ক্রেতার অপেক্ষায়: হোম গার্ডের সৃষ্টি অনবদ্য শিল্পকর্ম - Breaking Bangla

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Thursday, 6 September 2018

ক্রেতার অপেক্ষায়: হোম গার্ডের সৃষ্টি অনবদ্য শিল্পকর্ম


অর্ক রায়, মালদা : হাতে আর মাত্র কয়েকটা দিন, বাঙালির বারো মাসের তের পবনের দুয়ারে করাঘাত করছে দুর্গাপুজো। মালদা শহরের ক্লাব গুলিতে এখন চরম ব্যস্ততা, ব্যস্ততা জেলার কুমারটুলিতেও। এর ফাঁকেই নিঃশব্দে ,সৃষ্টি সুখের উল্লাসে নিজের বাড়িতে বসে, হারিয়ে যাওয়া শিল্পকে, নিজের তৈরি দুর্গা প্রতিমার মাধ্যমে ফিরিয়ে আনতে ব্যস্ত ,মালদায় কর্মরত রাজ্য পুলিশের এক হোম গার্ড। নাম বিষ্ণুপদ সাহা। বিষ্ণু বাবুর এবারের সৃষ্টি 'বিশ্ব উষ্ণায়ন'। হ্যাঁ আজ পৃথিবীর কাছে সবথেকে উদ্বেগের বিষয় কেই এবারে বিষ্ণু বাবু তুলে নিয়ে আসছেন তাঁর সৃষ্টিতে। এই সৃষ্টিতে তার মাধ্যম বাঁকুড়া-বিষ্ণুপুরের হারিয়ে যাওয়া ডোকরা শিল্প। মাছের জাল তৈরির সুতো, বিভিন্ন ফেলে দেওয়া জিনিস কে হাতিয়ার করে এবারে মালদা জেলায় কর্মরত এই হোমগার্ড তৈরি করে ফেলেছেন ডোকরা শিল্পের আদলে আস্ত এক দুর্গা প্রতিমা। দীর্ঘ প্রায় এক বছরের পরিশ্রমে সৃষ্টি, এই দুর্গা প্রতিমার বরাত এখনো জোটেনি শিল্পীর কপালে, কিন্তু তাতে কি? তিনি যে জাত শিল্পী।তাই অর্থের দিকে না তাকিয়ে কেবলমাত্র সৃষ্টির আনন্দে তিনি এখন ব্যস্ত শেষ মুহূর্তের কাজে। আর্থিকভাবে অনেকটাই দুর্বল বিষ্ণুপুর নেশা এই প্রতিমা তৈরি। প্রতি বছরই নতুন নতুন কিছু তৈরি করে তিনি চমকে দিন জেলাবাসীকে। তার তৈরি শিল্পকর্মে থাকে প্রতিবছরই সমাজ কল্যাণের বার্তা। কখনো ফেলে দেওয়া কাগজ, কখনো টায়ার-টিউব, সুপারি, নারকেলের খোলা বা বিভিন্ন ধরনের ফেলে দেওয়া জিনিসপত্র ব্যবহার করে প্রতিবছরই শারদ উৎসবে বিষ্ণুপুর হাতের ছোঁয়ায় উঠে আসে এক অনবদ্য শিল্পকর্ম।

প্রায় এক বছরের চেষ্টায় এবারে বিষ্ণু বাবু তুলে এনেছেন বাঁকুড়া বিষ্ণুপুর এর হারিয়ে যাওয়া ডোকরা শিল্প কে। প্রথমে ঘরের কাঠামো তারপরে প্লাস্টার অব প্যারিস এর প্রলেপ তার উপরে মাছের জালের সুতো আর সেই সুতো দিয়েই মায়ের সারা শরীরে কারুকার্য গয়না তৈরি দীর্ঘ পরিশ্রম আর অসীম ধৈর্যের কাজ, প্রায় ৩০ কিলো সুতো, আঠা ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র ।খরচ প্রায় ৩৫ হাজার টাকা।
মাসে বেতন ১০ থেকে ১২ হাজার, রয়েছে একমাত্র মেয়ের পড়াশোনার খরচ, অভাবের সংসারে নিজেদের খরচ বাঁচিয়ে গড়ে তুলেছেন এই অনবদ্য শিল্পকর্ম। কিন্তু এই শিল্পকর্ম কিনতে এখনো কোন ক্লাব বা প্রতিষ্ঠান যোগাযোগ করেনি। চিন্তা বাড়ছে ।কিন্তু তাতে কি? বিষ্ণু বাবুর কথায়, 'আমি তো পয়সা লাভের আশায় শিল্পকর্ম করিনা, এটা আমার নেশা বলতে পারেন ।জীবন তাই নেশার টানে ছুটে যায় বারবার ,শত বাধা-বিপত্তি আর অভাব-অনটন কে উপেক্ষা করেও, মানুষ তাকিয়ে থাকে যে।'তাই সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর বছরভর ফাঁকে ফাঁকে চলে শিল্প সৃষ্টি, চলে সমাজকে সচেতন করার কাজ। এ কাজে অর্থ হয়তো সেভাবে উপার্জন করতে পারেননি তিনি, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা সম্মান পেয়েছেন প্রচুর। আর এতেই আপ্লুত শিল্পী।
এবারে ডোকরা শিল্পের আদলে তৈরি দুর্গা প্রতিমার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে মায়ের এক হাতে অস্ত্রের বদলে পৃথিবী রয়েছে। দুর্গা বাবুর ভাবনা, বলতে পারেন প্রার্থনাও অস্ত্র হাতে যেভাবে একদিন মা দুর্গা পৃথিবী কে রক্ষা করেছিলেন, আজও তেমন বিশ্ব উষ্ণায়ন থেকে মানব জাতিকে রক্ষা করুন দেবী।
দুর্গাপদ বাবুর স্ত্রী ও বিভিন্ন সময় সাহায্য করেন তাকে। অলংকার তৈরি, আঠা লাগানো, কখনো বা অন্য ধরনের কাজ, সবসময়ই শিল্পী স্বামীর পাশে হাজির স্ত্রী। জানালেন, প্রথম প্রথম খুবই অসুবিধা হতো কারণ, সৃষ্টির আনন্দে মেতে থাকা বিষ্ণুপদ বাবু কাজের ফাঁকে প্রায় সারাক্ষণই ব্যস্ত থাকেন তার শিল্পকর্ম নিয়ে। ফলে সংসারের দিকে তেমন নজর দিতে পারেন না তিনি। প্রথমদিকে রাগ হলেও এখন মানিয়ে নিয়েছি ।জানি এই শিল্পী ওর জীবন তাই সৃষ্টিকে বাদ দিয়ে কখনই ভালো থাকতে পারবেন না স্বামী ।'তাই এই শিল্পকর্মে স্বামীর পাশে যোগ্য সহধর্মিনী হিসেবে সর্বসময়ের সঙ্গিনী হিসেবে স্বামী স্ত্রী ও।
দীর্ঘ এক বছরের কঠিন অধ্যাবসায় আর পরিশ্রমের মাধ্যমে একটু একটু করে অনবদ্য হয়ে উঠেছে সুতোর তৈরি মা দুর্গা। এক হাতে পৃথিবীর ভার নিয়ে, মা তৈরি বিশ্ব উষ্ণায়ন রোধেও। এখন দেখার মায়ের আশীর্বাদে, পেশায় ও হোমগাড, শিল্পী বিষ্ণুপদ বাবুর আর্থিক অনটন আর অভাব কেটে গিয়ে, সুখ আর সমৃদ্ধির আলোতে ভরে ওঠে কিনা শিল্পীর ভাঙাচোরা কুটির। শিল্পের যোগ্য মর্যাদা দিতে, বিষ্ণু বাবু অনবদ্য শিল্পকে কিনতে এগিয়ে আসে কিনা,কোন ক্লাব বা প্রতিষ্ঠান।

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad