“মেসি ভগবান”, নীল-সাদায় বাড়ি রাঙিয়েছেন ইছাপুরের শিবু - Breaking Bangla

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Thursday, 7 June 2018

“মেসি ভগবান”, নীল-সাদায় বাড়ি রাঙিয়েছেন ইছাপুরের শিবু






ব্যারাকপুর, ৭ জুন : ভয়ে ম্যাচটা দেখেননি শিবশংকর। দোকানে ছিলেন। প্রথম মিনিটেই ইকুয়েডর গোল করে এগিয়ে যায়। পাড়ার ব্রাজ়িল সমর্থকরা তখন বলতে শুরু করেছে, “কী শিবু দা, এবার তো হয়ে গেল ? তোমার দল তো আর বিশ্বকাপে যেতে পারবে না মনে হচ্ছে।” কেঁদে ফেলেছিলেন। পরে নিজেকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, “দেখ, আমার মেসি আছে। ও ঠিক কিছু না কিছু করবে।” ম্যাচ শেষে মেয়ে দোকানে ছুটে আসে। বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “আমরা পেরেছি। মেসি হ্যাটট্রিক করেছে। বিশ্বকাপে খেলব আমরাও।” ফের কেঁদেছিলেন শিবশংকর। এবার আনন্দাশ্রু। চা দিতে দিতে সবাইকে বলেছিলেন, “বলেছিলাম না আমার দলে ভগবান আছে। ঠিক পারব।”

শিবশংকর পাত্র। বাড়ি ইছাপুরের নবাবগঞ্জ। পাড়ায় শিবু দা নামেই পরিচিত। ফুটবল খেলতে ভালোবাসেন। এখনও পাড়ার মাঠে খেলা হলে জার্সি চড়িয়ে নেমে পড়েন। অন্ধ ভক্ত আর্জেন্টিনার। মারাদোনা, মেসি বলতে অজ্ঞান। বিশ্বকাপ হলে তো কথাই নেই। অন্য ম্যাচ হলেও দেখতে বসে যান। দোকান তখন বন্ধই থাকে। আগে থেকেই পাড়ার ঠেকে বলে দেন, “আজ দোকান খুলব না। ম্যাচ আছে দলের। খেলা দেখব। তোরাও চলে আসিস।”


এবার বিশ্বকাপের আসর বসছে রাশিয়ায়। মাঠে গিয়ে আর্জেন্টিনার খেলা দেখার ইচ্ছে ছিল শিবুর। কিন্তু, অত টাকা কোথায় ? যেতে পারেননি। তাই, অন্য পরিকল্পনা নেন। ভালোবাসার “আর্জেন্টিনা”-র পতাকার রঙে রাঙিয়ে তোলেন গোটা বাড়ি। আসবাব থেকে ঘড়ি সবই এখন নীল-সাদা। বাড়ি লাগোয়া দোকানঘরটাও তাই। নিজে আর্জেন্টিনার জার্সি চড়িয়ে দোকানে বসেন। আর চা খাওয়াতে খাওয়াতে বলেন, “গতবার একটুর জন্য বিশ্বকাপটা হাতছাড়া হয়েছে। এবার কিন্তু মেসি জান লড়িয়ে দেবে বলে দিচ্ছি।”

বিশ্বকাপ মানেই বাঙালির “গৃহযুদ্ধ”। মোহন-ইস্টের আবেগ কাজ করে সবসময়। বিশ্বযুদ্ধের আবেগ কম কিছু নয়। ব্রাজ়িল-আর্জেন্টিনা-জার্মানি-পর্তুগাল-ফ্রান্স নিয়ে তর্ক চলে। ভাগ হয় বাঙালি। এ বলে আমায় দেখ তো ও বলে আমায়। পাড়ায় পাড়ায় পতাকা, ফেস্টুন, মেসি-রোনাল্ডো-নেইমারদের ছবিতে ভরে ওঠে। শিবুও কম কিছু নন। আদ্যন্ত আর্জেন্টিনা ফ্যান হওয়ায় পাড়ায় একটু ‘টিপ্পনি’ শুনতে হয়। শিবুর কথায়, “ওরা (ব্রাজ়িল সমর্থক) বলে তোমার মেসি কী করছে ? দেশের হয়েই খেলতে পারে না। আমার খুব খারাপ লাগে। ও একা কী করবে ? চেষ্টা তো করে। গতবারই তো বিশ্বকাপ ছুঁতে পারতাম আমরা। এবার জানি না কী হবে। তবে, মেসির উপর ভরসা আছে।”

ছোটোবেলার কাহিনি শোনান শিবু। বলেন, “১৯৮৬। তখন তো এত টিভির চল ছিল না। মারাদোনার খেলার কথা রেডিওতে শুনেছিলাম। সেই সাতজনকে ড্রিবল করে “শতাব্দীর” সেরা গোল দিয়ে আসা। তখন থেকেই মারাদোনার ফ্যান। আর্জেন্টিনারও। আর হয়ত বিশ্বকাপ পাইনি। কিন্তু, আর্জেন্টিনা মনের মাঝে গেঁথে গেছে। এখন মেসি এসেছে। ও তো আমার ভগবান। আশায় আছি, ওর হাত ধরেই হয়ত বিশ্বকাপ আসবে।”

রাশিয়ায় যেতে পারছেন না। তা বলে উৎসাহ কম নেই। শিবশংকর বলছেন, “অত খরচ চালানো সম্ভব নয়। তাই, যাব না। কিন্তু, টাকা জমিয়ে গোটা বাড়িটা রাঙিয়েছি নীল-সাদা রঙে। ২০ হাজার মতো খরচ হয়েছে। আর কিছু কাজ বাকি আছে। সেগুলোও করে ফেলব।” বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স নিয়েও আশাবাদী। বলেন, “মন বলছে এবার চ্যাম্পিয়ন হব। জানি না। একটা জিনিসই মনেপ্রাণে চাই, গতবারের মতো যেন তীরে এসে তরি না ডোবে।” স্বামীর ফুটবলপ্রেম নিয়ে উৎসাহী শিবশংকরের স্ত্রী স্বপ্নাও। বলেন, “বিয়ের পর থেকেই দেখছি ও খেলাপাগল। আর্জেন্টিনার অন্ধ ভক্ত। ওর সঙ্গে খেলা দেখতাম। আমিও ভক্ত হয়ে গেছি। চাই, মেসির হাতেই বিশ্বকাপ উঠুক।”

নবাবগঞ্জে ইতিমধ্যে আর্জেন্টিনা ফ্যানস ক্লাবও খুলে ফেলেছেন শিবশংকর। সদস্য সংখ্যা শতাধিক। আর্জেন্টিনা ম্যাচের দিন ফ্যানস ক্লাবের সদস্যরা ঠিক করেছে, জায়েন্ট স্ক্রিনে খেলা দেখাবে। তবে, ম্যাচের দিনগুলোয় বাড়ি থেকে বেরোতে রাজি নন শিবশংকর। অনেক দূরে থেকেও নীল-সাদায় বেষ্টিত থাকতে চান তিনি। আর চান, ভারত কোনওদিন বিশ্বকাপ খেলুক। এখন থেকেই বলে রাখছেন, “না খেয়ে না দেয়েও খেলা দেখতে যাব। তেরঙ্গা নিয়ে স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে থাকব।” আর যদি ম্যাচটা হয় আর্জেন্টিনা বনাম ভারত ? ছোটো জবাব, “দেশ আমার কাছে আগে। তখন হয়ত ভগবানকেও ভুলে যাব

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad