ডায়াবেটিস একটি বিপাকজনিত রোগ। আমাদের শরীরে ইনস্যুলিন নামের হরমোনের সম্পূর্ণ বা আপেক্ষিক ঘাটতির কারণে বিপাকজনিত গোলযোগ সৃষ্টি হয়ে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং এক সময় তা প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে আসে। এই সামগ্রিক অবস্থাকে ডায়াবেটিস বলে। এই রোগে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ দীর্ঘস্থায়ীভাবে বেড়ে যায়। সুস্থ লোকের রক্তে প্লাজমায় গ্লুকোজের পরিমাণ অভুক্ত অবস্থায় ৫.৬ মিলি মোলের কম এবং খাবার দুই ঘণ্টা পরে ৭.৮ মিলি মোলের কম থাকে। অভুক্ত অবস্থায় রক্তের প্লাজমায় গ্লুকোজের পরিমাণ ৭.১ মিলি মোলের বেশি হলে অথবা ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ খাওয়ার দুই ঘণ্টা পরে রক্তের প্লাজমায় গ্লুকোজের পরিমাণ ১১.১ মিলি মোলের বেশি হলে ডায়াবেটিস হয়েছে বলে গণ্য করা হয়।
ডায়াবেটিসের লক্ষণসমূহ
ক. ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া
খ. খুব বেশি পিপাসা লাগা
গ. বেশি ক্ষুধা পাওয়া
ঘ. যথেষ্ট খাওয়া সত্ত্বেও ওজন কমে যাওয়া
ঙ. ক্লান্তি ও দুর্বলতা বোধ করা
চ. ক্ষত শুকাতে বিলম্ব হওয়া
ছ. খোস-পাঁচড়া, ফোঁড়া প্রভৃতি চর্মরোগ দেখা দেওয়া
জ. চোখে কম দেখা।
ডায়াবেটিসের প্রকারভেদ ও তাদের পার্থক্যসমূহ
টাইপ-১, ২. টাইপ-২, ৩. গর্ভকালীন ডায়াবেটিস। ৪. অন্যান্য নির্দিষ্ট কারণভিত্তিক শ্রেণী।
টাইপ-১
এই ধরনের রোগীদের শরীরে ইনসুলিন একেবারেই তৈরি হয় না। সাধারণত ৩০ বছরের কম বয়সে এ ধরনের ডায়াবেটিস দেখা যায়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য এসব রোগীকে ইনসুলিন ইনজেকশন নিতেই হয়। অন্যথায় রক্তের শর্করা অতি দ্রুত বেড়ে গিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই রক্তে অম্লজাতীয় বিষক্রিয়ায় অজ্ঞান হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হয়।
টাইপ-২
এই শ্রেণীর রোগীর বয়স অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ত্রিশ বছরের ওপরে হয়ে থাকে। আজকাল ত্রিশ বছরের নিচেও এ ধরনের রোগীর সংখ্যা দেখা দিচ্ছে ও দিনে দিনে বেড়ে চলছে। এদের শরীরে ইনসুলিন তৈরি হয়। তবে, প্রয়োজনে ইনসুলিন ইনজেকশন না দিলে টাইপ-১ রোগীর মতো এদের বিষক্রিয়া হয় না। অর্থাৎ এরা ইনসুলিন নির্ভরশীল নয়। অনেক ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ও নিয়মিত ব্যায়ামের সাহায্যে এদের চিকিৎসা করা সম্ভব।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস
অনেক সময় গর্ভবতী অবস্থায় প্রসূতিদের ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। আবার প্রসবের পর ডায়াবেটিস থাকে না। এই প্রকার জটিলতাকেই গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বলা হয়। গর্ভবতী মহিলাদের ডায়াবেটিস হলে গর্ভবতী মা ও গর্ভবতী শিশু উভয়ের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। বিপদ এড়ানোর জন্য গর্ভকালীন অবস্থায় ইনসুলিনের মাধ্যমে বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা আবশ্যক।
অন্যান্য নির্দিষ্ট কারণভিত্তিক শ্রেণী
ক. জেনেটিক কারণে ইনসুলিন তৈরি কম হওয়া।
খ. জেনেটিক কারণে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়া।
গ. অগ্ন্যাশয়ের বিভিন্ন রোগ।
ঘ. অন্যান্য হরমোন আধিক্য
ঙ. ওষুধ ও রাসায়নিক দ্রব্যের সংস্পর্শ।
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার কারণসমূহ
যে কেউ যে কোনো বয়সে যেকোনো সময় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে নিম্নোক্ত শ্রেণীর ব্যক্তিদের মধ্যে ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে:
ক. যাদের বংশে বিশেষ করে বাবা-মা বা রক্ত সম্পর্কিত নিকটাত্মীয়ের ডায়াবেটিস আছে।
খ. যাদের ওজন অনেক বেশি ও যারা ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রমের কোনো কাজ করেন না।
গ. যারা বহুদিন ধরে কর্টিসোল জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করেন।
ঘ. যেসব মহিলার গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস ছিল আবার যেসব মহিলা ৯ পাউন্ডের বেশি ওজনের বাচ্চা প্রসব করেছেন।
ঙ. যাদের রক্তচাপ আছে এবং রক্তে কোলেস্টেরল বেশি থাকে।
মাতৃত্বকালীন ডায়াবেটিস কী?
অনেক সময় গর্ভধারণ করার পর ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। এবং প্রসবের পর রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ স্বাভাবিক হয়ে যায়। তাকে মাতৃত্বকালীন ডায়াবেটিস বলে। গর্ভবতী অবস্থায় মায়ের শরীরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিমাণে ইনসুলিন প্রয়োজন হয়, রক্তের গ্লুকোজের পরিমাণ স্বাভাবিক রাখার জন্য। যদি এই ইনসুলিন তৈরিতে শরীর অক্ষম হয় তাহলে ওই গর্ভবতী মায়ের গর্ভাবস্থায় রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায়, অর্থাৎ মাতৃত্বকালীন ডায়াবেটিস হয়। মাতৃত্বকালীন ডায়াবেটিসের জন্য প্লাসেন্টাল হরমোনও দায়ী।

No comments:
Post a Comment