১৮৯৮ সালের শেষ দিকে প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ব্রাহ্মসমাজে ‘শিক্ষা’ বিষয়ে বক্তৃতা দিতেন নিবেদিতা। সেখানে ব্রাহ্মসমাজের শিক্ষিতা মেয়েদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের ভাইঝি ইন্দিরা দেবী ও ভাগনি সরলা দেবীর সঙ্গে বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর বোন লাবণ্যপ্রভাও যেতেন। জগদীশ্চন্দ্র নিজের বোনের কাছ থেকে নিবেদিতা সম্পর্কে শুনেছিলেন। সেই সময় স্বামী বিবেকানন্দের আরো দুজন বিদেশী শিষ্যা – মিসেস সারা বুল ও মিস ম্যাকলাউড ভারতভ্রমণ করছিলেন। নিবেদিতার মতো এরা তাদের সবকিছু ত্যাগ করে একেবারে চলে আসেননি, তবে স্বামীজির জন্য এঁদের টানও অফুরন্ত। এই ১৮৯৮ এর ডিসেম্বরে আমেরিকান দূতাবাসে নতুন ব্রাহ্মবন্ধুদের আমন্ত্রণ করে একটা পার্টিতে নিবেদিতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন সারা বুল। সেদিন মুখোমুখি আলাপ হয় নিবেদিতার সাথে জগদীশচন্দ্রের।
প্রথম আলাপেই নিবেদিতার মনে হতে থাকে এই মানুষটার সাথে তার মনের অনেক মিল। নিবেদিতার বয়স তখন ৩১ আর জগদীশের ৪০। কালক্রমে সেই পরিচয় পরিণত হয় বন্ধুত্বে। এক ব্যতিক্রমী বন্ধুত্ব ছিল জগদীশ ও নিবেদিতার। জগদীশচন্দ্রের বিজ্ঞান-প্রতিভা দেখে নিবেদিতা মুগ্ধ হন। তিনি বুঝতে পারেন পরাধীন ভারতবর্ষের প্রেক্ষিতে জগদীশচন্দ্রের গবেষণার গুরুত্ব অসীম। অবলা বসুর সাথেও বেশ ঘনিষ্ঠতা হয় নিবেদিতার। অবলা শিক্ষিতা, সমাজ-সচেতন, স্ত্রী-শিক্ষার উন্নতির জন্য প্রচুর কাজ করছেন দেখে খুবই ভালো লাগে নিবেদিতার। সময় সুযোগ পেলেই তিনি জগদীশের বাড়িতে গিয়ে অবলা ও জগদীশের সাথে কথা বলেন। উৎসাহ দেন জগদীশের বিজ্ঞানচর্চায়। কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান থেকে ‘রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের নিবেদিতা’ এই আইরিশ ভদ্রমহিলার সঙ্গে ব্রাহ্মধর্মে বিশ্বাসী বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্রের বিশ্বাসের কোন মিল ছিল না। তাছাড়া জগদীশচন্দ্র এমন গোঁয়ার, বদমেজাজী এবং ঠোঁটকাটা যে কোন আলগা ভদ্রতার ধার ধারতেন না। এদিকে নিবেদিতাও ছেড়ে কথা কইবার মানুষ নন। তাই দু’জনই অকপট যে কোন ব্যাপারে। ব্যক্তিত্বের সংঘাত হয়, অথচ এই দুই প্রবল ব্যক্তিত্ব কীভাবে কাছাকাছি এলেন, তা বড়ই আশ্চর্য্যের!
ভারতের গ্রীষ্মপ্রধান আবহাওয়ায় অতিরিক্ত পরিশ্রম করার ফলে কয়েক বছরের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়েন নিবেদিতা। ১৯১১ সালে হাওয়া বদলের জন্য জগদীশচন্দ্র বসু ও তাঁর স্ত্রী লেডি অবলা বসুর সঙ্গে দার্জিলিঙে চলে আসেন। কিন্তু স্বাস্থ্য ভালো হলো না তাতেও। ডাক্তার নীলরতন সরকার সেসময় ছিলেন দার্জিলিং এ। তিনি বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে চিকিৎসা শুরু করলেন। নিবেদিতা বুঝতে পারছিলেন শেষ সময় চলে আসছে। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটছিল প্রতিদিন।
৭ ই অক্টোবর, নিজের সব সম্পত্তি উইল করে লিখে দিলেন ভারতীয় মেয়েদের শিক্ষিত করে তোলার স্বপ্নে গড়ে ওঠা নিবেদিতা স্কুলের নামে, স্বামী বিবেকানন্দের বেলুড় মঠের মাধ্যমে।
এলো সেই দিন। ১৩ই অক্টোবর, ১৯১১, শুক্রবার। দার্জিলিং এর আকাশ কুয়াশা ও মেঘাচ্ছন্ন। সকাল ৭ টা। নিবেদিতার মুখ অধ্যাত্মিক সুষমায় উজ্জল হয়ে উঠল মুখ, মৃদু স্বরে বলে উঠলেন, ‘তরী ডুবছে, কিন্তু আমি সূর্যোদয় দেখব’।
তারপর সবাইকে ফাঁকি দিয়ে নিজের নিস্প্রান শরীরটিকে রেখে এ পৃথিবী ত্যাগ করলেন এই মহীয়সী মহিলা।
দার্জিলিং শহরে এ খবর ছড়িয়ে পড়ল দ্রুত। জগদীশের রয়-ভিলার সামনে হাজির হলেন দার্জিলিং বাসীরা। দার্জিলিং শহর, কোনো শবযাত্রা ঘিরে সেই প্রথম দেখল এত এত মানুষের উপস্থিতি, এই বিদেশিনীর জন্য মানুষের অফুরন্ত ভালোবাসা। বিকেল ৪ টে ১৫ তে, নিবেদিতার মুখাগ্নি সম্পন্ন করলেন রামকৃষ্ণ মিশনের ব্রহ্মচারী গনেন্দ্রনাথ। দাউ দাউ করে চিতার আগুন জ্বলে উঠল। উপস্থিত জনতার চোখ ও হৃদয় ভিজে যাচ্ছিল।
উত্তর আয়ারল্যান্ডের এক ছোট্ট শহর ডানগ্যানন জন্মানো এক বিদুষী, অধ্যাত্মিক, ভারতপ্রেমী নারীর মৃত্যু ঘটল মাত্র ৪৪ বছর বয়েসে। ১৮৯৫ খ্রীষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে, লন্ডনের এক শীতপ্রবণ সন্ধ্যায় লেডি ইসাবেলের আমন্ত্রনে এক বনেদি বাড়িতে স্বামী বিবেকানন্দ নামক এক তরুন ভারতীয় সন্ন্যাসীর বেদান্ত দর্শনের লেকচার শুনে যে তরুনী অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন, এবং নিজের ভবিষ্যত স্থির করে নিয়েছিলেন, ভারতের জন্য নিজের সব কিছু ত্যাগ করা এই মহিলার জীবন যাত্রা থেমে গেল নশ্বর এই দেহ পুড়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে।
এর ঠিক ১৪ বছর পরে, রামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠের স্বামী অভেদানন্দ, আমেরিকায় বেদান্তপ্রচার শেষে দার্জিলিং এ আসেন। উনি উদ্যোগ নিয়ে নিবেদিতার চিতাস্থলে একটি স্মৃতি মন্দির নির্মান করেন। সেখানে লিখে দেওয়া হলো, ‘এখানে শান্তিতে শুয়ে আছেন ভগিনী নিবেদিতা, যিনি, তাঁর সবকিছু ভারতবর্ষকে দিয়ে দিয়েছিলেন’।
কিন্তু দুঃখের ব্যাপার, এই ঐতিহাসিক স্মৃতিমন্দির আজ ভগ্নদশায়। প্রশাসন, বা স্থানীয় পার্টি, রাজ্যসরকার কিংবা রামকৃষ্ণ মিশনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি এর সংস্কারের এখনো। আপনাদের মধ্যে যারা সাংবাদিক বা মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত, তারা যদি এই ব্যাপারটি একটু তুলে ধরেন, এবং সমমনস্ক মানুষেরা যদি এই লেখাটিকে ছড়িয়ে দেন নিজেদের পরিচিত মহলে হোয়াটস অ্যাপে বা নিজেদের ফেসবুক দেওয়ালে , তাহলে এই বিষয়টিকে আরো খানিকটা গুরুত্ব পাবে।
এ প্রসঙ্গে ফেসবুক বন্ধু কৌশিক মজুমদারের একটি পোষ্ট শেয়ার করলাম।
কৌশিক মঝুমদার লিখছেন,
"দার্জিলিং রেল স্টেশনের ঠিক নিচে, যেখানে টয় ট্রেনগুলো থামে, রয়েছে মূর্দাহাটি বলে অদ্ভুত এক হিন্দু-বৌদ্ধ শ্মশান। তাতেই হেলায় পড়ে আছে এই সমাধিটি। কেউ জানে না। খেয়াল করে না। যত্ন দূরে থাক।
লোকাল নেতা বলেন " কি হবে এসব ঠিক করে? পার্টি চায় না।" তাঁরা আরও বড় আন্দোলনে ব্যস্ত। আর এভাবেই ধীরে ধীরে ধ্বংসস্তুপে পরিনত হচ্ছে সিস্টার নিবেদিতার সমাধি। যে অমর ভারতের টানে একদিন সব ছেড়ে চলে এসেছিলেন, সেখানে তাঁর শেষ শয্যার কথা আমরা বেমালুম ভুলে গেছি। চারিদিকে নিবেদিতার দেড়শো বছর পূর্তি নিয়ে এত হইচই, সাহিত্য পত্রিকায় এত লেখালেখি, কিন্তু এই ঐতিহাসিক স্মারকের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে সবাই অদ্ভুত নীরব।সরকার, বিরোধী ,মিডিয়া,মিশন no one gives a damn. এখানে, পাশেই রয়েছে মহাপন্ডিত রাহুল সংকৃত্যায়নের সমাধিও।
মজার ব্যাপার ঠিক গায়ে লাগা একটা জায়গার নাম আবার নিবেদিতা গ্রাম!"

No comments:
Post a Comment