পর্নো সাইটগুলি জোর করে বন্ধ করা নিয়ে বলিউড-এর প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা রামগোপাল ভার্মা লিখেছিলেন, ‘‘প্রাপ্তবয়স্কদের একটা নির্দোষ আনন্দ থেকে বঞ্চিত করা আর তালেবান বা আইএস যেভাবে মানুষের স্বাধীনতা হরণ করে সে দুটো একই জিনিস৷''
না, আমি সাংবাদিক৷ তাই জঙ্গি গোষ্ঠী তালেবান অথবা ইসলামিক স্টেট-এর সঙ্গে ‘পর্নোগ্রাফি' বন্ধ করাকে আমি এক করে দেখবো না৷ তবে আইন করে ইন্টারনেটের মুক্ত জগত থেকে কোনো কিছু নিষিদ্ধ করাকে আমি অবশ্যই ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরবো৷ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য – এ সবের দোহাই দিয়ে আজ পর্নোগ্রাফি, কাল ফেসবুক, পরশু ইউটিউব, আর একদিন হয়ত মোবাইল ফোন বা টেলিভিশন নিষিদ্ধ করতে উদ্যত হবে সরকার৷ বিশ্বাস হচ্ছে না? কেন গত বছরেই তো ‘ভিমেও', ‘ডেলিমোশন' সহ অন্তত ৩২টি সাইট ‘ব্যান' করেছিল সরকার৷ এর মধ্যে বেশ কিছু সাইটের ওপর থেকে পরবর্তীতে নিষিধাজ্ঞা তুলে নিলেও সরকারের মেজাজ-মর্জির ওপর আমাদের যদি সব সময় নির্ভর করতে হয়, তাহলে আর স্বাধীনতার মানে কী?
এখানেই শেষ নয়, ভারতে আরো কত কিছুই তো নিষিদ্ধ করেছে সরকার৷ কয়েকটি রাজ্যে পার্কে-পথে ঘাটে হাত ধরে হাঁটা যাবে না, গরুর মাংস খাওয়া যাবে না৷ এছাড়া সাহিত্য বা সিনেমায় – যেখানেই ‘রামরাজ্য', থুড়ি মোদীর ভারতবর্ষকে এতটুকু খাটো করে দেখানো হয়েছে, অথবা দেব-দেবীর শরীর তুলে ধরা হয়ছে, সেখানেই বিপদ৷
তারপর ধরুন বিবিসি-র ‘ইন্ডিয়াস ডটার' নিয়ে যা হলো৷ ২০১২ সালে নতুন দিল্লিতে চলন্ত বাসে গণধর্ষণের ঘটনা নিয়ে নির্মিত এই তথ্যচিত্রটির প্রচার নিষিদ্ধ করলো ভারত৷ এমনকি ইউটিউব থেকেও তুলে নেওয়া হলো ‘ইন্ডিয়াস ডটার'৷ ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে ভারতজুড়ে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হলো, হিন্দি সিনেমার তারকারা বিষয়টিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখলেন, অনেকেই এই সিদ্ধান্তকে সরকারের ‘উটপাখি মনোভাব' হিসেবে চিহ্নিতও করলেন৷ তাতে কী এসে গেল? মোদী সরকারের টনক তাতে নড়লো কি? এর মধ্যে বিবিসি তথ্যচিত্রটি প্রচার করায় আমার-আপনার মতো কয়েকজন, মানে যাঁরা সত্যিই আগ্রহী, তাঁরা ছবিটা ঠিকই দেখে নিলেন৷ সেভাবেই পর্নোগ্রাফি দেখতে চাইলে, তার যে বহু পথ আছে – সেটা নিশ্চয় আমাকে আর খুলে বলতে হবে না?
আমি পর্নোগ্রাফির ঘোর বিরোধী৷ কিন্তু একটি কথা ভেবে দেখুন৷ ভারতীয় সংস্কৃতিতে যৌনতা নিয়ে আলোচনা, তার চর্চা কি একেবারে নতুন? কামসূত্রের কথা না হয় ছেড়েই দিচ্ছি, কিন্তু খাজুরাহো অথবা কোনার্কের সূর্য মন্দিরের বেলা? সেখানকার শিল্প-স্থাপত্যে যৌনতা, কাম, সম্ভোগ – এই বিষয়গুলি কি আসেনি? এসেছে, তাহলে?
আসলে ‘পর্নোগ্রাফি' শব্দটি প্রাচীন গ্রীক শব্দ ‘পর্ন' ও ‘গ্রাফোস' থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ – বারাঙ্গণাদের সম্পর্কে লেখালেখি৷ পর্ন শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘বেশ্যা'৷ আরো পরিষ্কারভাবে বললে, সবচেয়ে নীচুজাতের ’গণিকা’, আমার ভাষায় যৌনকর্মী৷ তাই পর্নোগ্রাফির মানে কোনোভাবেই ‘যৌনকর্মের বিবরণ', ‘কামোদ্দীপক বর্ণনা' অথবা ‘নগ্নতার চিত্রায়ন' – এ সব নয়৷ পর্নোগ্রাফির অর্থ – জঘন্য, সস্তা, ‘বেশ্যা' রূপে নারীর চিত্রায়ন৷ আর আমি নারীর এমন চিত্রায়নের বিরোধী৷ বিরোধী নারীকে যৌন সম্ভোগের সামগ্রী হিসেবে, বেশ্যা হিসেবে দেখতে৷ অথচ দেখুন, আমাদের সংস্কৃতিতে, মহাকাব্যগুলোতে এমন অসংখ্য নারী আমরা পেয়েছি৷ ইন্দ্রের সভায় অপ্সরাদের মনে নেই?

No comments:
Post a Comment