সি পি আই (এম) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক সূর্য মিশ্রের বিবৃতি
সম্প্রতি দেশের সর্বোচ্চ আদালত তাৎক্ষণিক তিন তালাককে নিষিদ্ধ করে যে নির্দেশ দিয়েছে সেই সম্পর্কে আমাদের রাজ্যের সরকার ও মুখ্যমন্ত্রীর নীরবতায় আমরা বিস্মিত। মুখ্যমন্ত্রী বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে থাকলেও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরে এক সপ্তাহ পার হয়ে গেছে, এখনো পর্যন্ত তিনি তাৎক্ষণিক তিন তালাক নিষিদ্ধ করার বিষয়ে কিছুই বলেননি। অথচ তাঁর মন্ত্রিসভারই এক সদস্য সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী প্রকাশ্যে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের বিরোধিতা করেছেন এবং তিন তালাক প্রসঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সুপ্রিম কোর্টের এক্তিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। নিজের দল ও সরকারের এই মন্ত্রীর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী কি সহমত? গত বছরের নভেম্বর মাসে কলকাতায় রানী রাসমনি রোডে একটি সভায় মুখ্যমন্ত্রী তাঁর আরেক মন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জিকে পাঠিয়ে তালাক প্রসঙ্গে প্রায় মৌলবাদীদের ভাষায় সমর্থন জানিয়েছিলেন। আমরা একথাও জেনেছি যে তাৎক্ষণিক তিন তালাকে ক্ষতিগ্রস্ত এরাজ্যের এক মুসলিম মহিলা যিনি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন, বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন অথচ নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর ঠিকানায় বারবার লিখিত আবেদন করেও নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো আশ্বাস পাচ্ছেন না। মুখ্যমন্ত্রী কেন নীরবতা ভেঙে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারছেন না? তাঁর কি সাহসের অভাব হচ্ছে?
আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে এরাজ্যের বর্তমান শাসকদল কেন্দ্রের শাসকদলের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতায় নেমেছে। ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানে শপথ নেওয়ার পরেও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কন্ঠে ‘আমরা চারদিন বিসর্জন দেবো, ওরা একদিন মহরম করবে’ এমন ধরনের উক্তি শোনা যাচ্ছে। অন্যদিকে হিন্দুত্ববাদী গোরক্ষা বাহিনীর হাতে এরাজ্যের মাটিতেও সংখ্যালঘু মানুষদের প্রাণ দিতে হচ্ছে যা অতীতে অকল্পনীয় ছিলো। এরাজ্যের সরকার ও শাসকদলের কার্যকলাপের সুবিধা নিয়ে সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে হিন্দুদের সংহত করছে হিন্দুত্ববাদী শক্তি। দুই পক্ষের বোঝাপড়ায় যে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ঘটছে তার প্রভাবে রাজনৈতিক মেরুকরণ ঘটিয়ে তারা নির্বাচনে ফায়দা তোলার জন্য নেমেছে। তাৎক্ষণিক তিন তালাক নিষিদ্ধ করে সুপ্রিম কোর্টের রায় নিয়ে এরাজ্যের সরকারের নীরবতা শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট মৌলবাদী ধারণাকেই মদত দিচ্ছে না, হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শক্তিকেও সংহত ও শক্তিসঞ্চয় করতে সাহায্য করছে, সাম্প্রদায়িক মেরুকরণে ইন্ধন যোগাচ্ছে।
আমরা তাৎক্ষণিক তিন তালাকের বিরুদ্ধে এবং নারী ও পুরুষের সমানাধিকারের পক্ষে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সেই লক্ষ্যে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে আমরা তাকে স্বাগত জানিয়েছি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুসারে এখন সেই লক্ষ্যে আইন প্রণয়ন করাটা কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব। কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা সম্পর্কে তিলমাত্র মোহ পোষণ না করেও আমরা বলতে চাই সুপ্রিম কোর্টের রায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধির পক্ষে নয়, কোনো ধর্মের বিরুদ্ধেও নয়। এই রায় সমতার পক্ষে। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে নারীপুরুষের সমানাধিকারের জন্য সংগ্রামে অবিচল থাকতে আমরা দায়বদ্ধ, সেই সংগ্রামে আমরা আছি এবং থাকবো।
আমরা একথাও মনে করি, সংঘ পরিবার এবং প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে সমতার পক্ষে নয়, তাঁরা দেশের নানা ভাষা, জাতি, ধর্মের বৈচিত্র্যকে ভেঙে হিন্দুত্বের অভিন্নতার স্টিম রোলার চালাতে চান। কিন্তু আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কী চান? এই বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর সরকারের দ্ব্যর্থহীন বিবৃতি দাবি করছি।
৩১শে আগস্ট, ২০১৭
কলকাতা

No comments:
Post a Comment