অর্ক রায়, মালদা : মালদার ইংরেজবাজার পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এর বিরুদ্ধে এলাকার লাইব্রেরীর জায়গা জবরদখল করে বেআইনি নির্মাণ এবং এ ব্যাপারে স্থানীয়দের ইংরেজবাজার থানায় লিখিত অভিযোগ। এবারে এই অভিযোগ থেকে কাউন্সিলর কে আড়াল করতে আসরে নামলেন ইংরেজ বাজার পৌরসভার পৌরপ্রধান নিহার রঞ্জন ঘোষ, এমনই অভিযোগ তুললেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একটা বড় অংশ। এলাকাবাসীর অভিযোগ,এই বেআইনি নির্মাণ কে বৈধতার চাদর দিতে পৌর প্রধান গত ইংরেজী ৬.৯.১৮ তারিখে স্থানীয় একটি ক্লাব , শহীদ স্মৃতি সংঘ, এর সম্পাদকের নামে এই বিতর্কিত জায়গায় অস্থায়ী একটি নির্মাণ তৈরীর অনুমতি দিয়েছেন। যার মেমো নম্বর ১৭৪৭ / IV-২ /১৮-১৯ তারিখ ০৬.০৯.২০১৮ ।
আর পৌরপ্রধান এর দেওয়া এই অনুমতি পত্রকে ঘিরেই এখন বিতর্ক তুঙ্গে। ০৩ নম্বর ওয়ার্ডের মালঞ্চপল্লীর বাসিন্দাদের একটা বড় অংশ প্রশ্ন তুলেছেন, কাদের কে বাঁচাতে বা কোন দুর্নীতিকে আড়াল করতে পৌর প্রধান তড়িঘড়ি এই অনুমতি পত্র প্রদান করেছেন? আদেও কি এই অনুমতি পত্র পৌর আইন মেনে দেওয়া হয়েছে? কারণ পৌর প্রধানের দেওয়া এই অনুমতি পত্র ইতিমধ্যেই স্থানীয় মানুষদের মনে বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এই অনুমতি পত্র প্রকাশ্যে আসার পর এলাকার বহু মানুষ যোগাযোগ করেন আমাদের দপ্তরে। অভিযোগ করেন স্থানীয় কাউন্সিলর নিজের দুর্নীতি এবং স্বেচ্ছাচারিতা ঢাকতেই পৌর প্রধান কে ব্যবহার করে এই অনুমতি পত্র বের করে এনেছেন।
স্থানীয় যুবক সৌভিক মন্ডল বলেন,"আমাদের লাইব্রেরির জায়গায় বেআইনি নির্মাণের কাজ তো আগস্ট মাসের শেষের দিকেই হয়ে গিয়েছিল, আমরা বারবার কাউন্সিলর কে এই বেআইনী কাজ থেকে বিরত হতে বললেও তিনি না শোনায় এই মাসের ২ তারিখ অর্থাৎ ০২.৯.২০১৮ তারিখ আমরা কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ইংরেজবাজার থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করি। ইংরেজ বাজার পৌরসভা তেও ঘটনাটি জানায়। এ সংক্রান্ত খবর এবং এই বেআইনি নির্মাণ এর ছবি এ মাসের ৫ তারিখ অর্থাৎ ০৫.০৯.২০১৮ তারিখ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এরপর হঠাৎ দেখলাম ০৬.০৯.২০১৮ তারিখে ইংরেজ বাজার পৌরসভার পৌর প্রধান ঘটনার কোনরূপ তদন্ত না করেই, এই বেআইনী নির্মাণের জন্য একটি অনুমতি পত্র দিয়ে দিলেন। আমার প্রশ্ন ,কাকে বাঁচাতে এই অনুমতি পত্র ? কোন দুর্নীতিকে দুর্নীতিকে আড়াল করতে নয় তো? আর যে নির্মাণ আগেই হয়ে গেছে, সেই নির্মাণের অনুমতি পত্র নির্মাণ হয়ে যাওয়ার পরে কি কারণে দেয়া হল? আমরা বুঝতে পারছি না । আমরা সম্পূর্ণ ঘটনার তদন্ত চাই, প্রয়োজনে পুরো বিষয়টি নিয়ে ন্যায় এবং নিরপেক্ষ বিচারের আশায় আমরা আদালতের দ্বারস্থ হব।"
আরও পড়ুনঃ লাইভ: গঙ্গার করালগ্রাসে তলিয়ে যাচ্ছে আস্ত স্কুল
অন্য এক বাসিন্দা কিশোর চক্রবর্তীর দাবি,"যে জায়গায় শহীদ স্মৃতি সংঘ মালঞ্চ পল্লী ক্লাবের সম্পাদক কে নির্মাণের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়েছে, সেই জায়গাটি তো শহীদ স্মৃতি সংঘের নাম নেই তাহলে পৌর প্রধান কিভাবে এই ক্লাবের সম্পাদক কে এই বিতর্কিত জায়গায় নির্মাণের জন্য অনুমতি দিলেন।"
এই এলাকারই দীর্ঘদিনের বাসিন্দা মনোরঞ্জন দাস জানালেন, বহুদিন ধরেই এই জায়গাটি ফাঁকা পড়ে রয়েছে। আমরা ছোটবেলা থেকেই জানি এই জায়গায় একটি লাইব্রেরী করা হবে জায়গাটি ফাঁকা থাকায় আশেপাশের বহু মানুষ বিভিন্ন সামাজিক কাজেও এই জায়গাটি কে ব্যবহার করতেন। ফলে এই জায়গার ওপর হঠাৎ এই বেআইনি নির্মাণ কোনো অবস্থাতেই মেনে নিতে পারছি না। লাইব্রেরির জায়গায় লাইব্রেরীই গড়া হোক।"
এত মানুষের ক্ষোভ-বিক্ষোভ, আইনি বেআইনি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা হাজির হয়েছিলাম ইংরেজবাজার পৌরসভার পৌরপ্রধান নিহার রঞ্জন ঘোষ এর কাছে। কিন্তু এই বিতর্কিত জায়গা এবং সেই জায়গায় ক্লাবকে নির্মাণের অনুমতি দেওয়া প্রসঙ্গে পৌর প্রধান যা জানালেন তাতে চমকে যেতে হয়। পৌর প্রধান বলেন,"মালদা শহরে এ রকম বেআইনি নির্মাণ বহু রয়েছে, এক্ষেত্রে ,এই ক্লাবের সদস্যরা বেআইনি নির্মাণ করার পর পৌরসভায় জানিয়েছেন এবং অনুমতি নিতে চেয়েছেন এটা একটা ভালো দিক।" কিন্তু আপনি যাকে এই জায়গায় নির্মাণের অনুমতি দিয়েছেন তিনি তো সরকারিভাবে এই জায়গার মালিক ই নন ।তাহলে কিভাবে দেয়া হলো এই অনুমতি পত্র, আমাদের প্রশ্নের উত্তরে, পৌর প্রধান যথেষ্ট অস্বস্তিতে ।জানালেন "যদি বেআইনি কিছু হয়ে থাকে তা অবশ্যই তদন্ত করে দেখা হবে। তবে মালদা শহরে এ রকম বেআইনি নির্মাণ এর নজির বহু রয়েছে।"
পৌর প্রধানের এই যুক্তি আর বক্তব্য কিছুটা হতবাক আমরা, কিন্তু এ ব্যাপারে আইনি ব্যাখ্যা ও তো দরকার। তাই আমরা হাজির হলাম ইংরেজ বাজার পৌরসভার কাউন্সিলর তথা প্রখ্যাত আইনজীবী সঞ্জয় শর্মার কাছে, সঞ্জয় শর্মার ব্যাখ্যা,"সম্পূর্ণ বেআইনি কাজ করেছেন পৌর প্রধান। একজনের নামে জমি, আর অনুমতি দিচ্ছেন অন্যজনকে এটা কিভাবে সম্ভব হয় জানিনা। এ ধরনের অনুমতি পত্র দিতে হলে বোর্ড অফ কাউন্সিলর এর অনুমোদন দরকার হয়। ইংরেজবাজার পৌরসভায় দীর্ঘদিন ধরেই বোর্ড অফ কাউন্সিলরের কোন মিটিং হচ্ছে না। ফলে একটি জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। বোর্ড অফ কাউন্সিলর এর মিটিং না হওয়ায় পৌর প্রধান দীর্ঘদিন ধরে যে সমস্ত নির্মাণের নকশা অনুমোদন করছেন, তাকে কোন নাগরিক আদালতে চ্যালেঞ্জ করলে চূড়ান্ত অসুবিধার মধ্যে পড়বে পৌরসভা। সমস্ত অনুমোদন বাতিল হয়ে যাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।"
ইংরেজবাজার পৌরসভার প্রাক্তন পৌর প্রধান কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরীর বক্তব্য অনেক অংশে মিলে যাচ্ছে আইনজীবীদের সাথে। তিনি বলেন,'আইন জানেন না পৌর প্রধান, বিভিন্ন দুর্নীতি আর স্বেচ্ছাচারিতা চলছে পৌরসভায়। এভাবে কোনো অনুমোদন দেওয়া যায় না। একজন দুর্নীতিগ্রস্থ কাউন্সিলরকে আড়াল করতেই পৌর প্রধান এই অনুমতি দিয়েছেন। আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে এই অনুমতি খারিজ হয়ে যাবে।"
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যখন বিভিন্ন প্রশাসনিক বৈঠক গিয়ে, স্বচ্ছতা আর দুর্নীতি মুক্ত হবে প্রশাসন পরিচালনা করার পক্ষে সওয়াল করছেন, তখন মালদায় তৃণমূল পরিচালিত ইংরেজবাজার পৌরসভা একজন দলীয় কাউন্সিলর এর দুর্নীতি আড়াল করতে পৌর প্রধান এর এহেন কাজের সমালোচনা ইতিমধ্যেই আসরে নেমে পড়েছেন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। এখন দেখার স্থানীয় মানুষের দাবি মেনে কবে দখলমুক্ত হয় এই লাইব্রেরীর জায়গা।এই ঘটনায় অভিযুক্ত কাউন্সিলর পরিতোষ চৌধুরী ক্যামেরার সামনে কোনও ধরনের মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছেন।

No comments:
Post a Comment