মালদাঃ সম্পত্তি লিখে দিতে অস্বীকার করায় পুত্রবধূর মারে রক্তাক্ত হলেন শ্বশুর৷ ঘরের বউয়ের লোকজনের হাতে বেধড়ক মার খেলেন শাশুড়ি ও স্বামীও৷ পরিবারের সবাইকে মারধর করে বাড়িতে থাকা টাকাপয়সা, সোনার গয়না নিয়ে পলাতক পুত্রবধূ৷ যাওয়ার সময় নিজের সঙ্গে সে নিয়ে গিয়েছে সাড়ে তিন বছরের একমাত্র মেয়েকেও৷ ঘটনাটি ঘটেছে খোদ মালদা শহরে৷ রাতে ইংরেজবাজার থানায় পুত্রবধূ, তার মা, ভাই সহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন শাশুড়ি৷ তাঁদের সঙ্গে কথা বলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন থানার আইসি৷
মালদা শহরের পূর্ব দেশবন্ধুপাড়ায় নিজের বাড়িতে বসবাস করেন ৭৫ বছরের বৃদ্ধ সন্তোষ সরকার৷ মন্টুবাবু নামেই তিনি বেশি পরিচিত৷ মন্টুবাবু অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী৷ তাঁর এক ছেলে, এক মেয়ে৷ মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন অনেকদিন আগেই৷ ২০১৩ সালে একমাত্র ছেলে জিশুরও বিয়ে দিয়ে দেন তিনি৷ ছেলের সঙ্গে পুরাতন মালদার সাহাপুর এলাকার সোনালি চৌধুরির ভালোবাসার সম্পর্ক মেনে নেন মন্টুবাবু ও তাঁর স্ত্রী শান্তনা সরকার৷ জিশু শহরেই ব্যবসা করেন৷ তাঁদের একমাত্র নাতনি গুনের বয়স এখন সাড়ে ৩ বছর৷
শান্তনাদেবীর অভিযোগ, গত ৩ বছর ধরে তাঁর পুত্রবধূ তাঁদের বাড়ি ও জমিজায়গা নিজের নামে করে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল৷ এতে তাকে মদত দিত তার মা প্রতিমা চৌধুরি ও ভাই পঙ্কজ চৌধুরি৷ এনিয়ে বাড়িতে অশান্তি লেগেই থাকত৷ প্রতিদিনই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত সোনালি৷ মাঝরাতে বাড়ি ফিরত সে৷ বাড়ির কারোর কথাই সে শুনত না৷ এমনকি স্বামীর সঙ্গেও তার বনিবনা ছিল না৷ আজ সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ তিনি মালদা শহরেরই বালুচরে নিজের বাবার বাড়ি গিয়েছিলেন৷ ছেলেও সেই সময় ব্যবসার কাজে বাজারে ছিল৷ সেই সময় বেশ কিছু গুণ্ডা নিয়ে সোনালি, তার মা ও ভাই তাঁদের বাড়িতে যায়৷ বাড়ি ও দুটি বাগান তার নামে লিখে দিতে তাঁর স্বামীকে চাপ দেয়৷ তাঁর স্বামী তার কথা না শুনলে সে তাঁকে বেধড়ক মারধর করে৷ রক্তাক্ত হয়ে পড়েন তাঁর স্বামী৷ সেই সময় তাঁর মেয়ে বাড়িতে এলে তারা তাকেও মারধর করে৷ কোনওভাবে সেই খবর পেয়ে তাঁর ছেলে বাড়িতে ছুটে যায়৷ সে তার বাবাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলে তাকেও মারধর করা হয়৷ মেয়ের ফোনে খবর পেয়ে তিনি বাড়িতে ছুটে গেলেও তাকেও রেয়াত করেনি কেউ৷ তাঁর ও তাঁর মেয়ের শাড়ি ছিঁড়ে, প্রায় নগ্ন করে মারধর করে সবাই৷ বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার আগে তারা গোটা বাড়িতে ভাঙচুর চালায়৷ ঘরে থাকা লাখ দেড়েক টাকা ও বেশ কিছু সোনার গয়না সহ নাতনিকে নিয়ে চলে যায় তাঁর পুত্রবধূ৷ ঘটনার পর তাঁরা নিজেদের চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন৷ সবার পরামর্শে রাতে তিনি গোটা ঘটনা জানিয়ে ইংরেজবাজার থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন৷
মন্টুবাবু বলেন, আজ বাড়িতে তিনি যখন একা ছিলেন, তখন লোকজন নিয়ে তাঁর কাছে আসে বউমা৷ সে তার নামে বাড়ি ও দুটি বাগান লিখে দেওয়ার জন্য তাঁকে চাপ দেয়৷ তিনি তাতে রাজি না হওয়ায় বউমা তাঁকে বেধড়ক মারে৷ তাঁর চোখে আঘাত লাগে৷ বুকেও আঘাত করে সে৷ এখন ডান চোখ খুলতে পারছেন না তিনি৷ তাই বিচার পেতে তাঁরা ইংরেজবাজার থানার দ্বারস্থ হয়েছেন৷
ঘটনাটি জানতে পেরে ইংরেজবাজার থানায় ছুটে যান মানবাধিকার সংগঠন, এপিডিআর-এর মালদা জেলা সম্পাদক যিষ্ণু রায়চৌধুরিও৷ তিনি বলেন, এতদিন ভারতীয় আইনের ৪৯৮ ধারার অনেক অপব্যবহার তাঁরা দেখেছেন৷ সেদিকে লক্ষ্য রেখে সুপ্রিম কোর্টও সম্প্রতি রায় দিয়েছে, বধূ নির্যাতনের অভিযোগ দায়ের হলেই কাউকে গ্রেফতার করা যাবে না৷ কীভাবে বধূদের একাংশ শ্বশুর-শাশুড়ি, এমনকি স্বামীর উপরেও অত্যাচার চালায়, আজকের ঘটনা তার জ্বলন্ত উদাহরণ৷ তাঁদের দাবি, অবিলম্বে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক৷ আশার কথা, ইংরেজবাজার থানার আইসি এদিন রাতেই অভিযুক্তদের গ্রেফতার করার আশ্বাস দিয়েছেন৷
এদিন নির্যাতিতা বৃদ্ধ-বৃদ্ধার সঙ্গে কথা বলেন ইংরেজবাজার থানার আইসি পূর্ণেন্দু কুণ্ডু৷ তিনি অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতার করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন৷

No comments:
Post a Comment