সংস্কারের সূর্যোদয়ে ভারত - Breaking Bangla

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Wednesday, 17 January 2018

সংস্কারের সূর্যোদয়ে ভারত




গণতান্ত্রিক অর্থনীতি সংস্কার

জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট সরকারের আমলে ভারত বিশ্বের মধ্যে দ্রুত বর্ধনশীল বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।এই বছরটি ভারতীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক বছর ছিল। কম বৃদ্ধির হারউচ্চ মুদ্রাস্ফীতির হার এবং কমে যাওয়া উৎপাদনের হার থেকে এন ডি এ সরকার যে কেবলমাত্র আমাদের অর্থনীতির সাধারণ পর্যায়ের সূচকগুলিকে শক্তিশালী করেছে তাই নয়অর্থনীতিকে উচ্চ হারে বৃদ্ধির রাস্তায় নিয়ে গেছে। ভারতের জাতীয় আয় বৃদ্ধির হার ৭.৪ শতাংশের মতো উচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। এই হার বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতির দেশের মধ্যে দ্রুততম বলে বিবেচিত হয়েছে hi ।


বিভিন্ন রেটিং সংস্থা ও বিশেষজ্ঞ গোষ্ঠী এন ডি এ সরকারের আমলে ভারতীয় অর্থনীতির বৃদ্ধির হার দ্রুত হবে বলে পূর্বাভাষ দিয়েছে। শক্তিশালী অর্থনৈতিক সূচক ও সরকারের সংস্কারের কর্মসূচির ওপর ভিত্তি করে রেটিং সংস্থা মুডিস’ ভারতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মানকে স্থিতিশীল’ থেকে বাড়িয়ে ইতিবাচক’ বলে ঘোষণা করেছে। ব্রিক্‌স’ গোষ্ঠীর সূচনার সময়য় অনেকে মনে করেছিলেন ভারতএই গোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্তির মতো পরিস্থিতিতে নেই। ভারতের পরিস্থিতিকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছিল। আর এখন ভারতই ব্রিক্‌সকে বৃদ্ধির ইঞ্জিন হিসাবে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

উৎপাদন ক্ষেত্রে সরকারের গুরুত্বের ফলে শিল্প উৎপাদনের সূচকগত বছরের ঋণাত্মক বৃদ্ধি থেকে সরে এসে চলতি বছরে ২.১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মুদ্রাস্ফীতির (পাইকারি মূল্য সূচকহারও ক্রমাগত কমছে। ২০১৪র এপ্রিল মাসে এই হার ৫.৫৫ শতাংশ থেকে কমে ২০১৫র এপ্রিলে ২.৬৫ শতাংশ হয়েছে। প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নি ঐতিহাসিক গতিতে বাড়ছে। এক্ষেত্রে ইক্যুইটির পরিমাণ ৪০ শতাংশ বেড়ে গত বছরের ১,২৫,৯৬০ কোটি টাকা থেকে চলতি বছরে ১,৭৫,৪৪৫ কোটি টাকা হয়েছে।

রাজকোষ ঘাটতির হারও ক্রমাগত কমে চলেছে। ভারতের চলতি খাতে ঘাটতির হার গত বছরের জাতীয় আয়ের ৪.৭ শতাংশ থেকে কমে ১.৭ শতাংশ হয়েছে। ভারতে বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এটি ৩১,১৮০ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ৩৫,২১০ কোটি ডলার হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির টালমাটাল অবস্থা এর ফলে সামাল দেওয়া যাবে।


বেটি বাঁচাওবেটি পড়াও’ : কন্যাসন্তানের শিক্ষা ও সুরক্ষার লক্ষ্যে

আমাদের মন্ত্র হওয়া উচিৎ বেটা বেটিএক সম্মান
আসুনকন্যাসন্তানের জন্মকে আমরা স্বাগত জানাই। পুত্র-সন্তানের পাশাপাশি কন্যাসন্তানদের জন্যও আমাদের সমান গর্বিত হওয়া উচিত। কন্যাসন্তানের জন্মকে স্মরণীয় করে রাখতে পাঁচটি গাছের চারা রোপণ করুন - এই আবেদন জানাই আপনাদের কাছে।
জয়াপুর গ্রামের নাগরিকদের উদ্দেশে একথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী। ঐ গ্রামটি তিনি বেছে নিয়েছিলেন আদর্শ গ্রাম রূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে।
বেটি বাঁচাওবেটি পড়াও’ কর্মসূচির সূচনা ২২ জানুয়ারি২০১৫ তারিখে হরিয়ানার পানিপথে।এর সূচনা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। কন্যাসন্তানের জন্মহার ক্রমশ হ্রাস পাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলির কার্যকর মোকাবিলায় এই কর্মসূচিটির কথা চিন্তাভাবনা করা হয়। একইসঙ্গে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টিকে যুক্ত করা হয় এই কর্মসূচির বিশেষ ধারণাটির সঙ্গে। কেন্দ্রীয় নারী ও শিশুবিকাশ মন্ত্রকস্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রক এবং মানবসম্পদ মন্ত্রকের পারস্পরিক প্রচেষ্টার সমন্বয়ে রূপায়িত হচ্ছে বেটি বাঁচাওবেটি পড়াও’ কর্মসূচিটি।
পিসি অ্যান্ড পিএনডিটি আইন বলবৎ করা এবং সারা দেশে কন্যাসন্তানের বিকাশ সম্পর্কে সচেতনতা প্রসারের লক্ষ্যে কর্মসূচিটির প্রথম পর্যায়ে বেছে নেওয়া হয় ১০০টি গ্রামকে। প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার প্রসার সহ জনমানসে কন্যাসন্তান সম্পর্কে চিন্তাভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয় এই কর্মসূচি রূপায়ণের সময়।
কন্যাসন্তানের জন্ম সম্পর্কে বহুকাল ধরে চলে আসা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে বিশেষভাবে সচেষ্ট রয়েছে কেন্দ্রের এনডিএ সরকার। প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে হরিয়ানার বিবিপুর গ্রামের প্রধানের ভূমিকার বিশেষ প্রশংসা করেন। কারণকন্যাসন্তানের সঙ্গে একটি সেলফি অর্থাৎনিজস্বী তোলার জন্য বিশেষ আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন ঐ গ্রাম প্রধান। এই ঘটনার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী সাধারণ মানুষের কাছে আহ্বান জানিয়েছিলেনকন্যাসন্তানের সঙ্গে একত্রে সেলফি তোলার উদ্যোগ গ্রহণের জন্য। বলা বাহুল্যতাঁর এই আহ্বানে অনুপ্রাণিত হয়ে বহু সংখ্যক মানুষ এগিয়ে এসেছিলেন কন্যাসন্তানের সঙ্গে সেলফি তোলার কাজে। শুধু ভারতেই নয়বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এই ধরনের কাজে সামিল হতে। নিঃসন্দেহে তা ছিল এক গৌরবজনক ঘটনা।
বেটি বাঁচাওবেটি পড়াও’ কর্মসূচিটির সূচনার পর থেকে দেশের প্রায় সবকটি রাজ্যেই জেলা পর্যায়ে বহুক্ষেত্রীয় কার্যপরিকল্পনা গড়ে তোলা হয়েছে। জেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মী,বিশেষত সামনের সারিতে থেকে যাঁরা কাজকর্ম দেখাশোনা করেন তাঁদের দক্ষতাবৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে বেশ কিছু ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়। কেন্দ্রীয় নারী ও শিশুবিকাশ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে ২০১৫-র এপ্রিল থেকে অক্টোবর - এই সাত মাসে বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির জন্য আয়োজন করা হয় নটি প্রশিক্ষণ 


স্থানীয় উদ্যোগ
বেটি বাঁচাওবেটি পড়াও’ কর্মসূচি রূপায়ণে কন্যাসন্তানের শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার কাজে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে পিথোরাগড় জেলা কর্তৃপক্ষ। এই লক্ষ্যে জেলা ও ব্লক পর্যায়ে গড়ে তোলা হয় পৃথক পৃথক টাস্ক ফোর্স। কন্যাসন্তানের জন্মহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে বৈঠকের আয়োজন করে এই টাস্ক ফোর্সগুলি। কন্যাসন্তানের কল্যাণে বিভিন্ন কর্মপন্থাও চূড়ান্ত করা হয়। সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে কন্যাসন্তানের সুরক্ষার বার্তা পৌঁছে দিতে আয়োজিত হয় সচেতনতা প্রসার সম্পর্কিত কর্মসূচি। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসেনা স্কুলরাজ্য সরকারি দপ্তরগুলির কর্মচারি সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে আয়োজন করা হয় র‍্যালির।
বেটি বাঁচাওবেটি পড়াও’ সম্পর্কে জনসচেতনতার প্রসারে পিথোরাগড় জেলায় পথ-নাটিকারও আয়োজন করা হয়েছে। শুধুমাত্র গ্রামেই নয়গ্রামীণ হাট-বাজারেও পথ-নাটিকার মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে এই কর্মসূচির মূল বার্তাটিকে। পথ-নাটিকাগুলি থেকে গ্রামীণ এলাকার অধিবাসীরা উপলব্ধি করছেন কন্যাসন্তানের সুরক্ষা ও শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার দিকটি। কন্যাসন্তানের সমর্থনে স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযানেরও আয়োজন করা হয়েছে। স্নাতকোত্তর কলেজগুলির ৭০০ ছাত্রছাত্রী কন্যাসন্তানের সুরক্ষায় শপথ ও অঙ্গীকারগ্রহণ করে। বেশ কিছু সেনাকর্মীও সঙ্কল্প গ্রহণ করেছেন কন্যাসন্তানের সুরক্ষা ও শিক্ষার কাজে আত্মনিয়োগ করার।
কন্যাসন্তানদের নিজেদের মধ্যেই যাতে শিক্ষা সম্পর্কে সচেতনতার মানসিকতা গড়ে ওঠে সেই লক্ষ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করে পাঞ্জাবের মনসা জেলা কর্তৃপক্ষ। উড়ান – স্বপ্নেয়া দি দুনিয়া দি রুবারু’, (উড়ান একদিনের জন্যতোমার স্বপ্নকে সফল করে তোল) নামে একটি কর্মসূচি গ্রহণ করেমনসার প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ। এর মাধ্যমে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত পাঠরত ছাত্রীদের কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করা হয়। একদিনের জন্য তাঁরা কি হতে ইচ্ছুক তা জানতেই এই প্রস্তাব আহ্বান। চিকিৎসকপুলিশ অফিসারপ্রযুক্তিবিদআইএসএস কিংবা অন্য কোন্‌ পেশার সঙ্গে তাঁরা যুক্ত হতে চায় তা তাঁদের একদিনের অভিনয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
এই উদ্যোগে সাড়া মিলেছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। ৭০ জনেরও বেশি ছাত্রী একদিনের জন্য তাঁদের পেশাদারী ভূমিকা ফুটিয়ে তোলার সুযোগ লাভ করেছে। ঐ দিনটিতে পেশাদার ব্যক্তি হিসেবে কাজ করার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার সুযোগ দেওয়া হয় তাঁদের। ভবিষ্যতে একজন পেশাদার কর্মী হয়ে ওঠার জন্য কন্যাসন্তানদের সাহায্য ও সহযোগিতা করাই এই উদ্যোগের বিশেষ লক্ষ্য।


জ্যাম’ : জন ধনআধার ও মোবাইলের সমন্বয়ে এক অভিনব ভর্তুকি ও বিমা কর্মসূচি

জ্যাম’ সম্পর্কে ধারণা ও চিন্তাভাবনার মূলে রয়েছে অনেকগুলি উদ্যোগ ও কর্মসূচি যা আগামীদিনে এক এক করে রূপায়িত হতে চলেছে। আমার কাছে তাই জ্যাম’-এর অর্থ জাস্ট অ্যাচিভিং ম্যাক্সিমাম’, অর্থাৎসর্বোচ্চ সাফল্যের লক্ষ্যে।
প্রতিটি অর্থের ব্যয় থেকে সর্বোচ্চ সুফল লাভ করতে হবে
দেশের দরিদ্র মানুষের জন্য সর্বোচ্চ ক্ষমতায়নসম্ভব করে তুলতে হবে
দেশের জনসাধারণের জন্য সর্বোচ্চ মাত্রায় প্রযুক্তির প্রয়োগ ও ব্যবহার বাস্তবায়িত করে তোলা প্রয়োজন.
-নরেন্দ্র মোদী
স্বাধীনতার ৬৭ বছর পরেও ভারতের এক বিশাল সংখ্যক মানুষ ব্যাঙ্ক পরিষেবার সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত। এর অর্থএকদিকে যেমন সঞ্চয়ের কোন পথ তাঁদের সামনে খোলা নেইঅন্যদিকে তেমনই প্রাতিষ্ঠানিক ঋণলাভের কোন সুযোগও তাঁদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়নি। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনার সূচনা করেন ২০১৪-র ২৮ আগস্ট। এর মূল উদ্দেশ্য উল্লেখিত সমস্যাগুলির গ্রহণযোগ্য সমাধান। সূচনার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই এই কর্মসূচিটি কোটি কোটি ভারতবাসীর জীবনযাত্রায় নিয়ে আসে এক আমূল পরিবর্তন। সেইসঙ্গেতাঁদের ভবিষ্যতও হয় সুরক্ষিত। মাত্র এক বছরের মধ্যেই ১৯ কোটি ৭২ লক্ষ নতুন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। বন্টন করা হয় ১৬ কোটি ৮০ লক্ষ রূপে ডেবিট কার্ড। আমানত জমা পড়ে ২৮,৬৯৯ কোটি ৬৫ লক্ষ টাকার মতো। রেকর্ড সংখ্যক ১,২৫,৬৯৭ব্যাঙ্ক মিত্র’ অর্থাৎব্যাঙ্ক প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়েছে এই সময়কালের মধ্যে। মাত্র এক সপ্তাহকালের মধ্যে ১ কোটি ৮০ লক্ষ ৯৬ হাজার ১৩০টি নতুন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার সুবাদে ভারতের এই সাফল্য স্থান করে নেয় গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে।
এই ধরনের কোটি কোটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার বিষয়টি ছিল নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জপূর্ণ। কারণব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য দেশের সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করে তোলার কাজটিও ছিল কম চ্যালেঞ্জের নয়। সরকার গৃহীত উদ্যোগের ফলশ্রুতিতে শূন্য’ জমার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ২০১৪-র ৭৬.৮ শতাংশ থেকে ২০১৫-র ডিসেম্বরে ব্যাপকভাবে নেমে আসে ৩২.৪ শতাংশে। মোট ওভারড্রাফ্‌ট গ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় ১৩১ কোটি টাকারও বেশি।
এই সমস্ত কিছু সম্ভব করার মূলে ছিল প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ আগ্রহ ও উৎসাহ এবং সেইসঙ্গে দেশের আপামর সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরকার ও প্রশাসনের সমন্বয় ও যোগাযোগ সাধনের প্রক্রিয়া। এই বিশাল কাজটি হাতে নেওয়া হয় একটি মিশন হিসেবে। সরকারের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সেতুবন্ধন রূপে গড়ে তোলা হয় এই কর্মসূচিটিকে।
কোটি কোটি মানুষ এইভাবে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার কাজে এগিয়ে আসায় একদিকে যেমন ব্যাঙ্ক পরিষেবার সুযোগ তাঁদের কাছে আজ উন্মুক্ত হয়েছেঅন্যদিকে তেমনই দুর্নীতি দমন ও বন্ধ করার কাজেও এসেছে এক বড় ধরনের সাফল্য। সরকার প্রদত্ত বিভিন্ন ভর্তুকির অর্থ এখন সরাসরি জমা পড়ে গ্রহীতার নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। এর ফলেযাবতীয় কারচুপি ও ফাঁকফোকর বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থারও অবসান ঘটানো হয়েছে। সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ভর্তুকি সহায়তা জমা পড়ার কর্মসূচি পহল’ যোজনা বিশ্বে এ ধরনের একটি বৃহত্তম কর্মসূচি হিসেবে স্থান পেয়েছে গিনেজ বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস্‌-এ। পহল’ যোজনার আওতায় এলপিজি-র ওপর প্রদেয় ভর্তুকি সরাসরি জমা পড়ে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। এর মাধ্যমে ১৪ কোটি ৬২ লক্ষেরও বেশি মানুষ সরাসরি নগদ ভর্তুকি লাভের সুযোগ পাচ্ছেন। শুধু তাই নয়৩ কোটি ৩৪ লক্ষের মতো ভুয়ো অ্যাকাউন্ট চিহ্নিত করে সেগুলিকে বাতিল করার কাজও এই কর্মসূচি রূপায়ণের ফলে সম্ভব হয়েছে। আর এইভাবে সাশ্রয় হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকার। বর্তমানে সরকার ৩৫ থেকে ৪০টির মতো কর্মসূচির ক্ষেত্রে এইভাবে ভর্তুকি সহায়তাদানের ব্যবস্থা চালু করেছে। ২০১৫ সালে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা এইভাবে জমা পড়ে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলিতে।
এইভাবে ব্যাঙ্ক পরিষেবার সুযোগসুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি দেশের নাগরিকদের জন্য বিমা ও পেনশনের সুযোগ সম্প্রসারণের এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে কেন্দ্রের এনডিএ সরকার। বছরে মাত্র ১২ টাকা প্রিমিয়ামের বিনিময়ে ২ লক্ষ টাকার দুর্ঘটনা বিমা লাভের সুযোগ পৌঁছে দেওয়া হয় প্রধানমন্ত্রী সুরক্ষা বিমা যোজনার আওতায়। প্রধানমন্ত্রী জীবন জ্যোতি বিমা যোজনার আওতায় বিমা গ্রহীতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে জীবন বিমার সুযোগ। এজন্য বছরে প্রদেয় প্রিমিয়ামের কিস্তি মাত্র ৩৩০ টাকা। অন্যদিকে, ‘অটল পেনশন যোজনায়’ মাসে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশনের সুযোগ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে যোজনা গ্রহীতার কাছে। ৯ কোটি ২০ লক্ষেরও বেশি নাগরিক প্রধানমন্ত্রী সুরক্ষা বিমা যোজনায় যোগ দিয়েছেন। অন্যদিকেপ্রায় ৩ কোটি মানুষ গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী জীবন জ্যোতি বিমা যোজনা। অটল পেনশন যোজনার সুযোগ লাভ করেছেন ১৫ কোটি ৮৫ লক্ষের মতো মানুষ।


পল্লী উন্নয়নের লক্ষ্যে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি : সাংসদ আদর্শ গ্রাম যোজনা


সাংসদ আদর্শ গ্রাম যোজনার সূচনা উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন,
উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমরা একটি বিশেষ সমস্যার সম্মুখীন হই। আমাদের উন্নয়নসূচির আদর্শ ছিল একতরফাভাবে কোন কিছু রূপায়ণ করে যাওয়া। লক্ষ্ণৌগান্ধীনগর কিংবা দিল্লির জন্য কোন প্রকল্প রচনা করা হলে সেটিকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হত অন্যান্য এলাকা বা অঞ্চলগুলিতেও। কিন্তু এই আদর্শ অনুসরণ করার পরিবর্তে আমরা চাহিদা ও প্রয়োজনভিত্তিক উন্নয়নের দিকেই দৃষ্টি ফেরাতে চাই। আর এই কারণেই আদর্শ গ্রাম গড়ে তোলা আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। উন্নয়নের চাহিদা বা প্রয়োজনীয়তার দিকটি তাই গ্রাম পর্যায়ে প্রথম অনুভূত হওয়া প্রয়োজন।
আমাদের প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। সাধারণ মানুষের হৃদয় জয়ের লক্ষ্যে সকলকে সঙ্গে নিয়ে আমরা এগোতে চাই। সাংসদরা সাধারণত রাজনৈতিক আচরণের মধ্যেই তাঁদের কাজকর্মকে সীমাবদ্ধ রাখতেন। কিন্তু এখন থেকে যখন আপনারা গ্রামে পা দেবেনতখন সেখানে রাজনৈতিক তৎপরতা আপনারা দেখতে পাবেন না। সমস্ত গ্রামকেই মনে হবে যেন একটিমাত্র পরিবার। গ্রামবাসীদের সঙ্গে একসঙ্গে মিলিত হয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এই ব্যবস্থা গ্রামগুলিকে শুধু ঐক্যবদ্ধই করবে নাউৎসাহ ও উদ্দীপনাও সঞ্চারিত হবে গ্রাম জীবনে 
সাংসদ আদর্শ গ্রাম যোজনার সূচনা ১১ অক্টোবর২০১৪ তারিখে। ভারতে আদর্শ গ্রামের যে স্বপ্ন দেখতেন মহাত্মা গান্ধী তাকে বাস্তবায়িত করতেই এই কর্মসূচিটির কাজ শুরু করা হয়েছে পরিবর্তিত প্রেক্ষিত ও পরিস্থিতিকে অনুসরণ করে। সাংসদ আদর্শ গ্রাম যোজনার আওতায় প্রত্যেক সাংসদ একটি করে গ্রাম বেছে নিয়ে সেখানকার সার্বিক উন্নয়নের দিকে নজর দেবেন। এই কাজে পরিকাঠামো প্রসারের সঙ্গে গ্রামের সামাজিক দিকটির ব্যাপক উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেবেন তাঁরা। আদর্শ গ্রাম’ তাই হয়ে উঠবে উন্নয়নপরিচালন ও প্রশাসনের এক ভিত্তিভূমি যা অনুপ্রাণিত করবে গ্রাম পঞ্চায়েতগুলিকেও।
সাংসদের নেতৃত্বেই গ্রামের উন্নয়ন প্রকল্পটি প্রস্তুত করা হয়। এই কাজে সাংসদকে সাহায্য ও সহযোগিতা করে গ্রামবাসীরা। গ্রামবাসীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে এবং বৈজ্ঞানিক পন্থা-পদ্ধতি অনুসরণ করে শুরু হয় গ্রামোন্নয়নের কাজ। তার আগে প্রকল্পের খুঁটিনাটি পেশ করা হয় সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের কাছে। রাজ্য পর্যায়ের এক বিশেষ ক্ষমতাপ্রাপ্ত কমিটি এই প্রকল্প সম্পর্কিত রিপোর্টটি পর্যালোচনার পর প্রয়োজনবোধে পরামর্শ দেন কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তনের। এরপরসহায়সম্পদের বন্টন করা হয় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে। সাংসদ আদর্শ গ্রাম যোজনা’ সম্পর্কিত গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রকল্পগুলিকে অগ্রাধিকারদানের লক্ষ্যে এ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রক ও দপ্তরের ২১টি কর্মসূচিকে সংশোধন করা হয়েছে।
জেলা পর্যায়ে সাংসদের নেতৃত্বে প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েতের জন্য পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় প্রতি মাসে। অংশগ্রহণকারী সরকারি দপ্তরগুলির প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে প্রতিটি প্রকল্পের কাজ পর্যালোচনা করে দেখার পর সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা হয় সংশ্লিষ্ট রাজ্য প্রশাসনকে। ২০১৬-র মধ্যে প্রত্যেক সাংসদ একটি করে গ্রাম বেছে নেবেন আদর্শ গ্রাম হিসেবে তাকে গড়ে তোলার লক্ষ্যে। ২০১৯ সালের মধ্যে দুটি করে গ্রাম বেছে নেবেন সাংসদরা। আগামী ২০২৪ সালের মধ্যে আরও পাঁচটি গ্রামকে তাঁরা আদর্শ গ্রামে রূপান্তরিত করবেন। এ পর্যন্ত সাংসদরা ৬৯৬টি গ্রাম পঞ্চায়েতকে আদর্শ গ্রাম গড়ে তোলার কর্মসূচির আওতায় নিয়ে এসেছেন।
আদর্শ গ্রাম গড়ে তোলার কাজকর্মে সমন্বয় নিশ্চিত করতে প্রত্যেক জেলা কালেক্টর দায়িত্ব দিয়েছেন একজন করে চার্জ অফিসারের ওপর। রূপায়ণের বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব তাঁদের। দেশের নটি অঞ্চলে ৬৫৩ জন চার্জ অফিসারের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে কেন্দ্রীয় পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রক। জাতীয় স্তরে ভোপালে একটি কর্মশালার আয়োজন করা হয় ২০১৫-র ২৩ ও ২৪ সেপ্টেম্বর তারিখে। কেন্দ্রীয় পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রক আয়োজিত এই কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন সাংসদজেলা কালেক্টরগ্রাম প্রধান সহ রাজ্য সরকারগুলির প্রতিনিধিরা। মন্ত্রকের জাতীয় পর্যায়ের একটি কমিটি উন্নয়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে যে প্রদর্শনীর আয়োজন করে তা থেকেও আদর্শ গ্রাম গড়ে তোলার কাজ সম্পর্কে শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা লাভ করে সংশ্লিষ্ট অংশগ্রহণকারীরা। সাংসদ আদর্শ গ্রাম যোজনার আওতায় গ্রাম পঞ্চায়েতগুলির উন্নয়ন ও অগ্রগতি খতিয়ে দেখতে পঞ্চায়েত দর্পণ’ হিসেবে ৩৫টি নির্ণায়ক ব্যবস্থাও গড়ে তোলে কেন্দ্রীয় পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রক।
সাংসদ আদর্শ গ্রাম যোজনা : কয়েকটি সাফল্যের কাহিনী
জম্মু ও কাশ্মীরের কুপওয়াড়া জেলার ত্রেহ্‌গাম ব্লকের লেদারওয়ান গ্রামে অধিবাসীদের মূল জীবিকা কৃষিকর্ম। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কৃষির বিকাশের লক্ষ্যে গ্রামের ৩৭৯ জন কৃষকের মোবাইল নম্বরের সঙ্গে যুক্ত করা হয় কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রটিকে। কেন্দ্রের পক্ষ থেকে জল-হাওয়া সম্পর্কিত বিভিন্ন পূর্বাভাসের খবর মোবাইল বার্তায় পাঠানো হয় সংশ্লিষ্ট কৃষিজীবী মানুষদের কাছে। শুধু তাই নয়শস্যের উৎপাদন ও ফলন সম্পর্কেও বিভিন্ন ধরনের তথ্য পৌঁছে দেওয়া হয় মোবাইল বার্তার মাধ্যমে। সাংসদ শ্রী মুজফফর হোসেন বেগ-এর পরামর্শে ও নেতৃত্বে এই কাজ শুরু করা হয়। এর সুবাদে কৃষকরা এখন নিয়মিতভাবে তাঁদের মোবাইল ফোনে কৃষি সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্যের খোঁজখবর পাচ্ছেন। শস্যবীজ বপনের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণমাটি পরীক্ষাশস্য সুরক্ষাফসল তোলার পরবর্তী পর্যায়ে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিপণন সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এখন পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে কৃষিজীবী মানুষদের মোবাইলে। এর ফলেশস্যের উৎপাদন ও বিপণন সম্পর্কে বিশেষভাবে ওয়াকিবহাল হচ্ছেন গ্রামবাসীরা।
তামিলনাড়ুর শিবগঙ্গা জেলার মারাভামঙ্গলম গ্রামটিকে বেছে নেওয়া হয় আদর্শ গ্রাম’-এ রূপান্তরের লক্ষ্যে। এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন রাজ্যসভার সাংসদ ডঃ ই এম সুদর্শন নাচিয়াপ্পান। গ্রামের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে এবং গ্রামীণ মানুষের জীবনধারণের মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করেন তিনি। নারকেল ছোবড়ার ব্যবহার এবং নারকেল চাষ সম্পর্কে গ্রামবাসীদের জন্য প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করা হয়। জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় কয়েকটি সচেতনতামূলক কর্মসূচিরও ব্যবস্থা করেন সংশ্লিষ্ট সাংসদ। এর উদ্যোগ-আয়োজনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন আলাগাপ্পা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ভারতের কয়্যার পর্ষদনারকেল উন্নয়ন পর্ষদ এবং কেন্দ্রীয় চর্ম গবেষণা ইনস্টিটিউটের সঙ্গে ব্যবস্থাক্রমে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে প্রশিক্ষণেরও আয়োজন করেন সাংসদ।
সফল শিল্পোদ্যোগী হয়ে ওঠার কাজে গ্রামবাসীদের শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত করে তোলার লক্ষ্যে নারকেলের ছোবড়ার ব্যবহার সম্পর্কে দুমাসের এক প্রশিক্ষণসূচির ব্যবস্থা করা হয় সাংসদের উদ্যোগে। প্রশিক্ষণ সংস্থাগুলির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা গড়ে তোলেন তিনি। প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলিতে অংশগ্রহণ করেন ২৫৯ জন গ্রামবাসী। এদের মধ্যে নারকেল ছোবড়ার ব্যবহার সম্পর্কে প্রশিক্ষণ নেন ১২০ জন মহিলা। চামড়ার ব্যবহার সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ১১২ জনকে। অন্যদিকেনারকেল চাষ সম্পর্কে প্রশিক্ষিত করা হয় ২৭ জন গ্রামবাসীকে। প্রশিক্ষণ শেষে জেলা প্রশাসন এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাপকদের পক্ষ থেকে সর্বতোভাবে প্রচেষ্টা চালানো হয় সফল প্রশিক্ষণার্থীদের নিজস্ব শিল্পোদ্যোগ গড়ে তুলতে আর্থিক সহায়তাদানের লক্ষ্যে। সামাজিক শিল্পোদ্যোগ গঠনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করতে গ্রামবাসীদের সাহায্য ও সহযোগিতা করার লক্ষ্যেই রূপায়িত হয় এই বিশেষ কর্মসূচি।
ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূমের দুর্গম ও প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে বয়ঃসন্ধিতে উপনীত মেয়েদের স্বাস্থ্যরক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রসারে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি হাতে নেওয়ার কথা চিন্তা করেন সাংসদ বিদ্যুৎ বরন মাহাতো। তিনি অনুভব করেছিলেন যে এই বিশেষ দিকটি সম্পর্কে এর আগে সেভাবে তেমন চিন্তাভাবনা করা হয়নি। গ্রামের মহিলা ও কিশোরী এবং তরুণীদের মধ্যে রক্তাল্পতা সহ অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি তিনি বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছিলেন। তাইএই পরিস্থিতির মোকাবিলায় কিশোরী ও তরুণীদের জন্য তিনি আয়োজন করেন কয়েকটি স্বাস্থ্য শিবিরের। এই স্বাস্থ্য শিবিরগুলি অনুষ্ঠিত হয় কস্তুরবা গান্ধী বালিকা বিদ্যালয়ে। ১৮৮ জনেরও বেশি তরুণী ও কিশোরীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয় এই শিবিরগুলিতে। স্বাস্থ্য পরীক্ষা থেকে বেরিয়ে আসে প্রকৃত সত্যটি। দেখা যায়মেয়েদের অনেকেই মূত্রাশয়ের সংক্রমণ এবং চর্মরোগ সহ নানা ধরনের অসুখ-বিসুখের শিকার যা এতদিন পর্যন্ত সামাজিক তথা সাংস্কৃতিক অভ্যাস ও সংস্কারবশে গোপন রাখা হয়েছিল।
স্বাস্থ্য পরীক্ষায় আরও দেখা যায়মেয়েদের স্বাস্থ্যহানির পেছনে রয়েছে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা। তাইশুরু করা হয়েছে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যরক্ষা সম্পর্কে কিশোরী ও তরুণীদের মধ্যে সচেতনতা প্রসার সম্পর্কিত বিভিন্ন কর্মসূচি। এই ব্যবস্থা নিয়মিতভাবে চালু রাখা হবে সংশ্লিষ্ট গ্রামগুলিতে।



শিল্পোদ্যোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে উদার দৃষ্টিভঙ্গি :উৎসাহ ও ক্ষমতার মেলবন্ধন


আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে ভারতে শিল্পোদ্যোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে রয়েছে অফুরন্ত শক্তি ও উৎসাহ। এই বিষয় দুটিকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। আর এইভাবেই আমাদের জাতি হয়ে উঠবে কর্মপ্রার্থী নয়কর্মদাতা। - নরেন্দ্র মোদী
শিল্পোদ্যোগের বিষয়টিকে উৎসাহিত করতে এনডিএ সরকার বিশেষভাবে সচেষ্ট। মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচিটি গড়ে উঠেছে চারটি স্তম্ভকে ভিত্তি করে। শুধুমাত্র নির্মাণ বা উৎপাদন ক্ষেত্রেই নয়অন্যান্য ক্ষেত্রেও শিল্পোদ্যোগকে উৎসাহ যোগানো এই কর্মসূচিটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
নতুন প্রক্রিয়া : শিল্পোদ্যোগ সংক্রান্ত কাজকর্মে উৎসাহযোগানোর লক্ষ্যে মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বাণিজ্যিক কাজকর্ম সহজতর করে তোলার ওপর।
নতুন পরিকাঠামো: দেশের বিকাশ ও উন্নয়নের স্বার্থে আধুনিক এবং সহায়ক পরিকাঠামো গড়ে তোলা একান্ত জরুরি। পরিকাঠামোভিত্তিক অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্ভব করে তুলতে সরকার শিল্প করিডর এবং স্মার্ট নগরী গড়ে তুলতে আগ্রহী। এই লক্ষ্যে উচ্চ গতিসম্পন্নআধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সংহত ও সার্বিক এক পদ্ধতি অনুসরণের মধ্য দিয়ে এই কাজ সম্পন্ন করা হবে।
নতুন নতুন ক্ষেত্র : মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির আওতায় নির্মাণ ও উৎপাদনপরিকাঠামো এবং পরিষেবা সংক্রান্ত কর্মপ্রচেষ্টার ক্ষেত্রে ২৫টি ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ ও অংশীদারদের মধ্যে এ সম্পর্কিত তথ্য বিনিময়ের সুযোগও সম্প্রসারিত হয়েছে।
নতুন দৃষ্টিভঙ্গি : সরকারকে শিল্পের নিয়ন্ত্রক হিসেবে এতদিন ভাবা হত। কিন্তু মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচি এই ধারণায় আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এখানে সরকার শিল্পের নিয়ন্ত্রক মাত্র নয়শিল্প-বান্ধবও বটে। তাইসরকার তার কর্মপ্রচেষ্টাকে শুধুমাত্র নিয়ন্ত্রণ রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে আগ্রহী নয়বরংসরকারের ভূমিকা এখানে শিল্পের উপযোগী সুযোগ-সুবিধার নিয়ামক হিসাবে।
শিল্পোদ্যোগকে তিনটি উপায়ে উৎসাহদানের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। এই তিনটি কৌশলসূত্র হল নীতি ও পদ্ধতি অনুসরণ করে কাজকর্ম চালু রাখামূলধনের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং বরাত দেওয়ার ব্যবস্থাকে দ্রুত বাস্তবায়িত করা।
নীতি ও পদ্ধতি অনুসরণ করে কাজকর্ম চালু রাখা
বাণিজ্যিক কাজকর্মকে সহজতর করে তোলার কাজে ভারত যে দ্রুত সাফল্য অর্জন করেছে বিশ্ব ব্যাঙ্কের র‍্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় তা প্রমাণিত। বাণিজ্যিক উদ্যোগ সহজতর করে তোলার ক্ষেত্রে ভারতের স্থান এখন ১৩০-এ। নতুন করে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করার বিষয়টি এখন আগের থেকে অনেক সহজ হয়ে উঠেছে। অনাবশ্যক বাধ্যবাধকতার যাবতীয় খুঁটিনাটি বাতিল করে এখন অনলাইন প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় অনুমতি বা অনুমোদনলাভের বিষয়টি সম্ভব করে তোলা হয়েছে।
শিল্প লাইসেন্স এবং শিল্পোদ্যোগ সংক্রান্ত স্মারকপত্রলাভের বিষয়টি এখন অনলাইনেই সম্পন্ন হচ্ছে। শিল্পোদ্যোগীরা সপ্তাহে সাতদিন২৪ ঘন্টাই অনলাইনের এই সুযোগ গ্রহণ করতে পারবেন। ২০টির মতো পরিষেবাকে একত্রিত করে একটি সিঙ্গল উইন্ডো পোর্টালের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। সরকার বা সরকারি সংস্থাগুলি থেকে ছাড়পত্র লাভের জন্য ঐ সিঙ্গল উইন্ডো পোর্টালটিতেই যাবতীয় কাজকর্ম সেরে ফেলা যাবে।
বিশ্ব ব্যাঙ্কের এক গোষ্ঠী এবং কেপিএমজি-র সাহায্য ও সহযোগিতায় কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারগুলির বাণিজ্যিক সংস্কার রূপায়ণ সম্পর্কিতকাজকর্মেরমান নিরূপণ করেছে। এই র‍্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় একটি রাজ্য অন্যটির কাছ থেকে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে পারবে। আর এইভাবেই সারা দেশে দ্রুত বাণিজ্যিক কাজকর্মের উপযোগীউন্নত পরিবেশ গড়ে উঠবে।
ভারতে বিনিয়োগের প্রসারে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ সম্পর্কিত নিয়ম-নীতিকে আরও উদার করে তুলেছে কেন্দ্রের বর্তমান সরকার।
মূলধন
কর্পোরেট বহির্ভুত ৫ কোটি ৮০ লক্ষ সংস্থা ভারতে ১২ কোটি ৮০ লক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কর্মসংস্থানের ৬০ শতাংশই প্রসারিত হয়েছে গ্রামীণ এলাকাগুলিতে। এর মধ্যে আবার ৪০ শতাংশ কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভ করেছে অনগ্রসর শ্রেণীর মানুষ এবং ১৫ শতাংশ সুযোগ পেয়েছে তপশিলি জাতি ও আদিবাসী সম্প্রদায়। কিন্তু এই শিল্প সংস্থাগুলির অধিকাংশই ব্যাঙ্ক ঋণের সুযোগ থেকে ছিল বঞ্চিত। অন্যভাবে বলতে গেলেকর্মসংস্থানমুখী ভারতীয় অর্থনীতির এই ক্ষেত্রটিতে ঋণের সুযোগ সম্প্রসারণের হার ছিল খুবই নগণ্য। এই অবস্থা ও পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন সম্ভব করে তুলতে প্রধানমন্ত্রী মুদ্রা যোজনা এবং মুদ্রা ব্যাঙ্ক নামে দুটি কর্মসূচি চালু করে কেন্দ্রীয় সরকার।
ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোগীরা যাতে কোনরকম হয়রানি ছাড়াই সুবিধাজনক শর্তে ঋণের সুযোগ লাভ করতে পারেন সেই উদ্দেশ্যেই এই দুটি কর্মসূচি চালু হয়েছে। এযাবৎ শিল্পোদ্যোগীদের অস্বাভাবিক হারে ঋণের ওপর সুদ গুনতে হত। এই কর্মসূচি চালু হওয়ার অল্পদিনের মধ্যেই ১ কোটি ১৮ লক্ষ ঋণ আবেদনের ক্ষেত্রে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে যার মোট পরিমাণ প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা। ৫০ হাজার টাকার কম পরিমাণ অর্থ ঋণ সাহায্য হিসেবে পেয়েছেন এমন ব্যক্তির সংখ্যা গত বছরের সমতুল সময়কালের তুলনায় ২০১৫-র এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর – এই সময়কালে বৃদ্ধি পেয়েছে ৫৫৫ শতাংশ।
বরাতদান ব্যবস্থার বাস্তবায়ন
উন্নত বরাত লাভের বিষয়টি সম্ভব করে তুলতে সংশ্লিষ্ট একটি আইনে পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে।

নমামী গঙ্গে

উত্তর প্রদেশের গঙ্গার তীরে অবস্থিত বারাণসী থেকে সংসদে ২০১৪ সালের মে মাসে নির্বাচিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন, “মা গঙ্গার সেবা করাই আমার ভাগ্যের লিখনগঙ্গানদী যে কেবল সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় তাৎপর্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তাই নয়দেশের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের বেশি এর ওপর নির্ভরশীল। ২০১৪ সালে নিউইয়র্কে ম্যাডিসন স্কোয়ার পার্কে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যদি এই নদীকে আমরা পরিচ্ছন্ন করে তুলতে পারিতা হলে দেশের ৪০ শতাংশ মানুষের বিরাট উপকার হবে। তাইগঙ্গাকে পরিষ্কার করার কাজটি এক ধরনের অর্থনৈতিক কর্মসূচিও বটে
এই স্বপ্নকে বাস্তবের রূপ দিতে সরকার নমামী গঙ্গে’ নামে এক সুসংহত গঙ্গা সংরক্ষণ অভিযান চালু করেছে। গঙ্গানদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও নদীর পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যেই চালু হয় এই অভিযান। গঙ্গানদীকে পরিচ্ছন্ন করে তোলার জন্য ২০১৯-২০ অর্থবর্ষ পর্যন্ত ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের যে প্রস্তাব কেন্দ্রীয় সরকার করেছে মন্ত্রিসভায় তা অনুমোদিত হয়েছে। এই প্রকল্পের বাজেট বরাদ্দ এর ফলে চার গুণ বৃদ্ধি পাবে এবং এর ১০০ শতাংশই কেন্দ্রীয় প্রকল্প হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকার বহন করবে।
গঙ্গা পুনরুজ্জীবনের কাজের চ্যালেঞ্জটি বহুক্ষেত্রিকবহুমাত্রিক এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট হওয়ায়তা সফল করে তুলতে বিভিন্ন মন্ত্রক এবং কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে মূল কাজটির কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে এবং কেন্দ্র ও রাজ্য পর্যায়ে নজরদারি বাড়াতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির বর্ধিত উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।
এই কর্মসূচি রূপায়ণের লক্ষ্যে একে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এগুলি হল – তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় এমন ধরনের প্রাথমিক কাজকর্মপাঁচ বছরের মধ্যে রূপায়ণযোগ্য মধ্যবর্তী পর্যায়ের কাজকর্ম এবং ১০ বছরের মধ্যে রূপায়ণযোগ্য দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ।
প্রাথমিক পর্যায়ের কাজকর্মের মাধ্যে রয়েছে নদীর জলে ভেসে থাকা কঠিন বর্জ্যের সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে নদীর জলকে পরিষ্কার করাদূষণ (কঠিন ও তরল) নিয়ন্ত্রণে গ্রামীণ স্তরে পরিচ্ছন্নতার কর্মসূচি। গ্রামাঞ্চলে নর্দমা বাহিত হয়ে যাতে কঠিন ও তরল বর্জ্য নদীতে পড়ে দূষণ না ঘটায় তার চেষ্টা করা। এছাড়াশৌচাগার নির্মাণনদী তীরে শ্মশানগুলির আধুনিকীকরণ এবং পুনর্গঠন করে আধপোড়া অথবা আংশিকভাবে পোড়ানো মৃতদেহ ফেলে দেওয়ার প্রথা বন্ধ করা। অন্যদিকেনদীর ঘাটগুলি মেরামত ও আধুনিকভাবে নির্মাণের মাধ্যমে মানুষ ও নদীর মধ্যে ব্যবহারিক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটানো।
মধ্যবর্তী পর্যায়ের কাজকর্মের মধ্যে যে বিষয়গুলির উপর জোর দেওয়ার কথা ভাবা হয়েছেসেগুলি হল – পুর এলাকা এবং শিল্প সংস্থা থেকে দূষিত বর্জ্য পদার্থের নদীতে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা। পৌর এলাকার নর্দমাগুলি থেকে দূষিত বর্জ্য নদীতে মিশে যাওয়ার সমস্যার মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫০০ এস এল ডি অতিরিক্ত ক্ষমতাসম্পন্ন বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা বসানোর কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তিতে এই কর্মসূচিটিকে দক্ষদায়বদ্ধ এবং সুষমভিত্তিতে রূপায়ণের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা হাইব্রিড অ্যানুইটি-ভিত্তিক সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে প্রকল্প রূপায়ণের বিষয়টি বিবেচনা করছে। এটি অনুমোদিত হলে একটি বিশেষ উদ্দেশ্যসাধক ব্যবস্থার মাধ্যমে সমস্ত প্রধান শহরে পরিশোধিত জলের বাজার তৈরি করা হবে। লভ্যাংশ প্রদানের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী সুষমতার ভিত্তিতে নির্মিত সম্পদ ব্যবহারের নিশ্চয়তা তৈরি হবে।
শিল্প দূষণ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে দূষণ সংক্রান্ত আইন-কানুনগুলি আরও ভালোভাবে মান্যতার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। গঙ্গা তীর বরাবর যে সমস্ত শিল্প সংস্থা অধিক দূষণ ছড়ায়তাদের বর্জ্যের পরিমাণ ও দূষণ তীব্রতা কমাতে অথবা তরল বর্জ্য নিষ্কাশন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এইসব নির্দেশাবলী যাতে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদগুলি রূপায়ণ করতে পারে তার জন্য কর্মপরিকল্পনা ইতিমধ্যেই তৈরি করা হয়েছে। বিভিন্ন শিল্প সংস্থার সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের শিল্পের জন্য সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সমস্ত শিল্প সংস্থাকে তাৎক্ষণিক ভিত্তিতে দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অনলাইন নজরদারি কেন্দ্র বসাতে হবে। এই সমস্ত উদ্যোগ ছাড়াওএই কর্মসূচিতে জৈববৈচিত্র্য সংরক্ষণবনসৃজন এবং জলের গুণমানের ওপর নজরদারি চালানোর ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। গঙ্গার বিখ্যাত সব প্রজাতির প্রাণীদের যথা – গোল্ডেন মহাসির মাছশুশুকমেছো কুমির বা ঘড়িয়ালকচ্ছপ ও ভোঁদড় সংরক্ষণের প্রকল্পও শুরু করা হয়েছে। অনুরূপভাবে, ‘নমামী গঙ্গে’ কর্মসূচিতে ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে বনসৃজন করে ভূগর্ভস্থ জলভাণ্ডার সমৃদ্ধ করাভূমিক্ষয় রোধ এবং নদীর বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থাও করা হবে। ২০১৬ সালেই বনসৃজনের কাজ শুরু হবে। একইসঙ্গে১১৩টি জলের গুণমান নিরীক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে তাৎক্ষনিক সময়ের ভিত্তিতে জলের মানের ওপর নজরদারি চালানো হবে।
দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তিতে নদীতে পর্যাপ্ত জলের প্রবাহ বজায় রাখতেবৈদ্যুতিনভাবে প্রবাহমাত্রা নির্ধারণ করা হবে। এছাড়াজল ব্যবহারের বর্ধিত দক্ষতা ও সেচের জন্য মাটির ওপরের জলের ব্যবহারেও দক্ষতা বৃদ্ধির কথা ভাবা হয়েছে। একথা মনে রাখা দরকার যেগঙ্গার মতো নদীকে পরিচ্ছন্ন করে তোলার কাজ অত্যন্ত জটিলকারণ নদীর আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব রয়েছে। রয়েছেবিভিন্ন কাজে এর জলের ব্যবহারও। পৃথিবীতে কোথাও কখনও এই ধরনের জটিল কর্মসূচি রূপায়ণ করা হয়নি। তাইএই কাজকে সফল করে তুলতে প্রত্যেক ক্ষেত্রের ও দেশের প্রত্যেক নাগরিককে সক্রিয়ভাবে এই উদ্যোগে সামিল করতে হবে। গঙ্গানদীকে পরিচ্ছন্ন করে তোলার ক্ষেত্রে আমরা প্রত্যেকেই বিভিন্নভাবে অবদান রাখতে পারি। নিম্নলিখিত পদ্ধতিতে এই কাজ করা যেতে পারে :-
১) তহবিলে অর্থদান গঙ্গার মতো এত দীর্ঘ এক নদীকেজনসংখ্যার এক বিরাট অংশযার ওপর নির্ভরশীলপরিচ্ছন্ন করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। এই প্রকল্পের সরকারি বরাদ্দ চার গুণ বৃদ্ধি করা হলেওচাহিদার তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। পরিচ্ছন্ন গঙ্গা তহবিলের মাধ্যমে এই নদীকে পরিষ্কার করে তোলার কাজে সকলেই অর্থদান করতে পারেন।
২) হ্রাস পুনর্ব্যবহার ও পুনরুদ্ধার আমাদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষই বুঝি না ব্যবহৃত জল ও আমাদের ঘরের আবর্জনা সঠিকভাবে পরিষ্কার না করা হলেতা নদীতে গিয়ে পড়বে। সরকারের উদ্যোগে নিকাশি পরিকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছেকিন্তু নাগরিকরা জলের ব্যবহার এবং বর্জ্য পদার্থ তৈরির কাজ কমিয়ে সহায়তা করতে পারে। এছাড়াবর্জ্য জলের ও জৈব বর্জ্য এবং প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করা গেলে নদীর পরিষ্করণের কাজে অনেকটা সাহায্য করা হবে।
আসুন আমাদের সভ্যতার প্রতীকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান স্তম্ভজাতীয় নদী গঙ্গাকে বাঁচাতে সকলে হাতে হাত মেলাই।



ভারতের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার পূর্ণ বিকাশ ও সদ্ব্যবহার

স্বাধীনতা লাভের পর প্রায় সাতটি দশক অতিক্রান্ত। কিন্তু দেশের ১৮ হাজার গ্রাম এখনও অন্ধকারে পড়ে রয়েছে বিদ্যুতের অভাবে। প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ঘোষণা করেছিলেন যে অন্ধকার এই গ্রামগুলিতে আগামী ১ হাজার দিনের মধ্যে বিদ্যুতের সুযোগ পৌঁছে দেওয়া হবে। তাইগ্রামীণ বৈদ্যুতিকরণের লক্ষ্যে এক উচ্চাকাঙ্ক্ষামূলক কর্মসূচি রূপায়ণের কাজ শুরু করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। গ্রামীণ বৈদ্যুতিকরণের কাজ চলছে দ্রুততার সঙ্গে। আর এই কর্মসূচির সর্বত্র রয়েছে এক অভাবনীয় স্বচ্ছতা। একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন এবং একটি ওয়েব ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে যে গ্রামগুলিতে ইতিমধ্যেই বিদ্যুতের সুযোগ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে তার একটি তালিকা দেখতে পাওয়া যাবে। এই কর্মসূচিটিকে তাই গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার কাজ হিসেবেই চিহ্নিত করলে চলবে নাগ্রামবাসীদের জীবনে যে স্বপ্নআশা-আকাঙ্ক্ষা ও অগ্রগতির স্বপ্ন একদা অধরা ছিলতাই এখন চলে এসেছে তাঁদের আয়ত্তের মধ্যে।
একথা বিস্মৃত হওয়া কঠিন যে ২০১২-র জুলাই পর্যন্ত দেশের ৬২ কোটি মানুষকে দিন কাটাতে হয়েছে ঘোর অন্ধকারের মধ্যে। ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাকে কাজে লাগানো যায়নি শুধুমাত্র গ্যাস ও কয়লার মতো জ্বালানির অভাবে। অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এই ক্ষেত্রটি তখন কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। বিদ্যুতের উৎপাদন ও যোগান সংক্রান্ত নীতিটিও উদ্যোগের অভাবে হয়ে পড়ে অপ্রাসঙ্গিক। একদিকে বিনিয়োগ করা অর্থের সদ্ব্যবহারের অভাব এবং অন্যদিকে ব্যাপক বিদ্যুৎ ছাঁটাইয়ের ফলেজনজীবনে নেমে আসে অন্ধকার।
এনডিএ সরকার কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার সময় দেশের কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির দুই-তৃতীয়াংশেরই কয়লা মজুতজনিত পরিস্থিতি ছিল খুবই সঙ্কটজনক। মাত্র সাতদিনের জন্য বিদ্যুৎউৎপাদনের মতো কয়লা মজুত ছিল ঐ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির। এই সঙ্কটজনক পরিস্থিতি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলিকে এমন এক অবস্থায়উন্নীত করে কেন্দ্রীয় সরকার যেখানে এমন কোন বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট নেই যেখানে কয়লা এখনঅপ্রতুল বা অপর্যাপ্ত।
সকলের কাছে বিদ্যুতের সুযোগ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার বিশুদ্ধ জ্বালানির বিষয়টিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানির উৎসগুলিকে ব্যবহারের মাধ্যমে ১৭৫ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। এর মধ্যে ১০০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে সৌর শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষেত্রটির কাঠামোগত বিকাশ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে এক সার্বিক ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি রূপায়ণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। সপ্তাহের প্রতিটি দিনেই যাতে ২৪ ঘন্টা বিদ্যুতের যোগান নিরবচ্ছিন্ন রাখা যায় সেই লক্ষ্যে সরকার বিশেষভাবে সচেষ্ট রয়েছে। বিদ্যুৎ ক্ষেত্রটির বিকাশ ও উন্নয়নের দিকে একবার দৃষ্টি দেওয়া যাক। শিল্পোৎপাদনের সূচক অনুযায়ী অক্টোবর মাসে বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধির হার ছিল ৯ শতাংশ। অন্যদিকেকোল ইন্ডিয়া লিমিটেডের উৎপাদন ক্ষমতা ৯ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় এপ্রিল-নভেম্বর – এই সময়কালে। বিগত চার বছরের উৎপাদনকে যুক্ত করলে যা দাঁড়ায় তার থেকে অনেক বেশি উৎপাদন সম্ভব করে তোলে কোল ইন্ডিয়া। এর সুবাদে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় কয়লা আমদানির পরিমাণ হ্রাস পায় ৪৯ শতাংশ। বিভিন্ন উৎপাদন কেন্দ্রে কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বৃদ্ধি পায় ১২.১২ শতাংশ যা ছিল এযাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২১৪টি কয়লা ব্লক বন্টনের বিষয়টি শীর্ষ আদালত বাতিল বলে ঘোষণা করায় যে সঙ্কট দেখা দিয়েছিল তা কাটিয়ে উঠতে এক স্বচ্ছ কয়লা ব্লক বন্টন কর্মসূচির কাজ হাতে নেওয়া হয় প্রযুক্তি পরিচালিত নিলাম ব্যবস্থার মাধ্যমে। এবাবদ আয়ের প্রায় সবটাই পৌঁছে গেছে রাজ্যগুলির হাতে। বিশেষতপূর্ব ভারতের অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা রাজ্যগুলি তা থেকে বিশেষভাবে উপকৃত হয়েছে।
গত বছরটিতে ২২,৫৬৬ মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে যা এযাবৎকালের মধ্যে এক রেকর্ড বিশেষ। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও যোগানের ক্ষেত্রে ঘাটতির মাত্রাকেও ২০০৮-০৯-এর ১১.৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে আনা হয়েছে ৩.২ শতাংশে। এযাবৎকালের মধ্যে এটিও ছিল নিঃসন্দেহে এক বিশেষ সাফল্য। জ্বালানি ঘাটতির পরিমাণও ২০০৮-০৯-এর ১১.১ শতাংশের তুলনায় হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২.৩ শতাংশে। ভারতে জ্বালানি উৎপাদনের ইতিহাসে এটিও এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
বিদ্যুৎ যোগানের ক্ষেত্রে যে সমস্ত রাজ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্রা ছিল উদ্বৃত্তসেই সমস্ত রাজ্য থেকে বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ঘাটতি রাজ্যগুলিতে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার কাজে ছিল বিস্তর বাধা-বিপত্তি। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিদ্যুৎ উৎপাদন গ্রিডটিকে এক জাতিএকটি গ্রিডএকটি ফ্রিকোয়েন্সিতে উন্নীত করতে দ্রুততার সঙ্গে পদক্ষেপ গ্রহণ করে কেন্দ্রীয় সরকার। ২০১৩-১৪ সালে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যেখানে ৩,৪৫০ মেগাওয়াট উৎপাদিত বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার কাজে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়সেখানে পরে এই কাজকে ৭১ শতাংশ উন্নীত করে নিয়ে যাওয়া হয় ৫,৯০০ মেগাওয়াটে।
বিদ্যুতের উৎপাদন ও যোগানের ক্ষেত্রে যাবতীয় দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে উদয়’ যোজনাটির সূচনা হয় যাতে অতীতবর্তমান এবং ভবিষ্যতের সমস্যাগুলিকে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়। বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীমুখ্যসচিবপ্রধান সচিবডিসকম-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর সহ উচ্চতম পর্যায়ে আলাপ-আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে উদয়’ কর্মসূচিটিকে রূপায়িত করা হচ্ছে। এমনকিবিভিন্ন ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলির সঙ্গেও এ ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা করা হয়েছে। একসময় ডিসকম হয়ে পড়ে ঋণ জর্জরিত। উদয়’ কর্মসূচির মাধ্যমে ডিসকম-কে এই অবস্থা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করা হয়। বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতেও সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর সুবাদে ২০১৮-১৯ সালের মধ্যে সবকটি ডিসকম লাভজনক সংস্থা হয়ে উঠতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্যভাবে বলতে গেলে বিদ্যুৎ ক্ষেত্রটির সংস্কারের লক্ষ্যে অতীতে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ ও ব্যবস্থার তুলনায় উদয়’ কর্মসূচিটি এক বিশিষ্টতা লাভ করবে বলে আশা করা যায়।
জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয়টিতেও সরকার বিশেষভাবে সচেষ্ট রয়েছে। এলইডি বাল্বের মূল্য হ্রাস পেয়েছে ৭৫ শতাংশেরও বেশি। মাত্র এক বছরের মধ্যে বন্টন করা হয়েছে ৪ কোটিরও বেশি এলইডি বাল্ব। সচরাচর ব্যবহৃত বাল্বগুলির পরিবর্তে এলইডি বাল্বের ব্যবহার বাড়াতে ২০১৮ সালের মধ্যে বন্টন করা হবে ৭৭ কোটি এলইডি বাল্ব। শুধুমাত্র ঘর-গৃহস্থালির কাজেই নয়এলইডি বাল্বের সাহায্যে আলোকিত করা হবে বিভিন্ন অঞ্চলের পথ-ঘাটও। এর ফলেদিনের যে সময়টিতে বিদ্যুতের চাহিদা থাকে সবচেয়ে বেশিসেই সময়ে ২২ গিগাওয়াটের মতো চাহিদা কমিয়ে আনতে বিশেষভাবে সহায়ক হবে এলইডি বাল্বের কার্যকর ব্যবহার। আর এর ফলশ্রুতিতে বছরে বিদ্যুতের সাশ্রয় হবে ১১,৪০০ কোটি ইউনিটের মতো। একইসঙ্গে প্রতি বছর কার্বন ডায়অক্সাইড নির্গমণের মাত্রাও হ্রাস পাবে ৮.৫ কোটি টনের মতো। ২২ গিগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার বিষয়টিকে একটি সাফল্য হিসাবে চিহ্নিত করা যায় ঠিক কথাকিন্তু ব্যয়সাশ্রয়ী এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী এলইডি বাল্বেব সাহায্যে যদি এই অতিরিক্ত উৎপাদনের খরচ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়সেটি পরিবেশ রক্ষার দিক দিয়েও একটি কম সাফল্যমাত্র নয়।

অভূতপূর্ব স্বচ্ছতা : এক নতুন যুগের সূচনা


স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের সুফল জাতির জীবনে এক নতুন পরিবর্তনেরসূচনা করেছে।বিগত দশকটিতে নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবর্তে দুর্নীতিবৈষম্য ও একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণের বহু ঘটনাই ঘটে গেছে। কিন্তু গত এক বছরে এই অবস্থায় ঘটেছে এক বিশেষ পরিবর্তন যাকে স্বাগত জানিয়েছে সমগ্র জাতি।কয়লার ব্লক বন্টনের বিষয়টি যখন শীর্ষ আদালত বাতিল বলে ঘোষণা করেকেন্দ্রীয় সরকার তখন স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এবং সঠিক সময়ে নিলাম বন্টনের ব্যবস্থা করে এক অভূতপূর্ব তৎপরতার নজির সৃষ্টি করে। দেশের ৬৭টি কয়লা ব্লকের নিলাম ও বন্টন থেকে আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লক্ষ ৩৫ হাজার কোটি টাকা।স্পেকট্রামের নিলাম ও বন্টনের ক্ষেত্রে সরকার যে দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে তার সুফলও আমরা লক্ষ্য করেছি। অতীতে লাভের পরিবর্তে এই ধরনের নিলাম ও বন্টনে যাতে ক্ষতি স্বীকার না করতে হয় শুধু সেটুই দেখা হত। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দীর্ঘ সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে স্পেকট্রাম বন্টন সম্পর্কিত বিষয়টি অমীমাংসিত ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার এই বিষয়টির সমাধান সহজ ও সম্ভব করে তুলেছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের পক্ষ থেকে যে ২,১০০ মেগাহার্টজ ছাড়া হয়েছিলতাকে নিলামের আওতায় নিয়ে আসা হয়। এই প্রথম ৮০০৯০০,৮০০ এবং ২,১০০ মেগাহার্টজ – এই চার ধরনের ব্যান্ডকে একইসঙ্গে নিলামের বিভিন্ন পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয় যাতে অপারেটররা সমস্ত কিছু জানা ও বোঝার পরই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। নিলামের জন্য অনুমোদিত ও সংরক্ষিত দাম স্থির করা হয় ৮০,২৭৭ কোটি টাকার। কিন্তু নিলামবাবদ বাস্তবে আয় হয় রেকর্ড পরিমাণ,০৯,৮৭৫ কোটি টাকা।
স্বচ্ছতার লক্ষ্যে এক উদ্ভাবনী পদক্ষেপ গ্রহণ করে পরিবেশ মন্ত্রকও। পরিবেশগত ছাড়পত্র লাভের জন্য আবেদনের প্রক্রিয়াকে অনলাইন করে তোলা হয়েছে। এখন আর অনুমোদন বা ছাড়পত্রের জন্য মন্ত্রকে উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজন হয় না। কারণসমস্ত আবেদনপত্র এখন অনলাইনেই খতিয়ে দেখা হয়। অরণ্য ও বনাঞ্চলসম্পর্কিত প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র লাভের জন্য চালু করা হয়েছে জিআইএস-ভিত্তিক ডিসিশন সাপোর্ট সিস্টেম (ডিএসএস) যাতে দ্রুততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হয়।
কালো টাকার মতো বিষয়টির কার্যকর মোকাবিলায় বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনটিতেই বিশেষ তদন্তকারী দল (সিটগঠন করে। স্যুইজারল্যান্ডের সরকারের সঙ্গে সমন্বয় ও সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলিতে আয়কর দপ্তরের তদন্ত ও অনুসন্ধান সম্পর্কিতযাবতীয় তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে। অঘোষিত বিদেশি আয় ও সম্পদ (কর আরোপবিল২০১৫ ইতিমধ্যেই অনুমোদিত হয়েছে। অঘোষিত বিদেশি আয় ও সম্পদের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি ও জরিমানা আদায়ের সংস্থান রাখা হয়েছে ঐ বিলটিতে। ১ লক্ষ টাকার বেশি কেনাবেচার ক্ষেত্রে প্যানের উল্লেখ বাধ্যতামূলক করে তোলা হয়েছে।


সংস্কারের পথে :এক নতুন সূর্যোদয়

দেশের সার্বিক বিকাশ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে।
জন ধনআধার ও মোবাইলের (জ্যাম) মাধ্যমে পরিবর্তনমুখী এক সংস্কারের অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে ভারত। উল্লেখিত ঐ তিনটি ব্যবস্থার এক অভিন্ন সংযুক্তির মধ্য দিয়ে ভর্তুকি সহায়তা গ্রাহক ও গ্রহীতার কাছে সরাসরি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই চালু হয়েছে। ভর্তুকিবাবদ নগদ অর্থ গ্রাহকের হাতে তুলে দেওয়ার পরিবর্তে সরাসরি তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা করে দেওয়ার এক পদ্ধতি এখন অনুসরণ করা হচ্ছে। এর সুফল রয়েছে দুটি। একটিতে ভর্তুকি প্রদানের ক্ষেত্রে যাবতীয় কারচুপি বা ফাঁকফোকর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং অন্যটিতে ভর্তুকি সহায়তা পৌঁছে যাচ্ছে প্রকৃত ব্যক্তির কাছে।
পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) চালু করার লক্ষ্যে কেন্দ্রের এনডিএ সরকার এক জাতীয় সহমত গঠনের কাজেও সফল হয়েছে। এই কর প্রস্তাবকে বাস্তবায়িত করার উদ্দেশ্যে সংবিধান সম্পর্কিত একটি বিলও সরকারের পক্ষ থেকে পেশ করা হয়েছে। পণ্য ও পরিষেবা কর চালু হলে ১ এপ্রিল২০১৬ থেকে এক অত্যাধুনিক পরোক্ষ কর ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হবে। এই ক্ষেত্রটিতে ভিন্ন ভিন্ন কর যে দ্বিধা ও সংশয়ের সৃষ্টি করেছিল এবং তার ফলে যে প্রতিকূল প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে তা দূর করে এক সংযুক্ত সাধারণ দেশীয় বাজার গড়ে তোলার কাজে এই নতুন ব্যবস্থা যে সফল হয়ে উঠবে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
সাংসদ আদর্শ গ্রাম যোজনা নামে আরেকটি অভিনব কর্মসূচির কাজও শুরু করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। এর আওতায় সাংসদদের উৎসাহিত করা হচ্ছে তাঁদের নির্বাচনী এলাকার অন্তর্গত কোন একটি গ্রামকে বেছে নিয়ে সেটিকে এক আদর্শ গ্রামে (মডেল ভিলেজ) রূপান্তরিত করারলক্ষ্যে। পৃথক পৃথকভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি রূপায়ণের পরিবর্তে নিজের নির্বাচনী এলাকার সার্বিক বিকাশ ও রূপান্তরে সাংসদদের উদ্বুদ্ধ করাই সাংসদ আদর্শ গ্রাম যোজনার মূল লক্ষ্য।
কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের (এমওপিএনজি) একটি বিশেষ প্রস্তাবেও অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্যে গ্যাসচালিত সার প্রকল্পগুলিতে অভিন্ন মূল্যে প্রাকৃতিক গ্যাসের যোগানসম্পর্কিত এই প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়েছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ মন্ত্রক এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের পক্ষ থেকে যে যুগ্ম প্রস্তাব পেশ করা হয়েছিলতাও সরকারিভাবে অনুমোদন করা হয়েছে। এর ফলে১৬ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলি বিশেষভাবে চাঙ্গা হয়ে উঠবে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ ছিল তার অনেকটাই এখন শিথিল করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলেপ্রতিরক্ষানির্মাণ ও রেলের মতো ভারতের উচ্চমানের শিল্পক্ষেত্রগুলিতে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ এখন উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত নীতিকে উদার করে তোলা হয়েছে এবং এই ক্ষেত্রটিতে বিদেশি বিনিয়োগের মাত্রা ২৬ শতাংশ থেকে ৪৯ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার আওতায় প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে পোর্টফোলিও বিনিয়োগের মাত্রা বৃদ্ধি করা হয়েছে ২৪ শতাংশ পর্যন্ত। আধুনিক এবং যুগোপযোগী প্রযুক্তির প্রয়োগ ও ব্যবহারের লক্ষ্যে ১০০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ প্রসারিত হয়েছে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে। ১০০ শতাংশ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় সম্প্রসারিত হয়েছে সুনির্দিষ্ট রেল পরিকাঠামো ক্ষেত্রগুলির নির্মাণরক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় কাজকর্ম নিরন্তর করে তোলার লক্ষ্যে।

উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে

জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট সরকার শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ জোর দিয়েছে। শিক্ষার গুণমান ও প্রসার বৃদ্ধির লক্ষ্যে একগুচ্ছ অভিনব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিদ্যালক্ষ্মী কার্যক্রম প্রকল্পের আওতায় সমস্ত শিক্ষা ঋণ ও বৃত্তি প্রদান ও নজরদারি চালানোর জন্য একটি সম্পূর্ণ তথ্য প্রযুক্তি ভিত্তিক আর্থিক সহায়তা প্রদান কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে। শিক্ষা দানের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য পণ্ডিত মদন মোহন মালব্য মিশন চালু করা হয়েছে।বিদেশের খ্যাতনামা শিক্ষা ও বিজ্ঞান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিশিষ্ট শিক্ষকবিজ্ঞানী এবং উদ্যোগপতিরা যাতে ভারতের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে গ্রীষ্ম ও শীতকালীন অবকাশের সময় পড়াতে পারেনসেজন্য তাঁদের আমন্ত্রণ জানাতে গ্লোবাল ইনিসিয়েটিভ অফ অ্যাকাডেমিক নেটওয়ার্ক বা জ্ঞান’ নামে একটি প্রকল্প চালু করা হয়ছে। এর ফলেভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের আন্তর্জাতিক মানের পঠন-পাঠনের সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ ঘটবে। অনলাইন শিক্ষার সুব্যবস্থা করতে স্বয়ম’ নামে এক প্রকল্পের মাধ্যমে অনলাইন শিক্ষার ব্যাপক উদ্যোগ শুরু হচ্ছে। জাতীয় ই-গ্রন্থাগার সবার জন্য শিক্ষা সরঞ্জাম ও জ্ঞানের উৎসমুখ খুলে দেবে। শলাদর্পণ’ নামে একটি মোবাইল প্রযুক্তির মাধ্যমে অভিভাবকরা যাতে স্কুলের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে সন্তানদের শিক্ষার অগ্রগতির ওপর নজর রাখতে পারেন তারও ব্যবস্থা হয়েছে। ছাত্রীদের স্কুলে ভর্তির বিষয়টিতে উৎসাহিত করতে, ‘উড়ান’ নামে একটি বালিকা শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প চালু করা হয়েছে। ঈশান বিকাশ’ নামে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির নির্বাচিত কিছু স্কুল ও ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র-ছাত্রীদের তাদের অবকাশের সময় আই আই টিএন আই টি এবং আই আই এস ই আর-এর মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চিরাচরিত শিল্পকলা ও হস্তশিল্পের কাজে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে উস্তাদ’ নামে এক প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হচ্ছেচিরাচরিত শিল্পকলা ও হস্তশিল্পীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতাঁদের কাজের ও উৎপাদিত পণ্যের মানবৃদ্ধিএগুলির নথিভুক্তি এবং বিপণনের ব্যবস্থা করা।সকলেই জানেনপ্রধানমন্ত্রী শ্রী মোদী দক্ষ ভারত কর্মসূচিকে কতটা গুরুত্ব দেন। সরকারঅগ্রাধিকারের ভিত্তিতে দেশের যুবকদের ক্ষমতায়নের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন’ বিষয়ক একটি পৃথক মন্ত্রক চালু করেছে। বিভিন্ন কর্মসূচিতে ইতিমধ্যেই ৭৬ লক্ষ যুবককে দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। দক্ষতা সংক্রান্ত শংসাপত্রকে স্কুল টু স্কিল’ কর্মসূচিটি পাঠ্যক্রমের সমান মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। ১৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ সহ প্রধানমন্ত্রী কৌশল বিকাশ যোজনা অনুমোদিত হয়েছে। আগামী তিন বছরে পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় গ্রামীণ কৌশল যোজনায় ১০ লক্ষ গ্রামীণ যুবককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। শিক্ষানবিশ আইনের সংশোধনের ফলে কাজের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের আরও বেশি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সরকার আগামী আড়াই বছরে ১ লক্ষ শিক্ষানবিশের প্রশিক্ষণের সুযোগের জন্য তাদের স্টাইপেন্ডের ৫০ শতাংশ ব্যয়ভার বহন করবে। আগামী কয়েক বছরে শিক্ষানবিশের সংখ্যা এখনকার ২.৯ লক্ষ থেকে বাড়িয়ে ২০ লক্ষ করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সারা দেশের সর্বত্র অনলাইন পরিষেবার জন্য কেন্দ্র স্থাপনে চালু হয়েছে ন্যাশনাল কেরিয়ার সেন্টার। এখান থেকে যুবকরা পেশা সংক্রান্ত সরঞ্জাম ও স্বমূল্যায়নের যন্ত্রপাতি পাবে। যুবকদের জন্য উপদেষ্টা বা কাউন্সেলারদের সহায়তা দিতে একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করা হবে।



স্বচ্ছ ভারতের দিকে

২০১৯ সালে যখন ভারত মহাত্মা গান্ধীর সার্ধশততম জন্মবার্ষিকী উৎযাপন করবেতখন স্বচ্ছ ভারতই হবে তাঁর প্রতি আমাদের সেরা শ্রদ্ধার্ঘ্য। ২০১৪ সালে ২ অক্টোবর নতুন দিল্লির রাজঘাটে স্বচ্ছ ভারত অভিযানের সূচনা করে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী একথা বলেন। এই অভিযান সারা দেশের সর্বত্র জাতীয় আন্দোলন হিসেবে সূচনা হয়েছে।
পরিচ্ছন্নতার এই গণআন্দোলনের নেতৃত্বে দিতে গিয়েপ্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর ভারতের যে স্বপ্ন গান্ধীজী দেখেছিলেনতা পূরণ করার লক্ষ্যে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। শ্রী নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং দিল্লির মন্দির মার্গ থানা এলাকায় এই কর্মসূচির সূচনা করেন। আবর্জনা পরিস্কার করতে হাতে ঝাড়ু তুলে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী স্বচ্ছ ভারত অভিযানকে এক গণআন্দোলনে পরিণত করার লক্ষ্যে দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন – “নোংরা করবেন নাকরতে দেবেন না। তিনি মন্ত্রের মতো উচ্চারণ করেন – “না গন্দগি করেঙ্গেনা করনে দেঙ্গে। শ্রী মোদী৯ জন নাগরিককে এই পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগে সামিল হওয়ার আমন্ত্রণ জানান। এঁদের প্রত্যেককে এই আন্দোলনে আরও ৯ জন করে সামিল করানোর জন্যও তিনি অনুরোধ জানান।
এই উদ্যোগে অংশগ্রহণের অনুরোধ স্বচ্ছতা অভিযান এক জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। স্বচ্ছ ভারত আন্দোলনের মাধ্যমে দেশবাসীর মধ্যে এক ধরনের দায়িত্ববোধের সঞ্চার হয়েছে। সারা দেশ জুড়ে নাগরিকরা পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করায় পরিচ্ছন্ন ভারত’-এর যে স্বপ্ন মহাত্মা গান্ধী দেখেছিলেন তা সফল হতে চলেছে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর কথা ও কাজের মাধ্যমে স্বচ্ছ ভারতের বার্তা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে সহায়ক ভূমিকা নিয়েছেন। স্বচ্ছতার এই উদ্যোগকে তিনি বারাণসী পর্যন্ত নিয়ে গেছেন। পরিচ্ছন্ন ভারত মিশনে তিনি বারাণসীর গঙ্গার অসিঘাটে কোদাল হাতে নেমেছিলেন। বিরাট সংখ্যায় স্থানীয় মানুষ তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়ে স্বচ্ছতা অভিযানে সহযোগিতা করেন। পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব উপলব্ধি করে প্রধানমন্ত্রী শ্রী মোদীভারতীয় পরিবারগুলির বাড়িতে শৌচাগারের অভাবজনিত স্বাস্থ্য সমস্যাটিও একই সঙ্গে তুলে ধরেন।
সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ পরিচ্ছন্নতার গণআন্দোলনে এগিয়ে এসে যুক্ত হয়েছেন। এই মহান উদ্যোগে সরকারি কর্মকর্তা থেকে জওয়ানবলিউডের অভিনেতা থেকে ক্রীড়াবিদশিল্পপতি থেকে ধর্মীয় নেতা সকলেই যুক্ত হয়েছেন। সারা দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ দিনের পর দিন বিভিন্ন সরকারি বিভাগঅসরকারি সংগঠন এবং স্থানীয় গোষ্ঠীগুলি কেন্দ্রের উদ্যোগে পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন। সারা দেশ জুড়ে ঘন ঘন পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে প্রচার কর্মসূচিতে নাটক ও সঙ্গীতের মাধ্যমে ব্যাপক ভিত্তিতে স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে প্রচার সংগঠিত হচ্ছে।
বলিউডের খ্যাতনামা চিত্রতারকা থেকে শুরু করে টেলিভিশনের অভিনেতারা এগিয়ে এসে এই পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন। অমিতাভ বচ্চনআমির খানকৈলাশ খেরপ্রিয়াঙ্কা চোপড়ার মতো বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা এবং সব’ টিভির জনপ্রিয় শো তারক মেহতা কা উলটা চশমার সমস্ত অভিনেতা-অভিনেত্রী ও কর্মী স্বচ্ছ ভারত অভিযানে হাত লাগিয়েছেন। শচীন তেন্ডুলকরসানিয়া মির্জাসাইনা নেহওয়াল এবং মেরীকমের মতো বহু বিশিষ্ট ক্রীড়াবিদদের স্বচ্ছ ভারত অভিযানে অবদান বিশেষভাবে প্রশংসনীয়।
প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর মাসিক বেতার ভাষণ মন কী বাত’-এও স্বচ্ছ ভারত অভিযানকে সফল করতে বারে বারে সারা দেশের বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তির ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী মধ্যপ্রদেশের হার্দা জেলার একদল সরকারি কর্মী পরিচ্ছন্ন ভারতের লক্ষ্যে যে উদ্যোগ নিয়েছেনএই অনুষ্ঠানে তার প্রশংসা করেছেন। ব্যাঙ্গালোরের নিউ হোরাইজন স্কুলের ৫ জন ছাত্র যেভাবে বর্জ্য পদার্থ কেনা-বেচার জন্য মোবাইল-ভিত্তিক অ্যাপ তৈরি করেছে তারও প্রশংসা করেছেন।
আই সি আই সি আই ব্যাঙ্কপাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কজামশেদপুরের এক্স এল আর আই এবং আই আই এম – ব্যাঙ্গালোরের গণপরিচ্ছন্নতা উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা প্রসারের কাজ করেছে। শ্রী নরেন্দ্র মোদী সর্ব্দাঈ মুক্তকন্ঠে সোসাল মিডিয়ার মাধ্যমে এই উদ্যোগে মানুষের অংশগ্রহণকে প্রশংসা করেছেন। বারাণসীতে মিশন প্রভুঘাট’ নামে পরিচ্ছন্নতার অভিযান চালানোর জন্য তেমসুতুলা ইমসংদায়শিকা শাহ্‌ এবং একদল স্বেচ্ছাসেবীর কাজের প্রশংসা করেছেন।
সারা দেশে নাগরিকরা যেসব পরিচ্ছন্নতার কাজ করেছেনতা তুলে ধরতেস্বচ্ছ ভারত অভিযানের অঙ্গ হিসেবে #MycleanIndiaনামে একটি পোর্টালও চালু করা হয়েছে। স্বচ্ছ ভারত অভিযান জনগণের বিপুল সমর্থনে এক জনআন্দোলন’-এ পরিণত হয়েছে। নাগরিকরাও পরিচ্ছন্ন ভারতের শপথে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিরাট সংখ্যায় এই অভিযানে যুক্ত হয়েছেন। স্বচ্ছ ভারত অভিযান কর্মসূচির সূচনা হওয়ার পর ঝাড়ু হাতে রাস্তা পরিস্কারআবর্জনা পরিষ্কারস্বাস্থ্যবিধির প্রতি নজর এবং নির্মল পরিবেশ বজায় রাখার কাজ যেন মানুষের সাধারণ রুটিনে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষ এই কাজে অংশ নিচ্ছেন এবং পরিচ্ছন্নতাই পবিত্রতার বার্তা ছড়িয়ে দিতে এগিয়ে আসছেন।পুর এলাকায়স্বচ্ছ ভারত অভিযানে ব্যক্তিগত শৌচাগারগোষ্ঠী শৌচাগার নির্মাণ ও কঠিন বর্জ্য পরিচালন ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হয়। গ্রামাঞ্চলে আবার মানুষের ব্যবহারিক আচরণ বদলানোর লক্ষ্যে মুখোমুখী কথাবার্তার মাধ্যমে মানুষকে বোঝানোর কাজ চলছে। এছাড়াগ্রাম পঞ্চায়েত স্তর পর্যন্ত প্রকল্প রূপায়ণ ও পরিষেবা প্রদান ব্যবস্থাকে জোরদার করা হয়ে ...... রাজ্যগুলিকে স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রথাচাহিদা ও দাবিদাওয়ার কথা মাথায় রেখে নিজস্ব ধরনের পরিষেবা প্রদান ব্যবস্থা তৈরি করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। শৌচাগার নির্মাণের জন্য উৎসাহ প্রদান বাবদ অর্থ সাহায্যের পরিমাণ ২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার টাকা করা হয়েছে। গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে কঠিন ও তরল বর্জ্য পরিচালনের জন্যও অর্থ প্রদান করা হচ্ছে।

মেক-ইন ইন্ডিয়া

কারখানা ভিত্তিক উৎপাদন বা ম্যানুফেকচারিং দিক দিয়ে প্রবল শক্তিধর হতে চলেছে ভারত ।
মেক-ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগ চারটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে এর লক্ষ্য ভারতের শিল্প-উদ্যোগ ক্ষেত্রকে শক্তিশালী করা এবং তা শুধুমাত্র কারখানা ভিত্তিক উৎপাদন বা ম্যানুফেকচারিং-এর দিক দিয়েই নয়অন্য কিছু ক্ষেত্রেও এর সুফল মিলবে।নতুন উদ্যোগ:: ‘মেই ইন ইন্ডিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটাই বিষয় হলো ব্যবসায়ীরা যাতে খুব সহজে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারেন। যাতে শিল্পোদ্যোগ প্রসার লাভ করতে পারে । ব্যবসার পরিবেশকে সহজতর করার জন্য ইতিমধ্যেই বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়েছে। যেমন লাইসেন্স ও নিয়ন্ত্রন প্রথা তুলে দেয়া হয়েছেযাতে ব্যবসা করা সহজ হয়। ব্যবসার সার্বিক জীবনচক্রে লাইসেন্স বা নিয়ন্ত্রণ প্রথা থেকে শিল্পকে মুক্ত রাখার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
নতুন পরিকাঠামো:শিল্পের বিকাশে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় চাহিদা হলো সুবিধাজনক ও আধুনিক পরিকাঠামো প্রাপ্তির বন্দোবস্ত । সরকার এই কারণেই শিল্প করিডোর এবং স্মার্ট সিটি গড়ে তুলতে আগ্রহী যাতে থাকবে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর পরিকাঠামোসাথে আধুনিক হাইস্পিড তার-যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অন্যান্য সহযোগী সুযোগ-সুবিধা সমূহ । শিল্প তালুকগুলোতে বর্তমানে যেসব পরিকাঠামো রয়েছে সেগুলোকেও উন্নত করে শক্তিশালী করা হচ্ছে।
নতুন ক্ষেত্র:: ‘মেক ইন ইন্ডিয়ায় কারখানা ভিত্তিক উৎপাদন ক্ষেত্রপরিকাঠামো ও পরিষেবা বিষয়ক ২৫টি ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করা হয়েছে । এবিষয়ে বিস্তারিত সবরকম তথ্যযা দ্বিমুখীও বটেপাওয়া যাবে ওয়েব পোর্টাল এবং পেশাদারীভাবে প্রস্তুত করা পুস্তিকায় বা ব্রোসিওরে ।
নতুন মানসিকতা:শিল্পমহল সরকারকে নিয়ন্ত্রক হিসেবেই দেখে অভ্যস্ত। মেক ইন ইন্ডিয়া’ এই ধারণাকে আমূল বদলে দিতে অভিপ্রায়ী । তা করা হবে সরকার শিল্প পক্ষের সাথে যে পদ্ধতিতে মত-বিনিময় করে সে কাঠামোরই পরিবর্তন ঘটানোর মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকার শিল্পের সাথে শরিক হবে আমাদের পথ হবে সুবিধাদাতারনিয়ন্ত্রক হিসেবে নয়।
মেক ইন ইন্ডিয়া’ ইতিমধ্যেই দারুন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে । এনিয়ে শুধু দেশের মধ্যে নয়বিদেশী শিল্পপতি ও নেতৃত্বের মধ্যেও তৈরী হয়েছে প্রশংসাকারী ও অনুগামীর সংখ্যা। এই দিশারী পদক্ষেপে ভারতের সঙ্গে শরিক হবার জন্য আগ্রহী গোটা বিশ্ব |
ম্যানুফেকচারিং ক্ষেত্রে একমাত্র বৃহত্তম পদক্ষেপ নেবার জন্য আমরা একটি রূপরেখা প্রস্তুত করেছি সাম্প্রতিক কালের ইতিহাসে একমাত্র দেশ হিসেবে এটা আমরা করতে পেরেছি সরকারী-বেসরকারী সহযোগের রুপান্তরযোগ্য শক্তিই এতে প্রতিফলিত হয় ভারতের এই পারস্পরিক সহযোগিতার নমুনা বা মডেল সাফল্যের সাথে প্রসারিত হয়েছে অন্যত্রওযাতে ভারতের আন্তর্জাতিক শরিকদেরও একইসাথে অন্তর্ভুক্ত করা যায় |
খুবই অল্প সময়কালের মধ্যে অতীতের সেকেলে ও প্রতিবন্ধকতাময় কাঠামোকে বিদায় দিয়ে স্থাপন করা হয়েছে স্বচ্ছ্ব ও ব্যবহার-বান্ধব পদ্ধতি যা বিনিয়োগের পক্ষে সাহায্য করছেতেমনি উদ্ভাবনী ব্যাপারে উৎসাহের সঞ্চারেদক্ষতার বিকাশেমেধাস্বত্ব রক্ষায় এবং নিজ শ্রেণীতে সর্বোত্তম ম্যানুফেকচারিং পরিকাঠামো নির্মাণে সহায়তা করছে |
বিনিয়োগের উর্দ্ধসীমা ও বিধি নিয়ন্ত্রণ সহজতর করার মধ্য দিয়ে ভারতের বহু মূল্যবান শিল্পক্ষেত্র - প্রতিরক্ষানির্মাণ ও রেলওয়ে - এখন গোটা বিশ্বের অংশগ্রহনের জন্য উন্মুক্ত । প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে নীতি উদারীকরণ করা হয়েছে এবং প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের উর্দ্ধসীমা ২৬ % থেকে বাড়িয়ে ৪৯% করা হয়েছে । প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে পোর্টফোলিও বিনিয়োগের হার স্বাভাবিক ক্ষেত্রে ২৪% পর্যন্ত অনুমতি দেয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আধুনিক এবং সর্বোত্তম প্রযুক্তির জন্য ১০০% এফ ডি আই-এ অনুমোদন দেওয়া হয়েছেতবে তা একটি একটি করে প্রস্তাব ভিত্তিক হবে এছাড়া নির্মাণ কাজরেল পরিকাঠামো ও তার রক্ষনাবেক্ষনের জন্যেও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ১০০ % এফ ডি আই-এর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে |
পণ্য আমদানি ও রপ্তানীর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট বা দলিলের সংখ্যা কমিয়ে মাত্র তিনটে করা হয়েছে ভারত সরকারের ১৪টি পরিষেবাকে এক জানালা ব্যবস্থাপনায় আনা হয়েছে যা এখন সুলভ ই-বীজ (eBiz) পোর্টালে। লগ্নিকারকদের পথ-প্রদর্শনসহায়তা ও তাদের মদত দিতে তৈরী করা হয়েছে লগ্নিকারক সুবিধা প্রদানকারী বিভাগ । শিল্প গড়ার লাইসেন্স ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রেনার মেমোরেন্ডাম এর জন্য আবেদন করার প্রক্রিয়াকে অনলাইন করা হয়েছেযা ২৪x৭ ধরে সুলভ থাকছে ই-বীজ (eBiz) পোর্টালে শিল্পের লাইসেন্সের বৈধতা তিন বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রতিরক্ষা সামগ্রী বিষয়ক উৎপন্ন পণ্যের তালিকার মধ্য থেকে বৃহৎ সামগ্রীগুলোকে শিল্পের লাইসেন্স নেবার প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে বিদ্যুতের নতুন সংযোগ স্থাপনের জন্য নো-অবজেকশন-সার্টিফিকেট বা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেবার শর্তটি তুলে দেওয়া হয়েছে।



জন ধন থেকে জন সুরক্ষা

বিশ্ব রেকর্ড স্থাপন করলো ভারত : সর্বাধিক সংখ্যক ব্যাঙ্কের খাতা খোলা এবং সরাসরি নগদ অর্থ প্রদানের সর্ব-ব্যাপক প্রকল্পের জন্য এই রেকর্ড।স্বাধীনতার ৬৭ বছর পরও ভারতের জনসংখ্যার একটা বড় অংশের কাছে ব্যাঙ্কের পরিষেবার সুযোগ অধরা ছিল । তার মানেসঞ্চয়ের কোনো পথ তাদের কাছে খোলা ছিল না । এমনকি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ঋণ পাওয়ারও কোনো সুযোগ তাদের সামনে নেই। আর এই বাস্তব ও প্রাথমিক সমস্যার সমাধানে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী গত ২৮ শে আগস্ট প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনার সূচনা করেন। কয়েক মাসের মধ্যেই এই প্রকল্প লক্ষ লক্ষ ভারতবাসীর জীবনের মান ও তাদের ভবিষ্যতে একটা বিরাট পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এই কয়েক মাসেই পনেরো কোটি ব্যাঙ্কের খাতা খোলা হয়েছেসাড়ে তেরো কোটি রুপে’ কার্ড দেওয়া হয়েছে। টাকার অঙ্কে জমা পড়েছে ১৫,৭৯৮ কোটি টাকা। ব্যাঙ্ক মিত্র (ব্যাঙ্কের প্রতিনিধি) নিযুক্ত করা হয়েছে ১,২৫,৬৯৭ জনযা একটা রেকর্ড। এর মধ্যে এক সপ্তাহে ১ কোটি ৮০ লক্ষ ৯৬ হাজার ১৩০ টি ব্যাঙ্কের খাতা খোলা হয়েছেযা গিনেস বিশ্ব রেকর্ড।এই সমস্ত কিছুই সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী মোদীর প্রবল আগ্রহে ও জনগণের হৃদয় ও সরকারী ব্যবস্থায় তাঁর প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতার জন্য এই বিপুল উদ্যোগকে একটা মিশনের আকারে গ্রহণ করা হয়েছিল এবং জনগণ ও সরকারের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক অংশগ্রহণ ও সহযোগিতায় তা সফলতা লাভ করে |ব্যাঙ্কে খাতা খোলার ফলে লক্ষ লক্ষ ভারতবাসী যেমন ব্যাঙ্কের পরিষেবা গ্রহণের সুযোগ পেলেন তেমনি দুর্নীতি দমনেও তা বড় ভূমিকা নিয়েছে বর্তমানে সমস্তরকম ভর্তুকির অর্থ সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে চলে যাচ্ছে। ফলে ওই অর্থের কোনরকম অপব্যবহার ও কারচুপি হওয়ার সুযোগ দূরীভূত হয়েছে পহল যোজনায় এল পি জির ভর্তুকি এখন সরাসরি গ্রাহকের ব্যাঙ্কের খাতায় চলে যাচ্ছে। এই প্রকল্পে ১০ কোটিরও বেশি মানুষ সরাসরি নগদ ভর্তুকি পাবেন। এর ফলে ৪,০০০ কোটি টাকার ভর্তুকির অর্থ সঞ্চয় হবে।ন্যূনতম ও সাধারণ ব্যাঙ্কের সুযোগ সুবিধা যখন মানুষের নাগালে চলে এলতখন এনডিএ সরকার জনগণের জন্য বীমা ও পেনশনের সুযোগ করে দিতে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেয় । প্রধানমন্ত্রী সুরক্ষা বীমা যোজনা বছরে মাত্র বারো টাকার কিস্তিতে ২ লক্ষ টাকার দুর্ঘটনা বীমার সুযোগ এনে দিয়েছে ।প্রধানমন্ত্রী জীবন জ্যোতি বীমা যোজনায় বছরে ৩৩০ টাকার কিস্তিতে জীবন বীমার সুযোগ এসেছে । অটল পেনশন যোজনায় জমা করা রাশির অর্থের পরিমানের সাপেক্ষে প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত অবসরকালীন ভাতা পাওয়া যাবে। এই প্রকল্পগুলির সূচনার কয়েকদিনের মধ্যেই (১৬ মে ২০১৫ অনুযায়ী) ৭.২২ কোটি নাগরিক প্রকল্পগুলিতে নাম নথিভুক্ত করেছেন। এর পাশাপাশি সরকার কন্যা সন্তানের জন্য সঞ্চয় ও শিক্ষার লক্ষ্যে সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা চালু করেছে।

সংস্কারের সূর্যোদয়ে ভারত


দেশের সার্বিক বিকাশ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে।

জন ধনআধার ও মোবাইলের (জ্যাম) মাধ্যমে পরিবর্তনমুখী এক সংস্কারের অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে ভারত। উল্লেখিত ঐ তিনটি ব্যবস্থার এক অভিন্ন সংযুক্তির মধ্য দিয়ে ভর্তুকি সহায়তা গ্রাহক ও গ্রহীতার কাছে সরাসরি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই চালু হয়েছে। ভর্তুকিবাবদ নগদ অর্থ গ্রাহকের হাতে তুলে দেওয়ার পরিবর্তে সরাসরি তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা করে দেওয়ার এক পদ্ধতি এখন অনুসরণ করা হচ্ছে। এর সুফল রয়েছে দুটি। একটিতে ভর্তুকি প্রদানের ক্ষেত্রে যাবতীয় কারচুপি বা ফাঁকফোকর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং অন্যটিতে ভর্তুকি সহায়তা পৌঁছে যাচ্ছে প্রকৃত ব্যক্তির কাছে।

পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) চালু করার লক্ষ্যে কেন্দ্রের এনডিএ সরকার এক জাতীয় সহমত গঠনের কাজেও সফল হয়েছে। এই কর প্রস্তাবকে বাস্তবায়িত করার উদ্দেশ্যে সংবিধান সম্পর্কিত একটি বিলও সরকারের পক্ষ থেকে পেশ করা হয়েছে। পণ্য ও পরিষেবা কর চালু হলে ১ এপ্রিল২০১৬ থেকে এক অত্যাধুনিক পরোক্ষ কর ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হবে। এই ক্ষেত্রটিতে ভিন্ন ভিন্ন কর যে দ্বিধা ও সংশয়ের সৃষ্টি করেছিল এবং তার ফলে যে প্রতিকূল প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে তা দূর করে এক সংযুক্ত সাধারণ দেশীয় বাজার গড়ে তোলার কাজে এই নতুন ব্যবস্থা যে সফল হয়ে উঠবে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।

সাংসদ আদর্শ গ্রাম যোজনা নামে আরেকটি অভিনব কর্মসূচির কাজও শুরু করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। এর আওতায় সাংসদদের উৎসাহিত করা হচ্ছে তাঁদের নির্বাচনী এলাকার অন্তর্গত কোন একটি গ্রামকে বেছে নিয়ে সেটিকে এক আদর্শ গ্রামে (মডেল ভিলেজ) রূপান্তরিত করারলক্ষ্যে। পৃথক পৃথকভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি রূপায়ণের পরিবর্তে নিজের নির্বাচনী এলাকার সার্বিক বিকাশ ও রূপান্তরে সাংসদদের উদ্বুদ্ধ করাই সাংসদ আদর্শ গ্রাম যোজনার মূল লক্ষ্য।

কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের (এমওপিএনজি) একটি বিশেষ প্রস্তাবেও অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্যে গ্যাসচালিত সার প্রকল্পগুলিতে অভিন্ন মূল্যে প্রাকৃতিক গ্যাসের যোগানসম্পর্কিত এই প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়েছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ মন্ত্রক এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের পক্ষ থেকে যে যুগ্ম প্রস্তাব পেশ করা হয়েছিলতাও সরকারিভাবে অনুমোদন করা হয়েছে। এর ফলে১৬ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলি বিশেষভাবে চাঙ্গা হয়ে উঠবে।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ ছিল তার অনেকটাই এখন শিথিল করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলেপ্রতিরক্ষানির্মাণ ও রেলের মতো ভারতের উচ্চমানের শিল্পক্ষেত্রগুলিতে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ এখন উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত নীতিকে উদার করে তোলা হয়েছে এবং এই ক্ষেত্রটিতে বিদেশি বিনিয়োগের মাত্রা ২৬ শতাংশ থেকে ৪৯ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার আওতায় প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে পোর্টফোলিও বিনিয়োগের মাত্রা বৃদ্ধি করা হয়েছে ২৪ শতাংশ পর্যন্ত। আধুনিক এবং যুগোপযোগী প্রযুক্তির প্রয়োগ ও ব্যবহারের লক্ষ্যে ১০০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ প্রসারিত হয়েছে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে। ১০০ শতাংশ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় সম্প্রসারিত হয়েছে সুনির্দিষ্ট রেল পরিকাঠামো ক্ষেত্রগুলির নির্মাণরক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় কাজকর্ম নিরন্তর করে তোলার লক্ষ্যে।
#
 @দ্রুতগামী অর্থনীতি

জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট সরকারের আমলে ভারত বিশ্বের মধ্যে দ্রুত বর্ধনশীল বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। এই বছরটি ভারতীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক বছর ছিল। কম বৃদ্ধির হারউচ্চ মুদ্রাস্ফীতির হার এবং কমে যাওয়া উৎপাদনের হার থেকে এন ডি এ সরকার যে কেবলমাত্র আমাদের অর্থনীতির সাধারণ পর্যায়ের সূচকগুলিকে শক্তিশালী করেছে তাই নয়অর্থনীতিকে উচ্চ হারে বৃদ্ধির রাস্তায় নিয়ে গেছে। ভারতের জাতীয় আয় বৃদ্ধির হার ৭.৪ শতাংশের মতো উচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। এই হার বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতির দেশের মধ্যে দ্রুততম বলে বিবেচিত হয়েছে।



বিভিন্ন রেটিং সংস্থা ও বিশেষজ্ঞ গোষ্ঠী এন ডি এ সরকারের আমলে ভারতীয় অর্থনীতির বৃদ্ধির হার দ্রুত হবে বলে পূর্বাভাষ দিয়েছে। শক্তিশালী অর্থনৈতিক সূচক ও সরকারের সংস্কারের কর্মসূচির ওপর ভিত্তি করে রেটিং সংস্থা মুডিস’ ভারতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মানকে স্থিতিশীল’ থেকে বাড়িয়ে ইতিবাচক’ বলে ঘোষণা করেছে। ব্রিক্‌স’ গোষ্ঠীর সূচনার সময়য় অনেকে মনে করেছিলেন ভারতএই গোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্তির মতো পরিস্থিতিতে নেই। ভারতের পরিস্থিতিকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছিল। আর এখন ভারতই ব্রিক্‌সকে বৃদ্ধির ইঞ্জিন হিসাবে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।



উৎপাদন ক্ষেত্রে সরকারের গুরুত্বের ফলে শিল্প উৎপাদনের সূচকগত বছরের ঋণাত্মক বৃদ্ধি থেকে সরে এসে চলতি বছরে ২.১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মুদ্রাস্ফীতির (পাইকারি মূল্য সূচক) হারও ক্রমাগত কমছে। ২০১৪র এপ্রিল মাসে এই হার ৫.৫৫ শতাংশ থেকে কমে ২০১৫র এপ্রিলে ২.৬৫ শতাংশ হয়েছে। প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নি ঐতিহাসিক গতিতে বাড়ছে। এক্ষেত্রে ইক্যুইটির পরিমাণ ৪০ শতাংশ বেড়ে গত বছরের ১,২৫,৯৬০ কোটি টাকা থেকে চলতি বছরে ১,৭৫,৪৪৫ কোটি টাকা হয়েছে।



রাজকোষ ঘাটতির হারও ক্রমাগত কমে চলেছে। ভারতের চলতি খাতে ঘাটতির হার গত বছরের জাতীয় আয়ের ৪.৭ শতাংশ থেকে কমে ১.৭ শতাংশ হয়েছে। ভারতে বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এটি ৩১,১৮০ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ৩৫,২১০ কোটি ডলার হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির টালমাটাল অবস্থা এর ফলে সামাল দেওয়া যাবে।


ভারতের বৃহত্তম কর সংস্কার হল জিএসটি বিল

GST ( পণ্য এবং সেবা কর ) Bill ভারতের বৃহত্তম কর সংস্কারএটি এক করের মাধ্যমে সমস্ত পরোক্ষ করগুলিকে বাতিল করবে ।



GST হল একটি পরোক্ষ কর এই কর আরোপ করা হবে যখন ক্রেতা বা ভোক্তা কোন পন্য বা সেবা ক্রয় করবে ।করের বিভিন্ন স্তর যেমন ক্রয় কর ,VAT ,বিনোদন কর ইত্যাদি করগুলিকে বাতিল করবে GST 

এই করের লক্ষ্যে হল সমস্ত ভারত কে একত্রিত মার্কেটে পরিনত করা ।এই কর সিস্টেম প্রয়োগ করা হবে উৎপাদনকারী থেকে শুরু করে গ্রাহকদের উপর । GST-এর সাহায্যে করের অন্যান্য স্তরগুলি একক কর স্তরে পরিনত হবে এইভাবে ভারতে GDP-এর গ্রোথ বৃদ্ধি পাবে ।

আশা করা হচ্ছে GST-এর সাহায্যে GDP-এর গ্রোথ ২% বৃদ্ধি পাবে । এই করের হার ২% ৫% ১২% ১৮% এবং ২৮% । বর্তমানে কোন ভারতীয় যদি কোন দ্রব্য ক্রয় করেন তাহলে তাকে অন্তঃশুল্ক ,VAT,CUSTOM DUTY প্রদান করতে হয় আর যদি হোটেল থেকে কিছু কেনেন তাহলে তাকে তার সঙ্গে সেবা কর প্রদান করতে হয় ।

বিভিন্ন ধরনের করের সমস্যার সমাধান করবে যেহেতু এটি বস্তু ও সেবার উপর এক কর আরোপ করবে ।যদি স্বচ্ছতার সাথে আরোপ করা হয় তবে প্রত্যেক ভারতবাসী আগামী দিনে নতুন ভারত কে দেখতে পাবে যেখানে কর প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আসবে ।

বর্তমান ট্যাক্স সিস্টেম অনুযায়ী একজন ভারতীয় ভোক্তাকে কোন জিনিস ক্রয়ের উপর ২৫-২৬% কর দিতে হয় কিন্তু আশা করা হচ্ছে সিস্টেম-এর করের হার ১৮% হবে যা জিনিস-পত্রের দাম কমিয়ে দেবে ।

#ভারতের অর্থনীতি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম (ক্রয় ক্ষমতায়) ।
 #পঞ্চম বৃহত্তম (নামমাত্র) (Nominal) অর্থনীতি। 2017 সালে এর মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (GDP) ছিল 9.5 ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার (PPP) এবং 2.45 ট্রিলিয়ন (Nominal) মার্কিন ডলার।

ভারত বিশ্বের প্রবৃদ্ধিশীল অর্থনীতিগুলির মধ্যে সবচেয়ে দ্রুততম; 2017 সালে ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি হার ছিল 7.2%



@ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়ন

ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়ন দেশের স্বাধীনোত্তর ইতিহাসে মোটামুটি সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের নীতিতে পরিচালিত হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ। লাইসেন্স রাজ নামে পরিচিত বহুবিধ বিধি ও লাল ফিতের নীতি। এবং বিশ্ব অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্নতা ছিল এই ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য। স্বাধীনতার পরবর্তী তিন দশকে ভারতে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ১%।
১৯৮০-এর দশকের মধ্যভাগ থেকে অর্থনৈতিক উদারীকরণের মাধ্যমে ভারতের বাজার ধীরে ধীরে খুলে যেতে থাকে। ১৯৯১ সালের মৌলিকতর আর্থিক সংস্কার ও ২০০০-এর দশকে তার নবায়নের ফলে ভারত বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা স্থাপনের পথে অগ্রসর হয়।

#২০০০-এর দশকের শেষভাগে ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়ায় ৭.৫%যা দেশের গড় দশকীয় আয়ের দ্বিগুণ। বিশ্লেষক মহলের ধারণাভারত আরও বাজার সংস্কারের ক্ষেত্রে আরো কতকগুলি মৌলিক পদক্ষেপ নিলেই এই হার বৃদ্ধি পাবে এবং ২০১১ সালের মধ্যে সরকার কর্তৃক স্থিরীকৃত লক্ষ্যমাত্রা ১০ শতাংশে উপনীত হবে। নিজ নিজ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারতীয় রাজ্যগুলির নিজস্ব দায়িত্ব রয়েছে।

রাজ্যক্ষেত্রে ১৯৯৮-২০০৮ বর্ষভিত্তিক বৃদ্ধির হার হল :
গুজরাট (৮.৮%)হরিয়ানা (৮.৭%)দিল্লি (৭.৪%)। এই হার বিহার (৫.১%)উত্তরপ্রদেশ (৪.৪%) বা মধ্যপ্রদেশ (৩.৫%) রাজ্যের তুলনায় অনেক বেশি।

ভারত বিশ্বে দ্বাদশ বৃহত্তম অর্থব্যবস্থা। ক্রয়ক্ষমতা সমতার নিরিখে বিশ্বে চতুর্থ বৃহত্তম ও মাথাপিছু জিডিপি (নমিন্যাল) ও মাথাপিছু জিডিপি (পিপিপি) অনুযায়ী বিশ্বে যথাক্রমে ১২৮তম ও ১১৮তম।

ভারতে জীবনযাত্রার মান উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেলেও জনসংখ্যার ৭৫.৬ শতাংশের দৈনিক ক্রয়ক্ষমতা সমতা ২ মার্কিন ডলারেরও কমএবং নমিন্যাল ক্ষেত্রে তা ০.৫ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি।
ভারতীয়দের দুই তৃতীয়াংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গ্রামাঞ্চলে কৃষিকাজ থেকে জীবিকানির্বাহ করেন। আবার জিডিপির অংশ হিসেবে নগর ও মহানগরগুলি ভারতীয় অর্থনীতির দুই তৃতীয়াংশের গঠনকর্তা।

এখনও সংস্কার দরকার
ভারতের অর্থনৈতিক সংস্কার প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত সারা হচ্ছে। বিশ্ব ব্যাংকের মতে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ প্রয়োজন পাবলিক সেক্টর সংস্কারপরিকাঠামোকৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নশ্রম আইনের অপসারণপিছিয়ে পড়া রাজ্য ও এইচআইভি/এইডস-এর ক্ষেত্রে।
২০০৮ সালের ইজ অফ ডুইং বিজনেস ইনডেক্স অনুসারে ভারতের স্থান ১২০তম। উল্লেখ্য এই ইনডেক্সে গণপ্রজাতন্ত্রী চিন ও ব্রাজিলের স্থান যথাক্রমে ৮৩তম ও ১২০তম।


@সংস্কৃতিতে ভারত
 "কথক" নৃত্য। এই নৃত্যটি দেশের আটটি শাস্ত্রীয় নৃত্যের অন্যতম। খ্রিস্টপূর্ব একাদশ শতাব্দীতে বৈদিক যুগ উদ্ভূত "কথক" হিন্দু পুরাণের একটি গল্পকথন শৈলী থেকে উদ্ভূত। এই নাচে একাধিক হিন্দু ধর্মীয় মুদ্রা প্রদর্শিত হয়ে থাকে।

ভারতের ভাষাধর্মবিশ্বাসনৃত্যকলাসংগীতস্থাপত্যশৈলীখাদ্যাভ্যাস ও পোষাকপরিচ্ছদ এক এক অঞ্চলে এক এক প্রকারের। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই সবের মধ্যে একটি সাধারণ একাত্মতা লক্ষিত হয়। ভারতের সংস্কৃতি কয়েক সহস্রাব্দ-প্রাচীন এই সব বৈচিত্র্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও রীতিনীতিগুলির একটি সম্মিলিত রূপ।

ভারতীয় সভ্যতা প্রায় আট হাজার বছরের পুরনো। এই সভ্যতার একটি আড়াই হাজার বছরের লিখিত ইতিহাসও রয়েছে। এই কারণে কোনো কোনো ঐতিহাসিক এই সভ্যতাটিকে "বিশ্বের প্রাচীনতম জীবন্ত সভ্যতা" মনে করেন। ভারতীয় ধর্মসমূহযোগ ও ভারতীয় খাদ্য — ভারতীয় সভ্যতার এই উপাদানগুলি সমগ্র বিশ্বে গভীর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।


ভারতে ধর্মবিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতাসম্পাদনা

ভারত হল হিন্দুধর্মবৌদ্ধধর্মজৈনধর্ম ও শিখধর্মের উৎপত্তিস্থল। এই চারটি ধর্ম একত্রে ভারতীয় ধর্ম নামে পরিচিত। ভারতীয় ধর্মগুলি আব্রাহামীয় ধর্মগুলির মতোই বিশ্বের একটি অন্যতম প্রধান ধর্মীয় যূথ। বর্তমানে হিন্দুধর্ম ও বৌদ্ধধর্ম যথাক্রমে বিশ্বের তৃতীয় ও চতুর্থ বৃহত্তম ধর্মবিশ্বাস। এই দুই ধর্মের অনুগামীদের সংখ্যা ২ বিলিয়নেরও বেশি। (সম্ভবত ২.৫ বা ২.৬ বিলিয়ন)। লিঙ্গায়েত ও আহমদিয়া ধর্মমতের উৎপত্তিস্থানও ভারত।

ভারতের জনসাধারণের মধ্যে যে ধর্মকেন্দ্রিক পার্থক্য দেখা যায়তা বিশ্বের আর কোনো দেশে দেখা যায় না। এই দেশের সমাজ ও সংস্কৃতির উপর মানুষের ধর্মবিশ্বাসের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। দেশের অধিকাংশ মানুষের জীবনযাত্রা ধর্মই কেন্দ্রীয় ও প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করে। ডান্ডি সংস্কৃতির সাথে জড়িত। বিভিন্ন রাজ্য ডান্ডিবাদি মানুষ বসবাস করে তারা যারা প্রকাশ্য অন্য ধর্ম কে অবঙ্গা করে। ডান্ডিরা নিজ ধর্ম ছাড়া অন্য কোন মানুষ কে মেনে নিতে পারে না। তা নিয়ে কিছু সমস্যা হলেও ভারত একটি মিশ্র রাষ্ট্র।

ভারতের ৮০% মানুষ হিন্দুধর্মের অনুগামী। ১৩% মানুষের ধর্ম ইসলাম।তা সত্ত্বেও শিখধর্মজৈনধর্ম ও বিশেষ করে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব শুধু ভারতে নয়সমগ্র বিশ্বে প্রতীয়মান। খ্রিস্টধর্মজরথুস্ত্রবাদইহুদি ধর্ম ও বাহাই ধর্মের কিছু প্রভাব ভারতের সংস্কৃতিতে থাকলেওএই ধর্মগুলির অনুগামীর সংখ্যা এদেশে অত্যন্ত কম। ধর্ম ভারতীয়দের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিলেও নাস্তিকতা ও সংশয়বাদের অস্তিত্বও এদেশের সমাজে দেখা যায়। পরধর্মসহিষ্ণুতাও সাধারণ ভারতীয়দের অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

@সমাজ

ইউজিন এম. মাকারের মতেভারতের প্রথাগত সংস্কৃতির ভিত্তি আপেক্ষিকভাবে কঠোর এক সামাজিক ক্রমোচ্চ শ্রেণীবিন্যাস। তিনি আরও বলেছেনশিশুদের অতি অল্পবয়স থেকেই তাদের সামাজিক কর্তব্য ও অবস্থান সম্পর্কে সচেতন করে তোলা হয়। অনেকেই মনে করেন যেমানুষের জীবনকে চালনা করেন দেবতা ও উপদেবতারা।বর্ণাশ্রম প্রথা দেশের একটি শক্তিশালী সামাজিক বিভাজন রেখা। সহস্রাধিক বছর ধরে উচ্চবর্ণের মানুষেরা সামাজিক বিধিনিষেধগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে এসেছেন। তবে সাম্প্রতিককালেবিশেষ করে শহরাঞ্চলেএই বিভাজন অনেকটাই নির্মূল হয়েছে। গোত্রব্যবস্থা হিন্দুদের পারিবারিক জীবনের একটি বিশিষ্টতা। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিবারগুলির সঙ্গে তাদের পূর্বপুরুষদের সম্পর্ক রক্ষিত হয়ে থাকে। গ্রামাঞ্চলেএমনকি কখনও কখনও শহরাঞ্চলেও একই পরিবারের তিন কিংবা চারটি প্রজন্মকে একই ছাদের তলায় বসবাস করতে দেখা যায়।পুরুষতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পারিবারিক সমস্যাগুলির সমাধান করা হয়ে থাকে।





দেশের সংস্কৃতির রাজধানী হিসেবে বিশ্বনন্দিত কলকাতা


কলকাতা এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অধিকারী। এই শহর তার সাহিত্যিকশৈল্পিক ও বৈপ্লবিক চেতনার জন্য বিশ্ববিদিত। কলকাতা কেবলমাত্র ভারতের পূর্বতন রাজধানীই ছিল নাবরং আধুনিক ভারতের শিল্প ও সাহিত্য চেতনার জন্মস্থানও ছিল। শিল্প ও সাহিত্যের প্রতি কলকাতাবাসীদের বিশেষ আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়ে থাকেনতুন প্রতিভাকে গ্রহণ করার ঐতিহ্য কলকাতাকে তাই পরিণত করেছে "প্রচণ্ড সৃজনীশক্তিধর এক শহরে"।এই সকল কারণে কলকাতাকে অনেক সময় "ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী" বলে উল্লেখ করা হয়।

কলকাতার অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হল শহরের ছোটো ছোটো অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পাড়া সংস্কৃতি। সাধারণত প্রত্যেক পাড়ায় একটি করে ক্লাবঘর সহ নিজস্ব সংঘ বা ক্লাব থাকে। অনেক সময় ক্লাবগুলির নিজস্ব খেলার মাঠও থাকে। পাড়ার বাসিন্দারা অভ্যাসগতভাবে এখানে এই সব ক্লাবঘরে আড্ডা দিতে আসেনমাঝেমধ্যে এই সব আড্ডা হয়ে ওঠে মুক্তছন্দের বৌদ্ধিক আলাপআলোচনা।এই শহরে রাজনৈতিক দেওয়াললিখনেরও এক ঐতিহ্য লক্ষিত হয়এই সব দেওয়াললিখনে কুরুচিপূর্ণ কেচ্ছাকেলেংকারির বর্ণনা থেকে শ্লেষাত্মক রঙ্গব্যঙ্গলিমেরিককার্টুনইস্তাহার – সবই বিধৃত হয়।

কলকাতার অনেক ভবন ও স্থাপনা গথিকব্যারোকরোমানপ্রাচ্যও মুঘল স্থাপত্য সহ অন্যান্য ইন্দো-ইসলামীয় শৈলীর মোটিফ দ্বারা সজ্জিত। ঔপনিবেশিক যুগের অনেক উল্লেখযোগ্য ভবনই সুসংরক্ষিত এবং "ঐতিহ্যবাহী ভবন" হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। আবার অনেক ভবনই আজ কালের গহ্বরে বিলীয়মান। ১৮১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় সংগ্রহালয় এশিয়ার প্রাচীনতম জাদুঘরভারতের প্রাকৃতিক ইতিহাস ও ভারতীয় শিল্পের এক বিরাট সংগ্রহ এই জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। কলকাতার অন্যতম দর্শনীয় স্থান ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলে শহরের ইতিহাস-সংক্রান্ত একটি জাদুঘর রয়েছে। কলকাতায় অবস্থিত ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগার দেশের অগ্রণী পাবলিক লাইব্রেরি। অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস ও অন্যান্য শিল্প প্রদর্শশালায় নিয়মিত শিল্প প্রদর্শনী আয়োজিত হয়ে থাকে।

কলকাতার যাত্রাপালানাটক ও গ্রুপ থিয়েটারের ঐতিহ্য সুবিদিত। বাংলা চলচ্চিত্র ও মূলধারার হিন্দি চলচ্চিত্র এখানে সমান জনপ্রিয়। শহরের ফিল্ম স্টুডিও টালিগঞ্জে অবস্থিতএই কারণে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পকে "টলিউড" নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। একাধিক কিংবদন্তি চলচ্চিত্র পরিচালকের কর্মজীবন গড়ে উঠেছে এই শহরকে কেন্দ্র করেই। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সত্যজিৎ রায় (১৯২১১৯৯২)মৃণাল সেন (জন্ম ১৯২৩)ঋত্বিক ঘটক (১৯২৫১৯৭৬) এবং আধুনিক চিত্র পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (জন্ম ১৯৪৪)অপর্ণা সেন (জন্ম ১৯৪৫)গৌতম ঘোষ (জন্ম ১৯৫০) ও ঋতুপর্ণ ঘোষ (জন্ম ১৯৬২)।

কলকাতার খাদ্যতালিকার প্রধান উপাদান ভাত ও মাছের ঝোল,এবং রসগোল্লাসন্দেশ ও মিষ্টি দই প্রভৃতি মিষ্টান্ন। ইলিশচিংড়ি ও রুই সহ অন্যান্য মাছের নানা ব্যঞ্জনও কলকাতায় বেশ প্রচলিত। বেগুনিকাটি রোলফুচকা প্রভৃতি পথখাদ্য এবং পূর্ব কলকাতার চায়নাটাউনের ভারতীয় চীনা খাদ্যও যথেষ্ট জনপ্রিয়।

বাঙালি রমণীরা সাধারণত ঐতিহ্যবাহী পোষাক শাড়ি পরে থাকেনতবে কেউ কেউ পাশ্চাত্য পোশাক পরতেও অভ্যস্ত। আবার পুরুষদের মধ্যে পাশ্চাত্য পোষাকেরই চল বেশি।

দুর্গাপূজা কলকাতার সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ এবং সর্বাপেক্ষা জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব। প্রতি বছর বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে আশ্বিন-কার্তিক মাসে (ইংরেজি সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। অন্যান্য ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবগুলির মধ্যে জগদ্ধাত্রী পূজাকালীপূজাঈদুল ফিতরদোলযাত্রাবড়দিনপয়লা বৈশাখপঁচিশে বৈশাখসরস্বতী পূজারথযাত্রাপৌষপার্বন ইত্যাদি মহাসমারোহে পালিত হয়। এছাড়াও অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক কলকাতা পুস্তকমেলাডোভার লেন সঙ্গীত সম্মেলনকলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব ও নান্দীকারের জাতীয় নাট্য উৎসব ইত্যাদি সাংস্কৃতিক উৎসবও। প্রতি বছর জুন মাসে কলকাতায় সমকামীদের গৌরব পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়কলকাতার এই পদযাত্রা ভারতের প্রথম গৌরব পদযাত্রা।

ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্যিকদের হাত ধরে বাংলা সাহিত্যের আধুনিকীকরণ সম্পন্ন হয়। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮১৮৯৪)মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪১৮৭৩)রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১১৯৪১)কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৮১৯৭৬) ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬১৯৩৮) প্রমুখ। এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করে চলেন শহরের পরবর্তী প্রজন্মের খ্যাতিমান সাহিত্যিকেরা। এঁদের মধ্যে উল্লেখনীয় হলেন জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯১৯৫৪)বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪১৯৫০)তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮১৯৭১)মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮১৯৫৬)আশাপূর্ণা দেবী (১৯০৯১৯৯৫)শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৩৫)বুদ্ধদেব গুহ (জন্ম ১৯৩৬)মহাশ্বেতা দেবী (জন্ম ১৯২৬)সমরেশ মজুমদার (জন্ম ১৯৪৪)সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৩৬)সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৩৪) এবং জয় গোস্বামী (জন্ম ১৯৫৪) প্রমুখ।

রবীন্দ্রসংগীতভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত ও বাউল প্রভৃতি বাংলা লোকসঙ্গীতের প্রতি কলকাতাবাসীদের বিশেষ আগ্রহ লক্ষিত হয়। ১৯৯০-এর দশকের প্রথম ভাগ থেকে বাংলা সঙ্গীতের জগতে এক নতুন ধারার সূচনা ঘটে। এই ধারার বৈশিষ্ট্য লক্ষিত হয় বিভিন্ন বাংলা ব্যান্ডের গানে। কোনো কোনো ব্যান্ড আবার বাংলা লোকসঙ্গীতের সঙ্গে জ্যাজ ও অন্যান্য পাশ্চাত্য সঙ্গীতের ফিউশনও ঘটায়। তবে এই ধারায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কবীর সুমননচিকেতাঅঞ্জন দত্ত এবং বাংলা ব্যান্ড চন্দ্রবিন্দু ও ক্যাকটাসের জীবনমুখী গান।

কলকাতা এক সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অধিকারী। এই শহর তার সাহিত্যিকশৈল্পিক ও বৈপ্লবিক চেতনার জন্য বিশ্ববিদিত। কলকাতা কেবলমাত্র ভারতের পূর্বতন রাজধানীই ছিল নাবরং আধুনিক ভারতের শিল্প ও সাহিত্য চেতনার জন্মস্থানও ছিল। শিল্প ও সাহিত্যের প্রতি কলকাতাবাসীদের বিশেষ আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়ে থাকেনতুন প্রতিভাকে গ্রহণ করার ঐতিহ্য কলকাতাকে তাই পরিণত করেছে "প্রচণ্ড সৃজনীশক্তিধর এক শহরে"।এই সকল কারণে কলকাতাকে অনেক সময় "ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী" বলে উল্লেখ করা হয়।

কলকাতার অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হল শহরের ছোটো ছোটো অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পাড়া সংস্কৃতি। সাধারণত প্রত্যেক পাড়ায় একটি করে ক্লাবঘর সহ নিজস্ব সংঘ বা ক্লাব থাকে। অনেক সময় ক্লাবগুলির নিজস্ব খেলার মাঠও থাকে। পাড়ার বাসিন্দারা অভ্যাসগতভাবে এখানে এই সব ক্লাবঘরে আড্ডা দিতে আসেনমাঝেমধ্যে এই সব আড্ডা হয়ে ওঠে মুক্তছন্দের বৌদ্ধিক আলাপআলোচনা।এই শহরে রাজনৈতিক দেওয়াললিখনেরও এক ঐতিহ্য লক্ষিত হয়এই সব দেওয়াললিখনে কুরুচিপূর্ণ কেচ্ছাকেলেংকারির বর্ণনা থেকে শ্লেষাত্মক রঙ্গব্যঙ্গলিমেরিককার্টুনইস্তাহার – সবই বিধৃত হয়।

কলকাতার অনেক ভবন ও স্থাপনা গথিকব্যারোকরোমানপ্রাচ্যও মুঘল স্থাপত্য সহ অন্যান্য ইন্দো-ইসলামীয় শৈলীর মোটিফ দ্বারা সজ্জিত। ঔপনিবেশিক যুগের অনেক উল্লেখযোগ্য ভবনই সুসংরক্ষিত এবং "ঐতিহ্যবাহী ভবন" হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। আবার অনেক ভবনই আজ কালের গহ্বরে বিলীয়মান। ১৮১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় সংগ্রহালয় এশিয়ার প্রাচীনতম জাদুঘরভারতের প্রাকৃতিক ইতিহাস ও ভারতীয় শিল্পের এক বিরাট সংগ্রহ এই জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। কলকাতার অন্যতম দর্শনীয় স্থান ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলে শহরের ইতিহাস-সংক্রান্ত একটি জাদুঘর রয়েছে। কলকাতায় অবস্থিত ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগার দেশের অগ্রণী পাবলিক লাইব্রেরি। অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস ও অন্যান্য শিল্প প্রদর্শশালায় নিয়মিত শিল্প প্রদর্শনী আয়োজিত হয়ে থাকে।

কলকাতার যাত্রাপালানাটক ও গ্রুপ থিয়েটারের ঐতিহ্য সুবিদিত। বাংলা চলচ্চিত্র ও মূলধারার হিন্দি চলচ্চিত্র এখানে সমান জনপ্রিয়। শহরের ফিল্ম স্টুডিও টালিগঞ্জে অবস্থিতএই কারণে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পকে "টলিউড" নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। একাধিক কিংবদন্তি চলচ্চিত্র পরিচালকের কর্মজীবন গড়ে উঠেছে এই শহরকে কেন্দ্র করেই। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সত্যজিৎ রায় (১৯২১১৯৯২)মৃণাল সেন (জন্ম ১৯২৩)ঋত্বিক ঘটক (১৯২৫১৯৭৬) এবং আধুনিক চিত্র পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (জন্ম ১৯৪৪)অপর্ণা সেন (জন্ম ১৯৪৫)গৌতম ঘোষ (জন্ম ১৯৫০) ও ঋতুপর্ণ ঘোষ (জন্ম ১৯৬২)।

কলকাতার খাদ্যতালিকার প্রধান উপাদান ভাত ও মাছের ঝোল,এবং রসগোল্লাসন্দেশ ও মিষ্টি দই প্রভৃতি মিষ্টান্ন। ইলিশচিংড়ি ও রুই সহ অন্যান্য মাছের নানা ব্যঞ্জনও কলকাতায় বেশ প্রচলিত। বেগুনিকাটি রোলফুচকা প্রভৃতি পথখাদ্য এবং পূর্ব কলকাতার চায়নাটাউনের ভারতীয় চীনা খাদ্যও যথেষ্ট জনপ্রিয়।

বাঙালি রমণীরা সাধারণত ঐতিহ্যবাহী পোষাক শাড়ি পরে থাকেনতবে কেউ কেউ পাশ্চাত্য পোশাক পরতেও অভ্যস্ত। আবার পুরুষদের মধ্যে পাশ্চাত্য পোষাকেরই চল বেশি।

দুর্গাপূজা কলকাতার সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ এবং সর্বাপেক্ষা জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব। প্রতি বছর বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে আশ্বিন-কার্তিক মাসে (ইংরেজি সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। অন্যান্য ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবগুলির মধ্যে জগদ্ধাত্রী পূজাকালীপূজাঈদুল ফিতরদোলযাত্রাবড়দিনপয়লা বৈশাখপঁচিশে বৈশাখসরস্বতী পূজারথযাত্রাপৌষপার্বন ইত্যাদি মহাসমারোহে পালিত হয়। এছাড়াও অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক কলকাতা পুস্তকমেলাডোভার লেন সঙ্গীত সম্মেলনকলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব ও নান্দীকারের জাতীয় নাট্য উৎসব ইত্যাদি সাংস্কৃতিক উৎসবও। প্রতি বছর জুন মাসে কলকাতায় সমকামীদের গৌরব পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়কলকাতার এই পদযাত্রা ভারতের প্রথম গৌরব পদযাত্রা।

ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্যিকদের হাত ধরে বাংলা সাহিত্যের আধুনিকীকরণ সম্পন্ন হয়। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮১৮৯৪)মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪১৮৭৩)রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১১৯৪১)কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৮১৯৭৬) ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬১৯৩৮) প্রমুখ। এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করে চলেন শহরের পরবর্তী প্রজন্মের খ্যাতিমান সাহিত্যিকেরা। এঁদের মধ্যে উল্লেখনীয় হলেন জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯১৯৫৪)বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪১৯৫০)তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮১৯৭১)মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮১৯৫৬)আশাপূর্ণা দেবী (১৯০৯১৯৯৫)শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৩৫)বুদ্ধদেব গুহ (জন্ম ১৯৩৬)মহাশ্বেতা দেবী (জন্ম ১৯২৬)সমরেশ মজুমদার (জন্ম ১৯৪৪)সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৩৬)সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৩৪) এবং জয় গোস্বামী (জন্ম ১৯৫৪) প্রমুখ।


রবীন্দ্রসংগীতভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত ও বাউল প্রভৃতি বাংলা লোকসঙ্গীতের প্রতি কলকাতাবাসীদের বিশেষ আগ্রহ লক্ষিত হয়। ১৯৯০-এর দশকের প্রথম ভাগ থেকে বাংলা সঙ্গীতের জগতে এক নতুন ধারার সূচনা ঘটে। এই ধারার বৈশিষ্ট্য লক্ষিত হয় বিভিন্ন বাংলা ব্যান্ডের গানে। কোনো কোনো ব্যান্ড আবার বাংলা লোকসঙ্গীতের সঙ্গে জ্যাজ ও অন্যান্য পাশ্চাত্য সঙ্গীতের ফিউশনও ঘটায়। তবে এই ধারায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কবীর সুমননচিকেতাঅঞ্জন দত্ত এবং বাংলা ব্যান্ড চন্দ্রবিন্দু ও ক্যাকটাসের জীবনমুখী গান।


 সংস্কারে পশ্চিমবঙ্গ

ভূমি ও ভূমি সংস্কার

১৭৯৩ সালের ১নং প্রবিধান অনুসারে প্রণীত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন অনুসারে রাজস্ব সংগ্রহের ব‍্যবস্থা সুসংহত করার লক্ষ‍্যে স্থাপিত রাজস্ব পর্ষদ গঠন, যার উদ্দেশ‍্য ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক স্বার্থ পরিপূরণের জন‍্য জমি থেকে সর্বাধিক রাজস্ব সংগ্রহ - তার মধ‍্যেই ভূমি ও ভূমি সংস্কার বিভাগের উৎসের সন্ধান পাওয়া যায়। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর যুক্তিসঙ্গত কারণেই রাজস্ব প্রশাসনের দিক থেকে কল‍্যাণমূলক প্রশাসনের দিকেই গুরুত্ব ঘুরে যায়। দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গতি বজায় রেখে এই বিভাগটি যা স্বাধীনতার পূর্বে ভূমি ও ভূমি সংস্কার বিভাগ নামে পরিচিত ছিল, তা উপযোগিতা ও সংস্কার এবং ভূমি ও ভূমি রাজস্ব নামে পরিচিত হওয়ার পর শেষপর্যন্ত ভূমি ও ভূমি সংস্কার নাম গ্রহণ করে যার মধ‍্যে রাজ‍্যের অগ্রাধিকার প্রতিফলিত হয়েছে।
ভূমি সংস্কার স্বাধীন ভারতের একটি ধারণা। স্বাধীন ভারতের যোজনা প্রণেতাগণ কোনও না কোনওভাবে টিকে থাকা জমিদারদের শোষণের জাঁতাকল থেকে কৃষকদের মুক্ত করার আশু প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। স্বাধীন ভারতে সদ‍্য প্রতিষ্ঠিত কৃষিভিত্তিক শিল্পগুলির প্রয়োজন মেটানো, খাদ‍্য সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা এবং কৃষি উপকরণের সরবরাহ ছিল তখনকার জ্বলন্ত সমস‍্যা। শিল্পে কৃষির উদ্বৃত্ত বিনিয়োগ করার জন‍্য কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি অত‍্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জমি মুষ্টিমেয় ব‍্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত থাকবে না এবং ন‍্যায‍্যতার নীতি অনুসরণ করে ভূমিহীনদের মধ‍্যে তা বণ্টন করে দেওয়া হবে-এটাই সামাজিক ন্যায়ের দাবি।
ভূমি সংস্কারের অভিমুখে প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে ভূমি অধিগ্রহণ আইন, ১৯৫৩ প্রণয়ন করা হয়, যার দ্বারা জমিদারি ব‍্যবস্থার উচ্ছেদ ঘটে। অত:পর জোতের ঊর্ধ্বসীমা, খাস জমি ভূমিহীনদের মধ‍্যে বণ্টন করা, অর্থনৈতিক জোত সৃষ্টি, খাজনা হ্রাস, প্রজা ও বর্গাদারদের উচ্ছেদ বন্ধ করা, প্রজাদের মালিকানা স্বত্ব প্রদান, ছদ্ম স্বত্বভোগী ও অন‍্যান‍্য নিয়মবহির্ভূত ব‍্যবস্থা বন্ধ করার মতো বিষয়গুলি বিবেচনা করার প্রয়োজন হয়। এই ধরণের জ্বলন্ত সমস‍্যা সমাধানের জন‍্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১৯৫৫ সালে ভূমি সংস্কার আইন প্রণয়ন করে।

উদ্বাস্তু ত্রাণ ও পুনর্বাসন
 
ভারতের ইতিহাসে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা বিপুল সংখ্যক উদ্বাস্তুরা একটি বড় সমস্যার সৃষ্টি করেছিল । ১৯৪৬-এ এই প্রবনতার সূচনা এবং দেশবিভাগের পর তা বাড়তে বাড়তে প্লাবনের আকার নেয় । ১৯৬৪-তে আবার একবার বাস্তুহারাদের ভীড় দেখা যায় এবং ১৯৭১-এ বিপুল পরিমানে শরণার্থী আসতে থাকেন । ১৯৭১-এর ভিতর হিসাবমতো প্রায় ৫৮ লক্ষ উদ্বাস্তু ভারতে আসেন এই ১৯৭১-এর শরণার্থীরা যারা থেকে গিয়েছিলেন তাদের বাদ দিয়ে । ১৯৭৪-এর ভারতের পরিকল্পনা কমিশনে পছিমবঙ্গ সরকার প্রদত্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী রাজ্যে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬০ লক্ষ । আর আর কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৮১-তে এই সংখ্যা হয় ৮০ লক্ষ । তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে আগত বিপুল সংখ্যক  উদ্বাস্তুর চাপ সামলানোর উদ্দেশ্যে জেলা ও মহকুমা উদ্বাস্তু ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তরগুলি স্থাপিত হয় । সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এইসব জেলা ও মহকুমা উদ্বাস্তু ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তরগুলিকে সুসংহতভাবে গড়ে তোলা গিয়েছে।

 পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্য‌ার ১০ থেকে ১৯ বছরের নীচে রয়েছে ১.৭৩ কোটি মানুষ। এর মধ্য‌ে ৪৮.১১ শতাংশ মহিলা। ডিএলএইচএস-৩ সমীক্ষা অনুযায়ী, শিশু বিবাহের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চম স্থানে রয়েছে। রাজ্য‌ের ৫৪.৭৪ শতাংশ সদ্য‌ বিবাহিত মহিলার বিয়ে হয়েছে ১৮ বছরের কম বয়সে (২০০৭-০৮-এর তথ্য‌ অনুযায়ী)। গ্রামাঞ্চলে এই হার ৫৭.৯ শতাংশ। এ ব্য‌াপারে অগ্রগণ্য‌ জেলাগুলি হল, মুর্শিদাবাদ (৬১.০৪ শতাংশ), বীরভূম (৫৮.০৩ শতাংশ), মালদা (৫৬.০৭ শতাংশ), পুরুলিয়া (৫৪.০৩ শতাংশ)। দ্য সিলেকটেড এডুকেশন্যাল স্ট্যাটিসটিক্স ২০১০-১১ (মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক, ভারত সরকার) অনুযায়ী,পশ্চিমবঙ্গে স্কুলছুটের হার প্রথম থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রীদের মধ্য‌ে ৬৩.৫ শতাংশ। ছাত্রদের মধ্য‌ে ৬৪.৯ শতাংশ। ছাত্র বা ছাত্রী উভয় ক্ষেত্রেই এই গড় জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি। এই পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রীদের স্কুলে ধরে রাখতে এবং বাল্য‌বিবাহ রুখতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কন্য‌াশ্রী প্রকল্প গ্রহণ করেছে। ২০১৪-এর ১৪ আগস্ট কন্য‌াশ্রী দিবসের অনুষ্ঠানে মুখ্য‌মন্ত্রী মমতা বন্দ্য‌োপাধ্য‌ায় প্রদত্ত তথ্য‌ অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ১২০০ স্কুলের ১৬ লক্ষ ছাত্রী এই প্রকল্পে নথিভুক্ত হয়েছে। এই প্রকল্পের নোডাল এজেন্সি নারী ও শিশু কল্য‌াণ দফতর।

প্রকল্পটি কী

১৮ বছরের নীচে যাতে মেয়েদের বিবাহ না হয় সেই দিকে লক্ষ্য‌ রেখে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই প্রকল্প চালু করেছে। গরিব ঘরের মেয়েদের যাতে টাকার অভাবে পড়াশোনা বন্ধ না হয় তা দেখাও এই প্রকল্পের লক্ষ্য‌। এই প্রকল্প থেকে বছরে এক বার পাঁচশো টাকা করে বৃত্তি পাওয়া যাবে। ১৮ বছর পর্যন্ত বিয়ে না করে থাকলে ও পড়াশোনা চালিয়ে গেলে এককালীন অনুদান পঁচিশ হাজার টাকা পাওয়া যাবে।

কারা বার্ষিক বৃত্তি পাবে

১ এপ্রিল ২০১৩ তারিখে যাদের বয়স ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সের মধ্য‌ে এবং পারিবারিক আয়ের সীমা বছরে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা বা তার কম, তারা এই বৃত্তি পাবে। শুধুমাত্র বয়সই অনুদান পাওয়ার একমাত্র যোগ্য‌তা নয়। যে সব মেয়ে অষ্টম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করছে বা বৃত্তিমূলক শিক্ষায় যুক্ত একমাত্র তারাই এই বৃত্তি পাবে।

কারা এককালীন অনুদান পাবে

অবিবাহিত যে সব মেয়ের ১ এপ্রিল ২০১৩ বা তার পরে বয়স ১৮ বছর কিন্তু ১৯ বছরের কম তারা এই অনুদান পাওয়ার যোগ্য‌ বলে বিবেচিত হবে। তবে, তাদের সরকারি বা সরকার অনুমোদিত বিদ্য‌ালয়ের বা মুক্ত বিদ্য‌ালয়ের অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে পাঠরতা হতে হবে। অথবা তার সমান কোনও বৃত্তিমূলক\কারিগরি শিক্ষায় নাম লেখানো থাকতে হবে বা প্রশিক্ষণ নিতে হবে। অনুদানগ্রহণকারীর বার্ষিক পারিবারিক আয় ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকার কম হতে হবে। জে.জে হোমে থাকা (জুভেনাইল জাস্টিস অ্য‌াক্টের আওতাধীন হোম) মেয়েরা এই অনুদান পেতে পারে কিন্তু বার্ষিক পারিবারিক আয়ের শর্ত তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য‌। আবেদনকারীর পিতামাতা শারীরিক ভাবে ৪০ শতাংশ বা তার বেশি অসমর্থ হলে এই শর্ত প্রযোজ্য‌ নয়।



পশ্চিমবঙ্গের কৃষি — খর্বিত ভূমি সংস্কার ও সাম্রাজ্যবাদী অনুপ্রবেশ

সুরঞ্জন মিত্র

ভূমিকা  

পশ্চিমবঙ্গের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস খুবই উজ্জল। কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে সংগঠিত ভারতবর্ষের তিনটি বিখ্যাত কৃষক আন্দোলন-- তেভাগা, তেলেঙ্গানা এবং নকশালবাড়ির মধ্যে দুটিই সংগঠিত হয়েছে এই পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু বিগত কয়েক দশক পশ্চিমবঙ্গ কোন কৃষক অভ্যুত্থান প্রত্যক্ষ করেনি, যদিও শোষণ-বঞ্চনা থেকেই গেছে। শোষণে জর্জরিত কৃষককুল বিচ্ছিন্নভাবে বহুবার বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে। কিন্তু এই বিক্ষিপ্ত বিক্ষোভগুলি কোন সংগঠিত রূপ নেয়নি।

যে কোন বস্তুর বিকাশ ঘটে তার আভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব ও বাহ্যিক শর্তের কারণে। সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রেও একথা সত্য। উৎপাদিকা শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের দ্বন্দ্বই সমাজ বিকাশের প্রধান চালিকাশক্তি। তাই কৃষক সমাজকে বিপ্লবের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্রশক্তি হিসাবে সংগঠিত করতে হলে, অর্থাৎ বাহ্যিক শর্ত প্রয়োগে গ্রাম সমাজের বৈপ্লবিক বিকাশ ঘটাতে হলে তার আভ্যন্তরীন দ্বন্দ্বের প্রত্যেকটি দিক সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ ও বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞানলাভ করা দরকার এবং তারপর প্রয়োজন সেই জ্ঞানের যথাযথ বস্তুবাদী বিশ্লেষণ। এই প্রাথমিক কাজটুকু সম্পাদন করতে না পারলে, রাজ্যব্যাপী কৃষক অভ্যুত্থানের স্বপ্নকে বাস্তুবায়িত করা সম্ভব নয়।

কয়েকটি সমস্যা  

বস্তুই হল জ্ঞানের প্রধান উপাদান। বস্তুবাদের এই মৌলিক ধারণা থেকে বিচ্যুত হলে, ভাববাদের শিকার হবার সম্ভাবনা প্রবল। গ্রামীন সমাজের শ্রেণী বিশ্লেষণ করে ক্ষমতার কেন্দ্রগুলিকে চিহ্নিত করতে হলে তাই গ্রামীন সমাজ সম্পর্কে নিবিড় জ্ঞান লাভ করা প্রয়োজন। এই জ্ঞানলাভের পথে কতগুলি সমস্যা বিদ্যমান। প্রথমত পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম সমাজের বৈচিত্র্য ব্যাপক, এক জেলার সাথে অন্য জেলার গ্রাম সমাজের বহু পার্থক্য রয়েছে। যেমন বীরভূম জেলায় আজও মহিন্দর প্রথা বিদ্যমান, কিন্তু উত্তর ২৪ পরগনায় এর অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না। এই সব কারণে অল্প কয়েকটি গ্রামে সমীক্ষা করে প্রাপ্ত তথ্য থেকে সমগ্র রাজ্য সম্পর্কে সিদ্ধান্ত করা হলে ভুল হবার সম্ভাবনাই বেশি। দ্বিতীয়ত এই রাজ্যে ক্রিয়াশীল বিপ্লবী শক্তিগুলির সমগ্র রাজ্য জুড়ে সমীক্ষা চালাবার মতো পরিকাঠামোর অভাব। তৃতীয়ত সরকারি সমীক্ষাগুলি প্রায়শই অপেশাদারি মনোভাব নিয়ে করা হয়। তাছাড়া বিভিন্ন বেআইনি ও অসামাজিক কার্যকলাপ, যেগুলি প্রতিনিয়ত গ্রামীন ক্ষমতার কেন্দ্রগুলিকে পুষ্ট করছে তার কোন প্রতিফলন সরকারি সমীক্ষায় পড়ে না।

এই প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্যের উৎসগুলি নিম্নরূপ।

১। বিশিষ্ট সমাজ বিজ্ঞানীদের গবেষণা পত্র, যে গুলি সাম্প্রতিক কালে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন গ্রামে সমীক্ষার মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়েছে। (তালিকা শেষে দেওয়া হয়েছে।)

২। কয়েকটি রাজনৈতিক সংগঠনের প্রস্তুত করা গ্রাম সমীক্ষার রিপোর্ট।

৩। পেশাদার বিপ্লবীদের সাক্ষাৎকারে প্রাপ্ত তথ্য।

৪। ব্লকস্তরে বিভিন্ন আধিকারিকদের সাক্ষাৎকারে প্রাপ্ত তথ্য।

৫। লেখকের নিজস্ব অভিজ্ঞতা।

৬। সরকারি পরিসংখ্যান।

তাই গ্রামসমাজের অনেক বৈশিষ্ট্যই লেখকের দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারে। এ সম্পর্কে সচেতন পাঠক ওয়াকিবহাল করলে উপকৃত হব।

গ্রামীন শ্রেণী বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আর একটি বড় সমস্যা হল সনাতন চিন্তা পদ্ধতির সমস্যা। সবুজ বিপ্লব কর্মসূচির ব্যাপক প্রচলনের আগে পর্যন্ত কৃষিতে শ্রেণী দ্বন্দ্বের প্রধান রূপ ছিল মূলত কৃষিজমির উপর মালিকানা প্রতিষ্ঠার লড়াই। উৎপাদিকা শক্তির সাথে উৎপাদন সম্পর্কের দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য মূলত জমির পুনর্বণ্টনের প্রয়োজন ছিল। কৃষি উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণ যেমন বীজ, সার, জল ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান মূলত উৎপাদকদেরই করায়ত্ত ছিল। কিন্তু সবুজ বিপ্লব বা কৃষিতে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর, বীজ, সার, জল ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান ক্রমশ কৃষকদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। উৎপাদিকা-শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের দ্বন্দ্ব এখন আর কেবলমাত্র কৃষিজমির বণ্টনের মাধ্যমে নিরসন করা সম্ভব নয়। কিন্তু এখনও গ্রামীন শ্রেণী বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে জমির মালিকানাকে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এই প্রবণতা অতিক্রম করতে না পারলে গ্রাম সমাজের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলিকে যথাযথভাবে চিহ্নিত করা অসম্ভব।

কয়েকটি মিথ  

পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আছে। এই রাজ্যের শাসনব্যবস্থায় এমন বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা ভারতের অপরাপর রাজ্যের তুলনায় স্বতন্ত্র। রাজ্য সরকারে পক্ষ থেকে প্রায়ই দাবি করা হয় যে এই বিশেষ শাসনতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জীবন্মযাত্রার মানের প্রভূত উন্নতি ঘটেছে। শাসক দলের প্রভাবাধীন বিভিন্ন গণ সংগঠনগুলি সমাজের বিভিন্ন স্তরে এই রকম একটা প্রচার চালায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে এখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য-সচেতনতা, খাদ্য উৎপাদন, ভূমি সংস্কার, ন্যুনতম মজুরি ইত্যাদি কতকগুলি বিষয়ে ভারতে পশ্চিমবঙ্গের স্থান বর্ণনা করা হল। বর্তমান সময়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জীবনযাত্রার মান সম্পর্কে একটি ধারণা এই তথ্যগুলি থেকে পাওয়া যাবে।

তালিকা-১
বিষয়                             
ভারতে পশ্চিমবঙ্গের স্থান
মন্তব্য
সাক্ষরতা  (৬ বছর ও তার উর্ধ্বেপুরুষ)
১৪তম
অর্থাৎ এবিষয়ে ১৩টি রাজ্য এগিয়ে আছে।
সাক্ষরতা (৬ বছর ও তার ঊর্ধ্বেনারী)
১৪তম
অর্থাৎ এবিষয়েও ১৩টি  রাজ্য এগিয়ে আছে।
গ্রামে ৬-১৭ বছর বয়স্কদের স্কুলে যাবার হার (পুং)
২২তম
এ বিষয়ে ২১টি রাজ্য এগিয়ে।
গ্রামে ৬-১৭ বছর বয়স্কদের স্কুলে যাবার হার (স্ত্রী)
১৭তম
এ বিষয়ে ১৬টি রাজ্য এগিয়ে।
বিদ্যুত আছে এমন বাড়ি
২১তম
এ বিষয়ে ২০টি রাজ্য এগিয়ে।
পায়খানা বাথরুম আছে এমন বাড়ি
১৫তম
এ বিষয়ে ১৪টি রাজ্য এগিয়ে।
সপ্তাহে অন্তত একবার খবরেব কাগজ বা মাসিক পত্রিকা পড়ে এমন মানুষের সংখ্যা
১৯তম
এ বিষয়ে ১৮টি রাজ্য এগিয়ে।
গৃহস্থলীর কোনো কাজে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননা এমন নারীর শতকরা সংখ্যা
৮ম
অর্থাৎ অন্তত আরও ১৭টি রাজ্য এমন আছে যেখানে মহিলারা এই রাজ্যের তুলনায় বেশী স্বাধিকার   ভোগ করেন।
অসম্মানিত বা প্রহৃত হয়েছেন এমন মহিলার সংখ্যা
১০ম
৯ টি রাজ্যের মহিলারা পশ্চিমবঙ্গ   থেকে নিরাপদ।
শিশু মৃত্যুর হার
১১তম
১০ টি রাজ্যে শিশু মৃত্যুর হার এই রাজ্যের থেকে কম।
প্রতি ১,০০,০০০ গ্রামবাসীর মধ্যে জনডিসে আক্রান্তের সংখ্যা
৫ম
অর্থাৎ ২০ টি রাজ্যে জনডিসের আক্রমণের সংখ্যা এ রাজ্যের থেকে কম। জনডিস একটি জলবাহিত রোগ অর্থাৎ এ থেকে বিশুদ্ধ পানীয় জল প্রাপ্তি সম্পর্কেও ধারণা করা যায়।
প্রতি ১,০০,০০০ গ্রামবাসীর মধ্যে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তর সংখ্যা
১৫তম
অর্থাৎ এই বিষয়ে ১০টি রাজ্যের অবস্থা এ রাজ্যের থেকে ভাল।
প্রতি ১,০০,০০০ গ্রামবাসীর মধ্যে টি বি রোগীর সংখ্যা
১৪তম
এই বিষয়ে ১১টি রাজ্যের অবস্থা এ রাজ্য থেকে ভাল।
সমস্ত রকম টিকা নিয়েছে এমন শিশুর (১২-১৩ মাসসংখ্যা
১৫তম
অর্থাৎ ১৪ টি রাজ্যে টিকাপ্রাপ্ত শিশুর সংখ্যা এ রাজ্য থেকে বেশী।
ভিটামিন এ-এর অন্তত একটি ডোজ পেয়েছে এমন শিশুর (১২-১৩ মাসসংখ্যা
১১তম
অর্থাৎ আরও ১০ টি রাজ্যে শিশুরা এরাজ্য থেকে বেশি  ভিটামিন-এ  পেয়েছে।
রক্তাল্পতায় আক্রান্ত মহিলার সংখ্যা
৫ম
অন্তত ২০ টি রাজ্যের সংখ্যা মহিলারা এ রাজ্যের থেকে রক্তাল্পতায় কম ভোগেন।
লৌহের অভাব জনিত রক্তাল্পতায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা (-৩৫ মাস)
৫ম
অন্তত ২০টি রাজ্যের শিশুরা এ রাজ্যের থেকে কম রক্তাল্পতায় ভোগে।
প্রসবের সময় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রীর উপস্থিতি
১২তম
অন্তত ১১ টি রাজ্যে মহিলারা প্রসবের সময় শিক্ষিত ধাত্রীর সান্নিধ্য বেশি সংখ্যায় পান।
তথ্যের উৎস: National Family Health Survey 1998-1999, ১৯৯৮-১৯৯৯, এই সময় ভারতে মোট রাজ্য সংখ্যা ছিল ২৫ টি।

তালিকা-২
মাথা পিছু দৈনিক নীট খাদ্যশস্য উৎপাদন (পশ্চিমবঙ্গ ও বাকি ভারত)
২০০০ সালে মাথাপিছু দৈনিক মাথাপিছু দৈনিক নীট খাদ্য শস্য উৎপাদন
পশ্চিমবঙ্গে
২০০০ সালে নীট খাদ্যশস্য উৎপাদন
বাকি ভারত
ফারাক
৪৫১ গ্রাম
৫০১ গ্রাম
৫০ গ্রাম

১৯৫১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দৈনিক মাথা পিছু নীট খাদ্য উৎপাদনের শতকরা বৃদ্ধি
পশ্চিমবঙ্গ
১৯৫১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দৈনিক মাথা পিছু নীট খাদ্য উৎপাদনের শতকরা বৃদ্ধি
বাকিভারত
১৮৪
৫০০
তথ্যের উৎস : অজিত নারায়ণ বসু। ‘পশ্চিমবাংলার কৃষি, যা হয়ে চলেছে এবং যা হওয়া সম্ভব’’। অনীক, অক্টোবর-নভেম্বর ২০০১। অজিত নারায়ণ বসু এই তথ্য পেয়েছেন বার্ষিক আর্থিক সমীক্ষা পশ্চিমবাংলা সরকার ও ভারত সরকার এবং সেন্সাস থেকে।

তালিকা-৩
ভারতের কয়েকটি রাজ্যে সর্বনিম্ন মজুরীর হার (১৯৭৮, ’৮৩, ও ’৯৩ সালে)
রাজ্য
১৯৭৮
১৯৮৩
১৯৯৩
আসাম
.৫০ টাকা এবং একবেলা খাওয়া অথবা ৫ টাকা
৮ টাকা এবং একবেলা খাওয়া
৩২.৩০ টাকা
বিহার
-৫ টাকা            (জল খাবার সহ)
-৫ টাকা (জল খাবার সহ)
১৬.৫০ টাকা
মধ্যপ্রদেশ
.৫০ থেকে ৪ টাকা
৫ টাকা
২৮.১৭ টাকা
ওড়িশা
৪ টাকা
৫ টাকা
৩৫.০০ টাকা
উত্তর প্রদেশ
.৫ টাকা থেকে .৫ টাকা
.৮০-.৫০ টাকা
২৩-২৫ টাকা
পশ্চিমবঙ্গ
.২৫ টাকা
.২৫ টাকা
২৬.৯৫ টাকা
তথ্যের উৎস : Political Economy of Middleness, Behind Violence in Rural West Bengal, by Dipankar Basu, E. P. W. April 21-27, 2001.

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে এই ৫ টি রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে ন্যুনতম মজুরি হার ১৯৯৩ সালে কেবল বিহার ও উত্তর প্রদেশের থেকে বেশি, যদিও ১৯৭৮ ও ১৯৮৩ সালে পশ্চিমবঙ্গে এই মজুরির হার সর্ব্বোচ্চ ছিল।

তালিকা-৪
বিভিন্ন সময় কালে পশ্চিমবঙ্গে ভূমিসংস্কার আইনে সীমা বহির্ভূত জমি খাস ঘোষণা করার পরিমাণ (লক্ষ একরে)
সময় কাল
জমিরপরিমাণ
১৯৫৩-১৯৬৭
৩৫
১৯৬৭-১৯৭২
৬০
১৯৭২-১৯৮০
২৬২
১৯৮০-২০০০
১৫২
২০০০ সাল পর্যন্ত মোট
১৩৬৫
তথ্যের উৎস : Political Economy of Middleness, Behind Violence in Rural Welt Bengal, by Dipankar Basu, E. P. W. April 21-27 2001

তালিকা-৫
পশ্চিমবঙ্গে ভূমি বন্টনের সাম্প্রতিক চিত্র
মোট কৃষিজমি
খাস জমি
বন্টিত খাস জমি
১ কোটি ৩ লক্ষ একর
১৩ লক্ষ ৬৫ হাজার একর
১০ লক্ষ ৩৮ হাজার একর
তথ্যের উৎস পূর্বের ন্যায়

অর্থাৎ মোট খাস জমির মধ্যে এখনও ৩ লক্ষ একরেরও বেশি জমি বন্টিত হয় নি।

এই সকল তথ্য সমূহ থেকে দেখা যাচ্ছে যে শাসক দল যেমন দাবি করে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জীবনযাত্রার মান সেরকম উন্নত নয়। বরং ভারতবর্ষের অন্যান্য অনেক রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ বেশ পিছিয়ে আছে। খাসজমি দখল করার পরিমাণ বামফ্রন্ট সরকারের আমলে বেশি নয়। মাথা পিছু দৈনিক খাদ্য উৎপাদন বা মজুরির ন্যুনতম হারের ক্ষেত্রেও এরাজ্য বেশ পিছিয়ে। এই পশ্চাৎপদতার একমাত্র কারণ কি কেন্দ্রের বঞ্চনা, নাকি পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থাও এর জন্য দায়ী? মানুষের এত শোষণ-বঞ্চনা সত্ত্বেও বামফ্রন্ট বিগত আড়াই দশক ধরে নিরবচ্ছিন্ন ক্ষমতা ভোগ করে চলেছে। এই আপাত স্ববিরোধী ঘটনার পিছনেও কি উক্ত শাসনতান্ত্রিক  ব্যবস্থার কোন ভূমিকা আছে? কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছনর আগে গ্রাম সমাজের পশ্চাৎপটে বামফ্রন্টের বিশেষ শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিভিন্ন দিকগুলি নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই প্রসঙ্গে ‘বাম’ জমানায় গ্রামীন অর্থনীতিতে সাম্রাজ্যবাদ ও দেশি শোষকবর্গের প্রতিক্রিয়া নিয়েও আলোচনা করা হবে।




পশ্চিমবঙ্গে ভূমিব্যবস্থা : এক : বর্গাদারী প্রথা

আজও নির্বাচনী প্রচারের সময় বামফ্রন্টের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসাবে তুলে ধরা হয় অপারেশন বর্গা ও ভূমি সংস্কার কর্মসূচিকে। প্রথমে অপারেশন বর্গা সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা যাক। স্বাধীনতার পর ভারত সরকার ভাগচাস্নীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার জন্য ভূমিব্যবস্থার কিছু সংস্কার করেছিল। এরই ফলশ্রুতিতে ১৯৫৫ সালে বর্ধিত ভূমি সংস্কার আইন ও পরবর্তী সংশোধনগুলিতে দুটি প্রধান ধারার উল্লেখ ছিল।

১। জমির মালিককে আইন নির্ধারিত উৎপাদনের অংশ দিয়ে গেলে, জমি ফেলে না রাখলে বা জমি অন্য কাউকে ইজারা না দিলে, ভাগ চাস্নীরা জমিতে স্থায়ী ও উত্তরাধিকার যোগ্য ভোগ দখলের অধিকার পাবে। এছাড়াও অবশ্য জমি মালিক ব্যক্তিগত চাষের জন্য ওই জমি ব্যবহার করতে চাইলে ভাগচাষী সেই অধিকার হারাবে। এই অধিকার উত্তরাধিকারযোগ্য কিন্তু হস্তান্তরযোগ্য নয়।

২। জমির মালিক কোনো নথিভুক্ত ভাগচাস্নীর কাছ থেকে ২৫ শতাংশের বেশি উৎপাদন দ্রব্য দাবি করতে পারবে না। এক্ষেত্রে চাষের সম্পূর্ণ শ্রম ও উৎপাদনের খরচ ভাগচাস্নীকে বহন করতে হবে। যদি মালিক শ্রম ছাড়া অন্যান্য উপাদানের খরচ বহন করে তাহলে তার প্রাপ্য হবে ৫০ শতাংশ।

১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার আগে এই আইন ছিল কেবল মাত্র কাগজে-কলমে। ক্ষমতায় আসার পর বামফ্রন্ট সরকার অপারেশন বর্গা নামে একটি কর্মসূচি শুরু করে। এই কর্মসূচি অনুসারে ১৯৫৫ সালের ভূমি সংস্কার আইনকে বাস্তবে প্রযোগ করা শুরু হয়। ভাগচাষীরা ভূমি রাজস্ব দপ্তরে নিজেদের নাম নথিভুক্ত করে এবং জমির মালিককে নিয়মিত ভাবে উৎপাদনের ২৫ শতাংশ খাজনা হিসাবে দিয়ে ভাগে চাষ করা জমিতে প্রকৃতই স্থায়ী ও উত্তরাধিকারযোগ্য স্বত্ব অর্জন করে। এর ফলে যখন-তখন মালিকের মর্জি অনুযায়ী জমি থেকে উচ্ছেদ হবার ভয় থাকে না। উৎপাদন বৃদ্ধিতে তার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। কৃষি উৎপাদনে এর একটা ইতিবাচক প্রভাব পযে। মৈত্রীশ ঘটক, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং পল গার্টলার তাঁদের যৌথ গবেষণায় দেখাচ্ছেন যে পশ্চিমবঙ্গে ধানচাষে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির অন্তত এক তৃতীয়াংশ অপারেশন বর্গার ফলে সম্ভব হয়েছে।

কিন্তু সমগ্র পশ্চিমবঙ্গের কৃষি ক্ষেত্রে উৎপাদিকা শক্তি এবং উৎপাদন সম্পর্কের দ্বন্দ্বের নিরিখে অপারেশন বর্গার ভূমিকা কি? প্রথমত অপারেশন বর্গার ফলে নথিভুক্ত প্রায় সাড়ে চোদ্দ লক্ষ ভাগচাষী এই রাজ্যের সমগ্র কৃষিজমির মাত্র ৮ শতাংশ জমিতে চাষ করেন। যদি ধরে নেওয়া যায় যে অপারেশান বর্গার ফলে অনথিভুক্ত ভাগ চাষীদেরও দরকষাকষির ক্ষমতা এবং জমিতে স্থায়িত্ব বেড়েছে এবং এই অনথিভুক্তদের সংখ্যা নথিভুক্তদের প্রায় সমান, তাহলেও এই কর্মসূচীর (প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষ) মোট প্রভাব ১৬ শতাংশের বেশি জমিতে পড়েনি। বিভিন্ন গবেষকদের গবেষণা পত্র থেকেও জানা যায় যে, পশ্চিমবঙ্গে ভাগচাষের আওতাভুক্ত জমির পরিমাণ মোট জমির ২০%-এর বেশি নয়। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের অন্তত ৮০ শতাংশ জমির ওপর অপারেশন বর্গার কোন প্রভাব পড়েনি। ওই জমি কর্ষিত হয় মূলত ক্ষেতমজুর ও/বা ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক কৃষক পরিবারগুলির পারিবারিক শ্রমে।

অপারেশান বর্গার ফলে পুরাতন ভূমি সম্পর্কের কোনো গুণগত পরিবর্তন হয় না। এই আইনে জমির মালিকের অধিকার পূর্ণমাত্রায় বজায় থাকে। কোন শ্রম না করে, উৎপাদনের কোন খরচ বা ঝুঁকি বহন না করে জমি মালিক শুধু মালিক হবার সুবাদে উৎপাদনের ২৫ শতাংশ ভোগ করে। এই ব্যবস্থা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার থেকে পশ্চাৎপদ একটি ব্যবস্থা, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় জমি মালিককে সমগ্র উৎপাদনের তদারকি, উৎপাদন ব্যয় এবং ঝুঁকি বহন করতে হয়। কিন্তু বর্গাদারি ব্যবস্থায় জমি মালিককে প্রায় সামন্তবাদী কায়দায় উদ্বৃত্ত আত্মসাতের অধিকার দেওয়া হয়। এই উদ্বৃত্ত উৎপাদনে পুনর্বিনিয়োগের কোন ইচ্ছা বা উৎপাদনের মানের উন্নয়ন ঘটাবার কোন দায় তার থাকে না। চিরকাল মালিক বর্গাদারের ঘাড়ের ওপর পরজীবীর মত চেপে থাকে। ইদানিং আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় বাজার নির্ভর চাষে ঝুঁকি ক্রমশই বাড়ছে। জমির মালিক যে ব্যবস্থায় ঝুঁকি থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি পায় তা ভাগচাষীর পক্ষে কখনোই মঙ্গলজনক নয়।

ভাগচাষ মূলত ধানচাষের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ, ভাগচাষের জমির প্রায় ৯০ শতাংশই ধান চাষ হয়। এই প্রসঙ্গে বর্তমানে বোরো ধান চাষের লাভ-ক্ষতির হিসাব দেওয়া হল।

তালিকা-৬
এক বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষের উৎপাদন ব্যয়
উপাদান
খরচ
১. বীজ ১০ কে জি
*২. বীজ তলায় হাল দুটি
৩. সার এক কুইন্টাল
*৪. জমিতে হাল ৫টি
৫. সেচ (ডিজেল)
*৬. শ্রমিক (৮ জন-দিন)
*৭. নিড়ানি (১২ জন-দিন)
৮. কীটনাশক
১৫০.০০ টাকা
১৬০.০০ টাকা
৪০০.০০ টাকা
৬৪০.০০ টাকা
৩৪০.০০ টাকা
৪০০.০০ টাকা
৬০০.০০ টাকা
১১০.০০ টাকা
মোট
২৮৮০.০০ টাকা

জমিতে খুব ভালো ফলন হলে বিঘা প্রতি ২০ মণ ধান হবে (৪০ কেজিতে এক মণ)। এর মধ্যে ভাগ চাষীকে জমির মালিককে দিতে হবে ৫ মণ ধান এবং জলসেচের জন্য পাম্পের মালিককে ৩ মণ ধান। সমস্ত শ্রম যদি ভাগচাষীর পারিবারিক শ্রম হয় তাহলে * চিহ্নিত খরচগুলি বাদ যাবে এবং খরচ হবে বিঘাপ্রতি ১০০০ টাকা। অধিকাংশ ভাগচাষীরই চাষের থেকে যা আয় হয় তার সবটাই সংসার খরচে চলে যায়, তাই তাদের ধার করে এই খরচ যোগাড় করতে হয়। মহাজনের কাছ থেকে ১২০% বাৎসরিক সুদে চার মাসের জন্যে এই ১০০০ টাকা ধার করলে সুদ লাগবে ৪০০ টাকা। ভাগচাষীর ভাগে ধান থাকবে ১২ মণ যার বিক্রয় মূল্য ১৮০ টাকা/মণ হিসাবে ১২ X ১৮০ = ২১৬০ টাকা। অর্থাৎ বর্গাদারের নীটলাভ ২১৬০ -- ১৪০০ = ৭৬০ টাকা। যদি বর্গাদার বছরে দুবার ফসল হয় এমন ৪ একর (১২ বিঘা) কোন ক্ষেতের ভাগচাষী হন তাহলে তার মাসিক রোজগার হবে ১৫২০ টাকা যা কোন কারখানার ঠিকা শ্রমিকের রোজগারের সমান। তফাত এই যে কারখানার ঠিকা শ্রমিকের এই রোজগার হয় একক শ্রমে আর বর্গাদারের পারিবারিক শ্রমে।

পশ্চিমবঙ্গে ৩ একরের বেশি বড় জোতের পরিমাণ খুব কম এবং বর্তমানে জমিতে বিঘা প্রতি ২০ মণ ধানের ফলন হওয়া বিরল ঘটনা। গড় ফলন ১৬-১৭ মণের বেশি হয় না। এর থেকে বোঝা যায় একজন বর্গাদার কী অবস্থার মধ্যে জীবনযাপন করেন। মহাজনের ঋণের বোঝা ও চাষের সমস্ত ঝুঁকি মাথায় নিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রাণাদন পরিশ্রম করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না।

অপারেশন বর্গার ফলে উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদরা শুধু উৎপাদন বৃদ্ধিই দেখেন, উৎপাদনের জন্যে প্রয়োজনীয় শ্রমের পুনরুৎপাদনের দায়িত্বটা উৎপাদকের উপরেই ছেড়ে দেন। এই নির্মম পদ্ধতির এতটুকু শৈথিল্য বর্গাদারি ব্যবস্থায় নেই। জমি এক ফসলি হলে বা জোতের আকার ক্ষুদ্র হলে বর্গাদার অন্য কোন অতিরিক্ত পেশা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকেন, না হলে জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যুনতম ক্যালরিটুকুও তিনি যোগাড় করতে পারেন না।

দুই : ভূমি সংস্কার   

এবার আসা যাক ভূমি সংস্কার প্রসঙ্গে। পশ্চিমবঙ্গে বেশ কিছু জমি খাস হয়েছে এবং চাষীদের মধ্যে বিতরণও হয়েছে। কিন্তু তালিকা নং ৪ থেকে দেখা যায় এই খাসজমি দখলের অধিকাংশটাই হয়েছে ১৯৬৭ থেকে ৭২ সালের মধ্যে। সেই সময় সি পি আই (এম এল) সহ বিভিন্ন বিপ্লবী গ্রুপ এবং সি পি আই (এম) এর আপেক্ষাকৃত বিপ্লবী অংশের নেতৃত্বে গ্রাম বাংলায় উত্তাল কৃষক আন্দোলনের ফলেই এটা সম্ভব হয়েছিল। ১৯৭৭ সালের পর থেকেই ভূমি সংস্কার আইনে সীমাবহির্ভূত জমি খাস ঘোষণা করার হার কমতে থাকে। আজ পর্যন্ত খাস জমির পরিমাণ সমগ্র কৃষিজমির ১০ শতাংশও অতিক্রম করেনি এবং বণ্টিত খাস জমির পরিমাণ সমগ্র জমির ৬৫ শতাংশেরও কম (Sengupta and Gazdar 1997)। ’৭৭  সালের পর থেকে খাস জমি দখলের হার কমার কারণ হিসাবে অনেকে বলেন যে পশ্চিমবঙ্গে দখল করার মত জমির পরিমাণ খুবই কমে গেছে। এই প্রসঙ্গে দীপঙ্কর বসু তার EPW April 21-27,2001 সংখ্যায় প্রকাশিত Political Economy of Middleness Behind Violence in Rural West Bengal প্রবন্ধে একটি চমৎকার হিসাব দেখিয়েছেন। তার বক্তব্য এখানে সরাসরি বাংলায় তর্জমা করে দেওয়া হল :

“NSSO থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে ১৯৮১ সালে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে মোট পরিবারের সংখ্যা ছিল ৭,৩৭,৫০০। এর মধ্যে ১৩৬ শতাংশ ছিল ধনী কৃষক (অর্থাৎ যারা ১০ একর বা তার বেশি জমির মালিক ) অর্থাৎ ধনী কৃষক পরিবারের সংখ্যা হল প্রায় ১০,০৩০। যদি এই ধরনের প্রত্যেক পরিবারের ১০ একর করে জমি থাকে তাহলে দেখা যাচ্ছে এই রাজ্যে ধনীচাষীদের অধিকারে ছিল ১০,০৩,০০০ একর জমি।

  প্রকৃতপক্ষে দেখা গেছে যে ১৯৮১ সালে রাজ্যের মোট জমির (যা প্রায় ১,০৩,০০,০০০ একর) ১৩৬৬ শতাংশই এই শ্রেণীর হাতে ছিল। অর্থাৎ এই শ্রেণীর অধীনে প্রায় ১৪,০৬,৯৮০ একর জমি ছিল। তাই যদি ১৯৮১ সালে পরিবার পিছু সর্বাধিক জমির সীমা কমিয়ে ১০ একর করা হত (যা বর্তমানে সেচ এলাকায় ১৭২৯ একর ও অসেচ এলাকায় ২৪১২ একর) তাহলে উদ্বৃত্ত জমির পরিমাণ দাঁড়াত ৪,০৩,৯৮০ একর।

  ১৯৭৭ সালের পর এই রাজ্যে বণ্টিত খাসজমির মোট পরিমাণ ৪,১১,৭১৬ একর। উল্লিখিত তথ্যের সাথে তুলনা করলে দেখা যাবে যে যদি বামফ্রন্ট সরকার ১৯৭৭ সালে জমির সর্ব্বোচ্চ সীমা ১০ একর করতেন তাহলে তারা গত ২৩ বছর ধরে বণ্টিত খাস জমির উপরে আরও ৯৮ শতাংশ জমি পুনর্বণ্টনের জন্যে যোগাড় করতে পারতেন। এবং এর ফলে মাত্র ১৩৬ শতাংশ গ্রামীণ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হত।’

পশ্চিমবঙ্গে ভূমি সংস্কার আইন অনুসারে সীমা বহির্ভূত জমির মালিক খুব বেশি নেই। কিন্তু গোটা ভারত জুড়েই ব্যক্তি বা পরিবারভিত্তিক জমির কেন্দ্রীভবনের প্রবণতা বর্তমানে দেখা যাচ্ছে না। কৃষিতে সাম্রাজ্যবাদী অনুপ্রবেশের ফলে এমন কিছু পরিবর্তন ঘটেছে যার ফলে কৃষিতে পুনর্বিনিয়োগ আর লাভজনক হচ্ছে না (কৃষিতে সাম্রাজ্যবাদ অধ্যায়ে এই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে)। জমির ব্যক্তি বা পরিবারভিত্তিক কেন্দ্রীভবন না হবার সেটা একটা বড় কারণ। কিন্তু মাছ চাষের ক্ষেত্রে (বিশেষত অন্তর্দেশীয় মাছ চাষে) সাম্রাজ্যবাদী অনুপ্রবেশ কৃষির তুলনায় খুবই কম। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে মাছ চাষে স্থানীয় জ্ঞানের সাথে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির এমন অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে যে অন্তত প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী অনুপ্রবেশ হওয়াও মুশকিল (অন্য কোন প্রবন্ধে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছা থাকলো)। তাই মাছ চাষের ক্ষেত্রে একটা পুঁজিবাদী বিকাশ চোখে পড়ে। অনেক ধনী মাছ চাষীরই উদ্বৃত্ত উৎপাদনে পুনর্বিনিয়োগের এবং উৎপাদনের মানের অবিরাম উন্নতি ঘটাবার প্রবণতা লক্ষণীয়। মাছ চাষের ক্ষেত্রে এক ধরনের পুঁজি নির্ভর কেন্দ্রীভবন লক্ষ করা যায়। আইনি সীমা বহির্ভূত জলকরের মালিকের সংখ্যা খুব কম নয়। উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণার মেছো ভেড়িগুলোই তার প্রমাণ। পঞ্চায়েত বা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিগুলির অধীনস্থ বিশাল বিশাল জলকরগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধনী মৎস্য চাষীরাই বেনামে ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করে। ভূমি সংস্কার আইন কিন্তু কৃষি জমি ও জলকরের মধ্যে পার্থক্য করে না। তা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে, আইনি সীমা বহির্ভূত জলকরের মালিক যথেষ্টই আছে। এর থেকে সিদ্ধান্ত করা যেতে পারে যে পুঁজির জমি বা জলকর কেন্দ্রীভবনের ক্ষমতা থাকলে ভূমি সংস্কার আইন তাকে প্রতিহত করতে পারছে না, এমনকী ভূমি বণ্টন আন্দোলনের পীঠস্থান বলে পরিচিত এই পশ্চিমবঙ্গেও না। বর্তমানে অনেকেই ভারতবর্ষে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির প্রভাবে জমির কেন্দ্রীভবনের আশঙ্কা করছেন। সেই আশঙ্কা বাস্তবায়িত হতে শুরু হলে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ভূমি সংস্কার আইনের সাহায্যে তা প্রতিহত করতে পারবে বা চাইবে বলে মনে হয় না।

পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ভূমি কাঠামো সম্পর্কে অনিন্দ্য সেন ‘অন্যস্বর’ পত্রিকার এপ্রিল-মে, ২০০১ সংখ্যায়  প্রকাশিত ‘পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে ভূমি কাঠামো ও রাজনৈতিক বিন্যাস : একটি আন্তঃসম্পর্ক রচনার চেষ্টা’ শীর্ষক প্রবন্ধে যে পরিসংখ্যান দিয়েছেন তাতে দেখা যাচ্ছে যে, ১৯৭৮ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত ০-০.৫ একর, ০.৫-১ একর এবং ১-২ একর এই তিনটি স্তরের জোতের সংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে। এর মধ্যেও ০-০.৫ একর পর্যন্ত অংশটির বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১০.৮৮ শতাংশ। ০.৫-১ একর জোতের মালিক পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে ২.৬৫% এবং ১-২ একর জোতের মালিক পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে ০.৯২%। অনিন্দ্য সেন তার প্রবন্ধে এক জায়গায় বলেছেন এই ক্যাটেগরির কৃষকদের সাথে মধ্য কৃষকদের (মাও-এর সংজ্ঞা অনুসারে : ‘স্বনির্ভর কৃষক যারা মজুরি বিক্রি করেন না, নিয়োগও করেন না) কোন গুণগত পার্থক্য নেই। তাঁর লেখায় যে সমীক্ষার উল্লেখ আছে তা পশ্চিমবঙ্গের কোন্‌ কোন্‌ জেলায় হয়েছে তা বলা নেই (শুধুমাত্র একটি গ্রামের নাম উল্লেখ আছে নদীয়ার ধুবী নাগাদী, অন্যান্য গ্রামগুলি একই জেলায় না অন্য জেলায় তা জানা যাচ্ছে না), ওই অঞ্চলগুলিতে সেচ আছে না নেই, তারও উল্লেখ নেই। যদি সেচ থাকে তাহলে বছরে দুবার ফসল হবে ধরা যায়। তাহলে ০৫ একর জমিতে সর্বাধিক ৬০ মন বা ২৪০০ কেজি ধান হতে পারে। ওই ধান ফলাতে তার উৎপাদন খরচ হবে ৩০০০ টাকা (তালিকা ৬ দ্রষ্টব্য, কৃষক পারিবারিক শ্রমে চাষ করছেন ধরে নিয়ে * চিহ্নিত খরচ বাদ দেওয়া হল)। যদি তিনি ঋণ না করেও চাষ করেন তবে আগামী বছর চাষের খরচ তোলার জন্যে তাকে প্রায় ১৬ মণ ধান বিক্রি করতে হবে (১৮০ টাকা মণ হিসাবে)। অর্থাৎ তার নিট লাভ হবে ৬০ -- ১৬ = ৪৪ মণ বা ১৭৬০ কেজি ধান, যা থেকে চাল হবে ১০৫৬ কেজি। যদি তার পরিবারের ৫ জন সদস্য হয়, তবে দৈনিক মাথাপিছু চালের পরিমাণ হবে ৫৭০ গ্রাম, যার ক্যালরি মূল্য ২২৮০। একজন কর্মক্ষম মানুষের ন্যূনতম শক্তি চাহিদা ২৪০০ ক্যালরি হলে বলা যায় যে, ০.৫ একর জোতের মালিক শুধু জমির আয় থেকে তার পরিবারের ন্যূনতম পুষ্টিটুকুও জোগাড় করতে পারবেন না, জীবনধারণের অন্য উপকরণ তো দূরের কথা। আর অসেচ এলাকায় ০.৫ একর জোতের মালিকের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। তাই এই জোতের মালিকেরা অন্যের জমিতে মজুরি খাটতে বা অন্য কোন পেশা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকেন। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, শুধু অসেচ এলাকা নয়, সেচ এলাকাতেও বর্তমানে ২০ মণ ধান হওয়া বিরল দৃষ্টান্ত, বিঘা প্রতি ১৫-১৭ মণের বেশি ধান এখন আর হয় না। প্রশ্ন উঠতে পারে, কৃষক পরিবার ধান চাষ না করে অন্য ফসল চাষ করলে কী হবে? বিভিন্ন প্রকার চাষের লাভক্ষতির হিসাব দিয়ে প্রবন্ধকে ভারাক্রান্ত না করেও বলা যায় যে, আলু চাষে চূড়ান্ত ফাটকাবাজি থাকার জন্যে ক্ষুদ্র কৃষকের লাভ এর থেকে বেশি হবে না, ডাল বা গম চাষ করলে লাভ কমবে। তাই ০-০.৫ একর জোতের মালিকদের সাথে মধ্য কৃষক নয় বরং ক্ষেত মজুরদেরই গুণগত কোন পার্থক্য নেই। এরাও মাও বর্ণিত আধা-সর্বহারা শ্রেণী।

অনিন্দ্য সেন তাঁর প্রবন্ধের শেষের দিকে ক্ষুদ্র কৃষকদের (যারা প্রধানত ‘তৃণমূল’-এর সমর্থক, ১-৩ একর জোতের মালিক) আধা-সর্বহারা বলে বর্ণনা করেছেন। প্রবন্ধে প্রথমে যখন ক্ষুদ্র কৃষকদের মূলত মধ্য কৃষক বলে বর্ণনা করে পশ্চিমবঙ্গে মধ্য কৃষকদের বিপুল  সংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত করা হয়েছিল তখন ক্ষুদ্র কৃষক বলতে ০-২ একর জোতের মালিকদের বোঝানো হয়েছিল। যে অংশটির সত্যই বিপুল সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটেছে (০-০.৫ একর) তারা যে অন্তত মধ্য কৃষক নয় তা ওপরের আলোচনা থেকে প্রমাণ করা যায়। প্রবন্ধের শেষ দিকে যখন ১-৩ একর জোতের মালিকদের মধ্যে ‘তৃণমূল’ কংগ্রেসের প্রভাব বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করা হল, তখন লেনিন ও মাও-কে উদ্ধৃত করে ক্ষুদ্র কৃষকদের আধা-সর্বহারা বলা হল। এই ‘ক্ষুদ্র’ কৃষকেরা ১-৩ একর জোতের মালিক কারণ, তাঁর সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, এর থেকে ক্ষুদ্র জোতের মালিকদের মধ্যে ‘তৃণমূল’-এর প্রভাব সামান্য এবং তার প্রবন্ধের একটি অংশের শিরোনাম হল ‘ছোট চাষীরাই তৃণমূলের ভিত্তি : চূড়ান্ত বৈপরীত্য কিন্তু বাস্তব।’ তিনি কী ছোট চাষী ও ক্ষুদ্র কৃষক শব্দ দুটি আলাদা অর্থে ব্যবহার করেছেন? যদি করে থাকেন তাহলে প্রবন্ধের কোথাও তার ইঙ্গিত নেই। যদি না করে থাকেন, তাহলে একবার ০-২ একর জোতের মালিকদের ক্ষুদ্র কৃষক বলে, তাদের সাথে মধ্য কৃষকদের কোন গুণগত পার্থক্য নেই বলে, আবার অন্য জায়গায় ১-৩ একর জোতের মালিকদের ক্ষুদ্র কৃষক হিসাবে দেখিয়ে তাদের ধ্রুপদী অর্থে আধা-সর্বহারা বলা হল কেন বুঝতে পারলাম না। হয়তো ‘অন্য স্বরের’ পরবর্তী সংখ্যাগুলিতে এর ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে। যাই হোক, এক একর এবং তিন একরের মালিকেরা বোধ হয় একই শ্রেণীভুক্ত নয়। তালিকা ৬ থেকে দেখানো যায় যে, ভাল ফলন পেলে ৩ একর জমির মালিক জমির আয় থেকে পরিবারের পুষ্টি চাহিদা মিটিয়েও আরও কিছু জীবনধারণের উপকরণ সংগ্রহের অবস্থায় থাকেন। এই ৩ একর যদি সেচযুক্ত জমি হয় এবং জমি মালিকের যদি অন্য কোন আয়ের উৎস থাকে, তাহলে তার পক্ষে উদ্বৃত্ত সঞ্চয় করাও অসম্ভব নয়।

দুই বা তিন একরের একটা জোত কেবলমাত্র পারিবারিক শ্রমেই চাষ করা যায়, মজুর নিয়োগের দরকার হয় না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, সরকারি ভাষায় প্রান্তিক (জমির পরিমাণ ২.৫ একরের কম) বা ছোট চাষীদের (২.৫-৫ একর জমির মালিক) একটা ভাল অংশ, চাষের জন্য জমিতে মজুর নিয়োগ করেন। তালিকা ৭ এ প্রান্তিক এবং ছোট চাষীরা বিভিন্ন শস্য চাষের ক্ষেত্রে কী হারে মজুর নিয়োগ করেন তা দেখানো হয়েছে। এ থেকেও সিদ্ধান্ত করা যায় যে ওই প্রান্তিক ও ছোট চাষীর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ মধ্য কৃষক নন, বরং ওদের প্রবণতা ধনী কৃষকের দিকে। নিশ্চিতভাবেই এদের জমি ছাড়াও চাকরি, ব্যবসা বা অন্য কোন সূত্রে আয় আছে, না হলে মজুর লাগিয়ে ছোট জোত চাষ করা পোষাবে না। এরকম সিদ্ধান্ত করাও ভুল হবে না যে, এই বর্গের একটা উল্লেখযোগ্য অংশের হাতে ভাল রকম উদ্বৃত্ত সঞ্চিত হচ্ছে।

অর্থাৎ অনিন্দ্য সেন প্রদত্ত সমীক্ষা থেকেই সিদ্ধান্ত করা যায় যে, পশ্চিমবঙ্গে সর্বহারা ও আধা-সর্বহারা শ্রেণীর সংখ্যা বাড়ছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘স্টাডি অন ফার্ম ম্যানেজমেন্ট’ ও ‘কস্ট অফ প্রোডাকশন’ পশ্চিমবাংলা, কৃষি বিভাগ, ১৯৯৬-৯৭ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যাচ্ছে যে, পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন শস্য চাষে নিয়োজিত মোট জন-দিনের ৭৩%-ই আসে মজুরের শ্রম থেকে। আর মাত্র ২৭% আসে কৃষক পরিবারগুলির পারিবারিক শ্রম থেকে। এই তথ্যও সর্বহারা ও আধা-সর্বহারা শ্রেণীর সংখ্যা বৃদ্ধিকেই সমর্থন করে।

তিন : অবণ্টিত খাস জমি  

তালিকা ৫ থেকে দেখা যাচ্ছে যে পশ্চিমবঙ্গে ২০০০ সাল পর্যন্ত খাস হওয়া মোট জমির পরিমাণ ১৩৬৫ লক্ষ একর। এর মধ্যে বণ্টিত হয়েছে ১০৩৮ লক্ষ একর জমি। বাকি ৩২৭ লক্ষ একর জমি কী অবস্থায় আছে? দীপঙ্কর বসু তার পূর্ব-উল্লিখিত প্রবন্ধে স্টেটসম্যান পত্রিকায় প্রকাশিত একটি রচনা (Manas Ghosh : The Statesman, September, 25-26, 2000) উল্লেখ করে বলেছেন এই জমিগুলি সবই আছে সি পি আই (এম)-এর কৃষক সংগঠন কৃষক সভার হাতে। কেবলমাত্র পার্টির নেক নজরে থাকা কৃষকেরাই এই জমি চাষ করতে পারে, এবং উৎপাদনের ২০-২৫ শতাংশ কৃষক সভার নেতাদের খাজনা হিসাবে দিতে হয়। এই ৩.২৭ লক্ষ একর জমি থেকে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ খাজনা প্রতি বছর কৃষক সভার হাতে আসে। ওই বিপুল পরিমাণ অর্থ কী কাজে লাগে? গ্রামোন্নোয়নে নিশ্চয় নয়, কারণ কৃষক সভার টাকায় গ্রামে স্কুল, কলেজ, টিউবওয়েল বা রাস্তাঘাট তৈরি হয়েছে বলে শোনা যায়নি। অর্থাৎ এই বিপুল অর্থের সবটাই কৃষক সভার খরচ চালাতে ব্যয় হয়। এমনও হতে পারে যে, এই অর্থের একটা অংশ কৃষক সভার নেতারাও আত্মসাৎ করেন। কৃষক সভা কিন্তু এই অবণ্টিত খাস জমিতে কোন সমবায় গঠন করেনি। যেহেতু পার্টির নেকনজরে থাকা কৃষকেরাই এই সব জমিতে চাষ করার সুযোগ পায় এবং জমি চাষ করতে পারা বা না পারা সম্পূর্ণভাবে কৃষক সভার ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল, তাই এই ব্যবস্থায় ভূমিহীন বা প্রান্তিক কৃষকদের ওপর কৃষক সভার বেশ খানিকটা আধিপত্য বজায় থাকে।

এইভাবে আধিপত্য বজায় রাখা বা উদ্বৃত্ত আত্মসাৎ করা কিন্তু ভারতবর্ষের অন্য কোন রাজ্যে দেখা যাবে না। কেউ কেউ (যেমন দীপঙ্কর বসু) একে চার্চের অধীনে জমি বা দেবোত্তর জমির সাথে তুলনা করেছেন। কিন্তু তুলনাটা খুব সঙ্গত নয়। কৃষক সভা যে পদ্ধতিতে খাস জমির ওপর অধিকার কায়েম করেছে তার সাথে চার্চ বা মন্দিরের অধিকার কায়েমের গুণগত পার্থক্য আছে। প্রথম ক্ষেত্রে, সক্রিয় গণ আন্দোলনের মাধ্যমে এই অধিকার অর্জিত হয়েছে, কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে অধিকার এসেছে শাসক সম্প্রদায়ের  দানের মাধ্যমে।

আন্তর্জাতিক মতাদর্শগত মহা বিতর্কে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি মার্শাল টিটোর যুগোস্লাভিয়ার শাসন ব্যবস্থার সমালোচনা করার সময় কিছু শোষণমূলক সমবায় সমিতির কথা উল্লেখ করেছিল। পশ্চিমবঙ্গের কৃষক সভার চরিত্র অনেকটা ওই যুগোস্লাভিয় সমবায় সমিতিগুলির মতো। আসলে কমিউনিস্ট নামধারী ও লেনিনীয় পার্টির গঠন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কোন দল যখন সম্পূর্ণভাবে শ্রেণী সংগ্রাম থেকে বিচ্যুত হয়, তখন এইভাবেই গণ আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত অধিকারগুলি থেকে উদ্বৃত্ত আত্মসাৎ করতে শুরু করে।

তালিকা-৭
মালিকের ধরন অনুসারে বিভিন্ন শস্যে একর পিছু নিয়োজিত জন-দিনের শতকরা কতখানি মজুরের : পশ্চিমবাংলা-১৯৯৬-৯৭
শস্যের নাম
মালিকের ধরন অনুসারে ব্যবহৃত জন-দিনের শতকরা কত মজুরের
জমি
প্রান্তিক
(২.৫ একরের কম)
ছোট
(২.৫-৫ একর)
মাঝারি
(-১০ একর)
বড়
(১০ একরের বেশি)
সর্বমোট
পাট
৬২.৯%
৬৭.৩%
৫৬.০%
৭৮.১%
৬৩.৮%
আউস
(উচ্চ ফলনশীল)
৮৫.১%
৮৪.৬%
৮৩.৪%
৯৪.৯%
৮৭.২%
আমন
(উচ্চ ফলনশীল)
৬৭.৮%
৭৬.৬%
৭৫.৬%
৯২.১%
৭৫.০%
আমন(দেশী)
৬৮.৮%
৭৪.৩%
৯০.৯%
৮৫.৬%
৭৯.২%
বোরো
৬৪.৯%
৬৯.৪%
৮৪.৩%
৯১.৯%
৭২.৫%
গম
৫২.৪%
৫৮.৪%
৬২.৮%
৬৫.৮%
৫৮.০%
আলু
৯৬.৭%
৯৩.৯%
৮৩.৯%
৭৬.০%
৭৪.১%
সরষে
৫৮.৩%
৬৩.৬%
৭৫.৭%
৭০.৩%
৬৪.৭%
তথ্যের সূত্র : অজিত নারায়ণ বসু, ‘পশ্চিমবঙ্গের কৃষি যা হয়ে চলেছে এবং যা হওয়া সম্ভব’, অনীক, অক্টোবর-নভেম্বর-২০০১। অজিত নারায়ণ বসু এই তথ্য পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্টাডি অন ফার্ম ম্যানেজমেন্ট ও কস্ট প্রডাকশন, পশ্চিমবঙ্গ কৃষি বিভাগ ১৯৯৬-৯৭ থেকে।

চার : পঞ্চায়েতি রাজ  

বামফ্রন্ট ১৯৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচন করে। দীর্ঘ ১৪ বছর বাদে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বামফ্রন্টের পক্ষ থেকে এই পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের এক অপূর্ব পদ্ধতি বলে বর্ণনা করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে যে কিছুটা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হয়েছে, দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ যে কিছু ক্ষমতা পেয়েছে এই ধারণা অনেকেই পোষণ করেন। মৈত্রীশ ঘটক তার অনীক অক্টোবর-নভেম্বর, ২০০১ সংখ্যায় প্রকাশিত প্রবন্ধে গরিবদের রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলেছেন। এই প্রসঙ্গে কিছু পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণ রাখা হল।

রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর EPW February 3-10, 2001 সংখ্যায় প্রকাশিত প্রবন্ধ Agrarian Backdrop of Bengal Violence-এ যে পরিসংখ্যান উল্লেখ করেছেন তা সরাসরি বাংলায় তর্জমা করে দেওয়া হল।

‘‘মেদিনীপুর ও বর্ধমান জেলার মোট ৬০১৯টি গ্রামে সমীক্ষা করে দেখা গেছে যে, পঞ্চায়েত সদস্যদের ৫৩৮ শতাংশই ৬ একরের বেশি জমির মালিক বা শিক্ষক বা সমাজসেবী। পঞ্চায়েত সদস্যদের মাত্র ৮৩  শতাংশ হল কৃষি মজুর। ওই একই চিত্র হুগলি এবং বাঁকুড়ার উপদ্রুত অঞ্চলগুলিতেও দেখা যায়। পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়া দরিদ্র মানুষ মোট পঞ্চায়েত সদস্যদের মাত্র ৫ শতাংশ।’’

দীপঙ্কর বসু তাঁর পূর্ব-উল্লিখিত প্রবন্ধে একটি গবেষণা পত্র থেকে যে উদ্ধৃতি দিয়েছেন তাও এখানে সরাসরি বাংলায় তর্জমা করে দেওয়া হল।

‘‘এটা উল্লেখযোগ্য যে প্রায় সমস্ত সভাধিপতিই গ্রাম সমাজের উঁচুতলার মানুষ যাদের ‘ভদ্রলোক’ বলা হয়। অল্প কিছু পঞ্চায়েত সমিতি-সভাপতি নিম্নবর্ণের মানুষ হতেও পারেন, কিন্তু দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ নন। সি পি আই (এম) পার্টির জেলা নেতৃত্বের শ্রেণী অবস্থানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তথাকথিত গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতায় পার্টি সম্পাদকই শেষ কথা বলে, যদিও এর কিছু ব্যতিক্রম আছে। শ্রমিক শ্রেণী থেকে আসা পার্টি সম্পাদক বিরল। এই বিকেন্দ্রীভূত ক্ষমতা-কাঠামোতে, সুবিধাভোগীদেরই একচ্ছত্র আধিপত্য, আর একে সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ জানাবারও কেউ নেই। (আচার্য্য ১৯৯৩)’’

ওপরের আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, বিগত প্রায় আড়াই দশক ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় থাকার পরও সি পি আই (এম) গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি বা জেলা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ পদে গ্রামীন সর্বহারা বা আধা-সর্বহারা শ্রেণীর মানুষদের নিয়ে আসতে পারেনি। এই ঘটনার ব্যাখ্যা হিসাবে বলা যেতে পারে, প্রথমত পঞ্চায়েত ব্যবস্থা ক্রমশই এত কঠিন হচ্ছে যে ওখানে সাধারণ পশ্চাৎপদ শ্রেণীর মানুষের অংশগ্রহণ প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে। সরকারি কাজে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রিতা এত বেশি, সরকারি টাকা খরচ করতে হলে এত বিভিন্ন রকমভাবে তার হিসাব রাখতে হয় এবং হিসাবে সামান্য ভুলচুক হলেও এত বিভিন্ন জায়গায় তার জবাবদিহি করতে হয় যে একজন পশ্চাৎপদ দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ যদি পঞ্চায়েতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে যানও তাহলে তাকে সমাজের সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর মানুষদের এবং আমলাতন্ত্রের হাতের ক্রীড়নক হয়ে থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত বলা যেতে পারে যে, সি পি আই (এম) মূলত পেটি বুর্জোয়া মধ্যবিত্তদের পার্টি হবার দরুন তাদেরও এমন কোন রাজনৈতিক প্রচেষ্টা নেই যাতে গ্রামীন সর্বহারা ও আধা-সর্বহারা শ্রেণীর মানুষ উপযুক্ত প্রশিক্ষণ লাভের মাধ্যমে পঞ্চায়েতের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলিতে বসবার মতো যোগ্যতা অর্জন করে।

মার্কসবাদের প্রাথমিক জ্ঞান থেকেই বলা যায় যে, সমাজে চূড়ান্ত অর্থনৈতিক বৈষম্য থাকলে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা অর্থহীন। এই ব্যবস্থা কেবলমাত্র সম্পত্তিবানদেরই স্বার্থরক্ষা করে। তৃণমূল স্তরের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বা পঞ্চায়েত সম্পর্কে একথা সমভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু এই ব্যবস্থায় এরকম একটা নকল চেতনার সৃষ্টি হয় যে, ওতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটছে। এই নকল চেতনা নিপীড়িত মানুষদের ক্ষোভকে সরাসরি শ্রেণী সংগ্রাম বিকাশের ইন্ধন হিসাবে ব্যবহূত হতে বাধা দেয়। গ্রামীন মানুষের মধ্যে এরকম একটা ধারণা জীইয়ে রাখা যায় যে, ‘আমার ভোটেই প্রধান নির্বাচিত হয়, আমি ইচ্ছা করলে ভোট দিয়ে অন্য কাউকেও প্রধান নির্বাচিত করতে পারি।’ এছাড়া পঞ্চায়েতের মাধ্যমে গ্রামের মানুষ ছিঁটেফোটা সাহায্য পায়। প্রধান পরিচিত হলে বা প্রধানের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক থাকলে, বিভিন্ন সরকারি কাজ, যেমন রেশন কার্ড পাওয়া বা জমা দেওয়া, জন্ম-মৃত্যুর পঞ্জীকরণ, ছবি প্রত্যয়ন, তপশিলি জাতি বা উপজাতি সার্টিফিকেটের ফর্ম জমা দেওয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে সুবিধা হয়। তাই পঞ্চায়েতের ভোটকে কেন্দ্র করে মানুষের উৎসাহ-উদ্দীপনাও তীব্র। প্রধান পাল্টালেও (তা সে যে পার্টিরই হোক) ব্যবস্থা যে খুব বেশি পাল্টাবে না, গ্রামীন সম্ভ্রান্ত বর্গের শোষণ যে খুব বেশি কমবে না, এই চেতনা গ্রামীন সর্বহারা ও আধা-সর্বহারা শ্রেণীর মধ্যে বাইরে থেকেই সরবরাহ করতে হবে।

পঞ্চায়েত কোন নীতি নির্ধারক সংস্থা নয়। ভারতে পঞ্চায়েতগুলির নূন্যতম আইন প্রণয়নেরও ক্ষমতা নেই।  পঞ্চায়েতগুলির অর্থ সংগ্রহের ক্ষমতাও অত্যন্ত সীমিত। গ্রামীন মানুষের উন্নয়নের জন্য কোন প্রকল্পরচনা করার সময় সংশ্লিষ্ট গ্রামের মানুষদের কোন মতামত নেওয়া হয় না। এই প্রকল্পগুলি রচনা করেন উচ্চশ্রেণীর আমলা ও মন্ত্রীরা। পঞ্চায়েতের মাধ্যমে তৃণমূল স্তরে এই প্রকল্পগুলি প্রয়োগ করা হয়। অনেক সময়ই স্থানীয় বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করার জন্য প্রকল্পগুলি সফল হয় না। প্রকল্পের সাহায্য প্রাপক বা বেনিফিসিয়ারিরা কিছু অর্থ বা দ্রব্য হাতে পেলেও তাতে তাঁদের স্থায়ী উন্নতি হয় না। গত প্রায় আড়াই দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গে সক্রিয় পঞ্চায়েতি রাজ কায়েম হবার পরেও গ্রামীন দারিদ্র্যের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান খুব ভালো নয় (তালিকা-৮ দ্রষ্টব্য)।

তালিকা-৮
কিছু ভারতীয় রাজ্যে গ্রামীন দারিদ্র্য
রাজ্যের নাম
মাথা পিছু মাসিক খরচ 
(সমস্ত পরিবার ধরেটাকায়)
মাথা পিছু মোট মাসিক খরচ
(কেবল এস সি/এস টি পরিবার ধরেটাকায়)
অন্ধ্রপ্রদেশ
আসাম
বিহার
ওড়িশা
রাজস্থান
উত্তরপ্রদেশ
পশ্চিমবঙ্গ           
৩০৮৫৩
২৬৭৭০
২৩০৩৪
২৩৪০৩
৩৪৬০৬
২৯৩২৬
২৯৩০৬
২৫৮৮৭
২৬২৭৩
২০৭২৬
২০৫৭৬
৩০৭২৬
২৪২৯৮
২৫৬০৪
সর্বভারতীয়
৩০৮২৭
২৭২৩৫
তথ্যের উৎস : Poverty, Household Size and Child Welfare in India by Ranjan Roy, EPW, September 23, 2000.

ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ যদি দারিদ্র্য দূরীকরণের শর্ত হয় তবে উল্লেখিত তথ্য থেকে সিদ্ধান্ত করা যেতে পারে যে, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় গুণগতভাবে উন্নত নয়।

স্বদেশি-বিদেশি অনেক গবেষক বলেছেন যে, কিছু ত্রুটি থাকলেও, পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রামীন মানুষ আগের তুলনায় বেশি সরকারী সাহায্য পাচ্ছেন। কথাটা নেহাত মিথ্যা নয়। আগে যখন কোন মাতব্বর জোতদার পঞ্চায়েতের প্রধান হয়ে বসত, তখন সরকারি সাহায্যের প্রায় সবটাই সে আত্মসাৎ করতো। এখন আমলা বা জন্ম প্রতিনিধিদের দুর্নীতি থাকলেও গ্রামীন মানুষ কিছু সাহায্য পায়। কিন্তু যেহেতু এই সাহায্যগুলি অত্যন্ত অপরিকল্পিতভাবে দেওয়া হয় এবং পরিমাণেও প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম থাকে, তাই পার্টির নেক নজরে থাকা লোকেরা ছাড়া অন্যরা খুবই কম এই সাহায্য পায় এবং যারা পায় তাদেরও অর্থনৈতিক উন্নতি বিশেষ হয় না। এইভাবে পাইয়ে দেবার পদ্ধতিতে গ্রামাঞ্চলের আনাচে-কানাচে এক শ্রেণীর দালালের উদ্ভব ঘটেছে, যারা গ্রামীন  মানুষের প্রতিষ্ঠানবিরোধী ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রয়াস সম্পর্কেও নিয়মিত প্রশাসনকে সতর্ক করে।

গ্রাম সমাজ সামন্ততন্ত্রের নিগড়ে আবদ্ধ থাকলে ক্ষুধার্ত কৃষক সমাজের ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়ে দেশ থেকে  সাম্রাজ্যবাদকে সমূলে উৎপাটিত করতে পারে। চীন বিপ্লব থেকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির এ অভিজ্ঞতা হয়েছে। আবার গ্রামীন সামদনতন্ত্র সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে স্বাধীন পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটুক এটাও সাম্রাজ্যবাদের কাঙিক্ষত নয়। চাই একটা মাঝামাঝি ব্যবস্থা যেখানে উৎপাদন বাড়বে কিন্তু গ্রামীণ সামন্ততান্ত্রিক ভূমি সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট হবে না। তীব্র শোষণ থাকবে, কিন্তু মানুষের ক্ষোভ বিস্ফোরণ ঘটাবার আগেই কোন সেফটি ভাল্ব দিয়ে বেরিয়ে যাবে। সমাজব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন না ঘটিয়ে তথাকথিত ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং সংস্কার কর্মসূচির এটাই মূল উদ্দেশ্য। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সারা ভারত জুড়ে এই কর্মসূচি চালু করতে চেয়েছে। রাষ্ট্রসংঘের (যেখানে উন্নত সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলিই শেষ কথা বলে) উন্নয়ন পর্ষদও এই ধরনের সংস্কার কর্মসূচির গুণগান করে। বিশ্বব্যাঙ্কও তাই। কিন্তু ভারতের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলেরই কোন গণ আন্দোলনের অভিজ্ঞতা বা শৃঙ্খলাপরায়ণতা নেই। দলের মধ্যে দুর্নীতি প্রায়  একশ শতাংশ। গ্রামের সাবেক ক্ষমতার কেন্দ্রগুলিকে অল্প একটু নাড়ানোও তাদের পক্ষে কঠিন। তাই ভারতের অন্যান্য রাজ্যে এই ধরনের সংস্কার খুব বেশি সাফল্য অর্জন করেনি। ব্যতিক্রম পশ্চিমবঙ্গ। এই রাজ্যে সি পি আই (এম)-এর রয়েছে উত্তাল গণ আন্দোলনের অভিজ্ঞতা, আড়াই দশক আগে যাঁরা তৃণমূল স্তর থেকে গণ আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন তারা অনেকেই আজ পার্টির উচ্চপদে আসীন। সি পি আই (এম)-এর সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, অনেক দলের কাছেই দৃষ্টান্ত স্বরূপ এবং আজও এই দল অনেক সৎ কর্মীকে ধরে রাখতে পেরেছে। তীব্র গণ আন্দোলনের মাধ্যমে যখন এরা সংসদীয় পথে ক্ষমতায় এলেন, তখন শোধনবাদী রাজনীতির অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে এরা বিপ্লবী কর্মসূচিকে দুটি বিষয়ের দ্বারা প্রতিস্থাপিত করলেন। এক, বাস্তববাদিতা (Pragmatism), দুই, সংস্কার (Reform)। এসব ক্ষেত্রে কোন্‌ ধরনের সংস্কার হয়? অবশ্যই শোষক শ্রেণীর রাষ্ট্রনীতিবিদদের পরিকল্পিত সংস্কার। গণ সমর্থন এবং শৃঙ্খলাপরায়ণ পার্টি থাকার সুবাদে এই সংস্কার কর্মসূচিকে সাফল্যের সাথে গ্রামাঞ্চলে প্রয়োগ করা গেছে। কিন্তু তাতে সমস্যার সুরাহা বিশেষ কিছু হয়নি। বরং সাম্রাজ্যবাদের উদ্দেশ্যই সিদ্ধ হয়েছে। সেই কারণেই পঞ্চায়েতী রাজ আর বর্গাদারি ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বব্যাঙ্কের এত প্রশংসা। এ প্রশংসা অপ্রত্যাশিত (যেমন মৈত্রীশ ঘটক ভাবছেন) নয়, বরং অত্যন্ত প্রত্যাশিত। সমাজের মধ্যে কোন তীব্র প্রতিক্রিয়া ঘটতে না দিয়ে সাম্রাজ্যবাদের পরিকল্পনাগুলিকে মূলত সফলভাবে প্রয়োগে নিয়ে যাওয়ার হাতিয়ার হিসেবেও এ ধরনের শাসন সুবিধাজনক!

কৃষিতে সাম্রাজ্যবাদ  

১৯৬৫ সালে তৎকালীন ভারত সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সবুজ বিপ্লব কর্মসূচি গ্রহণের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই কর্মসূচি অনুসারে বিদেশ থেকে আমদানি করা খর্বাকৃতি ভ্যারাইটির শস্য চাষ করা শুরু হয়। এই বেঁটে জাতের ধান, গমগুলির অঙ্গজ্মবৃদ্ধি  একটা নির্দিষ্ট স্তরে এসে আটকে যায়। তাই মাটি থেকে শোষিত বা সালোকসংশ্লেষের ফলে উৎপন্ন পুষ্টি পদার্থের অনেকটাই বীজের ওজন বৃদ্ধির কাজে লাগে। এই জাতগুলি তাই রাসায়নিক সারের প্রতি সংবেদনশীল এবং যথোপযুক্ত সার প্রয়োগ করলে ফলন ভাল দেয়। এই বীজগুলি যখন প্রথম ভারতে আমদানি করা হয়, তখন বিখ্যাত কৃষি বিজ্ঞানী ড আর এইচ রিচারিয়া এর বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন যে, ওই বিদেশাগত বীজগুলি ভারতীয় আবহাওয়া এবং ভারতীয় ক্ষতিকর পতঙ্গের প্রতি কী পরিমাণে সংবেদনশীল তার বিচার না করে অবাধে বীজগুলি চাষ করা উচিত হবে না। এর ফলে রোগ বা পোকার আক্রমণে মহামারী ঘটতে পারে। তিনি আরও বলেন যে, ভারতেই এখন অনেক ভ্যারাইটির ধান পাওয়া যায় যা থেকে সংকরায়ন বা নির্বাচনের মাধ্যমে এমন জাত তৈরি করা যায় যার ফলন এই বিদেশি বীজগুলির সমান বা বেশি।২ সেক্ষেত্রে রোগ বা পোকার আক্রমণে মহামারী হবার সম্ভাবনা কম। তাঁর কথায় যথেষ্টই বৈজ্ঞানিক যুক্তি ছিল। মহামারী সংক্রান্ত তাঁর ভবিষ্যতবাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেছে। এই পশ্চিমবঙ্গেই অন্তত ২৭ প্রজাতির প্রাণী ধানের ক্ষতিকর প্রাণী হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে, যাদের আগে কোন ক্ষতিকর প্রভাব ছিল না। ৫টি প্রজাতির প্রাণী মারাত্মক ক্ষতিকর হিসাবে দেখা দিয়েছে যাদের আগে ক্ষতি করার ক্ষমতা ছিল সামান্য।৩ কিন্তু সেদিন এই সমস্ত কথা সোচ্চারে বলবার জন্য তাঁকে তাঁর পদ থেকে অপসারিত করা হয় এবং বিশ্বব্যাঙ্কের প্রত্যক্ষ নির্দেশে তাঁর সমস্ত গবেষণা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ওই উচ্চফলনশীল ধান চাষ করার জন্য বহুবিধ ক্ষতি হয়েছে। যেমন রোগ ও পোকার আক্রমণ প্রচুর বেড়েছে। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার করার ফলে জমির উর্বরতা শক্তি, সছিদ্রতা, জল ধারণ ক্ষমতা কমেছে। এর ফলে চাষে জলের চাহিদা বেড়েছে। এছাড়া বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে শুধু এই উচ্চফলনশীল বীজের চাষ করার জন্য দেশি ভ্যারাইটিগুলি ক্রমশ অবলুপ্ত হয়েছে। এর সামগ্রিক ফল হিসাবে চাষে ঝুঁকি বেড়েছে। একদিকে বিঘাপ্রতি সার, কীটনাশক ও জলের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে ফলন কমছে। আগে যে পরিমাণ সার প্রয়োগ করে বিঘাতে ২৫-৩০ মণ ধান হত এখন তার প্রায় দ্বিগুণ সার দিয়েও ফলন ১২-১৫ মণের বেশি হয় না। দেশী শস্যের বীজগুলির ক্রমাবলুপ্তির ফলে উচ্চফলনশীল চাষে ক্ষতি হলেও কৃষকদের দেশী বীজ চাষ করার সুযোগ কমছে। এই দেশি বীজগুলিই কিন্তু উচ্চফলনশীল বীজ তৈরির কাঁচামাল। তাই দেশ থেকে এই বীজগুলি অবলুপ্ত হলেও সাম্রাজ্যবাদী সংগঠন IBPGR (International Board of Plant Genetic Resources) ওই দেশী বীজের অধিকাংশই সযত্নে সংগ্রহ করে নিজেদের গবেষণাগারে সংরক্ষণ করছে।৫ চূড়ান্ত স্বেচ্ছাচারিতায় তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারকে ধোঁকা দিয়ে IBPGR এ কাজ করেছিল।

সবুজ বিপ্লবের মূল পৃষ্ঠপোষক ছিল ফোর্ড এবং রকফেলার ফাউন্ডেশান। এই কর্মসূচির ফলে সাম্রাজ্যবাদ নিম্নলিখিত উদ্দেশ্যগুলি সাধন করতে চেয়েছিল।

১। তৃতীয় বিশ্বে সার, বীজ, কীটনাশক এবং কৃষি যন্ত্রপাতির বাজারের বিপুল সম্প্রসারণ।

২। কৃষকদের কাছ থেকে বীজ নামক উৎপাদনের উপকরণটির অধিকার হরণ করা।

৩। ভূমি সম্পর্কের কোন বৈপ্লবিক পরিবর্তন না ঘটিয়েও সাময়িকভাবে খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়ে তৃতীয় বিশ্বের কৃষকদের ক্ষুধা তথা ক্ষোভকে কিছুটা প্রশমিত করে চীন বিপ্লবের পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধ করা।

আজ একবিংশ শতাব্দীতে সাম্রাজ্যবাদী কোম্পানিগুলি প্রথম ও দ্বিতীয় উদ্দেশ্য সাধনের পথে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর আবিষ্কারের ফলে সাম্রাজ্যবাদী কোম্পানিগুলি সমগ্র তৃতীয় বিশ্বের গোটা খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাটাকে আক্ষরিক অর্থে নিয়ন্ত্রণ করার মতো ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছে। (এই বিষয়টি অত্যন্ত জটিল এবং বিষদ ব্যাখ্যার দাবি রাখে। বর্তমান প্রবন্ধে তা করা গেল না।)

বীজের ব্যবসা আজ অত্যন্ত লাভজনক। এই ব্যবসার বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও প্রচুর। ভারতের কৃষি জমিতে বার্ষিক প্রায় ৬০ লক্ষ টন বীজ ব্যবহূত হয়। এর প্রায় ৮৫ শতাংশ অর্থাৎ ৫২ লক্ষ টন বীজ কৃষকেরা এখনও নিজেরাই তৈরি করেন।৬ বিভিন্ন প্রযুক্তি (যেমন টার্মিনেটর বা ডার্মিনেটর) এবং আইন (যেমন Plant Variety Protection and Farmers’ Right Act) প্রণয়নের মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী বীজ কোম্পানীগুলি কৃষকদের ওই বীজ তৈরির অধিকার হরণ ক’রে বীজের বাজার বাড়াবার জন্যে একেবারে উঠে পড়ে লেগেছে। বীজ ব্যবসায়ে আজ কোটি কোটি ডলার ঢালা হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী কোম্পানির ওই বীজগুলি চাষ করলে কিন্তু পরিবেশ তথা অর্থনীতির মারাত্মক বিপর্যয় ঘটতে পারে। যেমন, অন্ধ্রপ্রদেশের চাষীরা মনস্যান্টো কোম্পানির বোলগার্ড তুলো চাষ করার পরিণামে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ওই কুখ্যাত মনস্যান্টো কোম্পানির বীজ মাহিকো কোম্পানির নামের আড়ালে পশ্চিমবঙ্গের বাজার ছেয়ে ফেলেছে, কার্গিল বা অন্যান্য কোম্পানিও পিছিয়ে নেই। শুধু বীজ নয়, ওদের তৈরি অন্যান্য কৃষি রাসায়নিক, যেমন ম্যাচেটি বা রাউন্ড আপ এগুলিও রাজ্যের বাজারে হু হু করে ঢুকছে। বিশ্ব জুড়েই কৃষি রাসায়নিকের বাজার এখন খুবই তেজি (তালিকা ৯ দ্রষ্টব্য)। এই বীজ বা রাসায়নিকগুলি ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হলে সমস্ত কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার উপরেই সাম্রাজ্যবাদী কোম্পানিগুলির চূড়ান্ত আধিপত্য কায়েম হতে পারে।

তালিকা-৯
পৃথিবীর প্রথম দশটি কোম্পানির (১৯৯৩ সালে বিশ্বজুড়ে কৃষি রাসায়নিক বিক্রির নিরিখে) তালিকা।
কোম্পানির নাম
(বিক্রির পরিমাণের ক্রমানুসারে)
১৯৯৩ সালে মোট কৃষি রাসায়নিক বিক্রির পরিমাণ (মিলিয়ন ডলারে)
          সিবাগাইগি
          ডুপন্ট
          জেনেকা (ঢট্রঢ)
          মনস্যান্টো
          বায়ার
          রোন-পাউলেন
          ডাও-এলানকো
          হেক্‌স্ট
          বিএএসএফ
১০        এম সায়নাজাইড
২৭৯০
২০১৪
১৯৫০
১৯৩৬
১৭৯৫
১৭৫৬
১৬০৪
১৩৩৫
১১৪৯
১১০০
তথ্যের সূত্র : Ianet Bell, Genetic Engineering and Biotechnology in Industry. Published in the book The Life Industry, Biodiversity, People and Profit, Intermediate Technology Publication, 1996.

এই উপকরণগুলি বিক্রির জন্য স্থানীয় বিক্রেতাদের কোম্পানির তরফ থেকে অনেক লোভনীয় প্রস্তাব দেওয়া হয়। যেমন, নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরন করতে পারলে দামি-দামি উপহার দেবার বন্দোবস্ত থাকে। গ্রামাঞ্চলে এই সার, বীজ, কীটনাশকের ব্যবসাদাররা সাম্রাজ্যবাদের স্থানীয় মিত্র শক্তি এবং এরা ক্রমশই শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এই সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের ফলে গ্রামাঞ্চলে নিম্নলিখিত পরিবর্তনগুলি ঘটেছে।

১। বর্তমানে চাষ করতে হলে চাষীকে বীজ, সার, কীটনাশক কিনতেই হয়। দরিদ্র চাষী নগদে এটা কিনতে পারে না, তাঁকে ধার করতে হয়। সংস্কারবাদী রাজনীতির মাহাত্ম্যে গত দু’দশক ধরে চাষীকে প্রচুর অপরিকল্পিত খাতে ঋণ দেওয়া হয়েছে, স্বভাবতই যার অনেকটাই আদায় হয়নি। তাছাড়া বর্তমান বিশ্বায়নের হাওয়ায় ব্যাঙ্ক তার নীতিও বদলেছে। গ্রামে ব্যাঙ্কের ঋণ দেওয়া খুবই কমেছে। এই শূন্যস্থান পূরণ করেছে মহাজন, বার্ষিক ১০০ থেকে ১২০ শতাংশ সুদে রমরম করে মহাজনি ব্যবসা চলছে। ওই মহাজনদের সামাজিক আধিপত্যও প্রচুর।

অনেক কৃষক  চাষের খরচ যোগাড় করার জন্য মহাজনের দ্বারস্থ না হয়ে, ধারে দোকান থেকে সার, বীজ, কীটনাশক ইত্যাদি কেনেন এবং ফসল উঠলে সেই ধার শোধ করেন। দরিদ্র কৃষকদের কাছে সার বা কীটনাশকের বিক্রি বাড়ানোর এটা একটা ভাল পদ্ধতি, কিন্তু এর সামাজিক দিকটা হল এই যে, এতে সার, বীজ, কীটনাশকের ব্যবসাদারদের শুধু অর্থই বাড়ছে না, সামাজিক আধিপত্যও বাড়ছে। তারা ধারে মাল না দিলে চাষীকে না খেয়ে মরতে হবে।

২। চাষে জলের চাহিদা বাড়ার ফলে গ্রামে যারা শ্যালো বা মিনি ডিপ টিউবওয়েল বসিয়ে জলের ব্যবসা করছেন, তাদেরও প্রচুর লাভ হচ্ছে, সামাজিক আধিপত্যও বাড়ছে। সরকারি ডীপ টিউবওয়েল প্রকল্পগুলিতে জল কার জমিতে যাবে বা টিউবওয়েলটা কার জমির পাশে বসবে সেটা অনেক সময় স্থানীয় প্রভাবশালী পার্টি ঠিক করে এবং এইভাবে তাদের আধিপত্য বজায় রাখে।

নীল ওয়েবস্টার বর্ধমানের জয়নাপুর গ্রামে যে সমীক্ষা করেছেন তাকে উদ্ধৃত করে দীপঙ্কর বসু তার পূর্ব-উল্লিখিত প্রবন্ধে দেখাচ্ছেন যে, একটা Mini Submersible Tube Well (M.S.T.W) বসাতে খরচ হয় ৩৫,০০০ টাকা এবং বিদ্যুতের খরচ বছরে আরও ১২৬০ টাকা (বিদ্যুতের দাম বাড়ার ফলে যা বর্তমানে আরও অনেক বেশি হবে)। ধনী চাষী ছাড়া ওই M.S.T.W অন্য কেউ বসায় না, তাই জলের ব্যবসাও তাদেরই একচেটিয়া। যখন একজন বা অল্প কয়েক জন জমি মালিক মিলে একটা M.S.T.W বসায় তখন তারা জলসেচের আওতাভুক্ত জমিগুলি ইজারা নিতে শুরু করে। এই ইজারা ঠিকা ইজারা। এর শর্ত এমন যে উদ্বৃত্তের সিংহভাগই M.S.T.W মালিকদের পকেটেই যায়।

যারা ডিজেল পাম্প বা শ্যালোর মাধ্যমে জলের ব্যবসা করেন তারা এক বিঘা জমির ধান পাকাবার জন্য ৩ মণ ধান নেন, এছাড়া ডিজেলের সমস্ত খরচ চাষীকে বহন করতে হয়। একজন বর্গাদার যদি এক বিঘাতে ১৬ মণ ধান ফলান, তবে জমি মালিককে দিতে হবে ৪ মণ আর পাম্পওয়ালাকে ৩ মণ। উদ্বৃত্ত শোষণে জলের কারবারি খুব পিছিয়ে নেই।

জমির মালিক চাইবে এমন চাষ করতে যাতে একর পিছু আয় সবচেয়ে বেশি হয়। জল ব্যবসায়ীও চাইবে এমন চাষ হোক যাতে সবচেয়ে বেশি জল লাগে। ওই দুইয়ের নিরিখেই বোরো চাষ আদর্শ। বোরো চাষ হয় রবি খন্দে। এই সময়ে গম বা ডাল বা তৈল বীজ চাষ হতে পারে, কিন্তু এই চাষগুলির থেকে বোরো চাষে একর প্রতি আয় ও জলের চাহিদা অনেক বেশি। পশ্চিমবঙ্গে গত দু’দশকে বোরো চাষের জমি প্রায় ৪ গুণ বেড়েছে, অন্য কোন ফসলের চাষ এত বাড়েনি। ডাল ও অন্যান্য দানা শস্য চাষের এলাকা ৪১% ও ৪৯% কমেছে (তালিকা ১০ দ্রষ্টব্য)। বোরো চাষের মাত্রাতিরিক্ত জলের চাহিদা মেটাতে গিয়ে রবি খন্দে চাষ খুবই সীমিত হয়ে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মোট কৃষি জমির ৫০ শতাংশেই (প্রায়) রবি খন্দে কোন চাষ হয় না। খাদ্যশস্যের মোট উৎপাদনে পশ্চিমবঙ্গ পিছিয়ে পড়ার (তালিকা ২ দ্রষ্টব্য) এটাও একটা কারণ। গ্রামীন কর্মসংকোচনের পেছনেও এই ব্যবস্থা দায়ী। এর থেকে পরোক্ষ সিদ্ধান্ত করা যায় যে, পশ্চিমবঙ্গে কৃষি নীতি জমির মালিক এবং জল ব্যবসায়ীরাই অংশত নির্ধারণ করে। তাছাড়া বোরো চাষের পরিমাণ বৃদ্ধি করা সবুজ বিপ্লবেরও একটা অন্যতম কর্মসূচি ছিল।

তালিকা-১০
পশ্চিমবাংলার জমিতে কী কী চাষ হয় এবং তার পরিবর্তন
১৯৮০-৮১ ও ১৯৯৯-২০০০
শস্যের নাম
জমির পরিমাণ (লক্ষ একর)
খাদ্যশস্য
১৯৮০-৮১
১৯৯৯-২০০০
বৃদ্ধি
(আউস
(আমন
(বোরো
(গম
(অন্য দানাশস্য  
(ডাল
মোট খাদশস্য
১৫২০
১০৪১৪
৮৫৬
৬৯৯
২৯৬
১২৯৬
১৫০৭১
১০৫৬
১০৪৯৯
৩৬৪৩
৯০০
১৪৬
৫২৯
১৬৭৭৩
৪৬৪
+ ০৮৫
+ ২৭৮৭
+ ২০১
১৪০
৭৬৭
+ ১৭০২
 তথ্যের উৎস : তালিকা ৭-এর ন্যায়।

শ্রী অজিত নারায়ণ বসু তার ‘অনীক’, অক্টোবর-নভেম্বর, ২০০১ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘পশ্চিমবাংলার কৃষি : যা হয়েছে যা হওয়া সম্ভব’ শীর্ষক প্রবন্ধে অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গতভাবে দেখিয়েছেন যে, ৩৬ লক্ষ একর জমিতে বোরো চাষ করতে মোট ১৭২৮ লক্ষ একর-ইঞ্চিচ জল লাগে এবং এর থেকে খাদ্য উৎপাদন হয় ৫০৪ লক্ষ কুইন্টাল এবং কর্ম সংস্থান হয় ৩৩৮৪ লক্ষ জন-দিন। অথচ সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে এর থেকে কিছু কম পরিমাণ জলে (১৪৫৬ লক্ষ একর ইঞ্চি) অন্তত ১০১ লক্ষ একর জমিতে ধান, গম, ডাল, তৈলবীজ ইত্যাদি চাষ করে মোট ৮৮৪ লক্ষ টন খাদ্য শস্য এবং ৩২ লক্ষ টন তৈলবীজ উৎপাদন করা সম্ভব এবং এর ফলে কর্মসংস্থান হতে পারে ৬২১০ লক্ষ জন-দিন (প্রায় দ্বিগুণ)। তিনি আরও দেখিয়েছেন যে MSTW শ্যালো বসিয়ে মাত্রাতিরিক্ত ভৌমজল ব্যবহার না করে গ্রামের মজা পুকুর (পশ্চিমবঙ্গে যার সংখ্যা প্রায় ৫ লক্ষ) সংস্কারের মাধ্যমেও সেচের জলের সমস্যা সার্থকভাবে মেটানো যায়। এতে জমি মালিক ও জলকারবারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সর্বহারা ও আধা-সর্বহারা শ্রেণী উপকৃত হবে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, ভৌম জলের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে আর্সেনিক দূষণ ও পানীয় জলের সংকটের তীব্রতা বৃদ্ধি পেতে পারে।

শ্রীঅজিত নারায়ণ বসু প্রকারান্তরে জল নামক উৎপাদনের উপকরণটির সামাজিকী্মকরণ দাবি করেছেন। অত্যন্ত সঙ্গত দাবি। তবে শুধু জল নয়, গ্রামীন শ্রমশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিপুল পরিমাণে জৈবসার, ভেষজ কীটনাশক সামাজিকভাবে তৈরি করা যায়। দেশি শস্যের বীজ পরিকল্পিত উপায়ে চাষ করে খাদ্য উৎপাদনও বিপুল বাড়ানো যায়। সাম্রাজ্যবাদী বীজ, সার, কীটনাশক কোম্পানিগুলিকে দেশের মাটি থেকে সমূলে উৎপাটিত করা যায়। এই সম্ভাবনাগুলিকে অনেকে নিছক কল্পনা বিলাস বা N.G.O. মার্কা বদমায়েশি বলে মনে করেন। তাদের সবিনয়ে বলি, একবার কিউবার দিকে তাকান। এক দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জারি করা বাণিজ্যিক অবরোধ, অন্যদিকে সোভিয়েতে ভাঙনের পর রাশিয়ার সাথে বাণিজ্যের পথও বন্ধ। এই অবস্থায় কিউবার পক্ষে চাষের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক এবং যন্ত্রপাতি আমদানি করা অসম্ভব হয়ে পযে। কিউবায় তখন অধিকাংশ জমিতে জৈবসার, ভেষজ কীটনাশক আর দেশি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে চাষ শুরু হয়। তাতে কিউবা খাদ্যে স্বয়ম্ভর হয়েছে। প্রমাণ করে দিয়েছে যে, এভাবেও খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো যায়। (উৎসাহী পাঠক বিষদ বিবরণের জন্য The Ecologist পত্রিকার December 1999 সংখ্যায় প্রকাশিত Cuba’s Organic Revolution প্রবন্ধটি দেখতে পারেন।) নিম বা করঞ্জ গাছ থেকে একদম ঘরোয়া যন্ত্রপাতির সাহায্যে (যেমন শিল নোড়া, হাতা, কড়াই, উনুন) বাজার চলতি যে কোন কীটনাশকের থেকে ভাল কীটনাশক তৈরি করা যায় (ভেষজ কীটনাশক সম্পর্কে উৎসাহী পাঠক Simonds, H.C. Evan এবং W.M. Blency রচিত Pesticide for the year 2000, Mycochemical and Botanical প্রবন্ধটি দেখতে পারেন। এটি C.A.B. International 1992 থেকে প্রকাশিত  Pest Management and the Environment in 2000 পুস্তকের দশম অধ্যায়ে ছাপা হয়েছিল)। গোবর, কচুরিপানা, খড় ইত্যাদির সাহায্যে, সহজে উইচস্তরের জৈবসার তৈরি করা যায়। জীবাণুসার তৈরির মতো ছোটখাট ল্যাবরেটরি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও তৈরি করা সম্ভব। এলাকাভিত্তিক ছোট ছোট জীব বৈচিত্র্যের বাগান তৈরি করে দেশী শস্যের বীজ সংরক্ষণও কঠিন নয়। শ্রেণী সংগ্রামের রাজনীতিকে ভিত্তি করে কাজগুলি করলে তা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ে অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

উপসংহার  

ওপরের আলোচনাগুলি থেকে আমরা গ্রাম সমাজের নিম্নলিখিত কয়েকটি প্রবণতা চিহ্নিত করতে পারি।

১। গ্রাম সমাজে সর্বহারা ও আধা-সর্বহারা শ্রেণীর সংখ্যা বাড়ছে।

২। কৃষিক্ষেত্রে জমির পুঁজিনির্ভর কেন্দ্রীভবন খুব হচ্ছে না।

৩। কৃষিতে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ক্রমশই বাড়ছে, এই আগ্রাসনে সাম্রাজ্যবাদী প্রযুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

৪। সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং জলের ব্যবসায়ীরা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির স্থানীয় মিত্র হিসেবে তাদের ভূমিকা পালন করছে এবং এই অংশটি গ্রাম সমাজে ক্রমশই শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

৫। ভূমি সংস্কার কর্মসূচি থমকে আছে, জমির পুঁজি নির্ভর কেন্দ্রীভবন না হলেও, জমি মালিক হিসাবে অ-কৃষক বর্গের সংখ্যা বাড়ছে।

৬। পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই প্রবণতাগুলি এক ধরনের স্থায়িত্ব পাচ্ছে।

বর্তমানে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে গ্রাম সমাজের একটি পূর্ণাঙ্গ শ্রেণী বিশ্লেষণ হওয়া প্রয়োজন। আগামী সংখ্যায় এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছা থাকল।

সূত্র নির্দেশ  :

১. Molloy Chattopadhyay, Waged Labour Arrangements in a West Bengal Village, Economic and Political Weekly, February 17,2001.

২.  Dr. R.H. Richharia & Dr. S. Govindaswami, Rices of India : Academy of Development Science (1990).

৩.  P.K. Bera : Change in the first Scenario After HYV introduction in West Bengal : Proceeding of the workshop on the conservation and community copy rights of Folk Crop Variety, W.W.F. India Eastern Region.

৪.  Dr Claude Alvares : The Great Gene Robbery : The Illustrated Weekly of India, 23-29 March, 1986.

৫.  Damiel Querol : Genetic Resource : Our Forgotten Trees : Third World Network.

৬.  Sumen Salis : Farmers’ Right and Food Security : EPW, March 11-17, 2000.

যে প্রবন্ধগুলির সাহায্য নেওয়া হয়েছে : 

১.  Dipankar Basu : Political Economy of ‘Middlerness’, Behind Violence in Rural West Bengal. EPW, April 21, 2001.

২.  Ranjan Roy : Poverty, Household Size and Child Welfare in India, EPW, September, 23, 2000.

৩.  Sunil Sengupta and Haris Garden (1997) Agrarian Politics and Rural Development in West Bengal in Dreze and Sen (eds.).

৪.  Raghab Bandhyopadhyay : Agrarian Backdrop of Bengal Violence, EPW, February, 3-10, 2001.

৫. মৈত্রীশ ঘটক : পশ্চিমবঙ্গে ভূমি ব্যবস্থার সংস্কার এবং কৃষি উৎপাদনশীলতা, অনীক, অক্টোবর-নভেম্বর, ২০০১।

৬. অজিত নারায়ণ বসু   পশ্চিমবাংলার কৃষি যা হয়ে চলেছে এবং যা হওয়া সম্ভব   অনীক, অক্টোবর-নভেম্বর, ২০০১।

৭. অনিন্দ্য সেন : পশ্চিমবাংলার গ্রামাঞ্চলে ভূমি কাঠামো ও রাজনৈতিক বিন্যাস : একটি আন্তঃসম্পর্ক রচনার চেষ্টা   অন্যস্বর, এপ্রিল-মে, ২০০১।

৮. শুভ্রকেতন বসু : জীন সাম্রাজ্যবাদ, অনীক।

৯. High Warwick : Cuba’s Organic Revolution : The Ecologist : December 1999.

১০. Simonds, H.C. Evana and W.M. Blency : Pesticide for the year 2000, Mycochemical  and Botanical in Pest Management and the Environment in 2000, published by CAB International 1992.

১১. Jenet Bell : Genetic Engineering and Biotechnology in Industry, Biodiversity, People and Profit. International Technology Publication, 1996.

১২. National Family Health Survey, 1998-99.

১৩.  West Bengal Land Reforms Act-1955, by Mallick.

১৪. কার্ল মার্কস, ‘পুঁজি’। 

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad