কালো বৌ পেয়ে রাহাতের অবস্থা খুবই খারাপ। এমনিতেই সে কালো মেয়ে পছন্দ করে না, তাদের বিয়ে করা তো দূরের কথা। বন্ধু বান্ধবরা তাদের সুন্দরী বৌ নিয়ে যখন বিভিন্ন প্রোগ্রামে যায় রাহাত তখন বিভিন্ন উছিলায় সেই প্রোগ্রামে যায় না। মাঝে মধ্যে গেলেও একা একা যায়, স্ত্রী সুমীকে নেয় না। আরে এই যুগ হল গ্লামারের যুগ, কালো চামড়া হলে চলে। বাবা আসলেই পাগল হয়েছেন। সুমী পেশায় ব্যাংকার, চল্লিশ হাজার টাকার মত বেতন পায়। বাবার সম্পত্তি ভালই আছে, পরিবারেরও একটা সুনাম আছে, সে কারণে রাহাতের বাবা অনেকটা জোর করেই রাহাতকে সুমীর সাথে বিয়ে দিয়েছেন। রাহাতও ভাল বেতনে চাকরি করে। সে একটা ডেনিশ বায়ারের লিয়াজো অফিসের মার্চেন্ডাইজিং ম্যানেজার। লাখের উপরে বেতন পায়।
ছাত্র জীবনে কেয়ার কাছ থেকে ছ্যাঁকা খাওয়ার পরে সে তার পড়ালেখা ও ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এরপরে অনেক দিন কোন মেয়ের দিকে তাকায়নি। কেয়া দেখতে অনেক সুন্দরী ছিল। তখন থেকেই রাহাত শপথ নেয় জীবনে কোন দিন বিয়ে করলে কেয়ার চাইতে সুন্দরী মেয়ে বিয়ে করবে। কেয়াকে দেখিয়ে দিবে, তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছ তো কী হয়েছে, তোমার চাইতে সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করেছি। এরপরে সে জীবনের অনেক চড়াই উৎরাই পার করে ভাল পজিশনে চাকরি করে। রাহাত তার বাবার কথা ফেলতে পারল না তিনটা কারণে। এক নম্বর কারণ হল রাহাতের জন্য প্রায় তিন বছর ধরে পাত্রী খোঁজা হচ্ছে। রাহাতের পছন্দ মত সুন্দরী পাত্রীই খোঁজা হচ্ছিল। কিন্তু রাহাতের একটাকেও সুবিধা জনক মনে হল না। তাদের চাউনি দেখেই রাহাতের মনে হত এই মেয়ে দুই তিন জনের সাথে লিটনের ফ্ল্যাটে গিয়েছে! এই মেয়েকে বিয়ে করা যাবে না। রাহাতের অফিসেও সুন্দরী মেয়ে চাকরি করে। রাহাতে তাদের ভাল করে অবজার্ভ করে। পুরুষ কলিগরা তাদের সাথে সারাদিন হাসাহাসি করে। বিভিন্ন উছিলায় যেমন কলম, কাগজ, ফাইল ইত্যাদি একজনের কাছ থেকে আরেকজন নিলে হাতে শরীরে ছোঁয়া লাগায়। তাদেরকে রেস্টুরেন্টে খেতে নিয়ে যায়। রাহাতের তখন মেজাজ গরম হয়। তুমি শালী একজনের বৌ, আরেক পুরুষের সাথে রেস্টুরেন্টে খেতে যাও কেন? অবশ্য সুরঞ্জনা নামের মেয়েটাকে কেউ রেস্টুরেন্টে খেতে অফার করে না, কারণ ওর গায়ের রঙ শ্যামলা বর্ণের। তখন থেকে মনে হল সুন্দরী চাকরিজীবি মেয়েরা ‘সবার বৌ’। দুই নম্বর কারণ হল বাবার বয়স বেড়েছে। বাইপাস সার্জারী করা হয়েছিল সেই ২০০০ সালে, এখন বিছানায়। এই অবস্থায় বাবার কথা অমান্য করার চিন্তা করছে না। তিন নম্বর কারণ মেয়েটা একটা প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরি করে। বর্তমানে চাকরির যে বাজার তাতে ভাল বেতনের চাকরিজীবি বৌ সংসারে ভাল সাপোর্ট করতে পারবে।
বিয়ের পরে এই প্রথম তারা ঈদ পেল। ঈদের আর মাত্র দুই দিন বাকী। বেতন বোনাস মিলিয়ে সে এবার ভাল টাকাই পেয়েছে। বৌকে তো কিছু কিনে দিতে হবে। এখানেই রাহাতের আপত্তি। সুন্দরী ফর্সা বৌ হলে কত সুন্দর সুন্দর পোষাক কিনে দেয়া যেত। ফর্সা মেয়েদের যেকোন পোষাকে ভাল লাগে। কালো মেয়ের জন্য মার্কেটে পোষাক নেই। তবুও মন থেকে না চেয়ে জোর করে জিজ্ঞেস করল “তুমি ঈদে কী নিতে চাচ্ছ?”
সুমী পালটা প্রশ্ন করল “তোমার বাজেট কত?”
সুমীর কথা শুনে রাহাতের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। লাট সাহেবের মেয়ে এতদিন বাপের হোটেলে ছিল। বাপ যেহেতু ধনী তাই সেখানে নিশ্চয়ই দামী পোষাক পেত। এখন বিয়ে করে রাহাতের কাছে দামী পোষাক আশা করছে। রাহাত উত্তর দিল “পনের থেকে বিশ হাজার টাকা”
সুমী আগ্রহের সাথে বলল “সাথে আরো কিছু যোগ করতে পারবা? এই ধর দশ/বারো”
রাহাতের মেজাজ আরো গরম হল কিন্তু প্রকাশ করল না। এই অভ্যাসটা সে মার্চেন্ডাইজিং করতে করতে শিখেছে। সেখানে অনেক কঠিন পরিস্থিতির শিকার হতে হয়। তবে সব সময় মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়। নইলে বড় ভুলের শিকার হতে হয়। রাহাত বিড় বিড় করে বলল “পারব, তবে একটু কষ্ট হবে”
সুমী খুশীতে রাহাতের গালে চুমু খেয়ে বলল “এইতো লক্ষীটি, তোমার বাজেটের সাথে আমিও পনের হাআজ্র টাকা যোগ করে ঈদের খুশীতে অংশ গ্রহ্ন করব।”
রাহাতের মনে হল “ধনীর মেয়ে বিয়ে করে তো অনেক লস হল। এতদিন শুনেছি কালো মেয়েদের চাহিদা কম থাকে। এই মেয়ের তো অনেক চাহিদা। রাহাতের পঁচিশ হাজারের সাথে সে পনের যোগ করবে মানে চল্লিশ হাজার টাকার ঈদ শপিং সুমী একাই করবে! এটাতো কোটি পতির বৌরা করে। রাহাত তো ঢাকা শহরে ভাড়া থাকে, ফ্ল্যাটের মালিক হলেও না হয় একটা কথা ছিল।
শপিং এর দিনে তারা সিএনজি করে মোহাম্মদপুরের একটা এলাকায় গেল। রাহাত সিএনজি ভাড়া করতে চেয়েছিল কিন্তু সুমী বলেছে রিকশায় চড়বে। রাহাতের হাত ধরে সে মোহাম্মদপুরের পথে যখন যাচ্ছিল তখন রাহাত জিজ্ঞেস করল “মোহাম্মদপুরে যেখানে যাচ্ছ সেখানে আমার জানামতে কোন মার্কেট নেই। কোথায় যাচ্ছ?”
সুমী উত্তর না দিয়ে রহস্যময় হাসি দেয়। রাহাত কিছু বলল না। তারা একটা পুরান আমলের বাড়ীর সামনে নামল। গেইটের দারোয়ান সুমীকে দেখেই বলল “অনেকদিন পরে আসলেন আপা। বাচ্চারা সারাদিন আপনার কথা জিজ্ঞেস করে।”
তারা ভেতরে ঢুকল। রাহাত অবাক হয়ে দেখল এটা একটা এতিম খানা। পনের বিশটা বাচ্চা এখানে আছে। শপিং এর দিনে এতিম খানায় আসার কী দরকার ছিল। আরেকদিন আসলেই পারত। শুধু শুধু সময় নষ্ট। সুমীকে দেখে বাচ্চারা ‘আন্টি এসেছেন আন্টি এসেছেন’ বলে ছুটে আসল। রাহাত এতক্ষণে বুঝল এই বাচ্চাগুলি সুমীকে অনেক পছন্দ করে। দুই একটা বাচ্চা রাহাতের হাত ধরে বলল “আসেন আংকেল, আজ আপনি আমাদের সাথে ইফতার করবেন।” পরিবেশটা রাহাতের খুব ভাল লাগল। মনে হচ্ছে স্বর্গীয় পরিবেশ বলতে কিছু থাকলে এটাকেই বলে। মুহুর্তে সে সব কিছু ভুলে গেল। মনে হতে লাগল সুমী কোন সাধারণ মেয়ে নয়। সুমী রাহাতকে এক কোনে নিয়ে বলল “তুমি আমার জন্য যে ঈদের শপিং এর বাজেট করেছ তার পুরোটাই এখানে দিয়ে দাও। আমিও আমার বেতন বোনাস থেকে পনের হাজার টাক দিচ্ছি। এখানে আঠারোটা বাচ্চা আছে। একেক জনের পিছনে মাসে পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়। তুমি আমি মিলে যদি এই মাসের অর্ধেক খরচও দিতে পারি তাহলে অনেক ভাল লাগবে। রাহাত প্রশ্ন করল “তুমি কাপড় কিনবে না?”
সুমী উত্তর দিল “আমার জামা কাপড়ের তুমি কিছুই দেখনি। এখানে এক আলমারীতে শুধু আমারই জামা। আর বাপের বাড়ীতে এরকম দুইটা আলমারী ভর্তি জামা আছে। এর মধ্যে চারটা জামা আছে যা এখনো পরিনি। এই ঈদে মামা, খালা সহ সবাই যে গিফট করেছেন তাতেই আমার বছর খানেক চলে যাবে। বাবারটা না হয় বাদই দিলাম। অথচ এই বাচ্চাগুলোর মামা, খালা, বাবা কেউ নেই। ওরা কিছু পেলে আমি খুশী। তুমি কি রাজী?”
সুমী এমন একটা প্রশ্ন করেছে যার উত্তর নেগেটিভ দেয়ার প্রশ্নই আসে না। রাহাত নিজের জন্য শার্ট প্যান্টের বাজেটের টাকাটাও সুমী বাজেটের সাথে যোগ করে দিল।।
বাসায় ফিরতে ফিরতে রাহাতের মনে পড়ে গেল পুরানো সৃতি। কেয়াকে এই গিফট দেয়া নিয়েই ব্রেকাপ হয়েছিল। মাঝখানে থেকে ওদের ক্লাসের আরেক ছেলের সাথে কেয়ার রিলেশান হয়ে যায়। ঐ ছেলে বড় লোকের ছেলে ছিল বলে কেয়াকে ভাল ভাল জিনিস গিফট করত। আজ বুঝতে পারল সুমীর এই কালো চামড়ার ভেতরে অসাধারণ সুন্দর একটি হৃদয় আছে। রাহাতকে আজ গর্বিত মনে হচ্ছে।
সূত্র: লালসালুর ব্লগ

No comments:
Post a Comment