বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁর সঙ্গে সহবাস করার অভিযোগে রাজ্যসভার সাংসদ ঋতব্রত ব্যানার্জির বিরুদ্ধে বালুরঘাট থানায় এফআইআর দায়ের করলেন সেখানকার বাসিন্দা নম্রতা দত্ত। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি গত কয়েকদিন যে সমস্ত অভিযোগ করেছেন, সেগুলিই মঙ্গলবার তিনি থানায় লিখিত আকারে জানিয়েছেন। বাড়তির মধ্যে বলেছেন, তিনি ঋতব্রতর সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঋতব্রত তাঁকে ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করার ভয় দেখান। ফলে ‘বাধ্য হয়ে’ তাঁকে ওই সম্পর্কে থাকতে হয়েছিল।
নম্রতার অভিযোগের কোনও জবাব ঋতব্রত এদিন দেননি। তিনি শুধু বলেছেন, ‘আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ না–করে আমি এ ব্যাপারে কোনও মন্তব্য করব না।’ তবে জানা গেছে, ঋতব্রত আগাম জামিনের আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রসঙ্গত, ঋতব্রত আগেই নম্রতার বিরুদ্ধে তাঁকে ‘হেনস্থা করা’ এবং ‘চাপ দিয়ে টাকা আদায়’ করার অভিযোগ করেছেন। ৬ অক্টোবর গড়ফা থানায় দায়ের–করা সেই অভিযোগটি নিয়েও তদন্ত শুরু করেছে কলকাতা পুলিসের গুন্ডাদমন শাখা। তাদের তরফে ঋতব্রতর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়েছে। ওই অভিযোগের তদন্তের কাজে ঋতব্রতের বাড়িতেও গিয়েছিল পুলিস। কিন্তু তিনি কলকাতার বাইরে থাকায় তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারেনি। যথাশীঘ্র লালবাজারে যোগাযোগ করতে বলে তাঁর বাড়িতে পুলিসের তরফে বার্তা পাঠানো হয়েছে বলে লালবাজার সূত্রের খবর।
ঘটনাপরম্পরা বলছে, ৪ অক্টোবর নম্রতা প্রথম বালুরঘাট থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে পুলিস তাঁর অভিযোগ নেয়নি। তাঁকে বলা হয়েছিল, দিল্লিতে অভিযোগ করতে। কারণ, ঋতব্রত সংসদের সদস্য। এবং ঘটনাও ঘটেছিল দিল্লিতেই। নম্রতা জানান, এরপরেই তিনি ৬ অক্টোবর মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির কাছে ই–মেল করে জানান, পুলিস তাঁর অভিযোগ নিচ্ছে না। তাই তিনি তাঁর সাহায্যপ্রার্থী। সেই ই–মেলে এমনও লেখা হয়, তাঁকে সাহায্য না–করা হলে তাঁর আত্মহত্যা করা ছাড়া কোনও উপায় থাকবে না।
শেষপর্যন্ত এদিন বালুরঘাট থানায় নম্রতা এফআইআর করতে যান। পুলিস তাঁর অভিযোগ নথিভুক্ত করে। নম্রতার এফআইআরের বয়ানে দেখা যাচ্ছে, মুখ্যমন্ত্রীকে লেখা ই–মেলটিই সামান্য অদলবদল করে সেটি পুলিসে জমা দেওয়া হয়েছে। যা জানিয়েছেন নম্রতা নিজেও। আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো না–হলেও পুলিস সূত্রের খবর, বালুরঘাট থানা বিষয়টি দিল্লি পুলিসের কাছে পাঠাচ্ছে। কারণ, প্রথমত, ঋতব্রত সাংসদ। দ্বিতীয়ত, নম্রতা যে সহবাসের অভিযোগ করেছেন, তাঁর দাবি অনুযায়ী, তা ঘটেছিল দিল্লির সাউথ অ্যাভিনিউয়ে ঋতব্রতর ফ্ল্যাটে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে বিষয়টি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের আওতায় পড়ে। কারণ, দিল্লি পুলিস কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অধীন। অতএব, এক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের করণীয় বিশেষ কিছু থাকবে না। সেই সূত্রেই ঋতব্রতর পরবর্তী ‘রাজনৈতিক পদক্ষেপ’ কী হয়, তা নিয়েও যথেষ্ট কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
পুলিসে দায়ের–করা এফআইআরে নম্রতা লিখেছেন, ২০১৬ সালের মে মাসে তাঁর সঙ্গে টুইটারে ঋতব্রতর আলাপ। তৎকালীন সিপিএম সাংসদ তাঁর প্রতি প্রেম ব্যক্ত করে তাঁকে বিয়ে করতে চান। তিনি বালুরঘাটে গিয়ে নম্রতার মায়ের সঙ্গেও দেখা করেন। তারপর ঋতব্রত নম্রতাকে তাঁর দিল্লির ফ্ল্যাটে যেতে বলেন। নম্রতার কথায়, ‘ও আমাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এখন ও সেটা পুরোপুরি অস্বীকার করছে। ও আমাকে দিল্লি যাওয়ার টিকিট পাঠিয়েছিল। আমাকে রিসিভও করতে এসেছিল। ও–ই আমাকে ওর সাউথ অ্যাভিনিউয়ের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায়। সেখানেই আমাদের শারীরিক সম্পর্ক হয়।’ নম্রতার আরও দাবি, তিনি নেদারল্যান্ডসে থাকাকালীন ঋতব্রত সেখানে গিয়েছিলেন। সেই ব্যয়ও নম্রতাই বহন করেছেন। নম্রতার বক্তব্য, ‘যে অ্যাপ্লের হাতঘড়ি নিয়ে এত বিতর্ক, সেটাও আমিই ওকে উপহার দিই। ও আমায় ব্যবহার করেছে!’ তাঁদের মধ্যে মোট ১৯ বার শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল বলেও নম্রতার দাবি।
এফআইআরে নম্রতা লিখেছেন, ‘আমাদের এক বছরে বহুবার দেখা হয়েছে। আমার কাছে তার ছবিও রয়েছে। উনি ডিসেম্বরে নেদারল্যান্ডসে গিয়েছিলেন। তারপরে আমাদের মধ্যে সমস্যা হয় এবং আমি সম্পর্ক শেষ করতে চাই। কিন্তু উনি আমায় হুমকি দিয়ে বলেন, ভারত সরকারের থেকে–পাওয়া ১৮০টি ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করবেন। ফলে আমি ওই সম্পর্কে থাকতে বাধ্য হই।’
নম্রতার লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, এখন ঋতব্রত তাঁর বান্ধবী দূর্বা সেনের সঙ্গে রয়েছেন। তাই তিনি আর নম্রতাকে বিয়ে করতে চাইছেন না। এখন ঋতব্রত তাঁর ফোনও ধরছেন না। তাঁকে প্রাণনাশের হুমকিও দিচ্ছেন। এফআইআরের বয়ান বলছে, ‘উনি আমাকে মুখ না–খোলা, সংবাদ মাধ্যমের কাছে না–যাওয়া এবং আমাদের সম্পর্ক প্রকাশ্যে না–আনার জন্য ৫০ লক্ষ টাকা ঘুষ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।...উনি শারীরিক সম্পর্কের ক্ষতিপূরণ হিসেবে আমার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমাও দেন।’
প্রসঙ্গত, ঋতব্রত আবার তাঁর এফআইআরে লিখেছিলেন, নম্রতা তাঁর কাছে লিখিতভাবে ৫০ লক্ষ টাকা দাবি করেছেন। যার উদ্দেশ্য ‘ব্ল্যাকমেল’। তার ‘স্ক্রিনশট‘ও তিনি নিয়ে রেখেছেন।
এদিন নম্রতা আবার অভিযোগ করেছেন, ঋতব্রতর বান্ধবী দূর্বা তাঁকে হুমকি দিয়েছেন। নম্রতার কথায়, ‘গত অক্টোবরে আমি ফেসবুকে একটি মেসেজ পাই। যাতে দূর্বা লেখেন, তিনি ঋতব্রতর প্রেমিকা। আমি যেন ঋতব্রতর জীবনে না–থাকি। সেটি আমি ঋতব্রতকে দেখাই। তখন ও বলে, দূর্বা একজন হাই–সোসাইটি গার্ল।’ কিন্তু দূর্বা কি তাঁকে ফোনে হুমকি দিয়েছেন? নম্রতার দাবি, দিয়েছেন। তাঁর দাবি, ‘ও আমায় ফোন করে বলেছে, আমায় ওর রেপ বা মার্ডার করাতে বেশি সময় লাগবে না!’ যা শুনে দূর্বার বক্তব্য, ‘আমি ওঁর সঙ্গে একবারই ফোনে কথা বলেছি। যখন আমি ওকে বলেছিলাম, আপনি পুলিসে যান। এর বেশি আমার সঙ্গে ওঁর কোনও কথা হয়নি। এটা আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি। হুমকি দেওয়া তো অনেক দূরের কথা! বরং উনিই আমায় হোয়াট্সঅ্যাপে নোংরা ভাষায় গালিগালাজ করেছেন। আমি তার স্ক্রিনশট নিয়ে রেখেছি। প্রয়োজনে দেখাতেও পারি!’
সিপিএমের বহিষ্কৃত সাংসদ ঋতব্রত ব্যানার্জির বিরুদ্ধে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাস কাণ্ড নতুন মোড় নিল। অভিযোগকারী তরুণী নম্রতা দত্ত প্রকাশ্যে জানালেন, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দিনের পর দিন আমার সঙ্গে সহবাস করেছে ও। এখন অস্বীকার করছে। তাঁর কথায়, ২০১৬ সালে আমাদের প্রথম দেখা হয়। দিল্লিতে ওঁর ফ্লাটে দেখার করার জন্য আমাকে টিকিট পাঠায়। আমাকে নিতেও আসে। সেদিনই প্রথম শারিরীক সম্পর্ক হয়। ওর আরও গার্লফেন্ড আছে তা জানতাম না। কেবল জানতাম ওঁর বিবাহ বিচ্ছেদ মামলা চলছে। টুইটারে তরুণী যে কথা জানিয়েছিলেন মঙ্গলবার তিনি আবার সেই অভিযোগ করে বলেছেন, ঋতব্রতর হাতে যে অ্যাপল ঘড়ি রয়েছে তা তাঁরই দেওয়া। এই নিয়ে থানায় অভিযোগ করেছেন বালুরঘাটের তরুণী। আড়াই লক্ষ টাকা দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর দাবি, ঋতব্রতের স্ত্রী দুর্বা সেনও নাকি তাঁকে বলেছে, তাঁর সঙ্গে তৃণমূল নেতাদের জানাশোনা আছে। বিষয়টি নিয়ে থেমে না গেলে, তাঁকে রেপ করা হবে। ঋতব্রত সোমবার দাবি করেছেন, ৫০ লক্ষ টাকা না দিলে তাঁকে ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হয়। পুরো ব্যাপারে ঋতব্রতর পাশে দাঁড়িয়েছেন তাঁর স্ত্রী দূর্বা সেন। তিনি বলেছেন, তরুণীর অভিযোগ হাস্যকর। আমার এত ক্ষমতা আছে জানতাম না। আমি যে কাউকে রেপ করাতে পারি ভাবতেই পারছি না।
তৃণমূলের সঙ্গে বুধবার সব সম্পর্ক ছিন্ন করতে চলেছেন সাসপেন্ডেড সাংসদ মুকুল রায়। সূত্রের খবর, বুধবার সাংবাদিক বৈঠক করে দল ছাড়বেন একদা তৃণমূলের চাণক্য। এবার তাঁর গন্তব্য কোথায়, তা নিয়ে কিন্তু জল্পনা অব্যাহত। বিজেপি, কংগ্রেস নাকি নিজের নয়া দল? ঠিক কোন নৌকায় পা দিয়ে চলবেন মুকুল তা কিন্তু যথেষ্ট ধোঁয়াশাময়।
সম্প্রতি বিজেপি ও কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বর সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। বিজেপির শীর্ষনেতা কৈলাস বিজয়বর্গীয় তো তাঁর সঙ্গে বৈঠক করার পর একসঙ্গে ছবিও টুইট করেছেন। যদিও বৈঠকের নির্যাস নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছেন। অন্যদিকে, মঙ্গলবার প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, রাহুল গান্ধীর আপত্তিতেই মুকুলকে দলে নেওয়া হচ্ছে না। তবে কী কংগ্রেসের কাছে আঙুর ফল টক? হাওয়ায় এমনই কথা ঘুরছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, মুকুলের সঙ্গে দর কষাকষিতে সুবিধা করেত না পেরে এমন কথা বলেছেন অধীর। অন্যদিকে, কিছুদিন আগে দিলীপ ঘোষের মন্তব্যে নয়া জল্পনা তৈরি হয়েছিল। নারদ কাণ্ডে মুকুলকে প্রায় ক্লিনচিটই দিয়ে দিয়েছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি। আবার একইসঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর প্রশংসা করে এক ঢিলে দুই পাখি মারার চেষ্টাও করেছিলেন তিনি। কিন্তু এসবের মধ্যেও সবার নজর বুধবারের মুকুল রায়ের সাংবাদিক বৈঠকের দিকেই। নাটকের শেষ অঙ্ক তো সেখানেই হবে। তারপরই হবে মুকুল নাটকের যবনিকা পতন।
তবে হাল ছাড়তে রাজি নয় তৃণমূলও। অন্তত বিদায়বেলায় মুকুলকে কটাক্ষ করতে ছাড়ছেন না দলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়। এদিন যেমন বলেছেন, ‘দিল্লি কা লাড্ডু খেতে গিয়েছিল। খাওয়ার পর পেট ঠিক থাকে না খারাপ হয় দেখার।’ মুকুলকে নিয়ে তাঁর মাথা ব্যাথা নেই সে কথা আগেই জানিয়েছিলেন তিনি। মুকুল দলের লোকদের ভাঙিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন এই অভিযোগেও সরব হয়েছেন পার্থ। রীতিমতো ‘কাঁচড়াপাড়া বয়’ বলে মুকুলকে কটাক্ষ করেছেন রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী।
কিন্তু এসবের মধ্যেও অবিচল মুকুল। সংবাদমাধ্যমের যখন তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ জানতে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে, তখনও মচকাবেন না স্থির করে নিয়েছেন মুকুল। সঠিক সময়ে বোমা ফাটানোর মতো করেই কটাক্ষের উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘এর জবাব কাল দেব।’ বোঝাই যাচ্ছে, চাণক্য অন্য খেলার ঘুঁটি সাজাচ্ছেন।

No comments:
Post a Comment