পার্ক স্ট্রিটের অভিজাত এক রেস্তরাঁর পর এবার সল্টলেকের দুর্গাপুজো। ফের প্রকট হয়ে উঠল অর্থনৈতিক বৈষম্য। পাড়ার অভিজাত বাসিন্দাদের সঙ্গে এক পঙক্তিতে খেতে বসতে দেওয়া হল না সস্তার শাড়ি পরা বাড়ির কাজের মাসিকে। অভিযোগ, পুজোর উদ্যোক্তারা সকলের সামনে রীতিমতো অপমান করেই বলেন, “মাসি—আয়াদের জন্য এখানে পুজোর ভোগ দেওয়া হয় না।” খেতে চাইলে প্যাকেটে ভোগ নিয়ে অন্য কোথাও বসে খেতে বলা হয় ওই পরিচারিকাকে।
অভিযোগের তির সল্টলেকের সি বি ব্লকের পুজোর উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় চুপ করে থাকতে পারেননি ওই এলাকার বাসিন্দা শৌভিক ঘোষ। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে শৌভিক ঘোষ জানিয়েছেন সমস্তটা। প্রতিবছরই পুজোর চাঁদা দিলে এলাকার বাসিন্দাদের খাওয়ার কুপন দেন পুজোর উদ্যোক্তারা। শৌভিকবাবুর কথায়, “ নবমীর দুপুরে বিশেষ কাজ থাকায় আমি পুজোর ভোগ খেতে যেতে পারিনি।” কুপনটা নষ্ট হবে। এই ভেবে ওই কুপন তিনি দেন বাড়ির পরিচারিকা সঞ্চিতাকে। বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে সঞ্চিতাও যান পুজোর ভোগ খেতে। কিন্তু তারপর?
বাড়ির কাজের লোক মলিন শাড়ি পড়ে অভিজাত বাসিন্দাদের সঙ্গে ভোগ খাবেন, এটা মেনে নিতে পারেননি পুজোর উদ্যোক্তারা। রীতিমতো অপমান করে চলে যেতে বলা হয় তাঁকে। শৌভিকবাবুর কথায়, “ আমাদের ওই পরিচারিকা অনেক দিনের। পুজোর দিনগুলোতেও তিনি ছুটি না নিয়ে আমাদের বাড়িতে কাজ করছেন। তাঁরও তো অধিকার রয়েছে সকলের সঙ্গে বসে ভোগ খাওয়ার। উদ্যোক্তাদের এই ব্যবহারে আমি বিস্মিত।”
এই ঘটনার পর অত্যন্ত অপমানিত বোধ করেছেন ওই পরিচারিকাও। ঘটনার পর বাড়িতে ফিরে এসে দরজা বন্ধ করেই কাঁদতে থাকেন তিনি। গোটা বিষয়ের প্রতিবাদ জানাতে পরে ক্লাবে গিয়েছিলেন শৌভিকবাবু। সেখানে গিয়েই অন্য চমক। নির্বিকার ক্লাবের কর্মকর্তারা তাঁকে নিয়মাবলির কাগজ দেখান। কী রয়েছে সেই নিয়মে? সেখানে লেখা রয়েছে আবাসিকদের যে কুপন দেওয়া হয়েছে তা কাজের মাসি অথবা আয়ারা ব্যবহার করতে পারবেন না। যদি কাজের মাসির জন্য অতিরিক্ত খাবারের প্যাকেট নিতে চান তবে আলাদা করে ১০০ টাকা দিতে হবে। এই নিয়ম দেখার পরেই চক্ষু চড়কগাছ শৌভিকবাবুর। বিব্রত মুখে তিনি কর্মকর্তাদের কাছে প্রশ্ন তুলেছেন, “পুজোয় আমি চাঁদা দিয়েছিলাম। আসতে পারব না বলে বাড়ির পরিচারিকাকে খাওয়ার কুপন দিয়েছিলাম। কিন্তু তাকে সেই কুপনে খেতে দেওয়া হল না কেন?” এ প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি কেউই। এদিকে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে এই ঘটনা দেওয়ার পরেই প্রতিবাদে ফেটে পড়েছেন সকলে। যাদবপুর থেকে জোড়াসাঁকো এমনকী ভিন রাজ্যের মানুষরাও লিখিত প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁরা লিখেছেন, “দুর্গা ঠাকুর কী শুধুমাত্র অভিজাতদের জন্য? যাঁরা পুজোয় নতুন জামাকাপড় কিনতে পারেন না। তাঁরা কী ভগবানের আশীর্বাদ পেতে পারেন না? ঘটনায় পুজো উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনে অভিযোগও জানাতে বলেছেন কেউ কেউ। ওই এলাকার এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, এই ঘটনার পর মা দুর্গা আর সল্টলেকের এই পুজোয় আসবেন না। হঠাৎ এ কথা? তাঁর কথায়, “মা-ও বুঝে গিয়েছেন, এ অঞ্চলে মানবিক মুখ নেই।”

No comments:
Post a Comment