চিনির টুকরা মসজিদ: ঐতিহ্যে অবিচল - Breaking Bangla

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Wednesday, 3 October 2018

চিনির টুকরা মসজিদ: ঐতিহ্যে অবিচল





মসজিদের নামটিই এমন যে, শুনতেই বিভ্রান্তি লাগে। তবে তাতে এর ঐতিহ্যে কোনো ভাটা পড়ে না এবং এমনও নয় যে, এর নাম কেন চিনির টুকরা—তা মানুষ জানে। মূলত মসজিদটির পুরোটাই চিনামাটির কাচ দিয়ে আবৃত। নানা রঙের ডিজাইন করা কাচের তৈরি দেখতে অনেকটা চিনির টুকরার মতো ঝকঝকে। মসজিদের গায়ে চিনামাটির সাদা টুকরাগুলো দেখতে চিনির দানার মতো হওয়ার কারণেই স্থানীয় বাসিন্দারা মসজিদটিকে এই নামে ডাকেন। যদিও মসজিদের গায়ে রঙিন কাচ দিয়ে লেখা আছে— কাস্বাবটুলি জামে মসজিদ।
পুরান ঢাকার কসাইটুলি এলাকার পিকে ঘোষ স্ট্রিট রোড। তিন দিক দিয়ে আসা তিনটি রোডের সংযোগ। এ সংযোগস্থলের এক কোণায় দাঁড়িয়ে রয়েছে এই মসজিদ। ইতোমধ্যেই মসজিদটি তার নির্মাণের শতবর্ষ পার করেছে। [প্রথম আলো, ৮ জানুয়ারি ২০১৭]
মসজিদের নির্মাণ সাল নিয়েও বিভ্রান্তি আছে, যা পুরাতন স্থাপত্যের ক্ষেত্রে খুবই স্বাভাবিক। কারও মতে, এটি নির্মাণ করা হয়েছে ১৯০৭ সালে এবং সে-হিসেবে এই মসজিদের বয়স এখন ১১০ বছর। তবে অনেকেই ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, আদতে এটি নির্মিত হয়েছে ১৯১৯ সালে। [আমরা ঢাকা, মে ২৪, ২০১৫] কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই দ্বিমত শুধু ইংরেজি সন নিয়ে। বাংলা ১৩৩৮ সালে নির্মাণ বললে আর কারও ভিন্নমত থাকে না। সে-হিসেবেও মসজিদটি তার শতবর্ষের কোঠা পরা করেছে ১০ বছর আগে।
মসজিদটি তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এবং এই তিন গম্বুজের মসজিদ নির্মাতা হলেন আবদুল বারী বেপারী নামের পুরান ঢাকার জনৈক ব্যবসায়ী। [ঢাকা কোষ, এশিয়াটিক সোসাইটি।]
আজ থেকে প্রায় একশ’ বছর আগে পুরান ঢাকায় ছিল না এত ঘনবসতি। ফলে ছোট হলেও তখন পূরণ হতো মুসল্লিদের চাহিদা। ধীরে ধীরে জনসংখ্যা বাড়তে থাকলে মসজিদের ধারণক্ষমতা কমে যায়। এ কারণে ১৯৭৯ সালে কারুকার্যে কোনো পরিবর্তন না করে মসজিদ সংস্কার করা হয়। ফলে মূল ভবনের ভেতরটা আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এলাকাবাসীর সহায়তায় কয়েক বছর আগে মূল মসজিদের পূর্ব ও উত্তরে সম্প্রসারণ করা হয়। মূল মসজিদটি একতলা হলেও বর্ধিত অংশটি হয় তিনতলা। বর্তমানে এটি প্রায় পাঁচ কাঠা জায়গায় অবস্থিত। নতুন অংশের পুরোটাই উন্নতমানের টাইলস দ্বারা ঢেকে রাখা হয়েছে।
মূল মসজিদটির ভবনে সমতল কোনো ছাদ নেই। ছাদবিহীন মসজিদের প্রতিটি পিলারের মাথায় রয়েছে গম্বুজ। মূল অংশের ছাদে রয়েছে তিনটি গম্বুজ। তিনটি গম্বুজের মাঝের গম্বুজটি বড় আর দুপাশের দুটির আকার মাঝারি। এছাড়া চার কোণায় রয়েছে চারটি বুরুজ, চারটির কারুকাজ একই ধরনের। গম্বুজ তিনটিই আটকোনা ড্রামের উপর স্থাপিত রসুনাকৃতির মতো খাঁজকাটা। গম্বুজ ও বুরুজগুলোর মাথায় পদ্মফুলের নকশা করা তীর রয়েছে। ছাদের চারদিক ঘিরে আছে অনেকগুলো টারেট।
এছাড়া ছয়টি ছোট ও দুটি জোড়া পিলারের দুটি গম্বুজ রয়েছে। গম্বুজগুলোর উচ্চতা ৫-১২ ফুট। মসজিদটির মূল বৈশিষ্ট্য হলো এতে করা ‘চিনিটিকরির কারুকাজ’। মূল ভবনের ভেতরে ও বাইরের দেয়ালসহ সম্পূর্ণ জায়গায় চিনিটিকরি পদ্ধতির মোজাইক দিয়ে নকশা করা হয়েছে। চিনামাটির ভাঙা টুকরা আর রঙিন কাচ দিয়ে গোলাপ ঝাড়, আঙুরের থোকা, ফুলদানির ছবি মসজিদের দেয়ালে-খিলানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।মসজিদের ভেতরের মিহরাব ও মিহরাবের আশপাশের নকশাগুলি হচ্ছে সবচে’ রঙিন ও জমকালো।
একতলা মূল মসজিদটি এখনও প্রায় দুই কাঠা জমির ওপর দাঁড়িয়ে। পরে পেছনে তিনতলা পর্যন্ত সম্প্রসারণ এবং স্থানসংকুলান না হওয়ায় ধাপে ধাপে আকার বাড়ানো হলেও মূল মসজিদের কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। তবে সম্প্রসারণের ফলে এখন প্রায় বারো শ’ মুসল্লি একসঙ্গে এখানে নামাজ পড়তে পারেন।
শতবর্ষী মসজিদের দেয়ালের কিছু অংশে মোজাইক উঠে গিয়ে ভেতরের লাল ইট উঁকি দিচ্ছে। কোথাও কোথাও ফিকে হয়ে গেছে কাচের নীল-সবুজ রং। তবে পুরনো আমলের কাঠের দরজায় ও বারান্দার ছাদের কাঠের চেহারা সহজেই মনে করিয়ে দেয় পুরনো স্মৃতি। এক সময় পুরনো ঐতিহ্যবাহী ‘চিনির টুকরো' মসজিদের আশপাশে তেমন বাড়িঘর ও দোকানপাট ছিল না।
শুরু থেকে আশির দশকের শেষ দিকেও অনেক বিদেশি পর্যটক আসতেন এই মসজিদ দেখতে। শুধু তা-ই নয়, ৩০ বছর ধরে বিটিভির আজানের সময় এ মসজিদের দৃশ্য দেখানো হতো। সে সঙ্গে ‘কাস্বাবটুলী মসজিদ’-এর ছবি দিয়ে বের হয়েছে ‘ভিউকার্ড’। ফলে এর সুনাম অক্ষুণ্ন রয়েছে। এলাকাবাসীর একান্ত চেষ্টায় ওয়াক্ফ সম্পত্তির ওপর গড়ে ওঠা মসজিদটি ধরে রেখেছে এর ঐতিহ্য।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad