বৃহস্পতিবারের দুপুর শাসক তৃণমূলের কাছে এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা, শঙ্কা কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খবর পৌঁছেছে বাইপাসের ধারে তৃণমূল ভবনেও। তৃণমূলেরই একটি সূত্রে সামনে এসেছে তা। কী সেই তথ্য?
শাসক তৃণমূলের আয়-ব্যয় থেকে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি কেনাবেচার খরচ, ভোট প্রচারের হেলিকপ্টারের হিসাবের প্রায় সিংহভাগ তথ্যই খোদ দলেরই এক ‘বিদ্রোহী’ সাংসদের মাধ্যমে এসেছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার হাতে, দিল্লির সদরদপ্তরে।
ওই সাংসদের প্রতিনিধি হিসাবে দুই ব্যক্তি বৃহস্পতিবার দুপুরেই গিয়েছিলেন দিল্লিতে সি বি আই দপ্তরে। তুলে দিয়েছেন শাসক তৃণমূলের কেলেঙ্কারি, আর্থিক গরমিল, আয় ব্যয়ের বিস্তারিত নথি। শাসক তৃণমূলে এখনও সরকারিভাবে থাকা ওই নেতার নির্দেশেই তাঁর দুই অনুগামী এই তথ্য-পঞ্জিকা তুলে দেন সি বি আই’র হাতে। একগুচ্ছ সেই ফাইলে সম্পূর্ণ বেআব্রু তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রীর ছবি বিক্রির রহস্যময় হিসাবের ফাইলও ঠাঁই পেয়েছে তাতে। ভিনরাজ্যে ভুয়ো অ্যাকাউন্ট খুলে টাকা তোলা থেকে শুরু করে একাধিক চমকে ওঠার মতো আর্থিক কেলেঙ্কারির নথি এবার সযত্নে পৌঁছে দেওয়া হলো সি বি আই দপ্তরেই।
বৃহস্পতিবার দুপুরেই এই ঘটনায় রাজধানীর রাজনীতিতেও চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। যাবতীয় সন্দেহ, আশঙ্কার উত্তর মিলেছে আবার শুক্রবার দুপুরে। তৃণমূল ভবনে সাংবাদিক বৈঠক করে তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চ্যাটার্জি সরাসরি তোপ দেগেছেন সাংসদ মুকুল রায়ের বিরুদ্ধে। মুকুল রায়ের ওপর নজর রাখা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তৃণমূলের এই শীর্ষ নেতা। মমতা ব্যানার্জির নির্দেশেই এদিন পার্থ চ্যাটার্জি সাংবাদিকদের কাছে মুকুল রায় নিয়ে মুখ খুলেছেন বলে জানা গেছে। পার্থ চ্যাটার্জি বলেছেন, ‘আমরা একাধিক সূত্রে তথ্য পেয়েছি উনি (মুকুল রায়) বি জে পি নেতাদের সঙ্গে মিটিং করছেন। দল তাঁকে এসব করতে বলেনি। দল তাঁকে কারও সঙ্গে আলাদা করে মিটিং করতে বলেনি। উনি কেন বারেবারে দিল্লি যাচ্ছেন? হয়তো নিজে থেকেই এসব করছেন। তবে কেন এসব করছেন তা উনি নিজেই জানেন। উনি কোথায় কোথায় যাচ্ছেন, কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এখন থেকে তা আমরাও নজরে রাখছি। যাঁরা এসব করছেন তাঁরা তৃণমূলের বন্ধু নয়। যদি তিনি লিমিট ক্রস করে থাকেন তাহলে দল দেখবে বিষয়টা’।
দলীয় সাংসদ, একদা তৃণমূলের দ্বিতীয় ক্ষমতাশীল ব্যক্তি সম্পর্কে সরাসরি এভাবে আক্রমণ গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। মুকুল রায় যে গেরুয়া শিবিরেই প্রায় চলে গেছেন তা ধরে নিয়েই এবার পালটা আক্রমণের পথে যাচ্ছে তৃণমূল। তবে মুকুল রায় নিজে তৃণমূল ছাড়ার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেননি। বরং হেঁয়ালি করেই বলেছেন, ক্রিজে থাকলে রান আসবে। পালটা আবার পার্থ চ্যাটার্জির উত্তর ছিল, ‘পার্টনার না থাকলে একা কীভাবে ক্রিজে থাকতে পারবেন?’
দাবি, পালটা দাবির মাঝেই এই নাটকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্ক তৈরি হয়েছিল বৃহস্পতিবার দুপুরেই। কলকাতা থেকেই ওই দুই ব্যক্তি যান দিল্লিতে। তাঁরা এখনও সেখানেই আছেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে ওই দুই ব্যক্তি দিল্লিতে সি বি আই দপ্তরে গিয়েই জমা দিয়ে আসেন তৃণমূলের কেলেঙ্কারি-নামা’র সব নথিপত্র। তৃণমূল সূত্রেরই দাবি, এটা পাকা মাথার কাজ। দিল্লিতে বারেবারে যাতায়াত করা মুকুল রায়ের হস্তক্ষেপ ছাড়া এটা সম্ভব নয়। তাহলে কি মুকুল রায়ের নির্দেশেই তাঁরই হেপাজতে থাকা সব তথ্য চলে এল কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার দখলে? এক ধাক্কায় কি অনেকটাই এগিয়ে গেল চিট ফান্ড থেকে নারদ দুর্নীতির তদন্ত?
মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ মহলের তরফে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে কেন এই কাজ করতে হলো সাংসদকে? সারদা থেকে নারদ তদন্তের গ্রাস থেকে নিজেকে রক্ষা করতে? পরিবারের ঘনিষ্ঠতম কোন ব্যক্তিকে রক্ষা করতে? কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার একটি সূত্রেই জানা গেছে, মুকুল রায়ের একাধিক কাজের তদারকি যিনি করেন তিনি তাঁর পরিবারেরও সদস্য। তাঁর বিরুদ্ধে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য এসেছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার হাতে। তাঁর মাধ্যমে বিপুল লেনদেনের নির্দিষ্ট তথ্য পেয়েছেন ইডি’র তদন্তকারীরাও। উত্তর কলকাতায় গৌরীবাড়ির সামনে একটি ফ্ল্যাটে আপাতত তিনি থাকেন বলে খবর। ওই এলাকার কাছে এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে অফিসও খোলা হয়েছে। সেখানেও মুকুল রায় মাঝে মাঝে যান বলে খবর তৃণমূল সূত্রেই। ওই ব্যবসায়ী মাঝে মাঝেই বিদেশে যান ব্যবসার কাজে। তাও এখন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার নজরে।
এই পরিপ্রেক্ষিতেই ফের সারদাকাণ্ডের তদন্তের মতোই নারদকাণ্ডেও সামনে চলে এলেন মুকুল রায়। সারদা তদন্তেও একবার জেরার পরেই কার্যত তদন্তের গতিও শ্লথ হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয়বার জেরার মুখে পড়তে হয়নি মুকুল রায়কে। নারদকাণ্ডে ইতোমধ্যে এক দফায় জেরার মুখে পড়েছেন তিনি। সারদাকাণ্ডেই তৃণমূলের আয় ব্যয়ের নথি চেয়েছিল সি বি আই। ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আয় ব্যয়ের হিসাব। ততক্ষণে মুকুল রায়কে তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সুব্রত বক্সির নামে চিঠি পৌঁছায়। অনেক টালবাহানার পরে তৃণমূল সেই তথ্য দেয়। তাতে অসংগতিও মেলে। যদিও সেই তদন্ত আশ্চর্যজনক বোঝাপড়ার খেলায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
এবার গোপনে সেই মারণাস্ত্রই কি তুলে দেওয়া হলো কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে? কিছুদিন আগেই তৃণমূলের আর্থিক নয়ছয়ের জবাব চেয়ে চিঠি দিয়েছিল আয়করদপ্তর। হেলিকপ্টার চড়া, ভোটের সময় প্রচারে খরচ, খবরে কাগজ বিজ্ঞাপন, হরিয়ানার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টসহ প্রায় ২৪ কোটি টাকার কোন হিসাবই আয়করদপ্তরকে দেখায়নি তৃণমূল কংগ্রেস। স্বাভাবিকভাবে নির্বাচন কমিশনেও ভ্রান্ত হিসাব জমা দেওয়া হয়েছে। অডিট রিপোর্ট থেকে বেমালুম ‘উধাও’ ২৪কোটি টাকা।
সেই উত্তর এখনও দিতে পারেনি তৃণমূল।
সেই উত্তর, কেলেঙ্কারির যাবতীয় নথি কি রয়েছে বৃহস্পতিবার দুপুরে সি বি আই দপ্তরে জমা পড়া ফাইলে?
সুত্র : গনশক্তি
No comments:
Post a Comment