অর্ক রায়, মালদা : এ এক অন্য স্বপ্না বর্মন এর গল্প। জলপাইগুড়ির সোনার মেয়ে সপ্নার স্বপ্ন পূরণ হলেও, এখনো অধরা মালদা শহরের অভিরামপুর এর হরিজন বস্তিতে ৮ বাই ৬'ফুটের ঘরে থাকা রঞ্জিত আর কমলা ডোমের ছোট ছেলের স্বপ্ন।
মালদা শহরের অভিরামপুর এর পুলিশ লাইনের গা ঘেঁষে যাওয়া রাস্তাটার ধারেই ছোট্ট বস্তিতে, বৃদ্ধ মা বাবা, দাদা ,স্ত্রী আর ছোট দুই সন্তান নিয়ে বাস ৩২ বছর বয়সী রবি মল্লিকের।
তার বস্তির অন্যান্য ছেলেরা যখন ব্যস্ত বিভিন্ন অসামাজিক কাজে, তখন রবির নেশা ফুটবল। ছোটবেলা থেকেই চরম দারিদ্র্য অভাব-অনটন কে সঙ্গী করেই ধীরে ধীরে বড় হওয়া। এক সময় দুবেলা পেটভরে ভাতও জুটতো না। কিন্তু ছোট থেকেই চোখে স্বপ্ন ছিল বড় ফুটবলার হওয়ার । কিন্তু স্বপ্ন পূরণের জন্য দরকার ছিল, একটা ফুটবল আর জুতোর। ইংরেজবাজার পৌরসভা কর্মরত হরিজন রঞ্জিত ডোম এর কাছে যা ছিল কিছুটা বিলাসিতার ই সমান, তাই বোধহয় কোনদিনই রবির বাবা আগ্রহ দেখাননি এসব কিনে দিতে। ফুটবলের প্রতি ও তেমন আগ্রহও ছিল না, দিন আনি দিন খাই এই মানুষটির। তাতে কি? ছেলের চোখে যে তখন বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন। তাই জুতো আর বল কেনার টাকা জোগাড় করতে না পারলেও, থেমে থাকেনি তার অধ্যাবসায় আর উদ্যম। ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়, এই মূলমন্ত্রকে পাথেয় করে ই, সাফাইয়ের কাজে বাবাকে সাহায্য করতে প্রতিদিন সকালে বেরিয়ে পরতো রবি। সাফাই এর পাশাপাশি রাস্তা থেকে বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক কুরিয়ে বাড়ি ফিরে সেই প্লাস্টিক বেঁধেই তৈরি হয়ে যেত বল, বাকিটা পায়ে বেঁধে জুতো। এরপর আশেপাশে থাকা কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে নেমে পড়া বাড়ির সামনে থাকা পুলিশ লাইনের মাঠে। সবুজ মাঠে এই প্লাস্টিকের বল আর জুতো ই ঝড় তুলত বিভিন্ন সময়। প্রখর রোদ, বৃষ্টি সবকিছ কেই উপেক্ষা করে প্লাস্টিকের বলেই ফুটে উঠত রবির পায়ের জাদু!
কঠিন দারিদ্রতাকে হারিয়ে প্রবল অধ্যবসায় আর জেদই রবিকে আজ রবিকে পৌঁছে দিয়েছে সাফল্যের শিখরে। কারণ, তার ফুটবল শৈলীতে মুগ্ধ সর্বভারতীয় ফুটবল সংস্থা ২০১৮ সালে জাতীয় দলের জন্য নির্বাচিত করেছেন তাকে। সারা বিশ্বের গৃহহীন বস্তিবাসীদের এগিয়ে নিয়ে আসার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ফিফার উদ্যোগে হোমলেস ফুটসোল বিশ্বকাপ হয়ে থাকে ।এবছর মেক্সিকোতে বসছে বিশ্বকাপ ফুটবলের এই 'ফুটসোল ২০১৮'এর আসর। ইতিমধ্যেই জাতীয় স্তরে ১৫ জনের ভারতীয় দলের নাম ঘোষিত হয়েছে। এই তালিকায় রবি মল্লিক ওরফে কালুর নাম রয়েছে ৮ নম্বরে। আগামী অক্টোবর মাসেই দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এই জাতীয় দলের অনুশীলন শিবিরে যোগ দেবেন কালু। এখন তাই তারই প্রস্তুতিতে পুলিশ লাইনের সবুজ মাঠে সঙ্গীদের নিয়ে অনুশীলনে ব্যস্ত কালু। কখনো তার সমবয়সী কখনোবা তার বস্তিতে থাকা ছোট ছোট শিশুরাই তার এই যুদ্ধের প্রস্তুতির সঙ্গী। রবির এই সাফল্যে খুশি তার সমস্ত বস্তিবাসী। খুশি সেই সমস্ত মানুষগুলোও, যারা কোনদিনই সামান্যতম সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেননি রবির এই জীবন যুদ্ধে। তারাই আজ সবচেয়ে আগে এগিয়ে এলেন আমাদের ক্যামেরা দেখে, শোনালেন তার সাফল্য আর লড়াইয়ের কথা। রবির কথায় 'এটাও আমার একটা বড় প্রাপ্তি। দাদা, আমি জীবনে বড় হতে চাই । অনেক বড় নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। আর যদি কোনদিন কিছু হতে পারি সেদিন আমার অনেক ইচ্ছে এর মধ্যে একটা ইচ্ছে থাকবে, আমার মত অসহায় হতদরিদ্র যে সমস্ত মানুষ ঠিকমত খেতে পান না, মাথার ওপর ছাদ পান না,
তাদের জন্য কিছু করার। আমি অভুক্তদের খাওয়াতে চাই, কারণ আমি জানি খিদের জ্বালা কি হয়।'
'ফুটসোল বিশ্বকাপ ২০১৮' তে ভালো কিছু করে দেখানোর তাগিদটা এখন থেকেই রবির চোখে মুখে স্পষ্ট। সকালে ভোরের আলোয় পাখির ডাক এর সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ লাইনের মাঠের সবুজ ঘাস কে সঙ্গী করে চলছে কঠোর অনুশীলন, সকাল থেকে সন্ধ্যে শুধু নিজেকে প্রমাণ করার লড়াই। রবির কথায় ভারতের ১৮ জনের মধ্যে ৮ নম্বরে আমার নাম আছে। আমি গর্বিত, এখনো কোন কাজ পাইনি, খেলায় আমার জীবন। মাত্র ১০ বছর বয়স থেকেই ফুটবল খেলা দেখতাম, আর এই দেখতে দেখতেই কখন যে ফুটবল কে ভালোবেসে ফেলেছি নিজেই জানিনা। এখন তো নেশা, ফুটবল ছাড়া বাঁচতেই পারব না। ফুটবলকে মাধ্যম করেই জীবনে আমাকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। ভালো কিছু করতেই হবে নিজের জন্য ,দেশের জন্য। বহু মানুষের ঘৃণা আর তাচ্ছিল্য যেমন পেয়েছি তেমনি জীবনে বহু মানুষ এগিয়ে এসেছেন আমার এই প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে। সুজাপুর এর সাদ্দাম নামে এক দাদাই আমাকে প্রথম কলকাতায় নিয়ে যান। মূলত তার উদ্যোগ এবং সাহায্যেই আমি জাতীয় দল নির্বাচনের শিবিরে জায়গা পায়। পরে সেখান থেকেই আমি মেক্সিকোয় জাতীয় দলের হয়ে ফুটবল খেলার সুযোগ পেয়েছি।'
মালদার ছোট্ট বস্তি থেকে জাতীয় দলে জায়গা ।এই সফরটা খুব একটা সহজ ছিল না রবির কাছে। স্থানীয় ক্লাবের হয়ে জেলাস্তরে ফুটবল টুর্ণামেন্টে একবার খেলতে যান রবি সেখানেই সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়ে ৫০ টাকা পুরস্কার পান। এরপর লড়াই শুধু লড়াই, তারপর রাজ্য টিম ,কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলা দলের অধিনায়ক নির্বাচিত হন। এবারে রাজ্যস্তরে জাতীয় প্রতিযোগিতার ফাইনালে কেরালার কাছে ৩-২ ব্যবধানে হেরে যান ।কিন্তু তৃতীয় স্থান নির্ধারণের খেলায় তারা বাংলার হয়ে মহারাষ্ট্র কে ৩-১ গোলে হারায় । এরপরই নাগপুরে বসে 'হোমলেস ফুটসোল বিশ্বকাপ ২০১৮' দলের নির্বাচনী ক্যাম্প। সেখানেই তিনি জাতীয় দলের খেলোয়াড় হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এখন একটাই ভাবনা, গোটা দুনিয়ার সামনে দেশের নাম উজ্জ্বল করতে হবে। সঙ্গে অবশ্যই রয়েছে পরিবারের ভাবনা, পরিবারের সাথে থাকা বৃদ্ধ মা-বাবা, স্ত্রী এবং ছোট্ট দুটো শিশুর ভাবনা ও।
পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর ভক্ত রবি, ছোট থেকেই ছুটছেন ফুটবলের পেছনে। দারিদ্র, অবহেলা আর বঞ্চনা কে পেছনে ফেলে ছুটছেন রবি। এ লড়াই নিজেকে প্রমাণ করার, সমস্ত বঞ্চনা আর অবহেলার জবাব দিতে তৈরি হচ্ছেন রবি, আগামীতে জীবনের সমস্ত দুঃখ কষ্ট আর অন্ধকারের জাল ছিন্ন করে রবির পায়ের থেকে ছিটকে আসা বল, তাকে এবং তার মতো ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রতিভাকে নতুন কোন আলোর সন্ধান দিতে পারে কিনা এখন তারই অপেক্ষায় রবির সঙ্গে প্রায় ৪০ লক্ষ মালদাবাসীও।



No comments:
Post a Comment