কোড়া পাখির কথা:
কল্যাণ চক্রবর্তী।
ডাহুক গোষ্ঠীর পাখি; গোত্র রাল্লিডী (Rallidae) এবং জেনাস বা গণ -- Gallicrex, প্রজাতি -- cinerea; বাংলাদেশে ১০-১২ টি প্রজাতির দেখা মেলে বলে জানা যায়। এরা ছাইরঙা - ধূসর, বাদামী বা কলো; দেখতে মুরগির ছানার মতো বড়সড়, পুরুষ পাখি লম্বায় প্রায় ৪৫ সেমি আর স্ত্রী পাখি ৩৫ সেমি এবং ওজনে যথাক্রমে সাড়ে চারশো এবং তিনশো গ্রাম। এরা দক্ষিণ এশিয়ার জলজমা ধান বা পাট ক্ষেতে কিংবা বিল-বাওড়ে চরে বেড়ায় আর পোকামাকড়, ছোটো মাছ, আগাছার বীজ কিংবা কচি ঘাসের ডগা খায়। এদের সংখ্যা এখন বিপদগ্রস্তের দিকে চলেছে। মাংস আর ডিমের জন্য একসময় শিকার করা হত। পল্লীগ্রামে অনেক কিশোর-কিশোরী এই পাখি পুষতো। এদের ডাক বেশ মিষ্টি। অদ্বৈত মল্লবর্মণ 'পল্লী সঙ্গীতে পালাগান' প্রবন্ধে কোড়া পাখি শিকারের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। পূর্ববঙ্গ গীতিকার 'বিনোদের পালা'-তেও কোড়া শিকারের কথা পাওয়া যায়।
অদ্বৈত লিখছেন, "বর্ষাকালে পল্লীর চারিধারে যখন জল বাড়িয়া উঠে তখন আধডুবো নালিতা ও ধান গাছের ফাঁকে ফাঁকে কোড়া পাখি ডাকিতে থাকে। নিরক্ষর পল্লীবাসীদের অনেকেরই এক পাখি পুষিবার দারুণ শখ আছে।... পল্লীতে যাহাদের কোড়া পুষিবার বাতিক আছে তাহারা 'কোড়া ঋতু'তে ধান নালিতা জমির অন্তরালে কোড়ার ডাক শুনিলে 'শিকারের' জন্য উন্মত্ত হইয়া উঠে। আহার নিদ্রা ভুলিয়া যায়, ভুলিয়া যায় জীবনের মমতা।... পোষ মানা কোড়ার সাহায্যেই 'জঙ্গলে' কোড়া শিকার করিতে হয়।...আষাঢ় শ্রাবণ মাসে যখন ধান নালিতা গাছগুলো প্রায় ডুবো ডুবো হইয়া যায় তখনই কোড়া ধরিবার উপযুক্ত সময়। এই সময়ে শৈবাল ইত্যাদি জায়গায় জায়গায় জড়ো করিয়া উহার উপর কোড়ারা ডিম পাড়ে, তখন দিনে কিংবা রাত্রিতে বিল অথবা ডুবো জমির উপর দিয়া নৌকা বাহিয়া যাইবার কালে কোড়ার ডাক শুনা যায়। কোড়া শিকারীরা এই সময় বৃহদাকারের এক প্রকার পিঞ্জরাতে পোষমানা কোড়াকে লইয়া ডুবো জমিতে যায়। ইহারা ধান গাছের ফাঁকে জল-শেওলার উপর কোড়া শুদ্ধ পিঞ্জরাটি স্থাপন করিয়া অতি সন্তর্পণে আধ-ডুবো ক্ষেতের আলের উপর গভীর অন্ধকারে শুইয়া থাকে। পোষমানা কোড়ার ডাকে আকৃষ্ট হইয়া জঙ্গলে কোড়া উহার নিকটে আসে এবং দুই বীরের মধ্যে তখন রীতিমত যুদ্ধ বাধিয়া যায়। শেখানো পোষমানা কোড়াটি তখন বন্যটিকে সবলে আকৃষ্ট করিয়া পিঞ্জরার ভিতর পুরিয়া দেয়।"


No comments:
Post a Comment