‘মা আমাকে কেটে কুটে রান্না করেছিলেন’ - Breaking Bangla

Breaking

Post Top Ad

Post Top Ad

Saturday, 1 September 2018

‘মা আমাকে কেটে কুটে রান্না করেছিলেন’





সেই দিনটির কথা এখনও স্পষ্ট মনে আছে সুসান্নাহ বার্চের। তার মা ছুরি দিয়ে গলা কেটে তাকে ওভেনে ঢুকিয়ে আস্ত রোস্ট করতে শুরু করেছিলেন। ভাগ্য গুণে বেঁচে যায় শিশু সুসান্নাহ।

এটি ১৯৮৯ সালের ঘটনা। তখন বার্চের বয়স মাত্র দুই বছর। তারা তখন কুইন্সল্যান্ড অঞ্চলের ডলবি শহরের ছোট বাড়িতে থাকত। সেদিন সকালে তার বাবা জন অ্যান্ড্রু টেলিভিশনে কিছুক্ষণ ক্রিকেট খেলা দেখে রোজকার মতো কাজে চলে যান। তার মা লিন্ডা তখন তাদের একমাত্র মেয়েকে হত্যা করে রান্নার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। অবশ্য এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না বার্চের বাবা।

লিন্ডা তার মেয়েকে বলি দেয়ার ধারণাটি পেয়েছিলেন ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকে। ইহুদিদের এই ধর্মীয় পুস্তকটিতে একটি পংক্তিতে ইব্রাহিম নবী কীভাবে তার পুত্র ইসহাককে সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে উৎসর্গ করেছিলেন তার বর্ণনা রয়েছে। অবশ্য কোরআনের বর্ণনা এখানে ইসমাইলকে উৎসর্গ করার কথা বলা আছে। সম্ভবত, এটি পড়ার পর লিন্ডার মাথায় নিজের ঈশ্বরের উদ্দেশে বলি দেয়ার পরিকল্পনা আসে। ‘আমার স্পষ্ট মনে আছে মা সব্জি কাটার ছুরিটি গরম পানিতে সিদ্ধ করছিলেন।’ এভাবেই ২৫ বছর আগের ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন ২৭ বছরের সুসান্নাহ। জবাই করার আগে মা তাকে পরিষ্কার পাজামা পরান। বাইবেলের বর্ণনা মতোই তার গায়ে তেল মাখানো হয। এরপর গলা কাটার জন্য তাকে শোয়ান হয়।
.
সুসান্নাহ সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এবিসি রেডিওকে বলেন, ‘আমার এখনও সেই ছুরিটার কথা স্পষ্ট মনে আছে। ছুরিটি ধীরে ধীরে নেমে আসছে আমার মুখের ওপর।’ বাধা দিতে সে তার কচি হাত দুটো দিয়ে ছুরিটাকে ধরে ফেলে। কিন্তু এর আগেই লিন্ডা তার শ্বাসনালী আর ভোকাল কর্ড কেটে ফেলতে সমর্থ হন। এরপর তার গোটা দেহ ওভেনে ঢুকিয়ে দেন। প্রায় ৪০ মিনিট তাকে রান্না করেন মা।

তার বাবা জন এন্ড্রু বলেন, ‘সে আমকে বলেছিল দীর্ঘ ৪০ মিনিট ধরে সে সুসান্নাকে ওভেনে জ্বাল দিয়েছে। এ সময় সুসান্নার মাথা নীল হয়ে যায়।’ তখন লিন্ডার হঠাৎ খেয়াল হয়, ‘আরে ওতো এখনও বেঁচে আছে। না মরা পর্যন্ত তো আমি ওকে ওভেনে দেতে পারি না।’ এসময় নিজের অসুস্থতার কথাও মনে পড়ে যায় তার। তখন সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত লিন্ডা ডলবির পুলিশ স্টেশনে ফোন করে ঘটনাটি জানায়।

খবর পেয়ে পুলিশ সদস্যরা ছুটে আসেন এবং  তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। খবর যায় সুসান্নাহর বাবার কাছেও। এন্ড্রু বাড়ি ফিরে দেখেন, তার স্ত্রীকে পুলিশী হেফাজেতে নেয়া হয়েছে এবং মেয়েকে নেয়া হয়েছে হাসপাতালে। হাসপাতালে সঠিক পরিচর্যায় সুস্থ হয়ে ওঠে শিশু সুহান্না।
.
সুসান্নার অন্ননালীতে অস্ত্রোপচার করা হয়। শ্বাস-প্রশ্বাস পরিচালনার জন্য তার কণ্ঠনালীতে বাইরে থেকে একটি নল ঢুকানো হয়। উন্নত চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে সেরে ওঠে সুসান্না। সেদিনের ঘটনা স্মরণ করে এখনো কাঁদেন বাবা এন্ড্রু। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর নার্স সুসান্নাকে ডেকে বললেন, ‘এই যে তোমার বাবা এসেছে।’ তখন মেয়ে তার ব্যান্ডেজ করা হাত দুটি দিয়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে।

সুসান্নার হাতের আঙ্গুলগুলোতে এখনো রয়ে গেছে নীল সেলাইয়ের দাগ। মায়ের ছুরির আঘাত ঠেকাতে গিয়েই তার আঙ্গুল কাটা যায়। উন্নত চিকিৎসার পরও সুসান্না আর কথা বলতে পারবে কি না তা নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যেও সংশয় ছিল। কিন্তু সব শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে ছয় সপ্তাহ পর চিঁ চিঁ গলায় বাবাকে ডেকে ওঠে শিশু সুসান্না। ওদিকে মানসিক রোগী লিন্ডাকেও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

দীর্ঘ তিন মাস পালা করে মেয়ে আর স্ত্রীর দেখভাল করেন এন্ড্রু। এটা তার জন্য খুবই কঠিন ছিল। কেননা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজনকেও তার স্ত্রীর অসুস্থতা সম্পর্কে বুঝাতে হয়েছে। নইলে লিন্ডাকে কারাদণ্ড ভোগ করতে হতো। সুসান্নাহ যখন তিন বছরের তখন সে বাবাকে বলত, ‘মা আমার গলা কেটে ফেলেছে।’ তখন মেয়েকে তার মায়ের অসুস্থতার কথা বুঝিয়ে বলতে হতো। তাকে বুঝাতে হতো, মা এটা ইচ্ছা করে করেনি।

দীর্ঘ এক বছর মানসিক হাসপাতালে চিৎকিসা নেয়ার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসেন লিন্ডা। এ নিয়ে অবশ্য মায়ের সঙ্গে তেমন কথা হতো না তার। বাড়িতে এ নিয়ে কথা বলা ছিল বারণ। শিশু সুসান্না তখন খেলাধূলা আর লেখাপড়ায় ব্যস্ত থাকত। তার যখন ১৩ বছর বয়স তার মা আবারো মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তার বাবা- মায়ের বিয়ে ভেঙে যায়। তখন অবশ্য সে এ বিষয়টি নিয়ে সবার সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে পারত। আরো একটু বড় হওয়ার পর সে সবার কাছে এই গল্প করত। সে বলতো, ‘জানেন, আমার মা না আমার গলা কেটে ফেলেছিল।’ তখন পরিবারের অন্যরা মজা করে বলতো, ‘ভাগ্যিস তোমাকে জ্যান্ত রোস্ট করে ফেলেনি।’
আরো বেশ কয়েক বছর পর সে তার মায়ের অবস্থাটা অনুভব করতে পারে। সে বলে, ‘আমি বেশ বুঝতে পারি, আমার মা অসুস্থ থাকায় এরকম ঘটনা ঘটিয়েছিল। এখন আমি যদি তাকে সাহায্য না করি তাহলে সেটা অন্যায় হবে।’ পরে সুসান্নার কণ্ঠনালীতে লেজার অপারেশন করা হয়। এর আগে তার গলার পাইপটি তিন দিন অন্তর বদলাতে হতো। এই অস্ত্রোপচারের পর প্রথমবারের মতো স্কুলে যাওয়ার অনুমতি মেলে।

সুসান্নার বয়স এখন ২৭। সে একজন লেখিকা। বিভিন্ন ব্লগ এবং ফেসবুকে সে লেখালেখি করে। পাশাপাশি মানসিক রোগে আক্রান্তদের জন্য অ্যাডভোকেসি করে থাকেন।

২০০৫ সালে বিয়ে করেছেন। স্বামী ডেভিড এবং দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে তার সুখের সংসার। তবে তার মধ্যে এখনও নাইফ ফোবিয়া রয়ে গেছে। এজন্য কোথাও গেলে ভালো করে দেখে নেন, কারো কাছে ছুরি-চাকু আছে কি না!

No comments:

Post a Comment

Post Top Ad