস্তুহারা হয়েছে বিশ লক্ষাধিক মানুষ।
রাজা লিওপোল্ডের গণহত্যা
বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে আছেন তার নেতৃত্বে পরিচালিত নৃশংস গণহত্যার জন্য। তিনি ছিলেন বেলজিয়ামের সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের প্রধান। তার গল্পের শুরুটা আফ্রিকার দেশ কঙ্গো কিনে নেওয়ার পর থেকে। কঙ্গো কিনে নিয়ে সে দেশের জনগণকে দাসে পরিণত করেন। লিওপোল্ড ইন্টারন্যাশনাল আফ্রিকান সোসাইটি নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। সেই সংগঠনের বাহ্যিক রূপ ছিল সমাজ সংস্কার। কিন্তু এর আড়ালে চলে দাস ব্যবসা। তিনি কঙ্গোর মানুষদের দিয়েই কঙ্গোর প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন শুরু করেন। তার একনায়কতন্ত্র কঙ্গোর ওপর চাপিয়ে দিয়ে চলে ভয়াবহ অত্যাচার, অঙ্গচ্ছেদ, মৃত্যুদণ্ড।
এসব কিছুই তিনি করতেন তার নিজস্ব সেনাবাহিনী দ্বারা। কঙ্গোতে তার নিজস্ব বাহিনীর নাম ছিল ফোর্স পাবলিক। রাজা লিওপোল্ডের নির্দেশে ফোর্স পাবলিকের অফিসাররা জনপ্রতি আইভরি বা হাতির দাঁত ও রাবার সংগ্রহের কোটা ধার্য করে দিত। নির্দিষ্ট পরিমাণ আইভরি বা রাবার সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হলে সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। তবে সেনাবাহিনীর অফিসারদের দয়া হলে কুমিরের চামড়ার চাবুক খেয়েই অনেকে বেঁচে যেত।
এতে তার নৃশংস হত্যাকাণ্ডে নিহত হয়েছিল আফ্রিকার কঙ্গোর প্রায় ১০ মিলিয়নেরও (এক কোটি) বেশি মানুষ। মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করার জন্য সেনাবাহিনীর গুলি যাতে অপচয় না হয়, সে জন্য সরকারের নির্দেশে প্রত্যেকটি গুলির বিপরীতে একটি করে মানুষের কাটা কব্জি জমা দিতে হতো। এ ব্যবস্থার সুফল হিসেবে মনে করা হতো হাত কাটার ভয়ে কেউ রাবার সংগ্রহে আলসেমি করবে না।
যা অত্যন্ত রোমহর্ষক হলেও তাদের কাছে অযৌক্তিক ছিল না। কিন্তু একটা কুফল দেখা দিয়েছিল, বনের ভিতর থেকে রাবার সংগ্রহের তুলনায় কাটা হাত সংগ্রহ করা অনেকটা সহজ ছিল। ফলে কঙ্গোলিজদের মধ্যে যারা সন্ত্রাসী ছিল, তারা অন্যদের ওপর আক্রমণ করে বিজিত গোত্রের লোকদের হাত কেটে জমা দিত।
রাবার সংগ্রহের পদ্ধতি ছিল রোমহর্ষক ও নিষ্ঠুরতায় ভরা। রাবার সংগ্রহকারীরা রাবার গাছের জঙ্গলে, গাছের পাতায় ও লতায় লম্বা দা দিয়ে আঘাত করত সেই আঘাতে অনেক সময় তরল রাবার ছিটকে এসে তাদের গায়ে আটকে যেত। এসব রাবার পরে দা কিংবা ছুরি দিয়ে শরীর থেকে উঠানো হতো। উঠানোর সময় বেশির ভাগ সময়ই কঙ্গোবাসীর গায়ের চামড়া পশমসহ উঠে আসত। নিগ্রোদের কালো চামড়ার ব্যথা সাদারা গায়ে মাখত না। কারণ রাষ্ট্রীয় দলিলে এভাবেই তাদের দলপতিরা স্বগোত্রীয়দের ভাগ্য নির্ধারণ করে গেছে।
আফ্রিকার মহাযুদ্ধ কিংবা রাজা লিওপোল্ডের কুখ্যাত শাসনামলে কত মানুষ মারা গেছে সেটি কখনো কোথাও উচ্চারিত হয় না। দ্বিতীয় কঙ্গোযুদ্ধ যা কিনা আফ্রিকার মহাযুদ্ধ নামেও পরিচিত। তাতে নিহত হয় অসংখ্য মানুষ। এই মহাযুদ্ধে বাম্বেঙ্গা নামে একটি আঞ্চলিক নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী দাসে পরিণত হয়েছিল ও নরমাংস ভক্ষণকারীতে রূপান্তরিত হয়েছিল।
সর্বশেষ মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তাণ্ডবে এক হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গার সংখ্যাই বেশি। মিয়ানমারে মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াং লি শুক্রবার (০৮ সেপ্টেম্বর. ২০১৭) এ কথা বলেছেন।
মিয়ানমার সরকারের দেয়া নিহতের সংখ্যার চেয়ে তা প্রায় দ্বিগুণের বেশি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং দেশটিতে অতীত সহিংসতার স্বরূপ বিশ্লেষণ করে লি বলেন, রাখাইনে হয়ত এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। উভয় পক্ষের মানুষ মারা গেলেও রোহিঙ্গা মুসলমান অনেক বেশি নিহত হয়েছে বলে জানান তিনি।
২৫ আগস্ট মিয়ানমার পুলিশের বেশ কয়েকটি তল্লাশি চৌকি এবং সেনাঘাঁটিতে হামলার অজুহাতে রাখাইনে সামরিক অভিযান শুরু করে মিয়ানমার। এতে অন্তত চারশ মানুষ নিহতের তথ্য জানিয়েছে সু চির সরকার। তবে গত দুই সপ্তাহে এক লাখ ৬৪ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার তথ্য জানিয়েছে জাতিসংঘ।
রাখাইন রাজ্যের অন্যেরা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে। জাতিসংঘ এক লাখ ৬৪ হাজার বললেও আড়াই লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। পালিয়ে আসার সময়ও নারী-শিশুসহ অনেক রোহিঙ্গা মারা গেছেন। নাফ নদীতে অনেকেরই মরদেহ ভেসে উঠছে।
তবে বৌদ্ধদের দেশ মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের সেখানকার নাগরিক হিসেবে স্বীকারই করে না। তাদের দাবি রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে সেখানে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছে।
সূত্র: বিবিসি, হিস্টি ডটকম, আল-জাজিরা অনলাইন, আর্মেনিয়ান জেনোসাইড ডটঅর্গ, জাতিসংঘ ওয়েবসাইট
No comments:
Post a Comment