হিন্দুদের পুজিত দেব দেবীর প্রতিমা তৈরির কাজ করেই বংশ পরম্পরাই সংসার চলছে নাড়াজোলের এক মুসলীম পরিবার। হিন্দু মুসলীম ছুতমার্গ ভুলে এই এলাকা এখন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নজির গড়েছে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বড় উদাহরন পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার দাসপুর থানার নাড়াজোল গ্রামের ইসমাইল চিত্রকর। বয়স ৫৯, স্ত্রী আয়রন চিত্রকর ও পাঁচ মেয়ে, চার ছেলেকে নিয়ে এক চিলতে টিনের ছাউনি দেওয়া ভাঙ্গাচোরা মাটির বাড়িতে বসবাস। জমি জায়গা কিছুই নেই। বাসস্থানটুকই সম্বল।এহেন মুসলিম পরিবারের হাতের তৈরী হিন্দু দেব দেবীর প্রতিমা পূজিত হয় হিন্দুদের পুজোতে। দূর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কালী সব রকম প্রতিমাই গড়েন ইসমাইল চিত্রকর। বংশ পরম্পরাই নাকি চলে আসছে ভিন ধর্মের প্রতিমা গড়ার কাজ। বাপ ঠাকুরদার সেই পথ অনুসরন করে ১২ বছর বয়স থেকেই প্রতিমা তৈরীতে হাত লাগান।উল্লেখযোগ্য কোনও কারন নেই, নিছকই রুজির টানে এই পেশায়। তবে নাড়াজোল রাজার আমলে ইসমাইলবাবুর পূর্ব পুরুষেরা রাজ বাড়ির অন্দর মহলে পটচিত্র আঁকার ডাক পেয়েছিলেন। পটশিল্পী হিসেবে পরিচিত লাভ করেছিল ওনার পূর্ব পুরুষরা।ইসমাইল বাবুও পট শিল্প ধরে রেখেছেন। এখনও পটচিত্র তৈরী করেন। কিন্তু তা দিয়ে সংসার চলেনা, রোজগার কম। পটের চাহিদা নেই বললেই চলে। হাতের কারুকার্জ ফুটিয়ে তুলার চিন্তাভাবনা নেন একজন প্রতিমা শিল্পী রুপে। হিন্দুদের প্রায় সমস্ত দেবদেবীর প্রতিমা গড়ে এলাকায় পরিচিতি লাভও করেছেন। সামনেই কালী পূজো। তাই নাওয়া খাওয়ার সময় নেই ইসমাইল বাবু ও তার পরিবারের।ইসমাইল বাবুর হাতে গড়া প্রতিমার চাহিদাও অনেক।এথেকেই সংসার চলে। প্রতিমা গড়েই পাঁচ মেয়ের মধ্যে তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। তাই একাজে হাত লাগিয়ে ইসমাইলবাবুকে সাহায্য করেন ওনার স্ত্রী আয়রন চিত্রকর, দুই মেয়ে হাসেম, আসপিয়া। ছেলেরাও একই কাজে যুক্ত। এক কথাই পুরো পরিবার প্রতিমা গড়ার কাজ করেন। রাজ্য একের পর এক সাম্প্রদায়িক হানাহানির ঘটনা যেখানে ঘটছে, সেখানে দাসপুরের নাড়াজোলের ইসমাইল চিত্রকর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতিক। মুসলমান পরিবারের হাতে গড়া হিন্দু ধর্মের কালী প্রতিমা কিনতে বা পূজো করতে কোনও দ্বিধা নেই মানুষের। এক দিনে বাড়ির দালানে যখন বিকেলের নামাজ পড়ছে স্ত্রী আয়রন চিত্রকর ঠিক উল্টোদিকেই প্রতিমা তৈরীতে ব্যস্ত ছোট মেয়ে আসপিয়া।৪০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা নানান দামের প্রতিমা বিক্রি হয় ইসমাইল বাবুর কাছে।প্রস্তুতি চলছে জোর কদমে।ক্রেতাদের কেউ খোঁজ নিয়ে যাচ্ছেন আর কতটা বাকি আবার কেউ পয়সা দিয়ে পছন্দ মতো কালী প্রতিমা বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন।ইসমাইলবাবুর কথায় এখানে আমরা হিন্দু মুসলমান ভাই ভাই, কোনও বিভেদ নাই।আমাদের উৎসবে ওরাও সামিল হয় ওদের উৎসবে আমরা। আর আমার তৈরী প্রতিমার চাহিদাও খারাপ না।সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা হিসাবে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার দাসপুরের নাড়াজোল অনুঘটকের কাজ করবে।

No comments:
Post a Comment