ব্রাজিল ফুটলের একটা প্রচলিত রীতি বলুন কিংবা ঐতিহ্য- যাই হোক, ডিফেন্ডারকে খুব একটা ভালো ফুটবলার হিসেবে গণ্য করা হয় না। পর্তুগিজ ভাষায়, পেরনা ডি পাও। যার খাঁটি বাংলা পায়ে বাঁশ বেঁধে হাঁটা। যেটা সাধারণত বাংলাদেশে সার্কাসে দেখা যায়।
ব্রাজিলে যেসব ফুটবলারের ড্রিবলিং করার ক্ষমতা নেই, মনে করা হয় তারাই ব্রাজিলের সবচেয়ে বাজে ফুটবলার। এবং তাদেরকেই দাঁড় করিয়ে দেয়া হয় ডিফেন্ডার হিসেবে। কারণ, গোলরক্ষকের সঙ্গে তাদের কাজ শুধু গোল রক্ষা করা। তাদের পায়ে তো আর ফুটবলের সৌন্দর্য প্রকাশ পাবে না!
‘জোগো বোনিতো’র দেশে আর যাই বলুন, কেউ অন্তত ডিফেন্ডার হতে চায় না। কেন হবে বলুন? যেখানে ফুটবল মানেই হলো নিত্য-নতুন কৌশলের পটভূমি, রেশমের মতো পায়ের কারুকাজ, অসাধারণ সব স্কিল, দুর্দান্ত গোল। সেখানে যারা খেলবে, তাদের পেছনে কেন কেউ পড়ে থাকবে? অগ্রগামী সৈনিক যারা হতে চায়, তারা কখনও দুর্গরক্ষার করা জন্য পেছনে পড়ে থাকতে চায় না! ব্রাজিল ফুটবলে অন্তত এই দর্শন নেই।
অথচ, আধুনিক ফুটবলে কিন্তু ডিফেন্ডাররাই হলেন একটি দলের ‘আলমা’। আলমা শব্দটি পর্তুগিজ। ইংরেজিতে প্রতিশব্দ সৌল। বাংলায় ‘আত্মা’। ব্রাজিলের বর্তমান কোচ তিতে, দেশটিতে আগের সেই ধারণা, প্রচলিত রীতি কিংবা সংস্কৃতি- পুরোপুরি বদলে দিয়েছেন। তার দলের আত্মাই হলো এখন ডিফেন্ডাররা। ৫৭ বছর বয়সী এই কোচের এখন মূল দর্শনই হলো শক্তিশালী ডিফেন্স।
যে মাঠে ফুল ফোটান নেইমার, যেখানে মাঝ মাঠে ফুলের পাপড়ি ছড়ানোর মতো গুচ্ছ গুচ্ছ পাস আর ড্রিবলিংয়ের সমাহার ঘটান কৌতিনহো, উইলিয়ানরা, সেখানে তিতের মূল দর্শনই শক্তিশালী ডিফেন্স। বিষয়টা কেমন একটু বেখাপ্পা বেখাপ্পা মনে হতে পারে। কিন্তু তিতে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই নিজের এই ফর্মুলায় বেশ সাফল্য পেয়ে আসছেন এবং ব্রাজিলকে দাঁড় করিয়ে ফেলেছেন শক্তিশালী একটি ভিতের ওপর। যারা, বিশ্বকাপে এখনও টিকে রয়েছে শক্তিশালী দল এবং অন্যতম ফেবারিট হিসেবে।
একটু পেছন ফেরা যাক। মাত্র চার বছর আগের কথা। বেলো হরাইজন্তের স্টাডিও মিনেইরোয় বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে বিধ্বস্ত হওয়ার পর পুরোপুরি অন্ধকারে চলে গিয়েছিল ব্রাজিল ফুটবল। সেই দলটিই চার বছর পর এখন বিশ্বকাপের মঞ্চে বিশ্বজয়ের দ্বারপ্রান্তে। মিনেইরোজ্জোর ভুত তাড়িয়ে নতুন করে ব্রাজিল ফুটবলের ব্র্যান্ডিং হলো, পূনর্গঠন হলো, ঐতিহ্য ফিরে এলো- কিভাবে সম্ভব?
তিতে কিন্তু কখনোই সেলেসাওদের হয়ে ফুটবল খেলেননি। ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী হলুদ জার্সি নিজের গায়ে জড়ানোর সৌভাগ্য হয়নি তার। এমনকি তার ম্যানেজারিয়াল বায়োডাটায় ইউরোপের কোনো ক্লাবকে কোচিং করানোর অভিজ্ঞতাও লেখা নেই। কিন্তু অতি কৌতুহলোদ্দিপক মানসিকতা থেকেই তিনি পুরো প্রক্রিয়াটা জানেন এবং সেই প্রক্রিয়ায় তিনি দলকে পরিচালনা করেন।

No comments:
Post a Comment