সিদ্ধির সাথে প্রবৃদ্ধি নিয়ে গঞ্জিকা সেবনের কথকতায় বাউল তথ্য
– হাসান আহমেদ চিশতী
গাঁজাখোর কথাটা শুনতে খারাপ শোনায়। এমনকি গালাগালি কিংবা নেতিবাচক অর্থেও এর ব্যবহারের ব্যাপকতা রয়েছে। যদিও গাঁজা একটি ভেষজ উপাদানের সবুজ বৃক্ষ বলা যায়। হোমিওপ্যাথী চিকিৎসায় যার গুণাগুণ অতুলনীয়। তবু তার নিরগুণকে উপলক্ষ করেই কতিপয়ের অপব্যাবহার, অপপ্রচারে বন্ধ হয়ে গেছে আইন করে। অথচ এই গাঁজার প্রকৃত নাম হল সিদ্ধি, যাহা সাধু সন্তদের কথায় পাওয়া যায়-‘সিদ্ধ পুরুষ মাত্রই সিদ্ধির খোরাক অত্যাবশ্যক’। তাই বাউল ফকিররা বলেছে যে, প্রকৃতির অপার লিলায় গঞ্জিকা বৃক্ষের জন্ম হয় সেই মাটিতে যেখানে সিদ্ধ পুরুষ এসে আশ্রয় নেবে তার অনন্ত ক্ষুধা নিবৃত্তির খোরাকিতে। যে বা যারা প্রকৃতির এই বৃক্ষ নিধন করে পাহারায় রাখে তারাতো প্রকৃতির সাথেই বিরোধীতা করল আর সাধু সন্তদের খোরাক তুলে দিল। তাইতো দিল কোলিজায় আঘাত পেয়ে সাধু সন্তরা স্থান পরিবর্তন করে আর দেশান্তরিত হয়ে বিদেশ বিভুঁইয়ে চলে যায়। এক সাধুতো বলেই ফেললো- –‘একতারা হাতে মাটির গান গাইতে গাইতে নিজের বাপ-দাদার ভিটে বছরে একবার দেখতে আসি ঠিকই কিন্তুু নিজের খোরাক নাই বলে ফিরে যেতে হয় অন্যত্র।
এখানে সাধুসন্ত তাদের খোরাক পায়না বলে সাধারনের খোরাকে আগুন লেগেছে । বাজার দরে দ্রব্য মূল্য সবাইকে যাতনায় রাখছে। এ বড় অভিশাপ, সহজে থামবে না। এর পরও কি গঞ্জিকা সেবন বন্ধ হয়ে যাবে, না কি বন্ধ করা যাবে ?- এ কথায় বাউল সাধুর উত্তর হল ‘একমাত্র গোঞ্জিকা সেবনেই বায়ু শুদ্ধ আর সুরের মায়া তৈরী হয়। এই মায়াতেই পৃথিবী টিকে আছে। যদি সাধু সন্তরা দেশ ছেড়ে চলে যায় তাহলে সেখানে বিপর্যয় বাসা বাঁধে। তাইতো সাধু সন্তুরা দলে দলে এদেশে প্রতি বছর তাদের নানা আস্তানায় জড়ো হয়ে গঞ্জিকা সেবন করে সিদ্ধি প্রাপ্তির আলো আর মায়া ছড়িয়ে যায়।’ আমরা দেখেছি বিশেষ করে উত্তর জন পদের বগুড়ার মহাস্থান গড়ে, সোলেমান শাহর পদ্মা বিধৌত অঞ্চলে, কুষ্টিয়া ভেরামারার লালন শাহ, ঘোড়াশাহর মাজার প্রাঙ্গনে ব্যপক গঞ্জিকা সেবী সাধু-সন্ত বাউলের দর্শনীয় পদচারণা। এরা চায়না কোন বিত্ত বৈভব আর জীবন জীবিকার প্রাচুর্য্য।
ইহজাগতিক মোহমায়ায় তারা মহাবিষ্ট নয়। তাই শুষ্ক পত্র-পলবের বৃক্ষ জাতীয় গঞ্জিকায় অগ্নি সংযোগ করে ধূম্র জাতীয় আহার গ্রহণ করে প্রকৃতির একান্ত সান্নিধ্যে সিদ্ধি লাভ করে যোগ মায়ায় লিপ্ত হতে থাকে। বিধির অপার লীলায় লয় হতে হলে যে সুরের মায়া লাগে তার সুতো নাকি সিদ্ধির সাথে বাঁধা আছে। সে কারনেই হয়তো অনেক শিল্পী, সাধক, গায়ক, মাধব, মোহন্ত, শিক্ষক এমনকি ধ্যানত ঃ অধ্যাবসয়ী ছাত্রও একাগ্র চিত্তের সাধনায় সিদ্ধির আশ্রয়ে লালিত হয়ে থাকে বলে অতি গোপন তথ্য মূলে জানা যায়। কেননা শ্রদ্ধার সাথে সিদ্ধির সংগ নাকি বড়ই উপাদেয়। আমাদের নওগা অঞ্চলে এর চাষ হলে বিপুল পরিমান রাজস্ব আয় হত আর চাষীও সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারতো। সেই গাঁজার চাষ বন্ধ হয়েছে ঠিকই কিন্তু গঞ্জিকা সেবন বন্ধ হয় নাই। তাই বলতে হয় অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ হয়?
সে তো প্রাকৃতিক এবং তার সাথে অতি প্রাকৃত রুপের সমাহার স্বরুপে বেষ্টিত। তা না হলে কুমার পালেরা যতœ করে গোঞ্জিকা সেবনের জন্য মোহন বাঁশীা মতো করে ‘কল্কে নির্মান করতো না । মৃৎ শিল্পের এক বিশেষ উপাদান হিসেবে শিল্পরূপে গঞ্জিকা সেবনের কল্কে দেখা যায় নানা প্রকৃতির। এর সাথে গঞ্জিকা কর্তনের জন্য যে কাঠের টুকরো ব্যহার করা হয় তার নাম প্রেমতক্তি এবং সে অস্ত্র দ্বারা গঞ্জিকা কর্তন করা হয় তার নাম প্রেম কাটারী। বড়ই মায়াবী মাধুর্যে গঞ্জিকা সেবনের সরঞ্জামকে স্মরন করা হয়। এমন কি শিব দেবতার প্রসন্ন প্রশস্তি গাঁথার উপাখ্যানে সিদ্ধির সাথে কল্কের বিচিত্রতা নাকি ভিন্ন রকমের। তান্ত্রিক সাহিত্যে সিদ্ধির গোপন সুত্রতা আছে বলে কবি সাহিত্যিক শিল্পীসহ বিশ্ববিদ্যালয় চত্তরেও এর সাধন মার্গের চড়াই উৎরাই নিয়ে বিশেষ চর্চা চালু আছে অতিব সন্তর্পনে নিরবে নিভৃতিতে।
আবার আমাদের গ্রাম বাংলায় দেখা যায যে, গৃহল²ি গো-ছাগলের গলায় বহু বহু ব্যবহৃত পুরাতন কল্কি ব্যবহার করে নিশ্চিন্ত হন কর্ত। কারণ, এই কল্কের কৃপায় সিদ্ধ পুরুষের নজর থাকে বলে কোন অপশক্তিই তার আর ক্ষতি করতে পারে না। বিধায় গৃহস্থের আয়- উন্নয়ন বাড়ে। গঞ্জিকা সেবনের কথকথায় বাউল তথ্য অনেক। যার আঙ্গিক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অনেক লেখক তাদের ভিন্ন ভিন্নরুপে বর্ণনা দিয়েছেন। যেমন শরৎ সাহিত্যে শ্রীকান্তের সেই ইন্দনাথকে দিয়ে লেখক রীতিমত চাঞ্চল্য তৈরী করেছেন গঞ্জিকা সেবনের রুপ বর্ণনায়। আবার মঠ বা আশ্রমে যে সমস্ত গৃহত্যাগী বা যোগী সাধুদের পদচরনা আছে তাদের প্রকৃত রুপ বর্ণনা করতে গেলে গঞ্জিকা সেবনের সাথে দুগ্ধ যে কতটা গুনবাচক ভুমিকা রাখে সে সম্পর্কে আলোকপাত নাই বা করলাম। তবে সে যাই হোক যোগ উপযোগ মিলিয়ে গঞ্জিকা যে এক যুগান্তকারী ভেজষ উপাদানের মহাত্মে ঠাঁই করে নিয়েছে স্বর্ণ আসনে তা অনস্বীকার্য। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো ভদ্র বেশে সাধারনের ভেতর অনেককেই সিগারেটের মতো গাঁজার স্টিক টানতে দেখা যায় চিত্তের প্রবৃদ্ধি সাধনের প্রত্যাশায়। আবার তখনি মনে হয় সেই বিশিষ্ট শিল্পী কিশোর কুমারের গান “এক টানেতে যেমন তেমন দুই টানেতে —- রাজা”।
হাসান আহমেদ চিশতী
লেখক ও প্রাবন্ধিক
ঈশ্বরদী, পাবনা।বাংলাদেশ।
সেলঃ ০১৭৩৪-২৮৫৬২০

No comments:
Post a Comment