পবিত্রমোহন বিশ্বাস: আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে নক্ষত্র পতন হল।চলে গেলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ তথা বাম নেতা ড.অশোক মিত্র। প্রয়াত এই মানুষটিকে শুধু মাত্র 'অর্থনীতিবিদ' এই পরিচয়ে আটকে রাখলে চলবে না। তিনি ছিলেন চিন্তাবিদ। তাঁর সম্পর্কে আরও বাঘা বাঘা বিশেষণ ও বিশ্লেষণ করা যায়। অথবা কোন বিশেষণে হয়ত তাঁকে বাঁধা যায় না। কিন্তু, সেই যোগ্যতা এই অধম পত্রলেখকের নেই। নেহাতই বাংলা সাহিত্য নিয়ে একটু পড়াশোনা করেছি। তাই অর্থনীতির এই মানুষটিকে ধরার যোগ্যতা আমার নেই।
অশোক মিত্র জন্মেছিলেন ১৯২৮ সালের ১০ই এপ্রিল এখনকার বাংলাদেশের ঢাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।তার পর দেশ ভাগের পর এই দেশে চলে আসেন। পরবর্তী সময়ে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর হন। অর্থনীতিতে ডক্টরেট করেন নেদারল্যান্ডসের রটারড্যাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
ভারত সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন ১৯৭০ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত। ইচ্ছা করলেই আরও অনেক বড় পদে যোগদান করতে পারতেন। কিন্তু, তাঁর তেমন ইচ্ছা ছিল না।তাই হেলায় কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি ছাড়তে পেরেছিলেন।কোন লোভ তাঁকে গ্রাস করতে পারেনি।
১৯৭৭ সালের ২১ জুন পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্টের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। অনেকেই যাকে জ্যোতিবসুর সরকার বলে। সেই সরকারের প্রথম অর্থমন্ত্রী ছিলেন ড.অশোক মিত্র।১৯৭৭ থেকে ৮৭ সাল পর্যন্ত তিনি আমাদের রাজ্যের অর্থমন্ত্রী ছিলেন।পরে জ্যোতি বসুর সঙ্গে মতানৈক্যের কারণে সব ছেড়েছিলেন। এই রাজ্যের অর্থনীতির হাল ফেরাতে তাঁর অবদান অপরিসীম । অর্থনীতির পন্ডিত বলতে যা বোঝায় প্রয়াত মিত্র ছিলেন তাই।
অশোক মিত্র ছিলেন যথার্থ বুদ্ধিজীবী। তাঁর শিক্ষা তাঁকে ভাল মন্দের তফাৎ করতে শিখিয়েছিলো।বাম নেতা হয়েও নন্দীগ্রাম কান্ডের সময় মুখ খুলেছিলেন। বলেছিলেন এখন মুখ না খুললে বিবেকের কাছে অপরাধী হয়ে যাব। এই হলেন অশোক মিত্র।
দীর্ঘ দিন ধরেই তিনি অসুস্থ ছিলেন। লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন।তবু মাঝে মাঝেই তাঁকে নানা বিষয়ে মুখ খুলতে দেখা গেছে।কখনও বা তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্য রাখতেন।
তিনি তাঁর এই দীর্ঘ জীবনে লেখালেখির কাজ কম করেননি। নানান বিষয় নিয়ে তাঁর লেখালেখি গ্রন্হকারে ধরা আছে।
অনেকেই হয়ত জানেন না 'আপিলা চাপিলা'-র লেখক সাহিত্য চর্চা করতেন। তিনি একজন সাহিত্যিকও ছিলেন।সাহিত্যে তাঁর অবদান রয়েছে এই জন্য তিনি সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন।
এই রাজ্যে বামেরা যখন ঘোর সঙ্কটের মুখে পড়ে রয়েছে,তখনও তিনি লড়াই চালিয়ে গেছেন। তাঁর লড়াই ছিল ভিতরে এবং বাইরে। অবশেষে পরাজিত হলেন জীবন-যুদ্ধে।টানা নয় দশকের মননশীল জীবনে ছেদ পড়ল।
সকলকে শোকে ভাসিয়ে চলে গেলেন অশোক।ড.অশোক মিত্র।

No comments:
Post a Comment