ধারাবাহিক নতুন প্রজন্মের অভাবে সমস্যার সম্মুখীন কুমোরটুলি ! - Breaking Bangla

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Sunday, 16 September 2018

ধারাবাহিক নতুন প্রজন্মের অভাবে সমস্যার সম্মুখীন কুমোরটুলি !


জয়ন্ত সাহা, আসানসোল: পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোল পুরসভার অন্তর্গত ৮৫ নম্বর ওয়ার্ড তথা মহিশীলা কলোনির পাল পাড়া ৷ স্থানীয় অঞ্চলে আসানসোলের কুমোটুলি নামেই খ্যাত ৷ সব মিলিয়ে আঠারো থেকে কুড়িটি পরিবার সারাবছর বিভিন্ন প্রতিমা নির্মানে ব্যস্ত থাকে ৷ বছরের যে কোনো সময় যে কোনো পুজো- পার্বণের আগে এ পাড়ার কর্ম ব্যস্ততা চোখে পড়ার মত ৷ হাতে গোনা আঠারো থেকে কুড়িটি পরিবার হলেও বিষয়টি ঠিক ততটা ছোটো নয় ৷ মূর্তির গঠন থেকে প্রতিমার সৌন্দর্যায়ন ও শিল্প সৌকর্যে এমনকি প্রতিমা নির্মাণের সংখ্যাতেও কলকাতার কুমোরটুলির পরেই আসানসোলের কুমোরটুলি পাড়ার নাম যশ ও খ্যাতি ৷ ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকবার দুর্গাপুজোর আগে এখান থেকেই মূর্তি পাড়ি দিয়েছে বিদেশে ৷ পাশ্ববর্তী রাজ্য ঝাড়খণ্ড - বিহার - উড়িষ্যাতেও এখান থেকেই বেশির ভাগ মূর্তি পাড়ি দেয় ৷ পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুর মহকুমা অঞ্চল বাদ দিলে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বেশিরভাগ মূর্তিই তৈরী হয় আসানসোলের কুমোরটুলি পাড়ায় ৷ এখানেই রয়েছেন শ্রীকৃষ্ণ রুদ্র পাল , বাসুদেব পাল , সুধাংশু পাল রঞ্জিত পালের মত মৃৎশিল্পী ৷ যাদের নাম ও যশ শিল্পাঞ্চল ছাড়িয়েও বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ৷ মূলত মনসা পুজোর পর থেকে জগৎধাত্রী পুজো পর্যন্ত বাঙালির বারো মাসের তের পার্বণের বেশির ভাগ পুজো- উৎসব ৷ তাই এই সমতে পাল পাড়ার কাজ চলে দিন - রাত্রি ৷ চাহিদা বাড়ে কারিগরের ৷ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত , বিশেষত কালনা-কাটোয়া-নদীয়া-মুর্শীদাবাদ জেলাগুলিতে বহু কারিগর চুক্তিতে কাজ করতে আসে আসানসোলের পাল পাড়ায় ৷ শিল্পী রঞ্জিত পাল ও শ্রীকৃষ্ণ পাল জানিয়েছেন , বছরের এই সময় তাদের প্রত্যেকের মুর্তি তৈরীর কারখানায় ১০-১৫ জন করে কারিগর কাজ করেন ৷ সব মিলিয়ে মহিশীলার পাল পাড়ায় দুর্গা প্রতিমা তৈরী হয় ৩০০ অধিক ৷ এর সাথে গণেশ , বিশ্বকর্মা , লক্ষী , কালী থেকে জগৎধাত্রী ৷ তবে সব থেকে বেশি মূর্তি তেরী হয় সরস্বতীর ৷ এক একটি দুর্গার প্রতিমা গড়তে বর্তমান বাজারে আনুমানিক খরচ হয় ১৫০০০ টাকা ৷ তার উপর বায়নাকারী দের চাহিদা অনুসারে সে খরচ ৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে ৷ তবে বর্তমানে দিনে দিনে খরচ বেড়েই চলেছে ৷ গঙ্গার বিশেষ মাটি ছাড়াও উপকরণ হিসাবে বাঁশ , খড় ,রসি , পাট , রঙ ,কাপড় , পাড় , চুল ,জরি এসব লেগে থাকে ৷ যেগুলির দাম প্রায় প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে ৷ তার সাথে থাকে টানা অমানুষিক দৈহিক পরিশ্রম ৷ একই সাথে ভরা বর্ষার বৃষ্টির প্রকোপ এড়িয়ে যথা সময়ে পুজো কমিটিগুলির হাতে তাদের পছন্দ মত ঠাকুর তুলে দেওয়ার চাপ ৷ অথচ এবার জেলায় বর্ষা তার শেষ সময়ে ঝোড়ো ইনিংসে মেতে উঠেছে ৷ মূর্তি শুকোতে বেশ সমস্যায় পড়েছেন শিল্পীরা ৷ একই সাথে পুজোকমিটি ও বায়নাদার দের শেষ সময়ে মূর্তি পছন্দ না হলে মাথায় বাজ ভেঙে পড়ার অবস্থারও সম্মুখিন হতে হয় শিল্পীদের ৷ এই সমস্ত কিছুর সাপেক্ষে শিল্পীদের বক্তব্য , "এত খরচ পরিশ্রম ঝক্কির পরেও এ কাজে মুনাফা নেই তেমন ৷ পুজো উদ্যোক্তা কমিটিগুলি প্যাণ্ডেল লাইট বা আনুষঙ্গিক বিষয়ে খরচ করতে রাজি থাকলেও মূর্তি কেনার ক্ষেত্রে ততটা খরচ করতে রাজি থাকেনা ৷ " পাশাপাশি একজন কারিগরের প্রকৃত শিল্পী হয়ে ওঠার পথটিও মসৃণ নয় ৷ উদ্যমের সাথে প্রয়োজন হয় প্রতিভার সংমিশ্রনের ৷ একইসাথে এই জীবিকায় জড়িত শিল্পীদের জন্যে নেই সরকারি কোনো অনুদান বা বিশেষ প্রকল্পের ব্যবস্থা ৷ তাই বেশিরভাগ শিল্পী পরিবারগুলির পরবর্তী তথা নতুন প্রজন্মের এই মূর্তি তৈরীর জীবিকা বেছে নিতে অনীহা দেখা দিচ্ছে ৷ এই সব কারণেই আসানসোলের পাল পাড়ার নতুন প্রজন্ম মূর্তি তৈরীতে আর উৎসাহ দেখাচ্ছে না ৷ উদ্বাস্তু কলোনি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আসানসোলের কুমোরটুলি তথা পাল পাড়ার আভিজাত্যের যে যাত্রা শুরু , প্রকৃত উত্তরসূরি না মেলায় তা কালের গর্ভে হারাতে বসেছে৷

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad