তৃণমূল শিবির জুড়ে আতঙ্কের চোরাস্রোত। গোয়েন্দা সংস্থা সি বি আই-র সদর দপ্তরে মুকুল রায় কার বিরুদ্ধে নথি জমা দিলেন, তা নিয়েই দিনভর তৃণমূল ভবনে জল্পনা। বাড়ছে ধন্দ, শঙ্কাও।
মুকুল রায়ের সঙ্গে তৃণমূলের আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ প্রায় দোরগোড়ায়। তার আগে শাসক তৃণমূলের রাজনীতিতে সম্ভবত এই সময়ের সবচেয়ে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে বিদ্রোহী সাংসদের এক পদক্ষেপেই। তৃণমূলের তরফেও শঙ্কা, সন্দেহের মাত্রা প্রবল হয়েছে সেই পদক্ষেপেই। দুই প্রতিনিধির মাধ্যমে এই বিদ্রোহী সাংসদ কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সি বি আই-র দিল্লি দপ্তরে বেশ কিছু নথিপত্র পাঠিয়েছেন। বলাই বাহুল্য, তৃণমূলী দুর্নীতির নগ্ন চেহারাই রয়েছে সেই নথিতে। তা কার্যত সি বি আই-র হাতে যত্ন করেই তুলে দেওয়া হয়েছে।
এই খবর সামনে আসতেই শাসক তৃণমূলের অন্দরে কার্যত ঝড় বইছে। সেই নথিতে কেলেঙ্কারির কোন পর্ব লুকিয়ে আছে, কার বিরুদ্ধে রয়েছে বাড়তি তথ্য, তা নিয়েই প্রবল ধন্দ তৃণমূলের শীর্ষনেতা আর মন্ত্রীদের মধ্যে। প্রসঙ্গত, ভাইপো সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জির সঙ্গে মুকুল রায়ের শিবিরের দ্বন্দ্বও কার্যত ‘ওপেন সিক্রেট’।
দুবছর আগেই সি বি আই-র তরফে ২০১০-২০১৪সাল পর্যন্ত আয় ব্যয়ের রিপোর্ট চাওয়া হয়েছিল তৃণমূলের কাছে। প্রথমে গড়িমসি করলেও সেই রিপোর্ট পরবর্তীতে জমা দেয় তৃণমূল। ইতিমধ্যেই এই চার বছরেই হিসাবেই বিস্তর অসঙ্গতি মিলেছে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে দেখা গেছে, অনুদান খাতে তৃণমূলের আয় প্রতি বছর লাফিয়ে বেড়েছে। ২০১১-১২সালে যেখানে তৃণমূলের অডিট রিপোর্টে অনুদান বাবদ আয় দেখানো হয়েছে ১৩লক্ষ ৬৮হাজার টাকা, সেখানে ২০১২-১৩সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫লক্ষ ১৫হাজার টাকা। ঠিক তার পরের বছরই অনুদানের পরিমাণ একলাফে আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৯কোটি ৫০লক্ষ টাকা। বছরে সাড়ে ৯কোটি ‘অনুদান’! এই রহস্য মুকুল রায়ের চেয়ে আরও বেশি কে-ই বা জানে তৃণমূলের অন্দরে! যদিও পরবর্তীতে তৃণমূলের তরফে দাবি করা হয়, অনুদান নয় বেশিরভাগই ‘লোন’ হিসাবে নেওয়া হয়েছে।এমনকি ত্রিনেত্র-র হিসাবও লোন হিসাবেই দাবি করে সে সময় তৃণমূল। ত্রিনেত্র-র মতো ভুয়ো সংস্থা থেকেই প্রায় ৪কোটি ৯০লক্ষ টাকা তৃণমূলের তহবিলে ঢোকে।
আবার কলকাতায় অমিতকুমার সিং নামে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকেই শাসক তৃণমূলের তহবিলে ২কোটি ৭৫লক্ষ টাকা ঢুকেছিল। ঐ ব্যক্তিকে ইতিমধ্যেই আয়করদপ্তর জেরাও করেছে। নগদে কীভাবে এত টাকা দেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে জেরা করা হয় তাকে। এমনকি তাকে বিপুল অঙ্কের টাকা পেনাল্টিও করা হয়। ত্রিনেত্র এবং এই ব্যক্তির দেওয়া টাকা যদি ‘লোন’ হিসেবেই দাবি করে থাকে তৃণমূল, তাহলে এবার এই প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা তৃণমূলকে ফেরত দিতে হবে! অন্তত বিদ্রোহী সাংসদের জমা দেওয়া তথ্য ঘেঁটে সি বি আই-র তদন্ত প্রক্রিয়া সেদিকেই যাওয়ার কথা।
একদা মুকুল রায়ের সঙ্গে পৃথক দল করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন বিশিষ্ট চাটার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট অমিতাভ মজুমদার। তাঁর কথায়, ‘জানি না কে কী তথ্য দিয়েছে। তবে তৃণমূলের অডিট রিপোর্টে বিস্তর অসঙ্গতি রয়েছে। আরও বেশি কিছু নথিও তো সামনে আসছে। যে আর্থিক অসঙ্গতি রয়েছে তাতে কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্ত সঠিকভাবে এগলে গোটা দলের অস্তিত্বই সংকটে পড়তে পারে। এমনকি এই গুরুতর জালিয়াতির জন্য নির্বাচন কমিশন দলের প্রতীকও বাজেয়াপ্ত করতে পারে।’
কার্যত তৃণমূলের অস্তিত্বের সংকট বাড়াতে পারে এরকম তথ্যেই কী ভরেছে সেই ফাইল? দলের আর্থিক কেলেঙ্কারি থেকে একাধিক নেতার কারবার সম্পর্কেও কী জমা পড়েছে তথ্য? মমতা ব্যানার্জির ছবি বিক্রি করার অনেক রহস্যের জবাব কী রয়েছে প্রতিনিধির মাধ্যমে দিল্লিতে সি বি আই দপ্তরে পাঠানো সেই ফাইলে, যা তৃণমূলের রক্তচাপ দ্বিগুণ করেছে? যদিও তৃণমূলের তরফে পার্থ চ্যাটার্জি ছাড়া কোনও নেতা এখনও পর্যন্ত মুখ খোলেননি। এমনকি সি বি আই দপ্তরে নথি পাঠানোর বিষয়েও কেউ কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে তৃণমূল শিবিরের কৌতূহল, চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি নিয়ে কী কোনও গোপন নথিপত্র কী জমা দিয়েছেন বিদ্রোহী সাংসদ? সারদা থেকে রোজভ্যালি, কোটি কোটি টাকার চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি একাধিক চিত্রনাট্য এই বিদ্রোহী সাংসদের সামনেই রচিত হয়েছে। দুই চিট ফান্ড সংস্থার মালিকের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর গোপন বৈঠকের একমাত্র সাক্ষীও এই সাংসদ। সেই সম্পর্কিত কোন নতুন তথ্য তাহলে জমা পড়লো কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার দপ্তরে, যা নতুন করে চিট ফান্ড কেলেঙ্কারির তদন্তের গতি বাড়াতে পারে?
আনুষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার তরফে এবিষয়ে মুখ খোলা হয়নি। তবে তদন্তকারী সংস্থার একটি সূত্রের দাবি, ইতিমধ্যে আয়কর দপ্তর তৃণমূলের কাছে নোটিস পৌঁছেছে। তাতে প্রায় ২৪কোটি টাকার খরচের হিসাব চেপে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সেই ঘোটালার অনেক উত্তর এবার মিলতে পারে।’
২০১৩-১৪সালে শুধু পাঞ্জাবেই লোকসভা ভোটের আগে পতাকা কিনতেই নাকি তৃণমূল কংগ্রেস খরচ করেছিল ২কোটি টাকা! আয়কর দপ্তরের দাবি, হেলিকপ্টার চড়ার পিছনেই তৃণমূলের তরফে ১৫কোটি ৪৩লক্ষ ৪৯হাজার ৮৫৫টাকা খরচ করা হয়েছে! পবনহংস ও এয়ার কিং চার্টার— এই দুই সংস্থার কাছ থেকে হেলিকপ্টার ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। যে পরিমাণ টাকা মেটানো হয়েছিল তারমধ্যে আবার ১০লক্ষ টাকা একেবারে নগদে দেওয়া হয়! যদিও এত বড় আর্থিক লেনেদেনের কোনও বিষয়ই অডিট রিপোর্টে উল্লেখ করেনি মমতা ব্যানার্জির দল। সেই গুরুতর অসঙ্গতির হিসাবও মিলতে পারে বৃহস্পতিবার সি বি আই দপ্তরে জমা হওয়া নথিতে।
তৃণমূলের অভ্যন্তরে আর্থিক কেলেঙ্কারি, অসঙ্গতির পাশাপাশি চিট ফান্ডকাণ্ড— তৃণমূলের দুর্নীতির অপ্রকাশিত অনেক চিত্র-ই কী এবার ফাইলবন্দি হয়ে একদা ‘সেনাপতি’র কাছ থেকে পৌঁছাল সি বি আই দপ্তরে? হিসাব মেলাতেই গলদঘর্ম শাসক শিবির।
সুত্র : গণশক্তি

No comments:
Post a Comment