
ভারতের জাতীয় পতাকা হল কেন্দ্রে চব্বিশটি দণ্ডযুক্ত নীল "অশোকচক্র" সহ গেরুয়া, সাদা ও সবুজ আনুভূমিক আয়তাকার ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা। ১৯৪৭ সালের ২২ জুলাই গণপরিষদের একটি অধিবেশনে এই পতাকার বর্তমান রূপটি ভারত অধিরাজ্যের সরকারি পতাকা হিসেবে গৃহীত হয়েছিল। পরবর্তীকালে এটি ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের জাতীয় পতাকার মর্যাদা লাভ করে। ভারতে এই পতাকাটিকে সাধারণত "তেরঙা" বা "ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা" বলা হয়। পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া কৃত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের "স্বরাজ" পতাকার ভিত্তিতে এই পতাকাটির নকশা প্রস্তুত করা হয়েছিল।
পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া (২ অগস্ট, ১৮৭৬ – ৪ জুলাই, ১৯৬৩) ভারতের জাতীয় পতাকার নকশাকার। তিনি বর্তমানে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের মছলিপত্তনমের নিকটে ভাটলাপেনুমারুতে জন্মগ্রহণ করেন। ভেঙ্কাইয়া মছলিপত্তনমের উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে সিনিয়ার কেমব্রিজ সমাপ্ত করার উদ্দেশ্যে কলম্বো যান। ভারতে ফিরে তিনি রেল গার্ডের চাকুরি গ্রহণ করেন এবং পরে বেলারিতে সরকারি কর্মচারী নিযুক্ত হন। পরবর্তীকালে উর্দু ও জাপানি ভাষা শিক্ষার জন্য তিনি লাহোরের অ্যাংলো-বৈদিক কলেজে যোগদান করেন। আইনত, কেবলমাত্র খাদিবস্ত্রেই জাতীয় পতাকা প্রস্তুত করার নিয়ম রয়েছে। ভারতীয় মানক ব্যুরো এই পতাকা উৎপাদনের পদ্ধতি ও নির্দিষ্ট নিয়মকানুন স্থির করে দেয়। উৎপাদনের অধিকার খাদি উন্নয়ন ও গ্রামীণ শিল্প কমিশনের হাতে ন্যস্ত। এই কমিশন বিভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠীকে উৎপাদনের অধিকার দিয়ে থাকে। ২০০৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, কর্ণাটক খাদি গ্রামোদ্যোগ সংযুক্ত সংঘ জাতীয় পতাকার একমাত্র উৎপাদক। পতাকার ব্যবহারবিধি "ভারতীয় পতাকাবিধি" ও জাতীয় প্রতীকাদি সংক্রান্ত অন্যান্য আইন অনুসারে নিয়ন্ত্রিত হয়। পুরনো বিধি অনুযায়ী, স্বাধীনতা দিবস, সাধারণতন্ত্র দিবস সহ অন্যান্য জাতীয় দিবস ছাড়া সাধারণ নাগরিকেরা পতাকা উত্তোলন করতে পারতেন না। ২০০২ সালে, এক নাগরিকের আপিলের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট সাধারণ নাগরিকদের জাতীয় পতাকা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার জন্য ভারত সরকারকে পতাকাবিধি সংস্কারের নির্দেশ দেন। সেই মতো ভারতের কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট পতাকাবিধি সংস্কার করে কয়েকটি সীমিত ক্ষেত্রে জাতীয় পতাকার ব্যবহার অনুমোদিত করে। ২০০৫ সালে পতাকাবিধি পুনরায় সংশোধন করে কয়েকটি বিশেষ ধরনের বস্ত্র ব্যবহারের অতিরিক্ত ব্যবস্থা করা হয়। পতাকা উড্ডীয়নের প্রথা ও অন্যান্য জাতীয় ও অ-জাতীয় পতাকাগুলির সঙ্গে জাতীয় পতাকা ব্যবহারের বিধিও পতাকাবিধিতে উল্লিখিত হয়েছে।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে ভারত ছিল ব্রিটিশ শাসনের অধীনে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হওয়ার আগে বিভিন্ন দেশীয় রাজ্যের শাসকেরা ভিন্ন ভিন্ন নকশার একাধিক পতাকা ব্যবহার করতেন। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পরে ভারত প্রত্যক্ষভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে এলে ভারতের তদনীন্তন ব্রিটিশ শাসকবর্গ একক ভারতীয় পতাকার ধারণাটি প্রথম উত্থাপন করেন। পাশ্চাত্য হেরাল্ডিক আদর্শে নির্মিত স্টার অফ ইন্ডিয়া ছিল কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া সহ অন্যান্য ব্রিটিশ উপনিবেশের পতাকাগুলির সমরূপীয়। ব্লু ও রেড এনসাইন পতাকাদুটির ঊর্ধ্ব-বাম কোয়াড্র্যান্টে থাকত ইউনিয়ন ফ্ল্যাগ এবং দক্ষিণার্ধ্বের মধ্যভাগে রাজমুকুট-বেষ্টিত একটি "স্টার অফ ইন্ডিয়া"। স্টারটি যে "ভারতীয়ত্ব"-এর প্রকাশক, তা বোঝাতে রানি ভিক্টোরিয়া তাঁর ভারতীয় প্রজাবর্গের প্রতিনিধিস্বরূপ সাম্রাজ্যের সেবায় "নাইট কম্যান্ডার অফ দি অর্ডার অফ দ্য স্টার অফ ইন্ডিয়া" নামে একটি পদ সৃষ্টি করেছিলেন। এরপর সকল দেশীয় রাজ্য বিকৃত রেড এনসাইন উড্ডীয়নের অধিকার সহ ইউরোপীয় হেরাল্ডিক মাপকাঠি-সম্মত প্রতীকসহ পতাকা লাভ করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রেড এনসাইন ব্রিটিশ ভারতের প্রতিনিধিরূপে সর্বাপেক্ষা অধিক গুরুত্ব অর্জন করেছিল। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ এবং ১৯৪৫-৪৭ সময়পর্বেজাতিসংঘে এই পতাকাটিই ভারতের পতাকা হিসেবে ব্যবহৃত হত। বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনতাপাশ থেকে মুক্তিলাভের উদ্দেশ্যে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন তার গুরুত্ব অর্জন করতে শুরু করলে, একটি জাতীয় পতাকার প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে অনুভূত হয়। ১৯০৪ সালে স্বামী বিবেকানন্দের আইরিশ শিষ্যা ভগিনী নিবেদিতা ভারতের প্রথম জাতীয় পতাকার রূপদান করেন। এই পতাকাটি ভগিনী নিবেদিতার পতাকা নামে অভিহিত হয়। লাল চতুষ্কোণাকার এই পতাকার কেন্দ্রে ছিল বজ্র ও শ্বেতপদ্মসম্বলিত একটি হলুদ ইনসেট। পতাকায় "বন্দে মাতরম" কথাটি বাংলায় লিখিত ছিল। লাল রং ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক, হলুদ বিজয়ের ও শ্বেতপদ্ম পবিত্রতার প্রতীক। ১৯০৬ সালের ৭ অগস্ট কলকাতার পার্সিবাগান স্কোয়ারে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী এক সভায় প্রথম ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা উত্তোলিত হয়। এই পতাকা উত্তোলন করেনশচীন্দ্রপ্রসাদ বসু। পতাকাটি কলকাতা পতাকা নামে পরিচিত হয়। এই পতাকায় উপরে, মধ্যে ও নিচে যথাক্রমে কমলা, হলুদ ও সবুজ রঙের তিনটি আনুভূমিক ডোরা ছিল। উপরের ডোরায় আটটি অর্ধ-প্রস্ফুটিত পদ্ম এবং নিচের ডোরায় সূর্য ও অর্ধচন্দ্র অঙ্কিত ছিল। মাঝে দেবনাগরী হরফে লিখিত ছিল "বন্দে মাতরম" কথাটি। ১৯০৭ সালের ২২ জুলাই জার্মানির স্টুটগার্ট শহরে ভিখাজি কামা অন্য একটি ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা উত্তোলন করেন। এই পতাকার উপরে ছিল সবুজ, মধ্যে গেরুয়া ও নিচে লাল রং। সবুজ রং ছিল ইসলামের প্রতীক ও গেরুয়া হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মের প্রতীক। সবুজ ডোরাটির উপর ব্রিটিশ ভারতের আটটি প্রদেশের প্রতীক হিসেবে আটটি পদ্মের সারি অঙ্কিত ছিল। মধ্যের ডোরায় দেবনাগরী হরফে "বন্দে মাতরম" কথাটি লিখিত ছিল এবং নিচের ডোরায় পতাকাদণ্ডের দিকে অর্ধচন্দ্র ও উড্ডয়নভাগের দিকে একটি সূর্য অঙ্কিত ছিল। ভিখাজি কামা, বীর সাভারকর ও শ্যামজি কৃষ্ণ বর্মা একযোগে এই পতাকাটির নকশা অঙ্কন করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে বার্লিন কমিটিতে ভারতীয় বিপ্লবীরা এই পতাকাটি গ্রহণ করেন। সেই থেকে এটি বার্লিন কমিটি পতাকা নামে অভিহিত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধেমেসোপটেমিয়ায় সক্রিয়ভাবে এই পতাকাটি ব্যবহৃত হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গদর পার্টি পতাকাটি কিছু সময়ের জন্য ভারতের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯১৭ সালে বাল গঙ্গাধর তিলক ও অ্যানি বেসান্ত পরিচালিত হোমরুল আন্দোলন একটি নতুন পতাকার জন্ম দেয়। এই পতাকায় পাঁচটি লাল ও চারটি সবুজ আনুভূমিক ডোরা ছিল। উপরের বাঁদিকে আয়তাকার ইউনিয়ন পতাকা ছিল আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষিত ডোমিনিয়ন মর্যাদা লাভের প্রতীক। উপরের উড্ডয়নভাগে ছিল সাদা অর্ধচন্দ্র ও তারা। হিন্দুদের পবিত্র সপ্তর্ষি মণ্ডলের প্রতীকরূপে সাতটি সাদা তারা পতাকায় খচিত ছিল। এই পতাকাটি অবশ্য সর্বসাধারণ্যে জনপ্রিয়তা অর্জনে ব্যর্থ হয়। এক বছর আগে ১৯১৬ সালে অধুনা অন্ধ্রপ্রদেশের মছলিপত্তনম শহরের নিকটস্থ ভাটলাপেনামারু গ্রামের বাসিন্দা পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া একটি সাধারণ জাতীয় পতাকার রূপদানের চেষ্টা করেন। তাঁর এই প্রচেষ্টা উমর সোবানি ও এস বি বোমানজির চোখে পড়ে। এঁরা একসঙ্গে ভারতীয় জাতীয় পতাকা মিশন হাতে নেন। ভেঙ্কাইয়া এই পতাকার জন্য মহাত্মা গান্ধীর অনুমোদন চাইতে গেলে গান্ধীজি তাঁকে "ভারতের মূর্তপ্রতীক ও দেশের সকল অমঙ্গলহারী" চরকার চিত্র পতাকায় যোগ করার পরামর্শ দেন। মহাত্মা গান্ধীর প্রদর্শিত পথে হস্তচালিত চরকা ছিল ভারতের অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের প্রতীক। ভেঙ্কাইয়া লাল ও সবুজ প্রেক্ষাপটে চরকার ছবি সম্বলিত একটি পতাকা প্রস্তুত করেন। কিন্তু গান্ধীজি মনে করেন, এই পতাকাটিতে ভারতের সকল ধর্মসম্প্রদায়ের প্রতিফলন ঘটেনি। মহাত্মা গান্ধীর ইচ্ছানুসারে একটি নতুন পতাকার নকশা করা হয়। এই ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকার উপরে ছিল সাদা, মধ্যে সবুজ ও নিচে নীল; যা যথাক্রমে সংখ্যালঘু ধর্মসম্প্রদায়, মুসলমান ও হিন্দুদের প্রতীক। তিনটি ডোরা জুড়ে খচিত ছিল চরকার ছবি। আনুভূমিক তেরঙা ডোরা সম্বলিত এই পতাকাটি আয়ারল্যান্ডের জাতীয় পতাকার সমরূপ ছিল। উল্লেখ্য, আয়ারল্যান্ডের পতাকা আরেকটি প্রধান ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিরোধী আন্দোলনের প্রতীক। জাতীয় কংগ্রেসের আমেদাবাদ অধিবেশনে এটি উত্তোলিত হয়। যদিও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকখনই এটিকে সরকারি পতাকা হিসেবে গ্রহণ করেনি। স্বাধীনতা আন্দোলনে এর ব্যাপক প্রয়োগও অন্যদিকে চোখে পড়ে না। পতাকার এই সাম্প্রদায়িক প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি অনেকের মনেই অসন্তোষ সৃষ্টি করে। ১৯২৪ সালে কলকাতায় সর্বভারতীয় সংস্কৃত কংগ্রেস হিন্দুধর্মের প্রতীক রূপে গেরুয়া রং ও বিষ্ণুর গদার চিত্র পতাকায় সংযোজনের প্রস্তাব দেয়। এই বছরই "হিন্দু যোগী ও সন্ন্যাসী এবং মুসলমান ফকির ও দরবেশদের মধ্যে প্রচলিত ত্যাগের প্রতীক" গেরু বা গিরিমাটি রং পতাকায় যোগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। শিখেরা দাবি তোলে, হয় তাদের প্রতিনিধিরূপে হলুদ রং পতাকায় রাখতে হবে, নয়তো পতাকা থেকে ধর্মীয় প্রতীকতত্ত্ব বাদ দিতে হবে। এই সব দাবির প্রেক্ষাপটে সমস্যা সমাধানের লক্ষে ১৯৩১ সালের ২ এপ্রিল কংগ্রেস কর্মসমিতি একটি সাত সদস্যের পতাকা সমিতি গঠন করে। "পতাকায় ব্যবহৃত তিনটি রং নিয়ে আপত্তি আছে; কারণ এই রংগুলি সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে চিহ্নিত" – এই মর্মে একটি প্রস্তাব পাস হয়। কিন্তু এই সকল অপ্রাতিষ্ঠিনিক আলাপ-আলোচনার ফলস্রুতিটি হয় অভাবনীয়। পতাকায় একটিমাত্র রং হলদেটে কমলা রাখা হয় এবং উপরের দণ্ডের দিকে চরকার চিত্র খচিত হয়। পতাকা সমিতি এই পতাকাটির প্রস্তাব রাখলেও, সমগ্র প্রকল্পে সাম্প্রদায়িক ভাবধারার প্রতিফলন ঘটেছে মনে করে, কংগ্রেস এই পতাকা গ্রহণ থেকে বিরত থাকে।
পরে ১৯৩১ সালের করাচি কংগ্রেস অধিবেশনে পতাকা সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রস্তাবটি পাস হয়। পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া অঙ্কিত একটি ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা গৃহীত হয়। এই পতাকায় আনুভূমিক গেরুয়া, সাদা ও সবুজের মধ্যস্থলে একটি চরকা খচিত ছিল। গেরুয়া ত্যাগ; সাদা সত্য ও শান্তি এবং সবুজ বিশ্বাস ও প্রগতির প্রতীক তথা চরকা ভারতের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ও দেশবাসীর শ্রমশীলতার প্রতীক হিসেবে গৃহীত হয়। একই সময় আজাদ হিন্দ ফৌজ ব্যবহৃত পতাকায় "Azad Hind" (আজাদ হিন্দ) কথাটি ও চরকার পরিবর্তে একটি লম্ফমান বাঘের ছবি যুক্ত করা হয়। এটি ছিলমহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের বিরুদ্ধে সুভাষচন্দ্র বসুর সশস্ত্র সংগ্রামের অনাস্থার প্রতীক। মণিপুরে প্রথমবার সুভাষচন্দ্র এই পতাকাটি উত্তোলন করেন। স্বাধীনতা প্রাপ্তির কয়েকদিন পূর্বে ভারতের জাতীয় পতাকার বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার জন্য গণপরিষদ স্থাপিত হয়। গণপরিষদ রাজেন্দ্র প্রসাদের নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। এই কমিটির সদস্যরা ছিলেন মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, সরোজিনী নাইডু, চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী, কে এম মুন্সি ও বি আর আম্বেডকর। পতাকা কমিটি স্থাপিত হয় ১৯৪৭ সালের ২৩ জুন। এই সময় এই কমিটি পতাকা নিয়ে আলোচনা শুরু করে। তিন সপ্তাহ পরে ১৯৪৭ সালের ১৪ জুলাই তাঁরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের পতাকাটি উপযুক্ত সংস্কারের পর সব দল ও সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণীয় করে তুলে জাতীয় পতাকা হিসেবে গৃহীত হবে। পরে এমন প্রস্তাবও গৃহীত হয় যে ভারতের জাতীয় পতাকার কোনো সাম্প্রদায়িক গুরুত্ব থাকবে না। চরকার পরিবর্তে সারনাথ স্তম্ভ থেকে ধর্মচক্র-টি গৃহীত হয় পতাকায়। ১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট স্বাধীন ভারতে প্রথমবার এই পতাকাটি উত্তোলিত হয়।
২০০২ সালের পূর্বাবধি ভারতের সাধারণ নাগরিকবৃন্দ জাতীয় ছুটির দিনগুলি ছাড়া অন্য সময়ে জাতীয় পতাকা উড্ডয়নের অধিকারী ছিলেন না। শিল্পপতি নবীন জিন্দাল পতাকাবিধি ভঙ্গ করে তাঁর কার্যালয় ভবনের শীর্ষে জাতীয় পতাকা উড্ডয়ন করলে পতাকাটি বাজেয়াপ্ত হয় এবং তাঁকে সতর্ক করে দেওয়া হয় যে এই ধরনের বিধি ভঙ্গ করলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। জিন্দাল দিল্লি হাইকোর্টেএকটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, পূর্ণ মর্যাদা ও যথাযথ ব্যবহারবিধি অনুসরণ করে জাতীয় পতাকা উড্ডয়ন তাঁর নাগরিক অধিকারের মধ্যে পড়ে; কারণ এটি দেশের প্রতি তাঁর ভালবাসা ব্যক্ত করার একটি উপায়। মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের হস্তান্তরিত হলে সর্বোচ্চ আদালত ভারত সরকারকে এই বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি স্থাপনের নির্দেশ দেন। কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট জাতীয় পতাকাবিধি সংস্কার করেন এবং ২০০২ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে সংশোধিত বিধি চালু হয়। এই নতুন পতাকাবিধি অনুযায়ী মর্যাদা, গৌরব ও সম্মান অক্ষুন্ন রেখে যে কোনো নাগরিক বছরের যে কোনো দিনই জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে পারেন। অন্যদিকে ভারতীয় সংঘ বনাম যশোবন্ত শর্মা মামলায় পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়, জাতীয় পতাকাবিধি বিধিবদ্ধ আইন না হলেও এই বিধির বিধিনিষেধগুলি জাতীয় পতাকার গৌরবরক্ষার্থে অবশ্য পালনীয়। জাতীয় পতাকা উড্ডয়নের অধিকার পরম অধিকার নয়; এটি অর্জিত অধিকার এবং সংবিধানের ৫১ ক ধারা অনুযায়ী এটি মান্য করা উচিত।
ভারতীয় আইন অনুসারে জাতীয় পতাকার ব্যবহার সর্বদা "মর্যাদা, আনুগত্য ও সম্মান" ("dignity, loyalty and respect") সহকারে হওয়া উচিত। "প্রতীক ও নাম (অপব্যবহার রোধ) আইন, ১৯৫০" ("The Emblems and Names (Prevention of Improper Use) Act, 1950") অনুসারে জারি করা "ভারতীয় পতাকা বিধি – ২০০২" ("Flag Code of India – 2002") পতাকার প্রদর্শনী ও ব্যবহার সংক্রান্ত যাবতীয় নির্দেশিকা বহন করে। সরকারি বিধিতে বলা হয়েছে, জাতীয় পতাকা কখনই মাটি বা জল স্পর্শ করবে না; এটিকে টেবিলক্লথ হিসেবে বা কোনো প্লাটফর্মের সম্মুখে আচ্ছাদন হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না; জাতীয় পতাকা দিয়ে কোনো মূর্তি, নামলিপি বা শিলান্যাস প্রস্তর আবরিত করা যাবে না ইত্যাদি। ২০০৫ সাল পর্যন্ত জাতীয় পতাকা বস্ত্র, উর্দি বা সাজপোষাক হিসেবে ব্যবহার করা যেত না। ২০০৫ সালের ৫ জুলাই সরকার পতাকাবিধি সংশোধন করে বস্ত্র বা উর্দি হিসেবে ব্যবহার করার অনুমতি প্রদান করেন। যদিও নিম্নাবরণ বা অন্তর্বাস হিসেবে জাতীয় পতাকা ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে। এছাড়াও বালিশের কভার বা গলায় বাঁধার রুমালে জাতীয় পতাকা বা অন্য কোনো প্রতীকচিহ্ন অঙ্কণ করা নিষিদ্ধ। ইচ্ছাকৃতভাবে উলটো অবস্থায় পতাকা উত্তোলন, কোনো তরলে ডোবানো বা উত্তোলনের আগে ফুলের পাপড়ি ছাড়া অন্য কিছু তাতে বাঁধা বা পতাকাগাত্রে কোনো কিছু লেখাও নিষিদ্ধ।
No comments:
Post a Comment