ভারতের ৬৯তম প্রজাতন্ত্র দিবস। ১৯৫০ সালের এই দিনটিতেই ভারতের সংবিধান কার্যকর করা হয়েছিল। ১৯৫০ সালের এই দিনটিতেই শপথ নিয়েছিলেন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ।
প্রতিবছর দিনটিকে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে পালন করে ভারত। সারা দেশজুড়ে পালিত হয় নানা কর্মসূচি। দিল্লি, কলকাতাসহ দেশটির নানা প্রদেশের রাজধানীতে চলে প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান।
প্রতিবছরের মতো আগের বছরেও দিবসের এই অনুষ্ঠানের সূচনা করেছিলেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। দিবসের প্যারেড রাজপথ থেকে শুরু হয়েছিল লালকেল্লা পর্যন্ত। প্রতিবছরই এই বিশেষ দিনটিতে উপস্থিত থাকেন নানা সাম্মানিক অতিথি, থাকে বিদেশের শাসক, কূটনীতিকের ভিড়। আগের বছরেও সেই ধারা বজায় রেখেই উপস্থিত ছিলেন আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স জায়েদ আল নাহিয়ান। তিনিই গতবারের বিশেষ অতিথি। বিমানবন্দর থেকে তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে স্বাগত জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
এবার বাংলাদেশের ঢাকাস্থ ভারতীয় দূতাবাসও দিনটি উদযাপনের জন্য দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
১৫ আগস্ট ১৯৪৭- এ, দীর্ঘ স্বাধীনতা আন্দোলনের ফলে ভারত ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি পায়। স্বাধীনতা লাভের প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হয় যুক্তরাজ্যের সংসদে ভারতীয় স্বাধীনতা আইন পাস হওয়ার মাধ্যমে। এর ফলে ব্রিটিশ ভারত ভেঙে গিয়ে কমনওয়েলথ অফ নেশনস-এর অন্তর্গত অধিরাজ্য হিসেবে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম হয়।
১৫ আগস্ট ১৯৪৭ এ ভারত স্বাধীন হলেও দেশের প্রধান হিসেবে তখনো বহাল ছিলেন ষষ্ঠ জর্জ এবং লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন ছিলেন এর গভর্ণর জেনারেল। তখনো দেশে কোনো স্থায়ী সংবিধান ছিল না; ঔপনিবেশিক ভারত শাসন আইনে কিছু রদবদল ঘটিয়েই দেশ শাসনের কাজ চলছিল।
১৯৪৭ সালের ২৮ আগস্ট একটি স্থায়ী সংবিধান রচনার জন্য ড্রাফটিং কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন ভীমরাও রামজি আম্বেদকর। ৪ নভেম্বর ১৯৪৭ তারিখে কমিটি একটি খসড়া সংবিধান প্রস্তুত করে গণপরিষদে জমা দেয়। চূড়ান্তভাবে সংবিধান গৃহীত হওয়ার আগে ২ বছর, ১১ মাস, ১৮ দিনব্যাপী গণপরিষদ এই খসড়া সংবিধান আলোচনার জন্য ১৬৬ বার অধিবেশন ডাকে। এই সমস্ত অধিবেশনে জনসাধারণের প্রবেশের অধিকার ছিল। বহু বিতর্ক ও কিছু সংশোধনের পর ২৪ জানুয়ারি ১৯৫০ এ গণপরিষদের ৩০৮ জন সদস্য চূড়ান্ত সংবিধানের হাতে-লেখা দুটি নথিতে (একটি ইংরেজি ও অপরটি হিন্দি) স্বাক্ষর করেন। এর দুদিন পর অর্থাৎ ২৬ জানুয়ারি সারা দেশব্যাপী এই সংবিধান কার্যকর হয়।
সাধারণতন্ত্র দিবস বা প্রজাতন্ত্র দিবস এই শব্দযুগল প্রত্যেক
ভারতবাসীর নিঃশ্বাস, প্রশ্বাস বা বলা যায় রক্তের সাথে
ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রজাতন্ত্র অথবা সাধারণতন্ত্র এই শব্দ দুটি নিজেরাই ব্যখ্যা
করছে “লোকের জন্য এবং লোকের দ্বারা” । কিন্তু যদি আমরা একটু গভীর ভাবে ভাবি তাহলে সত্যি কি তাই ! একটু খেয়াল করলেই লক্ষ্য করা যাবে যে কোথাও একটা “রাজা” জড়িয়ে আছে প্রজায়; মানে যেখানে শাসন ক্ষমতা একজনের কাছে আর বাকিরা তার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কিংবা
শোষিত ! এর কারণ আমরা নিজেরাই । আমরাই তো
গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করে তার হাতে আমাদের শাসনভার
তুলে দিচ্ছি ব্রিটিশ রাজতন্ত্র-এর অনুকরণে । কারণ সেখানে রাজা বা রানী
আছে, প্রধানমন্ত্রী আছে কিন্তু আসল ক্ষমতা থাকে
রাজা বা রানীর কাছে ।
রাজপ্রাসাদ থেকেই সমস্ত নিয়ম
ঠিক করে দেয়া হয় আর প্রধানমন্ত্রী শুধু তা সাধারণ জনগণকে জ্ঞাত করেন। পার্থক্য
শুধু একটাই,
আমাদের এখানে কোনো রাজা নেই, তার জায়গায় রয়েছেন নির্বাচিত
জনপ্রতিনিধি আর প্রধানমন্ত্রীর জায়গায় রয়েছেন রাষ্ট্রপতি বা রাজ্যপাল ।
তাহলে কি প্রজাতন্ত্র আর সাধারণতন্ত্র অথবা গণতন্ত্র সমার্থক ? গণতন্ত্র শব্দটিতেই এর অর্থ নিহিত
রয়েছে । “গণ” যার অর্থ সাধারণ অর্থাৎ আপামর ভারতবাসী যাদের জন্যই গণতন্ত্র দিবস
। গণতন্ত্র মানে তাই জনসাধারণের জন্য আর জনসাধারণের দ্বারা । প্রজাতন্ত্র অনেকটা
গণতন্ত্রের মতো কিন্তু শেষে একটা রাজা বা শাসক থাকে, যেমন ইংল্যান্ডের শাসন ব্যবস্থা হলো প্রজাতান্ত্রিক আর আমেরিকার
শাসন ব্যবস্থা হলো গণতান্ত্রিক ।
তাই এটা হয়তো বলা যেতে পারে যে শুনতে একরকম হলেও গণতন্ত্র আর
প্রজাতন্ত্র সমার্থক নয় ।
প্রজাতন্ত্র দিবস সম্বন্ধে অনেক
ব্যাখ্যা হলো,
এবার ইতিহাস নিয়ে একটু চর্চা
করা দরকার যে কিভাবে প্রজাতন্ত্র দিবসের ভাবনা এলো । প্রাপ্ত তথ্য থেকে যতদূর জানা
যায় ১৯৪৭ সালের ৪ঠা নভেম্বর থেকে খসড়া কমিটি ১৬৬ বার সংসদের অধিবেশনে মিলিত হয়
যেখানে সাধারণ মানুষও অংশগ্রহন করেছিল এবং যা প্রায় ২ বছর ১১ মাস ১৮ দিন ধরে
চলেছিল সংবিধান প্রস্তুত করার জন্য । ১৯৪৬ সালের ৯ই ডিসেম্বর প্রথমবার গণপরিষদ সংসদের সংসদীয় কক্ষে মিলিত হয়েছিল
যাতে স্বাধীন ভারতের প্রথম গণতান্ত্রিক সরকারের ভিত শক্তপোক্ত ভাবে তৈরি হয় ।
ব্রিটিশ সরকারের তৈরি ক্যাবিনেট
মিশন ভারতে আসে ১৯৪৬ সালে, শান্তিপূর্ণ
এবং সরলভাবে দেশ পরিচালনার ক্ষমতা ভারতীয় নেতৃবৃন্দর হাতে হস্তান্তরিত করার জন্য ।
ক্যাবিনেট মিশন কর্তৃক নির্দেশিত নির্দেশনামা অনুযায়ী ২৯২ জন জনপ্রতিনিধি
নির্বাচিত হয়ে স্বাধীন ভারতের প্রথম গণপরিষদ গঠন করবেন । প্রথম নির্বাচিত
গণপরিষদের কিছু বর্ণময় ব্যাক্তিত্ব হলেন সর্দার বল্লবভাই প্যাটেল, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, সরোজিনী নাইডু এবং পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু যাঁদের উপর গুরুদায়িত্ব ছিল ভারতের
রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা, আর্থসামাজিক
সমতা, ন্যায়বিচার এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার
প্রতিষ্ঠা করা ।
১৯৪৯ সালের ৯ই ডিসেম্বর খসড়া সংবিধান অনুমোদন পায় এবং এর ঠিক এক
মাস পরে ১৯৫০ সালের ২৬ই জানুয়ারী সংবিধান আনুষ্ঠানিক ভাবে ক্ষমতায় আসে যার মাধ্যমে
নতুন দেশ গণতান্ত্রিক ভারতের জন্ম হয় ।
বছরে ৩৬৫ দিন থাকলেও কেন শুধু ২৬ ই
জানুয়ারী প্রজাতন্ত্র দিবস পালিত হয় সেটাও একটু জানা দরকার । ১৯২৯ সালের ৩১ সে
ডিসেম্বর নেহরুজী লাহোরে প্রথমবার তিরঙ্গা উত্তোলন করেন এবং ১৯৩০ সালের ২৬ সে
জানুয়ারী স্বাধীনতা দিবস হিসাবে ধার্য করেন । ওই দিনটাকে তারপর থেকে পরবর্তী ১৭
বছর ধরে “পূর্ণ স্বরাজ ” দিবস হিসাবে পালন করা হয়. কিন্তু স্বাধীনতা আসে ১৫ ই অগাস্ট, তাই ২৬ ই জানুয়ারী দিবসটিকে
পালন করা হয় পরাধীন ভারতবর্ষ থেকে আধুনিক গণতন্ত্রে রূপান্তরিত হওয়ার দিন অর্থাৎ
প্রজাতন্ত্র দিবস হিসাবে।
সংবিধান যেদিন সংসদ কক্ষে আনুষ্ঠানিক ভাবে
গৃহীত হয়, সেদিন পণ্ডিত নেহরুজী বক্তৃতা রাখেন সকলের
সামনে । তার মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা তিনি সেদিন উল্লেখ করেছিলেন যেমন “সমস্ত বুভুক্ষু মানুষের জন্য খাবার, সবার লজ্জা নিবারণের জন্য কাপড় এবং সমস্ত ভারতীয়কে সমান সুযোগ ও সুবিধা দেওয়া যাতে তারা নিজেদের ক্ষমতা
অনুযায়ী নিজেদেরকে উন্নীত করতে পারেন “।
নেহরুজী অনেক আশা নিয়ে, মহান আদর্শকে সামনে রেখে উপরিউক্ত বক্তব্য দিয়েছিলেন যাতে সবার উন্নতির
মাধ্যমে দেশের উন্নতি হয় এবং ভারতবর্ষ সারা পৃথিবীতে একদম সামনের সারিতে থাকে ।
আপামর ভারতবাসীও নতুন ভারতবর্ষের এক উজ্জ্বল স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং তা নিয়ে আশায়
বুক বেঁধেছিলেন । কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এটা বলতে হয়তো বাধা নেই যে , সেই উজ্জ্বল স্বপ্নের বেলুন চুপসে গেছে । নেহরুজী বর্ণিত কথাগুলি শুধু
পুস্তকেই রয়ে গেছে। বাস্তবে তার প্রয়োগ কোথাও হয় না । আজকের দিনে ধনী সমস্ত সুযোগ
ও সুবিধা আদায়ের মাধ্যমে আরও ধনী হয়ে উঠছে। যার কাছে অর্থ নেই তার কাছে ক্ষুদা
নিবারণের খাদ্য নেই, লজ্জা নিবারণের কাপড় নেই আর সমান অধিকার
সেটা শুধু তার কাছে রূপকথার মতো । মানুষ তার অধিকার আর ন্যায্য দাবির জন্য লড়াই
করলেও সব সময় তার জন্য মধুরেণ সমাপয়েৎ অপেক্ষা করে না । আজকের দিনে মানুষ প্রধান
বিষয় থেকে নজর সরিয়ে বেশিরভাগ সময়টাই গৌণ বিষয় কে নিয়ে চর্চায় বা তার মধ্যে বাঁচতে
ভালোবাসছে । যে মহান উদ্দেশ্য নিয়ে ভারত স্বাধীনতা লাভ করেছিল এবং তার সংবিধান
রচিত হয়েছিল, আজকে সেখান থেকে আমরা সহস্র যোজন দূরে ।
জানিনা কোনোদিন সেই কাঙ্খিত লক্ষ্যে আমরা পৌঁছুতে পারবো কিনা ?
প্রজাতন্ত্র
দিবসে মনে পড়া কবিতা
স্বদেশ গাথা।
( প্রেরনা গোবিন্দ চন্দ্র দাশ)
------ নবারুন ভট্টাচার্য।
------------------------------------------
স্বদেশ নয় এ, মড়ার ভাগাড়
চলতে ফিরতে পায়ে ফোটে হাড়
লাশের বিলাস, লাশের পাহাড়
যেই দিকে চাই, দুচোখ ময়।
গোবিন্দদাস থাকলে বলত
কথায় তাহার আগুন জ্বলত
যাহার দাপে গরীব কাঁপে
ঠিক যেন সে অন্ধ হয়
স্বদেশ স্বদেশ করছ কাকে,-এদেশ তোমার নয়।
ভূস্বর্গে যে উপবাসী
শাস্ত্রে তারাই নরকবাসী
খাদ্য তাহার পচা বাসি
নর্দমা উচ্ছিষ্টময়
শোষক চতুর বেনের দেশে
কক্ষনো তার জায়গা হয়?
সংবিধানে কার অধিকার
বেকারি আর ক্ষুধায় মরার
বাঁচতে বেশ্যাবৃত্তি করার
চক্ষু যাদের বাষ্পময়
বুদ্ধিজীবীর মাতৃভুমি,
শস্যজীবী নিরাশ্রয়।
গোবিন্দদাস থাকতো যদি
বলতো কাব্যে নিরবধি
বুদ্ধিজীবীর পাছায় দুচোখ
আকাশ তাহার দেখতে নয়
স্বদেশ স্বদেশ করছ কাকে,-এদেশ তোমার নয়।
শেয়াল শকুন পথের ধারে
কাপড় খুলে ন্যাংটো করে
যাহার চিত্র চিত্রকরের
দেশ বিদেশে কদর হয়
সংবাদে তার কান্না ছাপে
সাহিত্যকের কান্না ভাপে
ঠোটের ডগায় সিগার কাঁপে
মদ গিলিয়া শান্ত হয়,
কলম শুধু মলম লাগায়
ক্ষত যেমন তেমন রয়।
বিবেক রাখে পর্দা ঢাকা ,
তাকে রবীন্দ্রনাথ রাখা,
শাক দিয়ে মাছ নিত্ত ঢাকা
সেবাদাসের কর্ম হয়
গোবিন্দদাস বলতো থাকলে
সারাজীবন বিষ্ঠা মাখলে
কৃত্তিম এই ধুপের ধোয়ায়
গুয়ের কুবাস বিদায় হয় ?
স্বদেশ স্বদেশ করছ কাকে,-এদেশ তোমার নয়।
রেলস্টেশনে , হাসপাতালে
বাজার খোলা, খাস চাতালে
শহর নগর রেল পাতালে
কাহার দিবস রাত্রি হয়
জেলহাজতে,হাড়িকাঠে,
দুই বেলা যার মুন্ডু কাটে
চিতা যাহার জ্বলছে মাঠে
শ্মশানে চোখ অশ্রুময়
স্বদেশ স্বদেশ করছ কাকে,-এদেশ তোমার নয়।
প্রজাতন্ত্র দিবস ও কিছু ভাবনাঃ
মৌ দাশগুপ্তের প্রতিবেদন
নতুন বছরের ২৬তম
দিন, ২৬শে জানুয়ারী ২০১৫, সার্বভৌম প্রজাতান্ত্রিক
রাষ্ট্র ভারতবর্ষের ৬৬তম প্রজাতন্ত্র দিবস। এ দিনটি শুধু ক্যালেন্ডারের পাতার কোনো
জ্বলজ্বলে লাল তারিখ নয়, নয় কেবল শীতশীত আলসেমিমাখা মাঘ মাসের ছুটির একটি দিন, বছরের এই দিনটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য্য কিন্তু কোনভাবেই ফেলনা
নয়।
ছোটবেলা থেকেই
জানি প্রজাতন্ত্র দিবস মানেই একটা গোটা ছুটির দিন।ইচ্ছামত চলার দিন। স্কুলের মাঠে, খেলার ক্লাবে,মোড়ের মাথায়, পাড়ার শহীদ বেদীতে তেরঙ্গা পতাকা তোলার ভীড়,দড়ি ধরে একটা টান, তারপর,ফুলের পাপড়ীগুলো ঝরঝর ঝরলেই, কচিকাঁচাদের গলা
ছাপিয়ে মাইকে কান ফাটানো দেশভক্তির গান, একটা কলা কি
কমলালেবু ,দুটো লজেন্স, কি একমুঠো বোঁদে,সাথে ফ্রী ভাষণ। নেতাজী, গান্ধী, জহরলালের ছবিতে টাটকা ফুলের মালা।পাড়ার স্টেশনারী দোকানে, হকার্স কর্ণারে অঢেল তিনরঙ্গা ফেস্টুন,টুপি,পতাকা,রিস্টব্যান্ডের স্টক ক্লিয়ারেন্স সেল। বাবা- কাকার শার্টে
সেফটিপিনে আটকানো কাগজের তেরঙ্গা,আজ আকাশটা তিনরঙা
না হলেও অনেক তিরঙ্গা আকাশের পটভূমিকায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে দেখছি।‘এ্যয় মেরে প্যারে বতন…’
….” তেরঙ্গা,শুনছেন কি,আজ প্রজাতন্ত্র
দিবস,
ভোর হলেই দড়িতে
বাঁধা পড়বেন আজ,
সন্ধ্যায় পাটে
পাটে ভাঁজ হয়ে ঘুমাবার আগে অবধি,
সারাটি দিন
ডোরবাঁধা ঘুড়ির মত আকাশে উড়বেন,
ঘুড়িও সুতো কাটলে
পাখীর মত স্বাধীন-
আপনি কিন্তু
নিয়মবন্দী,
গতকাল যা ছিলেন, আজও তাই, আগামীকালও…”…
প্রজাতন্ত্র দিবস
মানেই মাইকে বা টিভিতে তারস্বরে দেশভক্তির গান বা সিনেমা , লালকেল্লার সরকারী অনুষ্ঠান, সামরিক বা
বেসামরিক কুচকাওয়াজ, স্কুল বা বিভিন্ন ক্লাব প্রতিষ্ঠানের তরফে প্যারেড।আর
আমরা কি করছি? ‘ভারতের আম জনতা’? এই ‘আমি - আপনি’র দল? ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপের
প্রোফাইল পিকচারে জাতীয় পতাকা, বা ভারতের
ত্রিবর্ণ ম্যাপ, স্ট্যাটাসে দেশভক্তির চরম পরাকাষ্ঠা, ওদিকে ছুটির দিন বলেই বোধহয় মা নলেনগুড়ের পায়েস বানাচ্ছেন, গন্ধটা হাওয়ায় ভাসছে, রান্নাঘর থেকে
যাতে শোনা যায় তাই টিভির ভল্যুমটা বাড়ানো আছে, গানটা বেশ ভালো
লাগছে শুনতে তো, ( ‘ভারত আমার ভারত বর্ষ,স্বদেশ আমার
স্বপ্ন হে,’ রবীন্দ্রসঙ্গীত? নাকি আধুনিক? আমার বস বাংলা গান টান অত আসে না, তবে বেশ দেশভক্তির স্মেল আছে, ) আজকের মত ফেসবুক
স্ট্যাটাস হয়ে যাক! ওয়াও! পোস্ট করতে না করতে এতো লাইক, কমেন্ট! অনলাইন শপিং, শপিং মলে দেদার
ছুট, ক্রেডিট কার্ডে আত্মহারা হয়ে ভাবছি ঈশ, আরেকটা ছুটী এক্সট্রা..তবে আর কি, গা ভাসাও দেশপ্রেমের জোয়ারে, ‘লেট আস সেলিব্রেট’! আজ তবে পিকনিক
হয়ে যাক, নাকি থিয়েটার,কি সিনেমা দেখা? বাড়ীতেই একটা জম্পেশ গেট টুগেদার, অথবা, দুপুরে মাংসভাত
শেষে বিকেল অবধি বেশ জমাটি ঘুম,সন্ধ্যায় আবার
নারী নির্য্যাতন নিয়ে প্রতীকী মোমবাতি মিছিল আছে কিন্তু! তাহলে থাক, ওদিকে মোবাইলে প্রজাতন্ত্র দিবসের স্পেশাল রিংটোন বাজছে, ‘সারে যাঁহা সে আচ্ছা হিন্দুস্তান হামারা’…
আমার কিন্তু মনে
একটাই প্রশ্ন উঁকি দেয়, সেটা হল, একদিন মাইক বাজিয়ে আর প্যারেড করে কি সত্যিই প্রজাতন্ত্র
উদযাপন করা যায়? আরে বাবা নাচাগানা তো শোনপুর মেলাতেও হয়, অমুকবাবু তমুকবাবু হাতে মাইক পেলে ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও রক্ত গরম
করা ভাষণ দিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে নির্বিকার চিত্তে নাক ডাকাতে পারেন,তারজন্য ‘প্রজাতন্ত্র’দিবসে’র বাহানাটা খুব
জরুরী কি? 'জনগণমন' ইস্কুল থেকে
শুনতে শুনতে মনের ওপর এমন ঘূণধরা এফেক্ট করেছে যে এখন গানটা বাজলে আমাদের মধ্যে
কতজন হাতের কাজ ফেলে দু’পায়ে দাঁড়িয়ে
পড়ার সৌজন্যটুকু দেখান সেটাও প্রদীপ হাতে খুঁজে দেখতে হয়। ‘বন্দেমাতরম’ গানটাই বা আজকাল
আমাদের মনে কতোটা এফেক্ট করে? ছোটবেলায় রেডিওতে
যে বন্দেমাতরম-র সুর শুনে বড় হয়েছি তার থেকে এ.আর.রহমানের 'মা তুঝে সালাম' –এর বন্দেমাতরমের
সুর আজকের প্রজন্মকে বেশি আবেগাপ্লুত করে না কি? বিতর্কিত বিষয়
সন্দেহ নেই। কিন্তু আরো বিতর্কিত বিষয় হল, প্রজাতন্ত্র
বাপারটা কি? খায় না মাথায় দেয়? দেশ
প্রজাতান্ত্রিক হলে প্রজা থুড়ি দেশবাসীর ক’টা লেজ গজায় নাকি
ক’টা শিং গজায় এই সব কূট প্রশ্নের উত্তর পাই কোথায়?
আচ্ছা,গোড়া থেকেই তবে শুরু করা যাক। এই ‘প্রজাতন্ত্র’ জিনিসটা ঠিক কি? খবরের কাগজে, ম্যাগাজিনে পড়েছি
বটে, কিন্তু সম্যক ধারনা নেই। একটু দেখা যাক। প্রথমেই
সর্বজ্ঞানের ভান্ডার গুগল কি বলে দেখা যাক। “একটি প্রজাতন্ত্র
হল এমন একটি সরকার ব্যবস্থা যেখানে সর্বোচ্চ ক্ষমতা ভোগ করে জনগণ বা জনগণের একাংশ।
ইংরেজি ভাষায় "প্রজাতন্ত্র" শব্দের প্রতিশব্দ "republic" এসেছে লাতিন শব্দবন্ধ res publica শব্দবন্ধটি থেকে, যার আক্ষরিক অর্থ "জনগণ-সংক্রান্ত একটি বিষয়"।
সাধারণত রাজশক্তি-বিহীন রাষ্ট্রকেই প্রজাতন্ত্র বলা হয়।
১৯৪৭ সালের ১৫ই
আগস্ট, এ দেশের মানুষ অনেক আত্মদান, অনেক ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করল । পতাকা বদল হলো, ইউনিয়ান জ্যাকের বদলে উড়লো তিরঙ্গা। আমরা সাম্প্রদায়িকতার
ভিত্তিতে অখন্ডতা খুইয়ে স্বাধীনতা পেলাম। যদিও গান্ধীজি বলেছিলেন, দেশভাগ হলে আমার লাশের ওপর দিয়ে যেতে হবে। তবুও দেশভাগ হল, দু’ দুটো নতুন দেশ ‘হিন্দুস্তান’ (ভারত) ও ‘পাকিস্তান’ (বর্তমান বাংলাদেশ এর অন্তর্ভুক্ত ছিল) তৈরী হল।
দিল্লীর মসনদে মোগলসাম্রাজ্যের পতনের পর বিদেশী শক্তির হাতে প্রায় দু’শো বছর পরাধীন থাকার পর এই যে ইংরাজ শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ
করে আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলাম…কেন? এ প্রশ্ন তো আসেই। মাঝরাতে চুপিসারে দেশ চালানোর ক্ষমতা
দুধসাদা আচকানের পকেটে পুরে নিয়ে নেহেরুবাবু স্বাধীন ভারতবর্ষের জন্মক্ষনে
বলেছিলেন- "At the stroke of the midnight hour when the world
will sleep India will awake for life and freedom". এ প্রসঙ্গে পরে
আসছি, আপাতত বলি, আমাদের এই
স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিল প্রধানত আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং অর্থনৈতিক মুক্তি।
আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের সঙ্গে গণতন্ত্রের যোগাযোগ ওতপ্রোত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ছিল
গণতন্ত্রের আকাঙ্খা। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের সংবিধান প্রণীত হয় এবং আমাদের
দেশ সেদিন থেকেই বিশ্বের দরবারে ‘ধর্মনিরপেক্ষ
গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সেই থেকে দিনটি আমাদের দেশের
প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। প্রজাতন্ত্র দিবস, মানে যে দিন স্বাধীনতা লাভের পর ভারত এক স্বাধীন সার্বভৌম
রাষ্ট্র হিসেবে তার প্রথম সংবিধান গ্রহণ করেছিল, তার মানে ভারতীয়
সংবিধানের জন্মতিথিই হল ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস। যাক এতটুকু তো ক্লিয়ার হল, কিন্তু এরপর?
পরের প্রশ্ন
আসতেই পারে, যে, তাহলে এই ‘সংবিধান’ জিনিষটা আবার কি? সংবিধান হল রাজনীতির নীতিমালার সেই কাঠামো যা এক সমতামূলক
রাষ্ট্রের বুনিয়াদ তৈরী করতে প্রয়োজন… শক্ত কথা
নিঃসন্দেহে। কাগজে ছাপার অক্ষরে এমন কতশত গালভরা কথা তো বলাই যায় কিন্তু বাস্তবে? পূর্বপুরুষদের যে রক্ত আমাদের শিরায় ধমনীতে বইছে তার কণায়
কণায় তো বৈষম্য শব্দটি শিকড় গেড়ে আছে। সেখানে রাষ্ট্রের সব মানুষের জন্য
সমানাধিকার? বলে কি? জাতি ধর্ম
নির্বিশেষে শিক্ষার সমান অধিকার, আইনের সমান
অধিকার, রুজি রোজগারের সমান অধিকার, ধন সম্পত্তি কায়েমের সমান অধিকার, এমনকি লিঙ্গ নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নবজাতকের ও নবজাতিকার
সমান বাঁচার অধিকারও নাকি সংবিধানে স্বীকৃত! “আমরা সবাই রাজা
আমাদের এই রাজার রাজত্বে”…
বলে কি! ঐ রতন
টাটা, আমাদের পি এম নরেন্দ্রমোদী, সি এম মমতাদিদি, সুদীপ্ত সেন, ছাপোষা কলমপেষা সরকারী কর্মচারী এই অধম আমি আর ঐ
ফ্লাইওভারের তলায় সন্ধ্যার অন্ধকারে কেরাসিন কূপি জ্বালিয়ে চাট বিক্রি করা
মদনা সাউ সংবিধানের চোখে, থুড়ি, সংবিধানের হিসাবে, (না মানে… ঐ যাকে বলে কিনা, সংবিধানের গুঁতোয় ) সবাই এক? কিংবা আমার ঘরের
পুতুপুতু যত্নে মানুষকরা শিবরাত্রির সলতে আর সাতবাড়ীর বাসন মাজা ঘরের কাজের মাসীর
সাতনম্বর মেয়ে, নাকে শিকনি, তেলছাড়া
বাদামীচুলে জট, ইজের সম্বল ফেলনী … দু’জনে এক? কোন মানে হয়? আজ্ঞে হ্যা, ঠিকই বলছি, কাগজে কলমে বড় মহান বড় উদার আমাদের এই ভারতীয় সংবিধান , এখানে সব মানুষ সমান। এ-সংবিধান এ-দেশের সকলের জন্য সুবিচার, স্বাধীনতা, সমতা ও
সৌভ্রাতৃত্ব কায়েম করার নীতিমালায় বিশ্বাসী। পাগল না পাজামা? এখন লজ্জাস্কর ব্যাপরটা হল, স্বয়ং ভীমরাও
রামজি আম্বেদকর, (পশ্চিম ভারতের সেই ‘অস্পৃশ্য’ জাতির মানুষটি, যিনি দলিতদের
নেতা হিসাবেই বেশী পরিচত ছিলেন, ১৯৪৭-এ যিনি
সদ্যগঠিত ভারত সরকারের আইনমন্ত্রীও ছিলেন, যিনি ভারতের
সংবিধান প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন…তিনি )
জীবিতবস্থাতেই দেখে যান যে সংবিধানে ‘অস্পৃশ্যদের’ বিরুদ্ধে বৈষম্য আইনত নিষিদ্ধ করার পরেও সমাজের
প্রাত্যহিকতায় ঘটনাটা আদতে কতটা অসম্ভব! সংবিধানের এই অসাড়তা, এই অপমান, সংবিধান
প্রণেতাকে ঠিক কতটা দুঃখ দিয়েছিল তা এইমুহূর্তে আমাদের জানার কোন উপায় নেই। তবে ১৯৫৬
সালে তিতিবিরক্ত এই প্রবীণ পোড় খাওয়া রাজনীতিকটির প্রায় দুই লক্ষ দলিত অনুগামীকে
নিয়ে হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণের মধ্যে দিয়ে আমরা কোন নীরব
প্রতিবাদ খুঁজে পাইনা কি?
... "গাল ফুলিয়ে গাইছি
মোরা “মেরা ভারত মহান”।
রাজনীতির দাবার
চালে স্বয়ং ভুতও ভগবান
স্বাধীন
প্রজাতন্ত্রের দেশে আমরা সবাই পুতুল,
যেমন খুশী নাড়ো
চাড়ো, বন্ধ মুখে আঙ্গুল।
নতুন যুগে পা
রাখছি, নবভারতের আউটলেট,
হাতে হাতে ছড়িয়ে
দেবো প্রজাতন্ত্রের লিফলেট।“ …
প্রজাতন্ত্র দিবস
উপলক্ষে সারা ভারত জুড়েই নানা রকম জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় ,যেমনটি প্রতিবার হয় আর কি। তারপর, দিল্লীর চওড়া রাজপথে দেশবিদেশের সম্মানিত অতিথিদের সামনে
এবং অবশ্যই আপামর সর্ব সাধারনের জানার জন্য আরও কিছু কমন ফ্যক্টরও যথাবিহিত
মর্য্যাদা সহকারে পুনঃপ্রদর্শিত হয়, যেমন,সামরিক বাহিনীর কুচকাওয়াজ সহ নানা ধরনের সামরিক যন্ত্রপাতি, আমরা জানতে পারি আমাদের সামরিক শক্তি কতটা, আমাদের বিভিন্ন স্কুলের বাচ্চারা প্রজাতন্ত্র কতটা বোঝে এবং
নাচগান করে অন্যকেও বোঝানোর চেষ্টা করে, ইত্যাদি ইত্যাদি।
আজকাল আবার 'হ্যাপী রিপাব্লিক ডে' বলে শুভেচ্ছা
জানানোটাও সভ্যজনের এটিকেট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে ঢেলে বিকোচ্ছে 'হ্যাপী রিপাব্লিক ডে' গ্রীটিংস কার্ড।
স্বাধীনতা দিবসের মত বছরের এইদিনেও সারা ভারতের সরকারী অফিস-আদালত, জেলখানা থেকে পাগলাগারদ সব জায়গাতেই একটা খুশির আমেজ দেখা
যায়। ব্যক্তিগত উদ্দোগ্যে ভাল খাবার-দাবার,কখনো সখনো নতুন
পুরানো জামাকাপড়, শীতবস্ত্র পরিবেশন করা হয় অনাথাশ্রম, বৃদ্ধাশ্রম, কিছু হাসপাতাল, অর্থনৈতিক অনগ্রসর মহল্লায়। সুবেশা মহিলারা সেজে-গুজে
অমুকবাবু তমুকবাবুর সাথে হাসিমুখে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে দান-ধ্যান করেন ও
মিডিয়াকে জানান দেন। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ চমকায়। বছরের আরো একটা দিন (আরেকটা
দিন ১৫ই আগস্ট, আমাদের স্বাধীনতা দিবস) বরনীয় স্মরনীয় দেশপ্রেমিকের
বছরভোরের জমে থাকা ধুলোমোছা বাঁধানো ছবি কি কাক চিলের পূরীষ মোছা আবক্ষমূর্তি বা
পূর্ণাঙ্গ মূর্তিতে ছুঁড়ে দিই গাঁদা কি রজনীগন্ধার মালা, না শোনার মত করে শুনি গুটি কয়েক দেশাত্মবোধক গান, গোলটুপি /লম্বা টুপি/ টুপিছাড়া নেতা (মোড়ল /দাদা)-দের কাগজে
লিখে মুখস্থ করে উগড়ে দেওয়া কিছু বাঁধা গতের কথা... তার পর শুধু ভুলে যাওয়া...
নিজেকে নিজের মতো করে গুছিয়ে নেওয়া... শুধু স্বার্থ আর অহঙ্কারের মায়াজালে, পরিবারতন্ত্রের নেশায়, ক্ষমতা
কুক্ষীকরনের আশায়… দেশকে, সমাজকে, শোষণ করা। প্রাদেশিকতার নামে, ধর্মের নামে, ভাষার নামে, রাজনীতির নামে
টুকরো টুকরো করা...সংবিধান বলে আমার আপনার তো দেশ একটাই, আমাদের “ভারত বর্ষ”. সারে যাঁহা সে আচ্ছা হিন্দুস্তান হামারা… সেটাই তো আর হয়ে ওঠে না। অথচ পরেরদিন খবরের কাগজ জানায় ২৬শে
জানুয়ারীতে বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারত ‘যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ৬৬তম
প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপন করেছে’ এবং এই উপলক্ষ্যে
‘সারা ভারতে এক অপরিসীম আনন্দের বন্যা বয়ে গেছে’।
মোদ্দা কথা হল
তাহলে প্রজাতন্ত্রের কোন সুফলটা আমারা পাচ্ছি? কেন আমরা
প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপন করছি? আজো বৈষম্য
আমাদের সঙ্গী, “নগরীর এক প্রান্তে খাদ্য কিন্তু খিদে নেই, অন্য প্রান্তে খালিপেটে জ্বলছে খিদের আগুন কিন্তু খাদ্য নেই,” মহাজনী টিপ-ছাপে গায়ে গতরে বাড়ছে চাষীর ক্ষেতের সবুজ শীষ,খাল পাড়, রেল লাইনের
ধারবরাবর বাড়ছে বাস্তুহারাদের ভীড়, বিদ্যাসাগরের ছবি
আজ ক্যালেন্ডারেও দুষ্প্রাপ্য, তার থেকে অনেক
বেশী পরিচিত নাম বিদ্যাবালান, রাংতামোড়া নেশার
ধোঁয়ায় ম্লান হচ্ছে আগামী দিনের সকাল। লাল জলে, মাদকের ঘোরে বেচা
কেনা হচ্ছে মানুষের নীতিজ্ঞান,অপুষ্টি, অশিক্ষা,আবাদিতে বাড়ছে
আগামী প্রজন্ম। ‘অমিতাভ’ লিখে শূন্যস্থান
পূরন করতে দিলে মোড়ের মাথার চা দোকানের ‘বয়’,পথশিশু বিল্টু ‘বুদ্ধ’ লেখে না, লেখে ‘বচ্চন’।আজ সুবিধাবাদ হয়ে
উঠেছে জাতীয় বৈশিষ্ট্য, সন্ত্রাসবাদ পাচ্ছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। মাঝে মধ্য
তো সন্দেহ হয় গান্ধী নেহেরু ছাড়া অন্য কেউ এ দেশের জন্য আদৌ কিছু করেছেন কি? যাবতীয় সরকারী প্রকল্পের নাম দেখুন, সন্দেহ জাগতে বাধ্য হবেই। গণতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র নয় নিরেট পরিবারতন্ত্র ও বান্ধবতন্ত্রের এমনই
লীলা। না, না, সংবিধানে এ সব
লেখা নেই। আছে রং (Wrong ও বলতে পারেন অনায়াসে)-বিধানে। ‘আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে।’ গণতন্ত্রে তো
আবার ‘সবার রঙ’ বলে কিছু নেই, চোখ খুললেই আলাদা আলাদা রাজনৈতিক দলের আলাদা আলাদা
রং। সবুজ, নীল, লাল,নীল-সাদা, গেরুয়া, এমনকি জাতীয় পতাকার অনুকরনে তেরঙ্গা অবধি ছাড় পায়নি।
সুকুমার রায়কে নকল করে বলা যায়,’রঙের আমি রঙের
তুমি রঙ দিয়ে যায় চেনা’। রঙে রঙে রঙ্গীন আমাদের প্রজাতন্ত্র, রঙে রঙে গলাগলি, লাঠালাঠি, রঙের শাসন বা ‘রংবাজি’ই (পড়ুন বিচ্ছিন্নতাবাদ, রাষ্ট্রীয়
সন্ত্রাস, ধর্মীয় অনুশাসন ) আমাদের সাংবিধানিক থুড়ি সংসদীয়
রাজনীতির মূল গল্প। প্রজাতন্ত্রের মূল ক্ষমতা জনগনের ভোট ভিত্তিক, অতএব ইমামি ফতোয়ার জোরে, গান্ধীবাবার ছবি
ছাপা নোটে, বস্তাবন্দী চাল-গম, বা কম্বলের
বিনিময়ে মাপা হচ্ছে ভোটের পারানি। অনেক জায়গাতেই সীসার গুলি, বন্দুকের নল, রক্তের দাগ লাগা
মাটি ও ঘরছাড়া নিরাপত্তাহীন মানুষদের সামনে নতজানু আমাদের ‘বিবেক’বাবু।অন্যদিকে সব
জেনেশুনেও কানুনের দেবীর মত চোখবন্ধ করে আমি.. আপনি.. আমরা সবাই.. একদিনের
দেশপ্রেমিক সাজছি । ‘মেরে দেশপ্রেমীয়ো, আপসমে প্রেম করো
দেশপ্রেমীয়ো।‘
তবু ঐ যে কথায়
বলে না ‘আশায় মরে চাষা’, আমাদেরও সেই হাল, সবই জানি, বুঝি, অনুভব করি, তবু বছরের পর বছর
‘কলুর বলদের’ মত ঠুলিপরা চোখে
একই বৃত্তাকার পথে ঘুরে চলেছি,সেই নির্বাচন, সেই প্রহসন, সেই একই
ট্রাডিশনের পুনরাবৃত্তি, সেই একই ভাবে আরেকটু ভালোর আশায় থাকা, আরেকটু জাতীয় স্বাচ্ছ্বন্দ্যকে অনুভব করতে চাওয়া। বাঙ্গালী/
গুজরাটি/ বিহারী / ওড়িয়া প্রাদেশিকতা বা হিন্দু / ক্রিশ্চান/ মুসলমানের
সাম্প্রদায়িক বিভেদ ভুলে ‘চক দে ইন্ডিয়া’র মত অন্তত একবার
নিজেকে ‘শুধু ভারতীয়’ ভাবা ।
প্রারম্ভিকভাবে এটাই না হয় আমাদের প্রজাতন্ত্র দিবসের চাহিদা হোক। তাতেই বা মন্দ
কি?
পরিশেষে একটাই কথা, সীমান্তে কোথাও
মাইনাস কুড়ি, কোথাও চল্লিশ ছুচ্ছে পারদ,অতন্দ্র পাহারায় খাকি পোশাকের ক‘টি মানুষের মত মানুষ,বাড়ী ছেড়ে, পরিবার ফেলে যাদের রোজ মৃত্যুর সাথে লুকোচুরী,আপনার আমার স্বার্থে দেশের সীমানার সুরক্ষায় জেগে ভারতীয়
সেনা,ওরা আছে বলেই নিশ্চিন্ত আমার দেশে ধর্মের বোলবালা,ডাস্টবিনে কন্যাভ্রূণ,নারী নির্য্যাতন, ধর্ষন,ডাইনি হত্যা, আরো কত কি,ওরা আছে বলেই
পুরো দেশ উৎসবে মগ্ন আর কাগজকলম নিয়ে প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রলাপ লিখছি আমি।
"মিলে সুর মেরা তুমহারা…’
প্রজাতন্ত্র দিবস
আসলে আমার আত্মসমালোচনার দিন...ভালো থাকুন সবাই, ভালো রাখুন, কাব্যলক্ষ্মীর সংস্পর্শে আনন্দে থাকুন। আপনাদের সবাইকে আমার
শুভ সদচিন্তা দিবসের, আত্মসমালোচনা দিবসের,প্রজাতন্ত্র দিবসের
অমলিন অমল শুভ্র শুভেচ্ছা।
প্রজাতন্ত্র
দিবসের প্যারেড
১।দক্ষিণাঞ্চলে রাজ্য গোয়ার পৌরাণিক কাহিনীর কাঁকড়া ও অন্যান্য জীবের
প্রতিমূর্তি নিয়ে হাঁটছেন শিল্পীরা।
২। বিশেষ কষ্ট করে মোটর সাইকেলে চড়ে মহড়া দিচ্ছেন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী
বিএসএফ।
৩। মাথার ওপরে ছাতায় বৃষ্টির টিপ টিপ শব্দ আর ভারতীয় সঙ্গীতের মূর্ছনায়
প্রজাতন্ত্র দিবসের প্যারেড উপভোগ করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।পাশে বসে
থাকেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।









No comments:
Post a Comment