ড. কল্যাণ চক্রবর্তী।
একটি প্রবাদ আছে 'চাকের মধু কি মিষ্টি হইত,/মৌমাছির খোঁচা না যদি রইত?' কেবল মৌমাছির খোঁচা নয়, বিশাল নদী ও ঘনজঙ্গলের দেশে বাঘ-কুমীর-সাপ-হাঙর-কামট-নৌকাডুবি-জলদস্যুর হাতছানি এড়িয়ে মধু সংগ্রহ করতে হয় মউলেকে। শুধু মউলে নয়, বাউলে, কাঠুরে, কাঁকড়ামারা, মৎস্যজীবী সম্প্রদায় তাদের জীবন-জীবিকার তাগিদে যাতায়াত করতে বাধ্য হয় এই ভয়ঙ্কর সুন্দর, প্রায়ন্ধকার বাদাবনে। সমুদ্রের দিগন্ত প্রসারিত জলে নোনাভূমির মানুষ বাঁচার রসদ খুঁজে নেয়। তার পথে পথে বিপদ লুকিয়ে থাকে। সামুদ্রিক ঝড়-ঝঞ্ঝা, গভীর নিম্নচাপ তো বটেই, বাদাবনের সুন্দরী, হেঁতাল, গরাণ আর গোলপাতার অরণ্যে বাস করে বাঘ আর নোনা জলের জোয়ার ভাটায় দিগন্ত-বিস্তারী জলরাশিতে কুমীর। আর এই বিশেষ বৈচিত্র্যের কারণেই বাদাবনকে ১৯৮৯ সালে 'World Heritage Site' বলে ঘোষণা করা হয়েছে, ecosystem with planetary precedence for conservation।
একটি লোকগীতিতে আছে 'কূলে উঠিলে বাঘে লইয়া পলায়,/জলে পড়িলে যে বোল কুম্ভীরে খায়।/নিরন্তর এই পানিতে ডাকাইত ফিরে,/পাইলেই ধনপ্রাণ দুই নাশ করে।' মোঘল যুগে 'পর্তুগীজ' ও 'মগ' জলদস্যুদের কথা আমরা জেনেছি। সুন্দরবন প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দ 'পরিব্রাজক' (ভারত: বর্তমান ও ভবিষ্যত) গ্রন্থে লিখেছেন, "সোঁদরবন পূর্বে গ্রাম-নগর ময় ছিল, উচ্চ ছিল। অনেকে এখন ও কথা মানতে চায় না। এই সকল স্থানেই পোর্তুগিজ বম্বেটেদের আড্ডা হয়েছিল; আরাকান-রাজের এই সকল স্থান অধিকারের বহু চেষ্টা, মোগল প্রতিনিধির গঞ্জালেজ-প্রমুখ পোর্তুগিজ বম্বেটেদের শাসিত করবার নানা উদ্যোগ; বারংবার ক্রিশ্চান, মোগল, মগ, বাঙালীর যুদ্ধ।" পরিবেশ, বন্য শ্বাপদ এবং জলদস্যুর বিপদের 'সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে।' আর যে ট্র্যাডিশনের বিপদ সম্পর্কে আমরা নেহাতই সুপ্তিতে রয়েছি, তা হল এই সমুদ্র-খাঁড়ির বিপদ সঙ্কুল পথেই ভারত রাষ্ট্রের নিরাপত্তাজনিত বিপদ।
নোনামাটির দেশ হল 'সুন্দরবন', স্থানীয় ভাষায় 'সোঁদরবন', তা থেকে বান্দরবন এবং অবশেষে বাদাবন। সুন্দরী, গরাণ, বীণা -- এইসব লবণাম্বু উদ্ভিদের বাস বলেই হয়তো এর নাম সুন্দরবন। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বিশাল ব-দ্বীপ হওয়ায় কেউ বলেছেন 'সমুদ্রবন'। 'চন্দ্রদ্বীপের বন' বলেও কোথাও উল্লেখ আছে। মেগাস্থিনিসের বিবরণে যে 'গঙ্গারিডি'-র নাম জানতে পারি তা ছিল বর্তমান সুন্দরবনের আদিনাম। উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় লবণাক্ত উদ্ভিদের জৈব পরিচয় 'ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট'।
আজ যেখানে হিংস্র শ্বাপদের বাসভূমি, লবণাক্ত জলরাশির মধ্যে ম্যানগ্রোভের অরণ্য, সূদুর অতীতের কোনো এক সময় এই সুন্দরবনই ছিল সমৃদ্ধশালী জনপদ ও কর্মভূমি। নদ-নদীর জটাজালকে কেন্দ্র করে জীবনের বাহন জলপথকে আশ্রয় করে গড়ে উঠছিল সুষ্ঠু যোগাযোগব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থায় সেদিন রূপলাভ করে আন্তর্দেশীয় বাণিজ্য। সরস্বতী, গঙ্গা, বিদ্যাধরী, যমুনা ও ইছামতী নদীকে কেন্দ্র করে এবং তাম্রলিপ্ত, গঙ্গে, সপ্তগ্রাম প্রভৃতি বন্দরকে আশ্রয় করে এই বাণিজ্য সফলতা। ভারতের বাণিজ্যতরী যেত পশ্চিমের মিশর, গ্রীস, রোম, ভূমধ্য সাগরীয় নানা এলাকায়; তেমনই বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়েছিল সিংহল, সুবর্ণভূমি, সুমাত্রা, যবদ্বীপ প্রভৃতি স্থানে। টলেমীর ম্যাপে এই অঞ্চল চিহ্নিত ছিল 'গঙ্গারিডি' নামে, হিউয়েন সাঙের বিবরণে 'সমতট', পাল ও সেন যুগে 'ব্যাঘ্রতটি', চৈতন্যযুগে 'পুন্ড্রবর্ধন' এবং মোঘল আমলে 'ভাটিদেশ'। ১৭৭৩ সালে কালেক্টর রাসেল ও পরবর্তীতে হেঙ্কল ২৪ পরগণার জমি বন্দোবস্ত নিতে শুরু করলে তা হল সুন্দরবন। এই অঞ্চলের পুরাকীর্তির স্বরূপ সন্ধান করে তা খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকের নিদর্শন বলে প্রমাণিত হয়েছে।
সুন্দরবন দিয়ে বাঙ্গালীর বহির্বাণিজ্যে প্রথম আঘাত মধ্যযুগে আরবসাগরের জলদস্যুদের দ্বারা। তখন বাঙালী বণিক পশ্চিম-পথ ত্যাগ করে পূর্বের সঙ্গে লেনদেন অব্যাহত রাখল। কিন্তু সে সুখ সইল না। ষোড়শ শতকে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের দরিয়ায় পর্তুগীজ ও মগ দস্যুদের বীভৎসতা সমুদ্র বাণিজ্যের দফারফা করল। অতএব বাঙালী বণিক বৈদেশিক বাণিজ্য থেকেই পিছু হটল। সুন্দরবন কুখ্যাতি অর্জন করল 'মগের মুল্লুক' নামে। দস্যুতা ও লুঠপাটের আবহে ভাটি এলাকার সমৃদ্ধশালী জনপদগুলি থেকে মানুষ পালিয়ে গেল। গ্রাম-নগরের জনচিহ্নের উপর পড়ল মাটির পরত, গজিয়ে উঠল ঘন অরণ্য। উপকূলীয় নোনামাটির প্রকৃতি, তাই স্বাভাবিকভাবেই জাঁকিয়ে বসল ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। নেই আবাদ, নেই জনপদ; বন এগিয়ে এল কলকাতাতেও। এখানেই ১৬৯০ সালে জব চার্ণক ব্রিটিশ বাণিজ্যের ঘাঁটি গাড়লেন।
ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়েছে। নোনামাটির বাদাবন ভাগ হয়ে এক তৃতীয়াংশ ভারতে আর দুই-তৃতীয়াংশ পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশের অধিকারে এসেছে। কিন্তু তাই বলে সুন্দরবন থেকে সামুদ্র-সন্ত্রাস বন্ধ হয়েছে কি? প্রস্তুত প্রবন্ধে তারই তারই সুলুক সন্ধানে অবতীর্ণ হব।
সাম্প্রতিক বিশ্বের সংঘর্ষ-সংবাদ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে 'হেডেলবার্গ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টার ন্যাশনাল কনফ্লিক্ট রিসার্চ' দাবী করেছে, বিশ্বের ৪২ শতাংশ সংঘর্ষ সংগঠিত হয় ভারত মহাসাগরে।
কী সেই সংঘর্ষ? চোরাচালানকারী পণ্য, সোনা, ড্রাগস, বিস্ফোরক, অস্ত্র এবং গোলা-গুলি-বারুদসহ সামরিক সম্ভারের দখলদারি নিয়ে।
এত সংঘর্ষ বাড়ল কেন?
কোল্ড ওয়ার বা ঠান্ডা যুদ্ধের সময় ভারতীয় মহাসাগরের তটে তটে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলি সুপার শক্তিধর দেশগুলির শক্তি প্রদর্শন আর আস্ফালনের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানে নিরাপত্তা ভারসাম্যের লব্ধি ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে গেল। আর এতদঞ্চলের শান্তি বিঘ্নিত হল। রাজনৈতিকভাবে অস্থির অস্থায়ী দেশগুলি পরস্পরের শত্রু, প্রতিদ্বন্দ্বী ও সন্দেহভাজন হওয়ায় তৈরি হল এক অশান্তির বাতাবরণ। এ থেকেই উৎপত্তি সামুদ্র-সন্ত্রাস আর তা ক্রমেই পরিবেশকে পরিবর্তিত করে চলেছে। দেশগুলির আভ্যন্তরীণ সরকারী দুর্বলতা, সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতা ভারত মহাসাগর জুড়ে সমস্ত ধরণের নিষিদ্ধ কার্যক্রমের সূচনা ঘটাল।এরই ফলে সমুদ্র নিরাপত্তা এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিল।
সামুদ্র-সন্ত্রাস কি?
এ এক সীমানা অতিক্রমণ সন্ত্রাস; সন্ত্রাসের এক নতুন মাত্রা। জাতীয় নিরাপত্তা কর্মীদের কাছে এক অতি উচ্চ-চকিত চ্যালেঞ্জ। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় নিরাপত্তা সমঝোতা পরিষদ (Council for Security Cooperation in the Asia Pacific, CSCAP)-এর কার্যকরী গোষ্ঠী সামুদ্র-সন্ত্রাসের সংজ্ঞা নিরূপণ করেছেন, "The undertaking of terrorist acts, activities within the maritime environment, using or against -- Vessels or fixed platforms, at sea or in port, or against any one of their passengers or personnel, against Coastal." অর্থাৎ উপকূল পেরিয়ে জলযান ব্যবহার করে সমুদ্র ও সামুদ্রিক পরিবেশের মধ্যে চলাচলকারী জাহাজ, নৌকা, রণতরী; বন্দর ও সমুদ্রের স্থায়ী মঞ্চ ধ্বংসের তৎপরতা, সক্রিয়তা ও কর্মানুষ্ঠান; তার যাত্রী ও কর্মীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী আচরণ, ক্রিয়াকলাপ, কর্মভার ও পরিকল্পনার উদ্যোগ ও অঙ্গীকারই হল সামুদ্র-সন্ত্রাস।
মুম্বই আক্রমণ:
নিরাপত্তার বজ্র আঁটুনির ফস্কা গেঁড়ো ছিন্ন করে সামুদ্র-সন্ত্রাস যে দেশবাসীকে কতটা অসহায় করে তুলতে পারে ২০০৮ সালের ২৬শে নভেম্বর মুম্বাই আক্রমণ তার জলন্ত উদাহরণ। মহারাষ্ট্রের রায়গড় উপকূলে বিস্ফোরক চোরাকারবারি এবং তা ব্যবহার করে ১৯৯৩ সালে ধারাবাহিক মুম্বাই বিস্ফারণ; সমুদ্রসঙ্কুল পথে ২০০৮ সালে ১০ জন সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ প্রমাণ করে দিয়েছে ভারতীয় উপকূলবর্তী অঞ্চল কতটা অরক্ষিত।
লস্কর-ই-তৈবা পরিকল্পনা করেছিল সমুদ্রপথে অনুপ্রবেশের এবং মুম্বাই দরিয়ায় তৈল উত্তোলন ঘাঁটিকে উড়িয়ে দেওয়ার। পরিকল্পনা করেছিল বন্দরে নাশকতামূলক কাজের, দেশের দামী সম্পত্তি বিনষ্টের, পরিকল্পনা নিয়েছিল পারমাণবিক বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদন কেন্দ্র বিনষ্টির এবং INS বিক্রান্ত আক্রমণ করার।
গোয়েন্দাবিভাগ সরকারকে সতর্ক করে দিয়েছিল প্রায় ৫০০ লস্কর-ই-তৈবা উগ্রপন্থী করাচির কাছে আজিজাবাদে উপকূল শিবিরে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে, India's Exclusive Economic Zone (EEZ)-এ একচেটিয়া সামুদ্রিক উগ্রপন্থার কাজ সংঘটিত করার জন্যে, ৭০০০ কিমি ভারতীয় ভূ-ভাগের সমুদ্র উপকূলবর্তী উচ্চমূল্যের দেশীয় সম্পদ বিনষ্ট করার।
এ কাজে উগ্রপন্থী সংস্থাগুলি অপব্যবহার করতে পারে শতশত ভারতীয় মাছ ধরার ট্রলারগুলিকে, যেগুলি পাকিস্তানি সেনা ও উপকূল রক্ষীরা বিগত বছরগুলিতে বাজেয়াপ্ত করেছিল, অভিযোগ ছিল পাকিস্তানি জলবলয়ে অনুপ্রবেশ করেছে। এই মাছ ধরার ডিঙ্গিগুলি ব্যবহার করছে পাকিস্তান-কেন্দ্রিক উগ্রপন্থীরা এবং সেই লক্ষ্যে ভারতেরই ডিঙ্গিগুলিকে ভারত মহাসাগরে ভারতীয় জলসীমা ভেঙ্গে প্রবেশ করিয়ে দিচ্ছে।
জলদস্যুতা, সামুদ্রিক ডাকাতি, লুণ্ঠন ও অপহরণ;
সমুদ্রে জলদস্যুতা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি অন্যতম নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্ক। এরমধ্যে রয়েছে সমুদ্রের বুকে দাঁড়িয়েই নানাভাবে ভীতি প্রদর্শন, আন্তর্জাতিক অপরাধ সংগঠন ও কার্যকলাপ, মৎস্য শিকার ও লুঠ করার মত অপরাধ।
সোমালিয়া উপকূলবর্তী ভয়ঙ্করী জলদস্যুতা বহুদেশকেই সামুদ্রিক নিরাপত্তা জনিত ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য করেছে। কারণ হাজার হাজার টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট পূর্ণ একটি জাহাজকে জলদস্যুরা বৃহৎ-বোমা রূপে পর্যবসিত করে ভারতীয় পোতাশ্রয়ে প্রবেশ করাতে পারে। কোথায় অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট সার তৈরির কাঁচামাল হবে, তা নয়, আসবে বোমার অভিশাপ হয়ে। সোমালিয়ার জলদস্যুতা নিরাপত্তাকর্মী এবং সৈনাপত্য-কুশলীদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে সমুদ্র-ডাকাতদের কাজে লাগিয়েও উগ্রপন্থী কার্যকলাপ সুচারুভাবে সংগঠিত করা যায়।
সমুদ্রপথে গতায়তকারী বিপুল সামগ্রীবাহী এবং পানামা খাল, সুয়েজ খাল, হরমুজ প্রণালী, বাব-এল-মানডব, মালাক্কা প্রণালী, বসপোরাস প্রণালীর মধ্যে চলাচলকারী মালবাহী জাহাজের লুব্ধ-সম্পদ দস্যুদের আমন্ত্রণ করে আনছে।
স্বামী বিবেকানন্দ লিখছেন (পরিব্রাজক -- মনসুন: এডেন), "এখন প্রত্যেক শক্তিমান জাতির যুদ্ধপোতনিচয় পৃথিবীময় ঘুরে বেড়াচ্চে।..সুয়েজ খাল হচ্চে এখন ইওরোপ-আশিয়ার সংযোগ স্থান। সেটা ফরাসীদের হাতে। কাজেই ইংরেজ এডেনে খুব চেপে বসেছে, আর অন্যান্য জাতও রেড-সীর ধারে ধারে এক একটা জায়গা করেছে। সাত-শ বৎসরের পর পদদলিত ইতালি কত কষ্টে পায়ের উপর খাড়া হয়ে, হয়েই ভাবলে -- কি হলুম রে! এখন দিগ্বিজয় করতে হবে। ইওরোপের এক টুকরোও কারুর নেবার জো নাই; সকলে মিলে তাকে মারবে! এখন বাকী আছে দু-চার টুকরো আফ্রিকার। ইতালি সেই দিকে চলল। প্রথমে উত্তর আফ্রিকায় চেষ্টা করলে। সেথায় ফ্রান্সের তাড়া খেয়ে পালিয়ে এল। তারপর ইংরেজরা রেড-সীর ধারে একটা জমি দান করলে।"
সোমালিয়া ও এডেন উপসাগর:
২০০৫ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে সোমালিয়া সাগর ও এডেন উপসাগরে সামুদ্রিক জলদস্যুতা এক প্রবল রূপ ধারণ করেছিল। গিনি উপসাগরের দরিয়াতেও দস্যু আক্রমণের সংখ্যা বেড়ে গেছিল।
২০০৯ সালে Djibouti Code of Conduct গৃহীত হয়, আর তার ফলে ভারত মহাসাগরের পশ্চিম ভাগ ও এডেন উপসাগরে চলাচলকারী জাহাজের উপর অস্ত্রবলে বলীয়ান জলদস্যুর আক্রমণ বন্ধ হয়।
মালাক্কা প্রণালি :
এটি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ইন্দোনেশিয়ার মধ্যস্থ এক সামুদ্রিক প্রণালি, এক অনন্য আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল পথ। বছরে প্রায় ৬৫ হাজার জাহাজ এই পথেই চলে। বিশ্ব সামুদ্রিক বাণিজ্যের এক তৃতীয়াংশ এই পথে সংঘটিত হয়। বিশ্বের শক্তি সামগ্রী ও জ্বালানীর অর্ধেক এই পথে সংঘটিত হয়। এই প্রণালি ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করে চলেছে। এজন্যেই সমুদ্র-দস্যুদের কাছে এই জলপথের দুর্নিবার আকর্ষণ, তারা অনেকানেক মৎস্য-তরী ও অর্থকরী সমুদ্র-তরীতে আক্রমণ করে থাকে।
মাছধরার অজস্র নৌকা ভারতীয় সুন্দরবন, কেন্দুদ্বীপ এবং মাতলা-বিদ্যাধরী ও ঠাকুরন নদীর খাঁড়ি মোহনা অঞ্চলে জলদস্যুদের কবলে পড়ে। এখন প্রশ্ন অকূল দরিয়ার এই জলদস্যুতা তার চরিত্র বদল করে আতঙ্কবাদী কুখ্যাতির এক নবতম চেহারা নেবে কি?
আপাত দমে থাকা সুসজ্জিত সোমালি ডাকাতদল প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে আবারও সোমালিয়া ও এডেনের মধ্যবর্তী এডেন উপসাগর সমেত সমগ্র ভারত মহাসাগরীয় জাহাজ-পথে ব্যাপক সহিংসতা ও লুঠপাটের জন্য তৈরি হচ্ছে?
আল কায়দা এবং তার সহযোগী উগ্রপন্থী দলগুলি সহজেই এদের সঙ্গে যোগসাজশ ও ষড়যন্ত্র করে তাদের ব্যবহার করতে পারে সামুদ্র-সন্ত্রাসের কাজে এবং ভাড়াটে দস্যুকর্মের নানান নতুন পথে। তারা দখল নিতে পারে বৃহৎ পণ্যতরীগুলিকে, অধিকারে আনতে পারে কোটি কোটি ডলার মূল্যে ঠাসা অশোধিত তেল বহনকারী সুপার ট্যাঙ্কগুলি। ২০০৮ সালে সোমালীয় ডাকাতদল ৯০টি জাহাজ ছিনতাই ও লুঠ করেছিল; তাতে কী না ছিল! গম থেকে শুরু করে রসায়ন সামগ্রী।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলি সহজেই অপহরণ করতে পারে সমুদ্র-পথ সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের, যাদের স্যাটেলাইট ফোন ব্যবহারের দক্ষতা আছে, অভিজ্ঞতা আছে বন্দর ও পণ্যবাহী জাহাজের মধ্যে যোগাযোগ করার বিস্তৃত নিয়ম ও কৃত্যের।
গুজরাট, মহারাষ্ট্রের উপকূলভূমি, তামিলনাড়ু, পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন এবং আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ সামুদ্রিক সন্ত্রাসের নয়া গন্তব্য। আমাদের সচেতন হতে হবে।
ভারত মহাসাগরে সামুদ্র-নিরাপত্তা জোরদার কেন প্রয়োজন?
১. অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য
২. শক্তি নিরাপত্তার জন্য
৩. সাগর পরিবেশ রক্ষার্থে
৪. বন্দর সুরক্ষার জন্য
৫. নৌ-যাত্রা এবং সমুদ্র পরিবহণ নিরাপদ করতে
৬. মৎস্যজীবীদের নিরাপত্তা দিতে
৭. অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে
৮. জলদূষণ রোধ করতে।
একটি প্রবাদ আছে 'চাকের মধু কি মিষ্টি হইত,/মৌমাছির খোঁচা না যদি রইত?' কেবল মৌমাছির খোঁচা নয়, বিশাল নদী ও ঘনজঙ্গলের দেশে বাঘ-কুমীর-সাপ-হাঙর-কামট-নৌকাডুবি-জলদস্যুর হাতছানি এড়িয়ে মধু সংগ্রহ করতে হয় মউলেকে। শুধু মউলে নয়, বাউলে, কাঠুরে, কাঁকড়ামারা, মৎস্যজীবী সম্প্রদায় তাদের জীবন-জীবিকার তাগিদে যাতায়াত করতে বাধ্য হয় এই ভয়ঙ্কর সুন্দর, প্রায়ন্ধকার বাদাবনে। সমুদ্রের দিগন্ত প্রসারিত জলে নোনাভূমির মানুষ বাঁচার রসদ খুঁজে নেয়। তার পথে পথে বিপদ লুকিয়ে থাকে। সামুদ্রিক ঝড়-ঝঞ্ঝা, গভীর নিম্নচাপ তো বটেই, বাদাবনের সুন্দরী, হেঁতাল, গরাণ আর গোলপাতার অরণ্যে বাস করে বাঘ আর নোনা জলের জোয়ার ভাটায় দিগন্ত-বিস্তারী জলরাশিতে কুমীর। আর এই বিশেষ বৈচিত্র্যের কারণেই বাদাবনকে ১৯৮৯ সালে 'World Heritage Site' বলে ঘোষণা করা হয়েছে, ecosystem with planetary precedence for conservation।
একটি লোকগীতিতে আছে 'কূলে উঠিলে বাঘে লইয়া পলায়,/জলে পড়িলে যে বোল কুম্ভীরে খায়।/নিরন্তর এই পানিতে ডাকাইত ফিরে,/পাইলেই ধনপ্রাণ দুই নাশ করে।' মোঘল যুগে 'পর্তুগীজ' ও 'মগ' জলদস্যুদের কথা আমরা জেনেছি। সুন্দরবন প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দ 'পরিব্রাজক' (ভারত: বর্তমান ও ভবিষ্যত) গ্রন্থে লিখেছেন, "সোঁদরবন পূর্বে গ্রাম-নগর ময় ছিল, উচ্চ ছিল। অনেকে এখন ও কথা মানতে চায় না। এই সকল স্থানেই পোর্তুগিজ বম্বেটেদের আড্ডা হয়েছিল; আরাকান-রাজের এই সকল স্থান অধিকারের বহু চেষ্টা, মোগল প্রতিনিধির গঞ্জালেজ-প্রমুখ পোর্তুগিজ বম্বেটেদের শাসিত করবার নানা উদ্যোগ; বারংবার ক্রিশ্চান, মোগল, মগ, বাঙালীর যুদ্ধ।" পরিবেশ, বন্য শ্বাপদ এবং জলদস্যুর বিপদের 'সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে।' আর যে ট্র্যাডিশনের বিপদ সম্পর্কে আমরা নেহাতই সুপ্তিতে রয়েছি, তা হল এই সমুদ্র-খাঁড়ির বিপদ সঙ্কুল পথেই ভারত রাষ্ট্রের নিরাপত্তাজনিত বিপদ।
নোনামাটির দেশ হল 'সুন্দরবন', স্থানীয় ভাষায় 'সোঁদরবন', তা থেকে বান্দরবন এবং অবশেষে বাদাবন। সুন্দরী, গরাণ, বীণা -- এইসব লবণাম্বু উদ্ভিদের বাস বলেই হয়তো এর নাম সুন্দরবন। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বিশাল ব-দ্বীপ হওয়ায় কেউ বলেছেন 'সমুদ্রবন'। 'চন্দ্রদ্বীপের বন' বলেও কোথাও উল্লেখ আছে। মেগাস্থিনিসের বিবরণে যে 'গঙ্গারিডি'-র নাম জানতে পারি তা ছিল বর্তমান সুন্দরবনের আদিনাম। উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় লবণাক্ত উদ্ভিদের জৈব পরিচয় 'ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট'।
আজ যেখানে হিংস্র শ্বাপদের বাসভূমি, লবণাক্ত জলরাশির মধ্যে ম্যানগ্রোভের অরণ্য, সূদুর অতীতের কোনো এক সময় এই সুন্দরবনই ছিল সমৃদ্ধশালী জনপদ ও কর্মভূমি। নদ-নদীর জটাজালকে কেন্দ্র করে জীবনের বাহন জলপথকে আশ্রয় করে গড়ে উঠছিল সুষ্ঠু যোগাযোগব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থায় সেদিন রূপলাভ করে আন্তর্দেশীয় বাণিজ্য। সরস্বতী, গঙ্গা, বিদ্যাধরী, যমুনা ও ইছামতী নদীকে কেন্দ্র করে এবং তাম্রলিপ্ত, গঙ্গে, সপ্তগ্রাম প্রভৃতি বন্দরকে আশ্রয় করে এই বাণিজ্য সফলতা। ভারতের বাণিজ্যতরী যেত পশ্চিমের মিশর, গ্রীস, রোম, ভূমধ্য সাগরীয় নানা এলাকায়; তেমনই বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়েছিল সিংহল, সুবর্ণভূমি, সুমাত্রা, যবদ্বীপ প্রভৃতি স্থানে। টলেমীর ম্যাপে এই অঞ্চল চিহ্নিত ছিল 'গঙ্গারিডি' নামে, হিউয়েন সাঙের বিবরণে 'সমতট', পাল ও সেন যুগে 'ব্যাঘ্রতটি', চৈতন্যযুগে 'পুন্ড্রবর্ধন' এবং মোঘল আমলে 'ভাটিদেশ'। ১৭৭৩ সালে কালেক্টর রাসেল ও পরবর্তীতে হেঙ্কল ২৪ পরগণার জমি বন্দোবস্ত নিতে শুরু করলে তা হল সুন্দরবন। এই অঞ্চলের পুরাকীর্তির স্বরূপ সন্ধান করে তা খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকের নিদর্শন বলে প্রমাণিত হয়েছে।
সুন্দরবন দিয়ে বাঙ্গালীর বহির্বাণিজ্যে প্রথম আঘাত মধ্যযুগে আরবসাগরের জলদস্যুদের দ্বারা। তখন বাঙালী বণিক পশ্চিম-পথ ত্যাগ করে পূর্বের সঙ্গে লেনদেন অব্যাহত রাখল। কিন্তু সে সুখ সইল না। ষোড়শ শতকে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের দরিয়ায় পর্তুগীজ ও মগ দস্যুদের বীভৎসতা সমুদ্র বাণিজ্যের দফারফা করল। অতএব বাঙালী বণিক বৈদেশিক বাণিজ্য থেকেই পিছু হটল। সুন্দরবন কুখ্যাতি অর্জন করল 'মগের মুল্লুক' নামে। দস্যুতা ও লুঠপাটের আবহে ভাটি এলাকার সমৃদ্ধশালী জনপদগুলি থেকে মানুষ পালিয়ে গেল। গ্রাম-নগরের জনচিহ্নের উপর পড়ল মাটির পরত, গজিয়ে উঠল ঘন অরণ্য। উপকূলীয় নোনামাটির প্রকৃতি, তাই স্বাভাবিকভাবেই জাঁকিয়ে বসল ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। নেই আবাদ, নেই জনপদ; বন এগিয়ে এল কলকাতাতেও। এখানেই ১৬৯০ সালে জব চার্ণক ব্রিটিশ বাণিজ্যের ঘাঁটি গাড়লেন।
ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়েছে। নোনামাটির বাদাবন ভাগ হয়ে এক তৃতীয়াংশ ভারতে আর দুই-তৃতীয়াংশ পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশের অধিকারে এসেছে। কিন্তু তাই বলে সুন্দরবন থেকে সামুদ্র-সন্ত্রাস বন্ধ হয়েছে কি? প্রস্তুত প্রবন্ধে তারই তারই সুলুক সন্ধানে অবতীর্ণ হব।
সাম্প্রতিক বিশ্বের সংঘর্ষ-সংবাদ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে 'হেডেলবার্গ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টার ন্যাশনাল কনফ্লিক্ট রিসার্চ' দাবী করেছে, বিশ্বের ৪২ শতাংশ সংঘর্ষ সংগঠিত হয় ভারত মহাসাগরে।
কী সেই সংঘর্ষ? চোরাচালানকারী পণ্য, সোনা, ড্রাগস, বিস্ফোরক, অস্ত্র এবং গোলা-গুলি-বারুদসহ সামরিক সম্ভারের দখলদারি নিয়ে।
এত সংঘর্ষ বাড়ল কেন?
কোল্ড ওয়ার বা ঠান্ডা যুদ্ধের সময় ভারতীয় মহাসাগরের তটে তটে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলি সুপার শক্তিধর দেশগুলির শক্তি প্রদর্শন আর আস্ফালনের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানে নিরাপত্তা ভারসাম্যের লব্ধি ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে গেল। আর এতদঞ্চলের শান্তি বিঘ্নিত হল। রাজনৈতিকভাবে অস্থির অস্থায়ী দেশগুলি পরস্পরের শত্রু, প্রতিদ্বন্দ্বী ও সন্দেহভাজন হওয়ায় তৈরি হল এক অশান্তির বাতাবরণ। এ থেকেই উৎপত্তি সামুদ্র-সন্ত্রাস আর তা ক্রমেই পরিবেশকে পরিবর্তিত করে চলেছে। দেশগুলির আভ্যন্তরীণ সরকারী দুর্বলতা, সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতা ভারত মহাসাগর জুড়ে সমস্ত ধরণের নিষিদ্ধ কার্যক্রমের সূচনা ঘটাল।এরই ফলে সমুদ্র নিরাপত্তা এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিল।
সামুদ্র-সন্ত্রাস কি?
এ এক সীমানা অতিক্রমণ সন্ত্রাস; সন্ত্রাসের এক নতুন মাত্রা। জাতীয় নিরাপত্তা কর্মীদের কাছে এক অতি উচ্চ-চকিত চ্যালেঞ্জ। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় নিরাপত্তা সমঝোতা পরিষদ (Council for Security Cooperation in the Asia Pacific, CSCAP)-এর কার্যকরী গোষ্ঠী সামুদ্র-সন্ত্রাসের সংজ্ঞা নিরূপণ করেছেন, "The undertaking of terrorist acts, activities within the maritime environment, using or against -- Vessels or fixed platforms, at sea or in port, or against any one of their passengers or personnel, against Coastal." অর্থাৎ উপকূল পেরিয়ে জলযান ব্যবহার করে সমুদ্র ও সামুদ্রিক পরিবেশের মধ্যে চলাচলকারী জাহাজ, নৌকা, রণতরী; বন্দর ও সমুদ্রের স্থায়ী মঞ্চ ধ্বংসের তৎপরতা, সক্রিয়তা ও কর্মানুষ্ঠান; তার যাত্রী ও কর্মীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী আচরণ, ক্রিয়াকলাপ, কর্মভার ও পরিকল্পনার উদ্যোগ ও অঙ্গীকারই হল সামুদ্র-সন্ত্রাস।
মুম্বই আক্রমণ:
নিরাপত্তার বজ্র আঁটুনির ফস্কা গেঁড়ো ছিন্ন করে সামুদ্র-সন্ত্রাস যে দেশবাসীকে কতটা অসহায় করে তুলতে পারে ২০০৮ সালের ২৬শে নভেম্বর মুম্বাই আক্রমণ তার জলন্ত উদাহরণ। মহারাষ্ট্রের রায়গড় উপকূলে বিস্ফোরক চোরাকারবারি এবং তা ব্যবহার করে ১৯৯৩ সালে ধারাবাহিক মুম্বাই বিস্ফারণ; সমুদ্রসঙ্কুল পথে ২০০৮ সালে ১০ জন সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ প্রমাণ করে দিয়েছে ভারতীয় উপকূলবর্তী অঞ্চল কতটা অরক্ষিত।
লস্কর-ই-তৈবা পরিকল্পনা করেছিল সমুদ্রপথে অনুপ্রবেশের এবং মুম্বাই দরিয়ায় তৈল উত্তোলন ঘাঁটিকে উড়িয়ে দেওয়ার। পরিকল্পনা করেছিল বন্দরে নাশকতামূলক কাজের, দেশের দামী সম্পত্তি বিনষ্টের, পরিকল্পনা নিয়েছিল পারমাণবিক বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদন কেন্দ্র বিনষ্টির এবং INS বিক্রান্ত আক্রমণ করার।
গোয়েন্দাবিভাগ সরকারকে সতর্ক করে দিয়েছিল প্রায় ৫০০ লস্কর-ই-তৈবা উগ্রপন্থী করাচির কাছে আজিজাবাদে উপকূল শিবিরে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে, India's Exclusive Economic Zone (EEZ)-এ একচেটিয়া সামুদ্রিক উগ্রপন্থার কাজ সংঘটিত করার জন্যে, ৭০০০ কিমি ভারতীয় ভূ-ভাগের সমুদ্র উপকূলবর্তী উচ্চমূল্যের দেশীয় সম্পদ বিনষ্ট করার।
এ কাজে উগ্রপন্থী সংস্থাগুলি অপব্যবহার করতে পারে শতশত ভারতীয় মাছ ধরার ট্রলারগুলিকে, যেগুলি পাকিস্তানি সেনা ও উপকূল রক্ষীরা বিগত বছরগুলিতে বাজেয়াপ্ত করেছিল, অভিযোগ ছিল পাকিস্তানি জলবলয়ে অনুপ্রবেশ করেছে। এই মাছ ধরার ডিঙ্গিগুলি ব্যবহার করছে পাকিস্তান-কেন্দ্রিক উগ্রপন্থীরা এবং সেই লক্ষ্যে ভারতেরই ডিঙ্গিগুলিকে ভারত মহাসাগরে ভারতীয় জলসীমা ভেঙ্গে প্রবেশ করিয়ে দিচ্ছে।
জলদস্যুতা, সামুদ্রিক ডাকাতি, লুণ্ঠন ও অপহরণ;
সমুদ্রে জলদস্যুতা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি অন্যতম নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্ক। এরমধ্যে রয়েছে সমুদ্রের বুকে দাঁড়িয়েই নানাভাবে ভীতি প্রদর্শন, আন্তর্জাতিক অপরাধ সংগঠন ও কার্যকলাপ, মৎস্য শিকার ও লুঠ করার মত অপরাধ।
সোমালিয়া উপকূলবর্তী ভয়ঙ্করী জলদস্যুতা বহুদেশকেই সামুদ্রিক নিরাপত্তা জনিত ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য করেছে। কারণ হাজার হাজার টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট পূর্ণ একটি জাহাজকে জলদস্যুরা বৃহৎ-বোমা রূপে পর্যবসিত করে ভারতীয় পোতাশ্রয়ে প্রবেশ করাতে পারে। কোথায় অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট সার তৈরির কাঁচামাল হবে, তা নয়, আসবে বোমার অভিশাপ হয়ে। সোমালিয়ার জলদস্যুতা নিরাপত্তাকর্মী এবং সৈনাপত্য-কুশলীদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে সমুদ্র-ডাকাতদের কাজে লাগিয়েও উগ্রপন্থী কার্যকলাপ সুচারুভাবে সংগঠিত করা যায়।
সমুদ্রপথে গতায়তকারী বিপুল সামগ্রীবাহী এবং পানামা খাল, সুয়েজ খাল, হরমুজ প্রণালী, বাব-এল-মানডব, মালাক্কা প্রণালী, বসপোরাস প্রণালীর মধ্যে চলাচলকারী মালবাহী জাহাজের লুব্ধ-সম্পদ দস্যুদের আমন্ত্রণ করে আনছে।
স্বামী বিবেকানন্দ লিখছেন (পরিব্রাজক -- মনসুন: এডেন), "এখন প্রত্যেক শক্তিমান জাতির যুদ্ধপোতনিচয় পৃথিবীময় ঘুরে বেড়াচ্চে।..সুয়েজ খাল হচ্চে এখন ইওরোপ-আশিয়ার সংযোগ স্থান। সেটা ফরাসীদের হাতে। কাজেই ইংরেজ এডেনে খুব চেপে বসেছে, আর অন্যান্য জাতও রেড-সীর ধারে ধারে এক একটা জায়গা করেছে। সাত-শ বৎসরের পর পদদলিত ইতালি কত কষ্টে পায়ের উপর খাড়া হয়ে, হয়েই ভাবলে -- কি হলুম রে! এখন দিগ্বিজয় করতে হবে। ইওরোপের এক টুকরোও কারুর নেবার জো নাই; সকলে মিলে তাকে মারবে! এখন বাকী আছে দু-চার টুকরো আফ্রিকার। ইতালি সেই দিকে চলল। প্রথমে উত্তর আফ্রিকায় চেষ্টা করলে। সেথায় ফ্রান্সের তাড়া খেয়ে পালিয়ে এল। তারপর ইংরেজরা রেড-সীর ধারে একটা জমি দান করলে।"
সোমালিয়া ও এডেন উপসাগর:
২০০৫ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে সোমালিয়া সাগর ও এডেন উপসাগরে সামুদ্রিক জলদস্যুতা এক প্রবল রূপ ধারণ করেছিল। গিনি উপসাগরের দরিয়াতেও দস্যু আক্রমণের সংখ্যা বেড়ে গেছিল।
২০০৯ সালে Djibouti Code of Conduct গৃহীত হয়, আর তার ফলে ভারত মহাসাগরের পশ্চিম ভাগ ও এডেন উপসাগরে চলাচলকারী জাহাজের উপর অস্ত্রবলে বলীয়ান জলদস্যুর আক্রমণ বন্ধ হয়।
মালাক্কা প্রণালি :
এটি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ইন্দোনেশিয়ার মধ্যস্থ এক সামুদ্রিক প্রণালি, এক অনন্য আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল পথ। বছরে প্রায় ৬৫ হাজার জাহাজ এই পথেই চলে। বিশ্ব সামুদ্রিক বাণিজ্যের এক তৃতীয়াংশ এই পথে সংঘটিত হয়। বিশ্বের শক্তি সামগ্রী ও জ্বালানীর অর্ধেক এই পথে সংঘটিত হয়। এই প্রণালি ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করে চলেছে। এজন্যেই সমুদ্র-দস্যুদের কাছে এই জলপথের দুর্নিবার আকর্ষণ, তারা অনেকানেক মৎস্য-তরী ও অর্থকরী সমুদ্র-তরীতে আক্রমণ করে থাকে।
মাছধরার অজস্র নৌকা ভারতীয় সুন্দরবন, কেন্দুদ্বীপ এবং মাতলা-বিদ্যাধরী ও ঠাকুরন নদীর খাঁড়ি মোহনা অঞ্চলে জলদস্যুদের কবলে পড়ে। এখন প্রশ্ন অকূল দরিয়ার এই জলদস্যুতা তার চরিত্র বদল করে আতঙ্কবাদী কুখ্যাতির এক নবতম চেহারা নেবে কি?
আপাত দমে থাকা সুসজ্জিত সোমালি ডাকাতদল প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে আবারও সোমালিয়া ও এডেনের মধ্যবর্তী এডেন উপসাগর সমেত সমগ্র ভারত মহাসাগরীয় জাহাজ-পথে ব্যাপক সহিংসতা ও লুঠপাটের জন্য তৈরি হচ্ছে?
আল কায়দা এবং তার সহযোগী উগ্রপন্থী দলগুলি সহজেই এদের সঙ্গে যোগসাজশ ও ষড়যন্ত্র করে তাদের ব্যবহার করতে পারে সামুদ্র-সন্ত্রাসের কাজে এবং ভাড়াটে দস্যুকর্মের নানান নতুন পথে। তারা দখল নিতে পারে বৃহৎ পণ্যতরীগুলিকে, অধিকারে আনতে পারে কোটি কোটি ডলার মূল্যে ঠাসা অশোধিত তেল বহনকারী সুপার ট্যাঙ্কগুলি। ২০০৮ সালে সোমালীয় ডাকাতদল ৯০টি জাহাজ ছিনতাই ও লুঠ করেছিল; তাতে কী না ছিল! গম থেকে শুরু করে রসায়ন সামগ্রী।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলি সহজেই অপহরণ করতে পারে সমুদ্র-পথ সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের, যাদের স্যাটেলাইট ফোন ব্যবহারের দক্ষতা আছে, অভিজ্ঞতা আছে বন্দর ও পণ্যবাহী জাহাজের মধ্যে যোগাযোগ করার বিস্তৃত নিয়ম ও কৃত্যের।
গুজরাট, মহারাষ্ট্রের উপকূলভূমি, তামিলনাড়ু, পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন এবং আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ সামুদ্রিক সন্ত্রাসের নয়া গন্তব্য। আমাদের সচেতন হতে হবে।
ভারত মহাসাগরে সামুদ্র-নিরাপত্তা জোরদার কেন প্রয়োজন?
১. অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য
২. শক্তি নিরাপত্তার জন্য
৩. সাগর পরিবেশ রক্ষার্থে
৪. বন্দর সুরক্ষার জন্য
৫. নৌ-যাত্রা এবং সমুদ্র পরিবহণ নিরাপদ করতে
৬. মৎস্যজীবীদের নিরাপত্তা দিতে
৭. অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে
৮. জলদূষণ রোধ করতে।











No comments:
Post a Comment