মে দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য - Breaking Bangla

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Tuesday, 1 May 2018

মে দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য



তারাপদ আচার্য্য: মে দিবস আমাদের জাতীয় জীবনে এবং আন্তর্জাতিকভাবে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ত্যাগের ও মহিমাময় দিন। এ দিনটি সবাই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। পৃথিবীর মেহনতি মানুষের জন্য আজকের দিনটি খুবই তাৎপর্যময় ও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ দিনটির মাধ্যমে তারা তাদের কাজের প্রকৃত স্বীকৃতি পেয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এ দিনটি উজ্জ্বল হয়ে আছে। এ দিনটির ত্যাগ মহিমা ও তাৎপর্য সবচেয়ে বেশি, বিশেষ করে পৃথিবীর শ্রমিকশ্রেণির কাছে। তাই এ দিনটি শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষার দিন। তাদের ন্যায্য পাওনা আদায় তথা অধিকার আদায়ের দিন। শ্রমিকদের অস্তিত্ব ঘোষণার দিন।
এ দিনটিকে পাওয়ার জন্য মানুষ নিজের জীবন রক্ষার জন্য, ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিবাদ-সংগ্রাম করেছে মালিকদের বিরুদ্ধে। যুগে যুগে দেশে দেশে সমাজে খেটে খাওয়া শ্রমিকশ্রেণি ও মেহনতি মানুষ দেশ-জাতির উন্নয়নে যথেষ্ট অবদান রেখেছে, তাদের জীবন চলে গেছে। কিন্তু কোনো প্রতিকার হয়নি। যে কোনো দেশের উৎপাদন অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে শ্রমিকরাই বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। আবার তারাই সবচেয়ে বেশি শোষিত-বঞ্চিত হয়েছে। নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। বহু জায়গায় তাদের প্রাণ চলে গেছে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে গিয়ে।



বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যুগে যুগে সবচেয়ে নির্যাতিত-নিপীড়িত হয়েছে এসব অসহায় গরিব শ্রমিকশ্রেণি। নির্যাতিত, লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত শ্রমজীবী মানুষ তাদের অধিকার রক্ষা ও দাবি আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেছে বছরের পর বছর। তারা সংগ্রাম করে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে নিজেদের দাবি আদায় করেছে। যে কোনো পেশাজীবী মানুষের ন্যায়সঙ্গত দাবি আদায়ে কোনো রক্তপাত যে বৃথা যায় না, ইতিহাসে তার অনেক প্রমাণ রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় প্রমাণ এই মহান মে দিবস। এরই ধারাবাহিকতায় শ্রমিক শ্রেণি আশার আলো খুঁজে পেয়েছে। তারা নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে।
এই মহান মে দিবস হচ্ছে পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষের বিজয় নিশান। এই কারণে মে দিবস বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমিকশ্রেণির মানুষ আত্মত্যাগের এক বিরাট ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তাদের সুমহান আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে স্বীকৃতি পেয়েছে শ্রমের মর্যাদা। শ্রমজীবী মানুষের কাছে 'সিলভিস' একটি কিংবদন্তি নাম। সিলভিস ছিলেন লোহা ঢালাই শ্রমিকদের তরুণ নেতা। তার নেতৃত্বে ন্যাশনাল লেবার ইউনিয়ন সর্বপ্রথম আমেরিকায় দৈনিক আট ঘণ্টা শ্রমের দাবি করে। মিল মালিকরা তাদের দাবি অগ্রাহ্য করলে মালিকদের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘাত বাঁধে। অনেক শ্রমিক নিহত হলে মিল মালিকরা তাদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হন। আর সে থেকেই পৃথিবীর দেশে দেশে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়ে আসছে।
শ্রমের মর্যাদা রক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করে রক্ত দিয়েছে পৃথিবীর লাখ লাখ মানুষ। তাই দিনটি শ্রমিকশ্রেণির মানুষের মহান দিন। নিজেদের জীবন দিয়ে তারা তাদের দাবি আদায় করেছে। তবুও প্রভুদের কাছে শোষকদের কাছে তারা মাথানত করেনি। মানুষের দাবি বা অধিকার ক্ষুণ্ন হয়, তখন মানুষ প্রতিবাদে-বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং রক্ত দিয়ে সে দাবি প্রতিষ্ঠিত করে। বিশ্বে এর অনেক নজির রয়েছে। তবে মহান মে দিবস তার অন্যতম। শ্রমিক আন্দোলনের প্রধান বিষয় ছিল শ্রমঘণ্টা নির্ধারণ। অর্থাৎ শ্রমিকরা তাদের মজুরির বিনিময়ে দৈনিক কতো ঘণ্টা শ্রম দেবে, তা নির্ধারণ ছিল না। শ্রমিকরা দৈনিক যত পরিশ্রম করত, মজুরি দেয়া হতো তার চেয়ে কম। তাই শ্রম নির্ধারণ ও শ্রমের বিনিময়ে যথার্থ মজুরির দাবিই ছিল শ্রমিক আন্দোলনের প্রধান বিষয়। ইতোমধ্যে মে দিবস পেরিয়েছে ১২৬ বছর। এত বছর পরও শ্রমিকরা নানা সমস্যায় জর্জরিত। আজো সমাজে তাদের অধিকার পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এখনো দেশে দেশে শ্রমিক শোষণ চলছে। তাদের দেখা হয় অবহেলার চোখে।
আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের বেতন বকেয়া রেখে উৎপাদন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে চায়। এ নিয়ে মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় দ্বন্দ্ব দেখা যায়। তাছাড়া আমাদের দেশে শ্রমিকদের একটি বড় অংশ নারী ও শিশু। এসব নারী ও শিশু বিভিন্ন কল-কারখানা, বিশেষ করে গার্মেন্টশিল্পে তারা বেশি কাজ করে থাকে। অথচ আমাদের সংবিধানে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ। তথাপি বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে কাজ করেও তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকেই আবার জীবন ঝুঁকির মধ্যেও পড়ে যাচ্ছে। মারাও যাচ্ছে অনেক শ্রমিক।
বাংলাদেশের শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার কারণে তারা শারীরিক-মানসিকভাবে বেড়ে উঠতে পারছে না। শিক্ষাসহ বিভিন্ন সামাজিক সুযোগ-সুবিধা থেকে তারা হচ্ছে বঞ্চিত। এসব শিশু স্নেহ-ভালোবাসার অভাবে এক সময় অপরাধ জগতে পা বাড়ায়। তাছাড়া প্রায় প্রতি বছর গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোয় বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এসব দুর্ঘটনায় অনেক নারী-পুরুষ-শিশু মারা যায়। দুর্ঘটনায় যেসব শ্রমিক মারা যায়, তাদের পরিবারের রুটি-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে যায়। তারা চোখেমুখে অন্ধকার দেখে।
আসলে আমরা শ্রম বা শ্রমিকের মর্যাদা বুঝেও বুঝতে চাই না। একজন মানুষের জীবনধারণের জন্য যা যা প্রয়োজন, অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা_ এসবই একজন শ্রমিকের প্রাপ্য। আর এটাই হচ্ছে শ্রমিকের প্রকৃত মর্যাদা। একুশ শতকে এসে শ্রমিকরা এর কতটুকু মর্যাদা বা অধিকার ভোগ করছে? বর্তমান রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থ নিয়ে অবশ্যই ভাবতে হবে। কারণ শ্রমিকরা এ দেশের সম্পদ। তাদের কারণেই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রয়েছে। এ কারণে তাদের অবহেলার চোখে দেখা ঠিক নয়। পাশাপাশি তাদের কাজের ও জীবনের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। মহান মে দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুধাবন করতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad