
প্রাচীন মিশর ইও ইতিহাসে বিস্ময়ের যেন শেষ নেই। পরতে পরতে রহস্য আর রহস্য। প্রাচীন মিশর ইও দের বিড়ালপূজা সেই রহস্যময় একটি দিক। বিড়ালের প্রাচীন মিশর এ বিড়ালকে বলা হত ‘মাউ’। এর মানে, ‘দেখা’। সে সময় বিড়ালকে অত্যন্ত পবিত্র মনে করা হত। ছোট-বড় সবাই সম্মান করত এই ছোট্ট প্রাণীটিকে। পরিবারের লোকেরা বিড়াল দেখেশুনে রাখত। বিড়াল নিয়ে তাদের ছিল ভারি অহংকার। পড়শির বিড়ালটি দেখতে সুন্দর হলে পাশের বাড়ির লোকেরা ঈর্ষা করত। ঘর সাজাত বিড়ালের ছবি দিয়ে। ঘরের এককোণে রাখত বিড়ালের মূর্তি। বিড়ালের নিরাপত্তার জন্য কঠোর আইন ছিল। ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃত বিড়াল হত্যার শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। মিশর এর বাইরে বিড়াল রপ্তানি ছিল নিষিদ্ধ। তারপরও লোভী চোরাচালানিরা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বিড়াল পাচার করত। প্রাচীন মিশর ইও নথিপত্রে দেখা যায়- বিড়াল উদ্ধারের জন্য পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সামরিক অভিযান পরিচালিত হত।
প্রাচীন মিশর ইও সমাজে বিড়াল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। যে কারণে বিড়ালকে তারা শিল্পে স্থান দিয়েছিল, মর্যাদা দিয়েছিল দেবতার। এমন কী মৃত্যুর পর বিড়ালের মমিও করা হত। বিড়াল কৃষিক্ষেত্রের অনিষ্টকর জীবজন্তু থেকে ফসল রক্ষা করত। সাপও মারতে পারত, বিশেষ করে বিষধর গোক্ষুর। এভাবে বিড়াল প্রাচীন মিশর এ সুখ ও শান্তির প্রতীক হয়ে ওঠে। বিড়াল ক্রমশ গৃহপালিত হয়ে উঠতে থাকে। বিড়ালের ওপর নির্ভর করতে থাকে গ্রামবাসী। তারা চাইত বিড়াল যেন গ্রামেই থাকে। কালক্রমে বিড়াল মানুষের খাদ্যে অভ্যস্ত হয়ে গেলে তাকে আর গ্রামের বাইরে খাদ্যের অন্বেষণ করতে হয়নি। রীতিমতো পোষা হয়ে ওঠে বিড়াল। কুকুরের বদলে বিড়াল নিয়ে শিকার করতে বের হত গ্রামবাসী। বিড়াল মাছ কিংবা পাখি খুঁজে নিয়ে আসত। পরবর্তীকালে প্রাচীন মিশর এ বিড়ালদেবীর পূজাও আরম্ভ হয়- যা প্রায় ২০০০ বছর টিকে ছিল। বিড়ালের দেবীর নাম ছিল বাস্ট বা বাসটেট।
গ্রিক ঐতিহাসিক হিরোডোটাসের একটি লেখায় প্রাচীন মিশর এর অধিবাসীদের বিড়াল প্রীতি সম্বন্ধে জানা যায়- একবার মিশর এ একটি বাড়িতে আগুন লেগেছে। বিড়ালের যেন ক্ষতি না হয় সেজন্য বাড়ির মানুষ বিড়াল ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল। তিনি আরও লিখেছেন- পারস্যের সেনাবাহিনী মিশর আক্রমণ করতে এসেছে। পারসিক সেনাপতি মিশর বাসীর বিড়ালপ্রেম সম্বন্ধে অবগত ছিলেন। তিনি সৈন্যদের বিড়াল সংগ্রহের নির্দেশ দিলেন। সীমান্তের দিকে মিশর ইও সৈন্যরা অগ্রসর হচ্ছে। পারসিক সৈন্যরা হাজার হাজার বিড়াল ছেড়ে দিল। এদিক ওদিক ছোটাছুটি করা ভয়ার্ত বিড়ালের ক্ষতি হবে ভেবে মিশর ইও সৈন্যরা রণাঙ্গন ছেড়ে চলে গেল। মিশর পারস্যের অধিকৃত হয়ে যায়।
রা ছিলেন প্রাচীন মিশর এ উচ্চতম সূর্যদেব- প্রথমদিকে সে দেবতারও ছিল বেড়াল-মূর্তি। রা-এর এক ভয়ালদর্শন সিংহমস্তক কন্যার নাম শেকহমেট। রা-এর বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহ করত শেকহমেট তাদের সমূলে ধ্বংস করতেন। এই শেকহমেট-এরই ছোট বোন বাস্ট। ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বে দেবী বাস্টকে সিংহমস্তক হিসেবে চিহ্নিত করা গেছে। পরে অবশ্য দেবী পরিপূর্ণ বিড়ালের রূপ ধারণ করেন এবং গৃহপালিত বিড়াল দেবী বাস্ট-এর পবিত্র প্রতীক হয়ে ওঠে। বিড়াল দেবী বাস্ট লেডি অভ দ্য ইস্ট নামে পরিচিত ছিলেন। অপরদিকে শেকহমেট পরিচিত ছিলেন লেডি অভ দ্য ওয়েস্ট নামে। প্রাচীন মিশর এর বুবাসটিস নগরে দেবী বাস্ট-এর প্রধান উপাসনালয় ছিল। বুবাসটিস নগরী ৯৫০ খ্রিস্টপূর্ব নাগাদ মিশর এর রাজধানী হয়ে উঠেছিল। আর বাস্ট হয়ে ওঠেন জাতীয় দেবী। সেই সঙ্গে উর্বরতার দেবী। দেবী বাস্ট বিড়ালের দেখাশোনা করতেন। সংগীত ও নৃত্যেরও দেবী ছিলেন বাস্ট। বুবাসটিসের উপাসনালয়ে পুরোহিতরা বেড়ালের দেখাশোনা করতেন। বিড়াল মারা গেলে জাঁকজমকপূর্ণ শেষকৃত্য পালন করা হত। মানুষের মতোই বিড়ালেরও মমি করা হত। মমিকৃত বিড়াল দেবী বাস্টকে উৎসর্গ করা হত।
১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে একজন মিশর ইও কৃষক বড় একটি সমাধিক্ষেত্রে অসংখ্য মমিকৃত বিড়াল ও ছানা আবিষ্কার করেন। বুবাসটিস-এ ৩০০,০০০ বিড়ালের মমি পাওয়া গেছে। কোনো কোনো মমিতে মাথায় ও ঘাড়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ধারণা করা হয়, হয়তো দেবীর উদ্দেশে বলি দেয়া হয়েছিল কিংবা বিড়ালের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল।
প্রাচীন মিশর এর সমাজজীবনে বিড়ালের স্থান ছিল অনন্য। লোকে ভাবত বিড়ালই জীবন রক্ষা করে। এ কারণে প্রাচীন মিশর এর অধিবাসীরাও বিড়ালকে সম্মানের সঙ্গে রক্ষা করত। বিড়াল মারা গেলে শোকে অভিভূত হয়ে ক্ষোভের চিহ্ন হিসেবে ভুরু চেছে ফেলত। পরবর্তীকালে বিড়াল মিশর থেকে রোমে যায়। ইঁদুর ধরে বলে রোমের অধিবাসীরা বিড়ালকে সম্মান করত এবং আদর করে ডাকত- ‘ফেলিস’। এর অর্থ, ‘মঙ্গলময় শুভ ইঙ্গিত’!
No comments:
Post a Comment