অর্ক রায়, মালদা: সরকারি স্কুল নাম মেঘপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়। খাতায় কলমে শিক্ষক রয়েছেন চারজন । রয়েছেন প্রধান শিক্ষক ও। সরকারি খাতায় এরা প্রায় প্রতিদিনই বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকলেও, বাস্তবে বিদ্যালয় দেখা যায় কোনদিন এক বা দু জন শিক্ষককে, আবার আজ যারা এলেন কাল তাড়া নেই। সরকারি নথিতে বিদ্যালয়ের ছাত্র সংখ্যা ১৬৪, কিন্তু বিদ্যালয়ে পৌঁছে কোনদিনই আপনি ৩০ বা ৪০ এর বেশি ছাত্রছাত্রীকে দেখতে পাবেন না। যদিও প্রায় প্রতিদিনই ১০০ জনেরও বেশি ছাত্র-ছাত্রী সরকারিভাবে এই স্কুল থেকে মিড ডে মিল খেয়ে যাচ্ছে। এটা কিভাবে সম্ভব? উত্তরে বিদ্যালয়ের শিক্ষকের বক্তব্য হিসাবপত্র ঠিক রাখতে, কোন ক্লাস টিচারকে নয় প্রধান শিক্ষক ই প্রতিটা ক্লাসের হাজিরা করেন। ফলে গড়বড় এর দায়ও তারিই। গ্রামবাসীদের অভিযোগ এভাবেই চলছে মালদার আদিনা চক্রের একটি সরকারি স্কুলের কাজকর্ম। বারবার অভিযোগ জানিয়েও কোন ফল হয়নি। ফলে আদিবাসী এবং গরীব মানুষ অধ্যুষিত এই এলাকার অভিভাবকরা আগ্রহ হারাচ্ছেন এই স্কুলে তাদের ছাত্রছাত্রীকে ভর্তি করার। দিনে দিনে ছাত্র-ছাত্রীরা অভাবে রুগ্ন হয়ে পড়ছে বিদ্যালয়।
এমনই এক গুরুতর অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের দপ্তরে জমা পড়ছিল। অবশেষে বৃহস্পতিবার দুপুর একটা নাগাদ আমরা হাজির হই এই বিদ্যালয়, কিছুদিন আগেই এই বিদ্যালয় গিয়ে দেখেছিলাম, ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা বাস্তবে ত্রিশ হলেও সরকারিভাবে মিড ডে মিল খেয়েছে এমন ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা দেখানো হয়েছে একশরও বেশি।
বৃহস্পতিবার দুপুর একটা নাগাদ বিদ্যালয় পৌছেই এক অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী হলাম আমরা। গ্রামবাসীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগের সত্যতাও পরল চোখে। বিদ্যালয় খাতায়-কলমে উপস্থিত রয়েছেন চারজন শিক্ষক ই। মানে হাজিরা খাতায় সই রয়েছে ৪ জন শিক্ষকের । কিন্তু দুপুর ১টা তেই হাওয়া বিদ্যালয় দুই সহ শিক্ষক শুভেন্দু রায় এবং ভৈরব দত্ত মন্ডল। প্রধান শিক্ষক শ্যামাপ্রসাদ মন্ডল জানালেন ১টার সময় দুজন শিক্ষক বাড়ি চলে গেছেন। তাদের বারণ করলেও তারা কথা শোনেন নি। যদিও প্রধান শিক্ষকের এই কথায় তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন গ্রামবাসীরা ।তাদের বক্তব্য এটা এই বিদ্যালয় এর স্বাভাবিক চিত্র। কোনদিন দুজন কোনদিন বা তিনজন। আজ যে এলেন অন্যদিন সে নেই, এভাবেই চলছে বিদ্যালয় এর কাজ। প্রধান শিক্ষক জড়িত মিড ডে মিলে দুর্নীতি সহ বিভিন্ন আর্থিক বেনিয়ম ছাড়াও বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষকদের অনৈতিক এবং বেআইনি কাজের দোসর হওয়ার দায়ে। নিজের বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি এবং আর্থিক অনিয়মের ঘটনা চাপা দিতেই প্রধান শিক্ষক তার শিক্ষকদের এই সমস্ত অনৈতিক এবং বেআইনি কাজে সহযোগিতা করেন বলে গ্রামবাসীদের অভিযোগ। কেউ কেউ আবার এই সমস্ত ঘটনার বিনিময়ে সহ শিক্ষকদের কাছ থেকে অর্থ নেয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও তুলেছেন।
আদিবাসী অধ্যুষিত, মূলত গরীব মানুষের বাস এই স্কুলের চারপাশে। এক সময় এই বিদ্যালয় বহু অভিভাবকই তাদের শিশুদের পাঠাতেন পাঠ গ্রহণ করতে। কিন্তু দিনের পর দিন শিক্ষকদের 'অনীহা' আর 'ফাঁকিবাজির' কারণে অভিভাবকরা আর এই স্কুলে তাদের শিশুদের পাঠাতে ভরসা করেন না।
বর্তমানে বিদ্যালয় বাস্তবিক ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ৪০ থেকে ৫০, এই ছোট ছোট শিশুদের মধ্যেও অনেকেই আমাদের অভিযোগ করল, স্কুলের অনেক শিক্ষকই প্রতিদিন আসেন না ।ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাদের পড়াশোনা। সব ক্লাস ও হয় না। সমস্ত শিক্ষক না থাকার কারণে একটা ক্লাসের মধ্যেই কোন সময় দুটো কোন সময় বা তিনটে ক্লাসের ছাত্র ছাত্রীদের একসঙ্গে বসিয়ে পড়ানো হয়। বিদ্যালয়ে নেই কোন ফ্যান। কখনো বা ১টা কখনো বা ২ টো, কোন কোন সময় ৩ টার সময় সময় বিদ্যালয় ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়। মাঝেমাঝেই বিদ্যালয়ে পরীক্ষা সহ বিভিন্ন কারণে সরকারি নিয়ম না থাকলেও শিশুদের কাছ থেকে পয়সা আদায়ের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে প্রধান শিক্ষক শ্যামাপ্রসাদ মন্ডলের বিরুদ্ধে। যদিও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগই অস্বীকার করেছেন তারা।
তবে এই বিদ্যালয় এর অধীনে বিদ্যালয় পরিদর্শক সৌমিত্র সরকারকে এর আগেও বিস্তারিত তথ্য দিয়ে অভিযোগ জানানোর পরও পরিস্থিতির যে কোন ধরনের পরিবর্তন হয়নি তা আজকের ঘটনা থেকেই স্পষ্ট।
বৃহস্পতিবার এর ঘটনা বিদ্যালয় পরিদর্শককে আবার জানানো হলে, তিনি বলেন বেশ কিছুদিন ধরেই এই বিদ্যালয় এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ আসছে, বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয় আসছেন না। মিড ডে মিলে ও বেশকিছু গরমিলের খবর আমাদের কানে পৌঁছেছে। ইতিমধ্যেই আমরা বিদ্যালয়ের সহ শিক্ষক এবং প্রধান শিক্ষককে ডেকে সতর্ক করেছিলাম। এখনো পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। এবারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে মালদা জেলা বিদ্যালয় প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের সভাপতি আশীস্ কুন্ডু তার কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, তিনি বলেন কোন অবস্থাতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈরাজ্য বা কোন ধরনের বেআইনি কাজ বরদাশ্ত করা হবে না। রাজ্যের শিক্ষা মন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রী প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছেন রাজ্যের বিভিন্ন স্কুলের পড়াশোনার মান উন্নত করতে। উন্নয়ন যজ্ঞে শামিল জেলার হাজার হাজার শিক্ষকও। যদি দু একজন শিক্ষকের জন্য সুনাম ক্ষুন্ন হয় তাহলে কোন অবস্থাতেই তাদের রেয়াত করা হবে না। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী দোষী প্রমাণিত হলে এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং শিক্ষা মন্ত্রী যখন প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে এতটা সচেষ্ট , সরকারি নির্দেশ মেনে হাজার হাজার শিক্ষক শিক্ষিকা যখন প্রতি নিজেদের কাজে অর্থাৎ শিশুদের তৈরি করতে তাদের প্রাণপাত করছেন , তখন তার রাজ্যেই কোন সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দিনের পর দিন মিড ডে মিল এ গরমিল, আর্থিক দুর্নীতি এবং নিয়ম না মেনেই স্কুল চালানো এবং নিজের দুর্নীতি ঢাকতে সহ শিক্ষকদের অন্যায় সুযোগ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার মতো অভিযোগ এবং বিদ্যালয় সদ্য নিযুক্ত সহ শিক্ষকদের এ ধরনের ফাঁকিবাজি এবং গা ছাড়া মনোভাব যে, এই সরকারি ব্যবস্থা এবং প্রচেষ্টার পরিপন্থী এবং শিশু স্বার্থবিরোধী এ কথা বোধহয় বলার অপেক্ষা রাখেনা।
এখন মেঘপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় এর দুর্নীতি গ্রস্থ এই সমস্ত শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় শাস্তির ব্যবস্থা করে, এই বিদ্যালয় সুস্থ এবং স্বাভাবিক অবস্থা কত দিনে প্রশাসন ফিরিয়ে দিতে পারেন, এখন তারই অপেক্ষায় রয়েছেন প্রাথমিক বিদ্যালয় এর আশেপাশের আদিবাসী এবং এবং গরীব মানুষ জন এবং তাদের সাথে থাকা শিশুরা।



No comments:
Post a Comment