দুই কন্যা: একই ব্যথা - Breaking Bangla

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Friday, 28 September 2018

দুই কন্যা: একই ব্যথা

দুই কন্যা, একই ব্যথা
একজন হিন্দু ব্রাহ্মণ। আরেকজন মুসলিম। দুজনেই ১৯৩০-৪০-এর দশকে অবিভক্ত ভারতের রাজনীতিকে দাপুটে নেতা। তাঁরা একে অন্যের শত্রুও বটে। তাঁদের রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও মতে মিলের চেয়ে অমিলই বেশি। তবে ব্যক্তিগত জীবনে দুজনেই বয়ে বেড়িয়েছেন একই রকমের চাপা দুঃখ।
তাঁদের একজন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু এবং অন্যজন পাকিস্তানের জাতির পিতা কায়েদ-ই-আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। এই দুই নেতারই আদরের মেয়েরা বিয়ে করেছিলেন ভিন্ন সম্প্রদায়ের পুরুষকে। দুজনেরই জামাতা ছিলেন পার্সি। আর এই বিয়েকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিকভাবে, ব্যক্তিজীবনে বাবা-মেয়ের সম্পর্কে চলেছে টানাপোড়েন। আট দশক পরে সেই কাহিনি আবার তুলে এনেছেন পাকিস্তানের ডন পত্রিকার দিল্লি প্রতিনিধি জাভেদ নাকভি।
জিন্নাহর একমাত্র মেয়ে দিনা ১৯৩৮ সালে পার্সি সম্প্রদায়ের নেভিল ওয়াদিয়াকে বিয়ে করেন। আর নেহরুর মেয়ে ইন্দিরা ১৯৪২ সালে বিয়ে করেন পার্সি সম্প্রদায়ের ফিরোজ গান্ধীকে। ২ নভেম্বর নিউইয়র্কে মারা যান দিনা। অন্যদিকে ১৯৮৪ সালে ৩১ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী।

দিনা ও ইন্দিরা দুজনেই বাবার মতের বিরুদ্ধে গিয়েছিলেন। ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে ঘর বাঁধার সিদ্ধান্তে ছিলেন অটল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাঁদের ভালোবাসার বিয়ের পরিণতি সুখের হয়নি। বিয়ের পাঁচ বছরের মধ্যে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয় দিনার। ইন্দিরা ও ফিরোজের বিবাহিত জীবনও কেটেছে টানাপোড়েনের মধ্যেই।
দিনা ও ইন্দিরা দুজনেরই দুটি করে সন্তান। দিনা ও নেভিল দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ে। আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ না হলেও ১৯৪৩ সালে আলাদা হয়ে যান তাঁরা।
ইন্দিরা ও ফিরোজ গান্ধীর দুই ছেলে—রাজীব ও সঞ্জয়। বিবাহিত জীবনে তাঁদের মতানৈক্য ছিল ভারতের রাজনীতিতে আলোচিত ইস্যু। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত এভাবেই জীবন কাটে ইন্দিরা ও ফিরোজের। পরে মারা যান ফিরোজ।

সুইডিশ সাংবাদিক বার্টিল ফক তাঁর লেখা ‘ফিরোজ গান্ধী’ বইতে বলেছেন, নেহরুর জামাতা ছিলেন গণতন্ত্রমনস্ক ও বিরল সাহসী। ফিরোজ দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি আকর্ষণীয়, বুদ্ধিদীপ্ত ও ধৈর্যশীল। ফিরোজের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ওই বইতে আরও বলা হয়, তিনি মজা করতে পারতেন। সত্যের প্রতি অবিচল ছিলেন। দরিদ্রদের উন্নয়নের জন্যও কাজ করতেন। পাশাপাশি ইন্দিরা গান্ধীকে কর্তৃত্ববাদী না হয়ে উঠতে আগেই সতর্ক করেছিলেন ফিরোজ। ১৯৫৯ সালে ভারতের কেরালা রাজ্যে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট সরকার ভেঙে দেন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। ইন্দিরা গান্ধী এ ব্যাপারে বাবাকে প্রভাবিত করেন। কমিউনিস্ট সরকারকে এভাবে সরানো নিয়ে ইন্দিরা ও ফিরোজের মধ্যে মতবিরোধ চরমে ওঠে। ফিরোজ তখন ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের রায়বেরিলি থেকে নির্বাচিত কংগ্রেস দলের সাংসদ। ইন্দিরার এ পদক্ষেপে নিজের অসন্তোষ তীব্রভাবে প্রকাশ করেছিলেন ফিরোজ। সরাসরি ফ্যাসিবাদী বলেছিলেন ইন্দিরাকে। ক্ষুব্ধ ফিরোজ আরও প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কংগ্রেসের নীতি ও আদর্শ কোথায় গেল?’
মেয়ে ও জামাইয়ের এই ঝগড়ায় বিব্রতবোধ করেন নেহরু। ফকের লেখায় জানা যায়, ফিরোজ ফ্যাসিবাদী বলায় রেগে যান ইন্দিরা। বলেন, এটি তিনি মেনে নিতে পারছেন না। ফিরোজের বন্ধু ও সাংবাদিক নিখিল চক্রবর্তীর কাছ থেকে এসব কথা শুনেছেন বলে দাবি করেন ফক।

ফক আরও বলেন, ইন্দিরা বাবাকে (নেহরু) দুর্বল ও অবিবেচক মনে করতেন। মার্কিন বন্ধু ডরোথি নরম্যানকে ইন্দিরা লিখেছিলেন, শুরুতে তাঁর বাবা ভালো নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হননি। এ তো গেল ইন্দিরা আর ফিরোজের জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের গল্প।
দিনা যখন নেভিলকে বিয়ে করেন, তখন জিন্নাহ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। পার্সি সম্প্রদায়ের নেভিল ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেও মন ভেজাতে পারেননি জিন্নাহর। ‘মি. অ্যান্ড মিসেস জিন্নাহ দ্য ম্যারেজ দ্যাট সুক ইন্ডিয়া’ বইতে শিলা রেড্ডি লেখেন, নেভিলের সঙ্গে দিনার বিয়েতে রাজনৈতিক মহলে অস্বস্তিতে পড়েছিলেন জিন্নাহ। বাবার প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও দিনা ছিলেন বিয়ের সিদ্ধান্তে অটল। উর্দুভাষী লেখক সাদাত হাসান মান্তোর বরাত দিয়ে রেড্ডি লিখেছেন, মেয়ের বিয়ের পর দুই সপ্তাহ পর্যন্ত কারও সঙ্গে দেখা করতেন না জিন্নাহ। সারাক্ষণ সিগার টানতেন। আর বাড়িতে ওপর-নিচে পায়চারি করতেন।
১৯৪৩ সালে নেভিলের সঙ্গে বিচ্ছেদের কিছুদিন আগে দীর্ঘদিনের অভিমান ভেঙে বাবাকে চিঠি লেখেন দিনা। ১৯৪১ সালের ২৮ এপ্রিল দিনার লেখা ‘মাই ডার্লিং পাপা’ সম্বোধনে সেই চিঠিরও উল্লেখ রয়েছে রেড্ডির বইতে। মুম্বাইতে (তৎকালীন বোম্বে) জিন্নাহর বাড়ি বিক্রি করে দেওয়ার খবর শোনার পরই সম্ভবত ওই চিঠি লেখেন দিনা।
দিনা সেই চিঠিতে বাবার কাজের জন্য নিজে গর্বিত বলে জানান। ডালমিয়ার কাছে বোম্বের সাউথ কোর্ট নামে নিজেদের বাড়িটি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে বলে খবর শুনেছেন বলেও জানান। শুধু ওই বাড়িতে থাকা বায়রন ও শেলির পুরোনো বইগুলো নিজের কাছে রাখার অনুমতি চান।
চিঠির পর বাবা-মেয়ের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়েছিল কি না, তার স্পষ্ট কোনো উত্তর মেলেনি। শুধু সংক্ষেপে জিন্নাহ মেয়েকে জানিয়েছিলেন, বাড়ি বিক্রির খবরটি ছিল একেবারেই ভিত্তিহীন।
জওহরলাল নেহরুর উত্তরাধিকারী হিসেবে ইন্দিরাকে মেনে নিয়েছিল ভারতের মানুষ। যার ফলে অনেক বাঘা বাঘা নেতাদের টপকে সে দেশের প্রধানমন্ত্রীও হন ইন্দিরা। অন্যদিকে দিনার জীবনের দীর্ঘ সময়, এমনকি শেষ দিন পর্যন্ত কেটেছে আমেরিকায়।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad