কাকদ্বীপ : অভাবকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে স্বপ্নের সিড়িতে পা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর। অভাব তার নিত্য সঙ্গী। প্রতিবন্ধকতা তার স্বপ্নের সোপান। দারিদ্রতা তার অন্তহীন আকাশ। সীমাহীন স্বপ্নে বেঁচে থাকাই তার প্রয়াস। সংগ্রামী জীবন তাই প্রতিমুহূর্তে তাকে দিয়েছে আঘাত। তবুও হাল ছাড়তে নারাজ দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার কাকদ্বীপের রাজনগর শ্রীনাথগ্রামের একরতি ছেলেটা সোমনাথ রাউৎ।জন্ম থেকেই জীবন-সংগ্রামে ব্রতী সে। জীবনের অর্থ তার কাছে রূঢ়। তবুও এগিয়ে চলার শপথ গ্রহণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সোমনাথ। মায়ের অজানা স্বপ্ন আজ তার দু’চোখে ভরে। মায়ের আবছা মুখ শুধুই স্মৃতি। পৃথিবীকে ঠিকমতো চেনা’ই হয়নি তখন। বয়স মাত্র ২। কোন অজানা অভিমানেই মা ছেড়ে চলে গিয়েছেন তার। মায়ের মৃত্যুর পর ঠাকুমা ও ঠাকুরদার কাছেই তার বেড়ে ওঠা। অভাবের সংসার চালাতে বাবাও পাড়ি দিয়েছিলেন কলকাতায়। ‘জীবনের লড়াই’ তখন থেকেই বুঝে গিয়ে ছিল সোমনাথ। সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল তার ‘জীবন যুদ্ধ’।
২০১২ সালে আবারও কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় সে। এক পথদুর্ঘটনায় ঠাকুরদা সত্যরঞ্জন রাউতের মৃত্যু হয়। তার দু’বছর পরই বাবা লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। বিনা চিকিৎসায় যন্ত্রণায় ছটফট করে, চোখের সামনে বাবাকে মরতে দেখেছে সোমনাথ। তখন সে সপ্তম শ্রেণী। ঠাকুমার ছোট্ট সংসারে, নিঃসঙ্গ সোমনাথের লড়াই তখন ‘জীবনের সঙ্গে’। তবুও হার মানতে নারাজ সে। ঠাকুমার বিধবা ভাতার ৭০০ টাকা ও ছাত্র পড়িয়ে নিজের সামান্য আয়ের টাকায়, সংসার চালানোই ছিল তার কাছে বড় পরীক্ষা। সে পরীক্ষায় হাসতে হাসতেই পাস করেছে সোমনাথ।
এরপর শুরু হল তার স্বপ্নের লড়াই। অদম্য জেদ আর অধ্যাবসায়ের ফলে সব প্রতিবন্ধকতাকে কাটিয়ে, স্বপ্নের লক্ষ্যে এগিয়ে চলল সে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সহানুভূতি, তাকে দিল এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা। দৃঢ়চেতা সোমনাথ সংখ্যার কাটাকুটি খেলা খেলতে খেলতে, জীবনের প্রথম পরীক্ষাতেও আজ সে উত্তীর্ণ।
মাধ্যমিক পরীক্ষায় কাকদ্বীপের রাজনগর শ্রীনাথগ্রাম বাণী বিদ্যাপীঠের প্রথম স্থানাধিকারী সোমনাথ। তার প্রাপ্ত নম্বর ৬৩৯। সোমনাথের মাধ্যমিকের ফলাফলে খুশি তার স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা থেকে শুরু করে এলাকাবাসী। এখন সোমনাথের স্বপ্ন, আরও পড়াশুনা করে গণিতের অধ্যাপনা করা। গণিতের ওপর গবেষণাও করতে চায় সোমনাথ। তবে তার কাছে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘অভাব’। সোমনাথের কথায়, ‘গৃহ শিক্ষকতা করে আগামী দিনে পড়াশুনা চালিয়ে যাব।’ তবে গৃহ শিক্ষকতা করার পর, নিজের সাফল্যকে ধরে রাখা নিয়ে, তার সংশয় রয়েছে।

No comments:
Post a Comment