রংঙ্গোলী,রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের রং খেলা - Breaking Bangla

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Tuesday, 27 February 2018

রংঙ্গোলী,রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের রং খেলা



হিন্দু বাঙালিদের যা দোল,অবাঙালিদের তা হোলি বা হোরি খেলা। কৃষ্ণের সঙ্গে রাধাসহ অন্যান্য গোপিনীরা এই রং বা প্রেমের খেলা খেলেছিল যা পুরাণে লেখা আছে। এ জন্যই ঐ দিন বহু স্থানে মহোৎসব হয়,রাধা কৃষ্ণের নাম সংকৃত্তন হয়।

আমার ছোটকালে কখনো ঐ দিনটাকে দোল উৎসব বলতাম না। বলতাম রং খেলা। যখন একদম ছোট তখন বাঁশের পিচকারি নিয়ে পাড়ার ছোটরা রংজল সহ বেরিয়ে পড়তাম সামনের মূল রাস্তার ধারে। পথ চলতি মানুষের পিছন দিকে পিচকারি দিয়ে রং দেওয়ায় কি যে আনন্দ হোত তা বোঝানো যাবেনা। তখন তো বেশীর ভাগ জন শাদা ধুতি বা শাদাটে জামা পরতেন,রং ও খুলতো ভালো। কোন বালতিতে থাকতো লাল খুনখারাব রং,অন্য অন্য বালতিতে থাকতো হলুদ,সবুজ,বেগুনী রং। এক সময় সব বালতির রং জল মিলেমিশে কালো হয়ে যেতো,তখনই আমরা ছুটি নিতাম। রং ই নাই রংখেলা হয় নাকি?
তারপর একদিন বড় হয়ে গেলাম। মানে নাইন টেন বা আরো উঁচু ক্লাসের ছাত্র তখন। এ এক অন্য অনুভূতি অন্য আনন্দ। মিশে গেলাম বড়দের দলে। দোলের ছুটির আগেরদিন ক্লাসের বান্ধবীদের আবির দেওয়া দিয়ে যা শুরু। ওরা রং নিতে চেয়েও চায়না,আমাদের হাজার অনুরোধে রং নেওয়া যা মনকে রাঙানো হৃদয় জাগানো।
দোলের দিন একটু বেলা হলে পাড়ার দু,একজন উৎসাহীর হাতে ম্যাজেন্টার রং। কেউই রং খেলতে চায়না। ফলে জেদ বাড়ে দ্রুতগতিতে। একজনকে রং মাখাতে পারলেই দল ভারী হয়। আমি থাকতুম প্রথম দিকের সদস্য। এভাবে পাড়ার দিদি বৌদি ভাই দাদাকে রং মাখাতে মাখাতে দলের সদস্য সংখ্যা হয়ে যায় দশ কুড়ি তিরিশে। অজানা মানুষকে রং মাখানোর প্রশ্নই আসেনা।
ও পাড়ার নতুন বৌদি দরজা আটকে বসে আছে,হাজার অনুরোধেও নো খোলা। পরে নতুন দাদার আদেশে দরজা অবারিত হল,আমরা কিশোর ছাড়ানো দেওরেরা তখন,“রঙ বরষে ভিগে চুনরবালি,রঙ বরষেআবার সুতপাদিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। অরূপদার পেছন পেছন আমরা ছুটছি। পরে ঘর বাগান ঢুঁড়ে দাদাই আবিস্কার করলো ও লুকিয়েছে দুই খড়গাদার মাঝে। অরূপদা রং দিল আর আমি শুনলাম অনুচ্চারে,“ তোমারই রং তোমায় দিলাম,দিলাম তোমার অন্তরে
মেজদা রং নেবেনা,না নিতে চাওয়াদের রং দেওয়াতেই আনন্দ বেশী। কখনো তার পিছনে ছুটতে ছুটতে আবিস্কার হয় অজানা না দেখা পৃথিবী। মেজদা সদরঘরে দরজা আঁটিয়ে থম। অবশেষে দরজা খুললো এবং রং মাখাতে যাওয়া কানুকাকার মাথায় মারলো সজোরে হাতে থাকা ক্রিকেট ব্যাট। আমরা সবাই কানুকাকাকে নিয়ে ব্যাস্ত। না,তেমন কিছুই হয়নি। মেজদা কি তখন বোকা ছিল? এ ও ছিল পারস্পারিক জেদ। মাখাবো মাখবোনা। ঘটনাটা ঘটেছিল বলেই আজ স্মৃতি। আবার কোন বছর দল বেঁধে গেছি পাশের বারিক পাড়ায়। বাড়ির সবাইকে রং দিয়ে আসার পথে ওদের বাড়ির মেজছেলে যাকে রংই দিইনি ছুঁড়তে থাকলো ঢিল। আমরাও কম যাইনি,পাল্টা ঢিল। যেন ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ।
ছোটকাল থেকে অনেক বড়কাল অবধি রং খেলায় মেতেছি। এ ব্যাপারে সামান্যতম কার্পন্য করিনি। একবার মনেহলো রং খেলবো না। সকাল থেকে নো রং। সবাই অবাক,এ যেন বিড়ালের নিরামিষ ব্রত। দশটার দিকে বাবুদা এসে বললো,“ বাজার যাবি না?” বললাম, “রং দেবে তো,যাবোনা   বললো,“ ধুর চলতো   এক বুদ্ধি করা গেল। ও সাইকেলে চালাবে এবং আমি পেছনের ক্যারিয়ারে উল্টোদিকে মুখ করে বসবো। তাই ঠিক হল। রাস্তার বাচ্চারা মানুষের পিছন দিকেই রং দেয় কিন্তু এ তো দুই দিকই সামনের। তাছাড়া দৃশ্যটা এতোটাই অন্যরকম ছিল যে ওরা রং দিতেই ভুলে যাচ্ছিল। যথারীতি না রং এ বাজারে এলাম কিন্তু ফিরলাম ভূত হয়ে। বন্ধুরা চালাকি মানবে কেন?
রংখেলা আমার তখনকার জীবনের এক মহাপ্রাপ্তি। দলবেঁধে গ্রামের চারিদিকে পৃথিবী চেনার আনন্দ প্রাণভরে অনুধাবন করেছি। বেশ কয়েক বছর দোলের সময় বাড়িতে থাকিনি। কখনো কোলকাতা নয়তো তমলুকে থেকেছি। তমলুকের দোল বেশ অন্য রকম। সকাল থেকে সবাই রং এ মাতোয়ারা কিন্তু বিকেল বেলা সব শেষ। ধোপ দুরস্ত পোষাকে সবাই ঘুরে বেড়ায়। কোলকাতার অভিজাত এলাকাতেও তাই। দাদার কীর্তি সিনেমার দোল উৎসবের গান ও সিকোয়েন্স অনেক জায়গায় আছে। আমার জীবনে দোল কখনো ধর্মীয় আচার হিসাবে আসেনি,তাই বুঝি উৎসবটাকে রং খেলা হিসাবে চিনি। দোলের দিন এলো, বড়দের কেউ রং খেলুক না খেলুক বড়দি এবং তার বান্ধবী রূপুদি খেলবে,যেমন প্রতি বছর খেলে।
অনেকদিন পর এ বছর এই দিনে বাড়িতে থাকছি। পাঁচদিন ছুটি,নানা কারণে । বন্ধুসম দাদা ফোন করেছিল এ বছর যেন দোলে বাড়িতে থাকি,ঐ দিন সব খরচ তার। রইল পড়ে তমলুকে এক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ। আমি কিন্তু বাড়িতে।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad